পবিত্র ঈদুল আজহা যত ঘনিয়ে আসছে, ততই জমে উঠছে কোরবানির প্রস্তুতি। আর সেই প্রস্তুতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে পশু জবাই ও গোশত প্রস্তুতের সরঞ্জাম তৈরির কাজ। মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার বিভিন্ন কামারপল্লী ও হাট-বাজারে এখন চলছে কর্মচাঞ্চল্যের ব্যস্ততম সময়। দা, বঁটি, ছুরি ও চাপাতি তৈরিতে দিন-রাত এক করে কাজ করছেন কামার শিল্পীরা। আগুনের লেলিহান শিখা আর হাতুড়ির টুংটাং শব্দে মুখর হয়ে উঠেছে পুরো এলাকা।
শিবচর উপজেলার ১৮টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার বিভিন্ন বাজারে এখন কোরবানির সরঞ্জামের জমজমাট বেচাকেনা চলছে। বিশেষ করে পাচ্চর বাজার, পৌরসভার চকবাজার, মাদবরেরচর হাট, চান্দেরচর হাট ও ভেইলি ব্রিজ বাজার এলাকায় কামারদের দোকানে উপচেপড়া ভিড় লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কেউ নতুন সরঞ্জাম কিনতে আসছেন, আবার কেউ পুরোনো দা-ছুরি শান দিতে ভিড় করছেন। ঈদের আগে শেষ মুহূর্তের এই ব্যস্ততায় দম ফেলারও ফুরসত নেই কামার শিল্পীদের।
সরেজমিনে বিভিন্ন কামারশালায় গিয়ে দেখা যায়, কয়লার আগুনে লোহা গরম করে তা হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে প্রয়োজনীয় আকার দেওয়া হচ্ছে। পরে পানিতে ঠান্ডা করে ধারালো শান দেওয়া হচ্ছে এবং কাঠের হাতল লাগিয়ে বিক্রির জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে। ভালো মানের দা ও ছুরি তৈরিতে ব্যবহার করা হচ্ছে গাড়ির স্প্রিংয়ের উন্নতমানের ইস্পাত।
কামার শিল্পীরা জানান, বছরের অধিকাংশ সময় তাদের তেমন কাজ থাকে না। সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হয়। তবে ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে কয়েকদিনের এই ব্যস্ততাই তাদের বছরে সবচেয়ে বড় আয়ের সুযোগ এনে দেয়।
পাচ্চর বাজারের কারিগর বিরেন চন্দ্র সরকার কামার বলেন,“কোরবানির সরঞ্জামের অর্ডার এখন পুরোদমে চলছে। তবে গত বছরের তুলনায় লোহা ও কয়লার দাম অনেক বেড়েছে। তাই বাধ্য হয়েই সরঞ্জামের দাম বাড়াতে হয়েছে। এতে অনেক ক্রেতা অসন্তোষ প্রকাশ করছেন।”
একই বাজারের আরেক কারিগর ঝন্টু কর্মকার বলেন,“এখন হার্ডওয়্যারের দোকান ও ভ্যানগাড়িতে তৈরি সরঞ্জাম সহজেই পাওয়া যায়। ফলে আগের মতো সরাসরি অর্ডার কমে গেছে। তারপরও ঈদের সময় অতিরিক্ত শ্রমিক নিয়ে কাজ করতে হচ্ছে।”
বর্তমানে বড় ছুরি বিক্রি হচ্ছে এক হাজার থেকে দেড় হাজার টাকায়। চাপাতির দাম ৮০০ থেকে ১২০০ টাকা পর্যন্ত। এছাড়া দা, বঁটি ও ছোট ছুরি প্রকারভেদে ৬০০ টাকা কেজি বা তারও বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে বলে জানান কারিগররা।
মাদবরেরচর হাটে ছুরি ও চাপাতির অর্ডার দিতে আসা জাকির হোসেন বলেন,“গত বছরের সরঞ্জাম অযত্নে নষ্ট হয়ে গেছে। তাই এবার নতুন করে কিনতে এসেছি। তবে আগের তুলনায় দাম অনেক বেশি।”
মাদবরেরচর হাটের প্রবীণ কারিগর সুবোধ কর্মকার, যার কর্মচারী রয়েছেন চারজন, তিনি বলেন,“আগে মানুষ দা দিয়ে গরু জবাই করত। এখন বড় একটি ছুরি দিয়েই পুরো মাঠের গরু জবাই দেওয়া যায়। তবে ছোট ছুরি ও চাকুর চাহিদা বেশি। চাঁদ রাতে সবচেয়ে বেশি ভিড় হয়। এ মৌসুমে প্রায় এক লাখ টাকার বেশি লাভ হবে বলে আশা করছি।”
তবে আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার এবং বাজারে তৈরি পণ্যের সহজলভ্যতার কারণে ঐতিহ্যবাহী কামার শিল্প আগের মতো জমজমাট নেই বলে জানান অনেক কারিগর। তারপরও কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে কয়েকদিনের এই ব্যস্ততাই তাদের মুখে হাসি ফোটাচ্ছে।
আগামী ২৮ মে পবিত্র ঈদুল আজহা অনুষ্ঠিত হবে। ঈদকে সামনে রেখে শিবচরের কামারপল্লীগুলোতে এখন যেন উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে। কয়লার আগুনে রক্তিম হয়ে ওঠা লোহা আর হাতুড়ির অবিরাম আঘাতে তৈরি হচ্ছে কোরবানির অপরিহার্য সরঞ্জাম। টুংটাং শব্দে মুখরিত কামারশালাগুলো যেন জানান দিচ্ছে—দোরগোড়ায় কড়া নাড়ছে পবিত্র ঈদুল আজহা।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

