চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ড

পরিবহন ব্যবসার দ্বন্দ্বে বগুড়ার শাহীন খুন, সাত বছর পরও বিচার ঝুলছে

পরিবহন ব্যবসার দ্বন্দ্বে বগুড়ার শাহীন খুন, সাত বছর পরও বিচার ঝুলছে

বগুড়ার বহুল আলোচিত বিএনপি নেতা, আইনজীবী ও পরিবহন ব্যবসায়ী মাহবুব আলম শাহীন হত্যা মামলার বিচার প্রায় শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছে। তবে হত্যাকাণ্ডের সাত বছর পেরিয়ে গেলেও মামলার নিষ্পত্তি না হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেছেন নিহতের স্বজন ও সহকর্মীরা। একই সঙ্গে তারা অভিযুক্তদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। তবে তারা আক্ষেপ করে বলেন, পরিবহন ব্যবসার আধিপত্য নিয়ে যাদের নির্দেশে শাহীন খুন হয়েছে, সেই ফ্যাসিস্টদের দূরপাল্লার শতাধিক কোচ যথারীতি এখনো চলছে। ২০১৯ সালের ১৪ এপ্রিল রাতে বগুড়া শহরের নিশিন্দারা উপশহর এলাকায় দুর্বৃত্তদের হামলায় নিহত হন মাহবুব আলম শাহীন। ঘটনার দুই দিন পর তার স্ত্রী আকতার জাহান শিল্পী বাদী হয়ে বগুড়া সদর থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন।

প্রসিকিউশনের দাবি, পরিবহন মালিকদের সংগঠনের নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্যকে কেন্দ্র করে পূর্বপরিকল্পিতভাবে এ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়।

বিজ্ঞাপন

যেভাবে হত্যা করা হয়

মামলার নথি অনুযায়ী, ২০১৯ সালের ১৪ এপ্রিল রাত ১১টার দিকে উপশহর বাজার এলাকায় অবস্থানকালে ৮-৯ জনের একটি দল ধারালো অস্ত্র নিয়ে শাহীনের ওপর হামলা চালায়। হামলাকারীরা তার দুই পাসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে এলোপাতাড়ি কোপ দেয়। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে প্রথমে স্থানীয় একটি ক্লিনিকে এবং পরে শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। তৎকালীন ছিলিমপুর পুলিশ ফাঁড়ির এসআই আব্দুল আজিজ মণ্ডল এ তথ্য নিশ্চিত করেছিলেন।

নিহতের ভাতিজা শাহরিয়ার জানান, বগুড়া থেকে ঢাকা যাওয়ার পথে তার চাচার একটি বাসকে শেরপুরের মালিক সমিতি আটক করে। বিষয়টি জানতে পেরে শাহীন বাসা থেকে বের হন। পরে উপশহর বাজার এলাকায় সদরের নুনগোলা ইউপি চেয়ারম্যান আলিমুদ্দিনের সঙ্গে গল্প করার সময় তার ওপর হামলা হয়।

পরিবহন ব্যবসার দ্বন্দ্ব

নিহতের স্ত্রী আকতার জাহান শিল্পীর অভিযোগ, জেলা মোটর মালিক গ্রুপের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধের জের ধরে তার স্বামীকে কয়েক দিন ধরে হত্যার হুমকি দেওয়া হচ্ছিল।

শাহীনের আরেক ভাতিজা মেজবাহর দাবি, মোটর মালিক গ্রুপ নিয়ে দ্বন্দ্ব ছাড়াও উপশহর স্নিগ্ধা আবাসিক এলাকায় জমিকে কেন্দ্র করে তার চাচার কাছে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করা হচ্ছিল।

স্থানীয় আইনজীবীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চারদলীয় জোট সরকারের সময় মাহবুব আলম শাহীন বগুড়া মোটর মালিক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর সংগঠনের নেতৃত্বে পরিবর্তন আসে এবং পরবর্তীকালে নেতৃত্ব নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি হয়। প্রসিকিউশনের অভিযোগ, সে বিরোধের ধারাবাহিকতায় বিএনপি নেতা শাহীনকে হত্যা করা হয়।

