বসন্তের আগমনী বার্তায় আমের মুকুলে ছেয়ে গেছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি)–এর ৭৫৩ একর বিস্তীর্ণ সবুজ ক্যাম্পাস। প্যারিস রোড থেকে শুরু করে আবাসিক হল, একাডেমিক ভবন ও বুদ্ধিজীবী চত্বর— সবখানেই আম গাছের ডালে ডালে এখন সোনালি মুকুলের সমারোহ। হালকা মিষ্টি সুবাসে মুখর চারপাশ, যা শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মনে এনে দিচ্ছে নতুন ঋতুর প্রশান্ত আমেজ।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বুদ্ধিজীবী চত্বর, শহীদুল্লাহ কলা ভবন, মমতাজউদ্দীন কলা ভবন, জুবেরী ভবন, বিজ্ঞান ভবন, চারুকলা অনুষদ, কৃষি অনুষদ, কেন্দ্রীয় মসজিদ প্রাঙ্গণ, ইবলিশ চত্বরসহ ক্যাম্পাসের বিভিন্ন সড়ক ও আবাসিক হলের সামনের আমগাছগুলো মুকুলের ভারে নুয়ে পড়ার উপক্রম। মৌমাছির গুঞ্জন আর মুকুলের ঘ্রাণে তৈরি হয়েছে এক মায়াবী পরিবেশ।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র জানায়, ক্যাম্পাসে চার হাজারের বেশি আমগাছ রয়েছে। এর মধ্যে হিমসাগর, ল্যাংড়া, ফজলি ও আম্রপালিসহ বিভিন্ন জাতের গাছ উল্লেখযোগ্য। অধিকাংশ গাছই বহু বছরের পুরোনো। প্রতিবছর বসন্তের শুরুতেই এসব গাছে মুকুল আসে; তবে এ বছর অনুকূল আবহাওয়ার কারণে মুকুলের পরিমাণ তুলনামূলক বেশি বলে জানিয়েছেন উদ্যান শাখার সংশ্লিষ্টরা। টানা শীত ও পর্যাপ্ত রোদ থাকায় গাছে ভালোভাবে মুকুল ধরেছে বলে তারা জানান।
প্রতি বছর ইজারার মাধ্যমে এসব আমগাছ থেকে বিশ্ববিদ্যালয় বড় অঙ্কের রাজস্ব আয় করে। এ বছর মুকুলের আধিক্য দেখে সংশ্লিষ্টরা বাম্পার ফলনের আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। শিক্ষার্থীরাও একই প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন।
হিসাববিজ্ঞান ও তথ্য ব্যবস্থা বিভাগের শিক্ষার্থী রাকিবুল ইসলাম বলেন, এবার গাছের শাখায় শাখায় যে পরিমাণ মুকুল দেখা যাচ্ছে, তা সত্যিই মনোমুগ্ধকর। ভোরের বাতাসে মুকুলের ঘ্রাণ প্রাণচাঞ্চল্য তৈরি করে। প্রশাসনের কাছে আমাদের প্রত্যাশা, যথাযথ পরিচর্যার মাধ্যমে যেন ভালো ফলন নিশ্চিত করা হয়।
রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী মেহেদী হাসান বলেন, আমের মৌসুমে রাবির সৌন্দর্য দ্বিগুণ বেড়ে যায়। চারদিকে মুকুলের সুবাস ক্যাম্পাসকে বিশুদ্ধতার ছোঁয়া দেয়। এই মুকুল থেকে যখন আম হবে, তখন সৌন্দর্য আরো বাড়বে।
যআমের মুকুলের আধিক্যের কারণ ব্যাখ্যা করে বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মুস্তফা আবুল কালাম আজাদ বলেন, আবহাওয়া ও পরিবেশগত কারণের পাশাপাশি এ বছর কুয়াশা তুলনামূলক কম থাকায় মুকুল কম নষ্ট হয়েছে। তিনি আরো জানান, প্রাকৃতিকভাবে অনেক আমগাছ এক বছর বেশি ফলন দেয়, পরের বছর বিশ্রামে থাকে—যা ‘অলটারনেট বিয়ারিং’নামে পরিচিত।
এগ্রোনোমি অ্যান্ড অ্যাগ্রিকালচারাল এক্সটেনশন বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. গিয়াসউদ্দিন আহমেদ বলেন, বসন্তকালে তাপমাত্রা ধীরে ধীরে বৃদ্ধি ও কুয়াশা কমে যাওয়া আমের মুকুল আসার জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে। গত দুই বছর ফলন কম হওয়ায় গাছগুলো পর্যাপ্ত পুষ্টি সঞ্চয় করতে পেরেছে, ফলে এ বছর ফুল ও ফল ধারণের সম্ভাবনা বেশি। তবে নিয়মিত ও সঠিক পরিচর্যা নিশ্চিত না হলে ফলন ব্যাহত হতে পারে বলেও তিনি সতর্ক করেন।
তিনি আরো বলেন, সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান কৃষকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে এবং নির্ধারিত সময়ে ছত্রাকনাশক বা বালাইনাশক ব্যবহারের পরামর্শ দেয়। কিন্তু অনেক সময় অপ্রয়োজনীয় ও অতিরিক্ত স্প্রে পরিবেশ ও মাটির উর্বরতার জন্য ক্ষতিকর হয়ে ওঠে।
সব মিলিয়ে, আমের মুকুলে সেজে ওঠা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এখন যেন সোনালি বসন্তের এক প্রাণবন্ত প্রতিচ্ছবি। অনুকূল আবহাওয়া অব্যাহত থাকলে এ বছর ক্যাম্পাসে বাম্পার আম ফলনের সম্ভাবনা দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

