জাতীয় গ্রিড থেকে টানা পাঁচ দিন ধরে গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ থাকায় নেত্রকোণায় স্বাভাবিক জনজীবন কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। বাসাবাড়িতে রান্নাবান্না ব্যাহত হচ্ছে, জেলার একমাত্র সিএনজি ফিলিং স্টেশন বন্ধ রয়েছে এবং পরিবহন ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে জেলা সদর হাসপাতাল, জেলা কারাগার ও পুলিশ লাইন্সের মতো গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠানও চরম সংকটে পড়েছে। এতে তিতাস গ্যাসের আওতাধীন জেলার প্রায় ৫ হাজার ৬০০ গ্রাহক দুর্ভোগে পড়েছেন।
জাতীয় পর্যায়ে এলএনজি টার্মিনালের কারিগরি ত্রুটির কারণে এ সংকট সৃষ্টি হয়েছে বলে জানিয়েছে তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ। তারা এটিকে সাময়িক সমস্যা উল্লেখ করে দ্রুত সমাধানের আশ্বাস দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, দেশীয় প্রকৌশলীদের পাশাপাশি বিদেশি বিশেষজ্ঞরাও ত্রুটি নিরসনে কাজ করছেন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেই পুনরায় গ্যাস সরবরাহ শুরু হবে।
তিতাস গ্যাস সূত্রে জানা গেছে, নেত্রকোণায় প্রায় ৫ হাজার ৬০০ আবাসিক ও বাণিজ্যিক গ্রাহকের পাশাপাশি একটি সিএনজি ফিলিং স্টেশন, ২৪টি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান এবং ২৯টি সরকারি প্রতিষ্ঠানে গ্যাস সংযোগ রয়েছে। তবে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় গত পাঁচ দিন ধরে জেলায় গ্যাসের চাপ কার্যত শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। যদিও প্রায় দুই সপ্তাহ ধরেই কম চাপের কারণে ভোগান্তি চলছিল।
গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকায় বাসাবাড়িতে রান্নাবান্না মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। পাশাপাশি হোটেল-রেস্তোরাঁ, বেকারি ও অন্যান্য বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক কার্যক্রমেও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। জেলা সদর হাসপাতাল, পুলিশ লাইন্স, জেলা কারাগারসহ বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের রান্না ও দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
জেলার একমাত্র এ.আর. খান পাঠান সিএনজি ফিলিং স্টেশনের স্টেশন ইঞ্জিনিয়ার বোরহান কবির বলেন, প্রায় এক মাস ধরে কম প্রেসারের সমস্যা থাকলেও গত সাত-আট দিন ধরে ইনলেট প্রেসার পুরোপুরি শূন্য। ফলে কোনো যানবাহনে গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। এতে স্টেশনের কার্যক্রম প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে এবং সিএনজিচালিত অটোরিকশা, অ্যাম্বুলেন্সসহ অন্যান্য যানবাহন চরম সংকটে পড়েছে।
তিনি বলেন, তিতাস কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এলএনজি টার্মিনালের কারিগরি ত্রুটি দূর হলেই গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হবে। তবে নেত্রকোণা ময়মনসিংহ অঞ্চলের শেষ প্রান্তে হওয়ায় এখানে গ্যাসের চাপ সবচেয়ে বেশি কমে গেছে।
সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও অ্যাম্বুলেন্স চালকেরা জানান, পর্যাপ্ত গ্যাস না পেয়ে অনেকেই ময়মনসিংহে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও প্রয়োজনীয় পরিমাণ গ্যাস পাচ্ছেন না। ফলে জীবিকার তাগিদে বাধ্য হয়ে ব্যয়বহুল এলপিজি ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় প্রতি ট্রিপে অতিরিক্ত ১০ থেকে ২০ টাকা ভাড়া নিতে হচ্ছে, যা নিয়ে যাত্রীদের সঙ্গে প্রায়ই বাকবিতণ্ডার সৃষ্টি হচ্ছে।
চালকদের ভাষ্য, গ্যাস সংকটের কারণে আয় কমে যাওয়ায় অনেকেই গাড়ির কিস্তি পরিশোধ করতে পারছেন না। পরিবার নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটছে। দ্রুত গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করতে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপও দাবি জানিয়েছেন তারা।
নেত্রকোণা জেলা তিতাস গ্যাসের উপব্যবস্থাপক মো. গোলাম মর্তুজা বলেন, জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় নেত্রকোণায় গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। এটি স্থানীয় কোনো সমস্যা নয়, বরং জাতীয় পর্যায়ের একটি সাময়িক কারিগরি সংকট। সমস্যার সমাধানে দেশীয় প্রকৌশলীদের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য থেকে আসা বিশেষজ্ঞ দল কাজ করছে।
তিনি আরো বলেন, আমিও নেত্রকোণার বাসিন্দা এবং তিতাসের একজন গ্রাহক। মানুষের দুর্ভোগ আমি উপলব্ধি করতে পারছি। আশা করছি আগামী পাঁচ দিনের মধ্যে পরিস্থিতির উন্নতি হবে। ততদিন গ্রাহকদের ধৈর্য ধরার অনুরোধ জানাচ্ছি।
এদিকে দীর্ঘস্থায়ী এ গ্যাস সংকটে জনজীবন স্বাভাবিক রাখতে দ্রুত গ্যাস সরবরাহ পুনরায় চালুর পাশাপাশি ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি এড়াতে কার্যকর ও টেকসই পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী গ্রাহক, পরিবহন চালক ও ব্যবসায়ীরা।
এআরবি
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