¬তদন্ত ও বিচার

হত্যাকাণ্ডের প্রায় নয় মাস পর, ২০২০ সালের ৩০ জানুয়ারি পুলিশ প্রধান আসামি আমিনুল ইসলামসহ ১৪ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে। অভিযুক্ত অন্যরা হলেন— সোহাগ সরদার, আজিজুল ইসলাম কাইলা, সাগর, শাকিল আহম্মেদ, শিপলু মৃধা, সাইদুর, বিপুল (বড়), শাহীন, বিদ্যুৎ, বেলাল হোসেন ওরফে ছোট বিপুল, পায়েল, রুবেল হোসেন ও রাসেল। তাদের মধ্যে বিদ্যুৎ ইতোমধ্যে মারা গেছেন।

দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর ২০২৪ সালে আদালত ১৪ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন। মামলার ২৪ জন সাক্ষীর মধ্যে ইতোমধ্যে ২৩ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ হয়েছে।

বগুড়ার পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট আব্দুল বাছেদ বলেন, তদন্ত কর্মকর্তা আম্বার হোসেন বর্তমানে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে কর্মরত থাকায় তার সাক্ষ্যের জন্য মামলাটি অপেক্ষমাণ রয়েছে। তার সাক্ষ্য শেষ হলে বিচার কার্যক্রম শেষ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, মোটর মালিক গ্রুপের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দ্বন্দ্বের কারণে আমিনুল ইসলাম অ্যাডভোকেট মাহবুব আলম শাহীনকে হত্যার জন্য অন্য আসামিদের নির্দেশ দিয়েছিলেন। হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনাকারী, নির্দেশদাতা ও অর্থের সংস্থানকারী হিসেবে আমরা আদালতের কাছে প্রধান অভিযুক্ত আমিনুল ইসলামের সর্বোচ্চ শাস্তি চেয়েছি।

জামিন নিয়ে পরিবারের অভিযোগ

নিহতের পরিবারের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় প্রধান আসামি আমিনুল ইসলাম রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে বিশেষ ব্যবস্থায় জামিন পান। পরে তিনি পলাতক থাকলেও চলতি বছর ঢাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। বর্তমানে তিনি কারাগারে রয়েছেন।

পরিবারের প্রত্যাশা

নিহতের স্ত্রী আকতার জাহান শিল্পী বলেন, দীর্ঘ সাত বছর ধরে তারা ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় রয়েছেন। তার ভাষ্য, স্বামীর হত্যার বিচার নিশ্চিত করতে পরিবার আইনি লড়াই চালিয়ে গেছে। তিনি আশা করেন, আদালত হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক রায় দেবে।

পরিবারের সদস্যরা আক্ষেপ করে বলেন, পরিবহন ব্যবসার যে আধিপত্য নিয়ে শাহীন খুন হয়েছে, সেই ফ্যাসিস্টদের দূরপাল্লার পরিবহন ঢাকা থেকে উত্তরাঞ্চলগামী শতাধিক কোচ সব জেলাতেই যথারীতি এখনো চলছে। ওই সময় আমাদের পরিবহন চালাতে কতজনের দ্বারস্থ হয়েছি, তারই ইয়াত্তা নেই। ওই সময় আমাদের বিভিন্ন জায়গা-জমি ওই সন্ত্রাসী গ্রুপ দখল করে নিয়েছে।

আইনজীবীদের দাবি

বগুড়া মহানগর বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট হামিদুল হক চৌধুরী হিরু, জেলা বার সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট রফিকুল ইসলাম, বার কাউন্সিলের সদস্য অ্যাডভোকেট আজগর আলী, জেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট মোজাম্মেল হকসহ বগুড়া জেলা বারের একাধিক আইনজীবী এ আলোচিত হত্যা মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি এবং দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন