বিদ্যুতের প্রিপেইড মিটারের টোকেনে দীর্ঘ নম্বর, চরম ভোগান্তি

মঈন উদ্দিন, রাজশাহী

বিদ্যুতের প্রিপেইড মিটারের টোকেনে দীর্ঘ নম্বর, চরম ভোগান্তি

বিদ্যুতের প্রিপেইড মিটার রিচার্জ করতে গিয়ে নতুন এক বিড়ম্বনায় পড়েছেন রাজশাহীর গ্রাহকরা। এতদিন ২০ ডিজিটের টোকেন নম্বর দিয়ে সহজেই রিচার্জ সম্পন্ন করা যেত, কিন্তু এখন অনেক গ্রাহকের মোবাইলে আসছে ২২০ থেকে ২৫২ ডিজিট পর্যন্ত দীর্ঘ টোকেন। ফলে টাকা পরিশোধের পরও মিটারে ব্যালান্স যোগ করতে গিয়ে চরম ভোগান্তির মুখে পড়ছেন ব্যবহারকারীরা। বিশেষ করে বয়স্ক, কম শিক্ষিত ও প্রযুক্তিতে অনভ্যস্ত গ্রাহকদের মধ্যে এ নিয়ে ব্যাপক অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।

বিশাল ডিজিটের টোকেন নম্বর নিয়ে রাজশাহীসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রিপেইড মিটার ব্যবহারকারীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। দীর্ঘ টোকেন নম্বর মিটারে তুলতে গিয়ে ভুল হওয়ায় অনেকেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা চেষ্টা করেও সফল হতে পারছেন না। ফলে অর্থ পরিশোধ করার পরও বিদ্যুৎবিহীন অবস্থায় থাকতে হচ্ছে বহু পরিবারকে।

বিজ্ঞাপন

রাজশাহীর জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও লেখক সরদার আব্দুর রহমান সম্প্রতি নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দীর্ঘ টোকেন নম্বরের স্ক্রিনশট দিয়ে লিখেছেন, ‘গণিতের মহান শিক্ষক আমাদের নেসকো। মিটারে ব্যালান্স শেষ হয়ে যাওয়ার পর রিচার্জ করলাম। পরে দেখি প্রায় ২৫২ ডিজিটের টোকেন। এতগুলো সংখ্যা একে একে টিপে বিদ্যুৎ ফেরত আনতে হবে। এই বয়সে আর অঙ্ক করা সম্ভব নয়। মনে হচ্ছে বাড়িতে একজন অঙ্কের শিক্ষক রাখতে হবে।’

ফেসবুকে তার এই পোস্ট ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। অনেক গ্রাহক একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে মন্তব্য করেন।

নগরীর রাজপাড়া এলাকার বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, আগে নিজের কাজ নিজেই করতে পারতাম। এখন একবার নম্বর দেই, আবার ভুল হয়। এতগুলো সংখ্যা লিখতে গিয়ে চোখ ঝাপসা হয়ে যায় এবং একাধিকবার লিখার পর সফল হয়েছি। একটা মিটার রিচার্জ করতে এত সময় লাগবে ভাবিনি।

শালবাগান এলাকার বাসিন্দা মুয়াজ্জেম হোসেন জানান, নিজে কয়েক ঘণ্টা চেষ্টা করেও টাকা তুলতে পারিনি। পরে পাশের বাসার বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া ছেলেকে ডেকে এনে কাজটা করতে হয়েছে। বিদ্যুতের বিল বাড়ছে, তার ওপর আবার নতুন ঝামেলা।

একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন নগরীর সুলতানাবাদ এলাকার ইসলাম উদ্দিনও। তিনি বলেন, চার ঘণ্টা ধরে চেষ্টা করছি। প্রতিবারই কোথাও না কোথাও ভুল হচ্ছে। বাসায় বিদ্যুৎ নেই, বাচ্চারা কষ্ট পাচ্ছে। তাই বাধ্য হয়ে খাতায় লিখে নম্বর মিলিয়ে আবার চেষ্টা করছি।

বিশ্লেষকদের মতে, প্রযুক্তি মানুষের জীবন সহজ করার জন্য। কিন্তু কোনো প্রযুক্তিগত পরিবর্তন যদি সাধারণ গ্রাহকের জন্য অতিরিক্ত জটিলতা তৈরি করে, তাহলে সেটি বাস্তবায়নের আগে পর্যাপ্ত প্রচার ও সহায়তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

জ্বালানি ও ভোক্তা অধিকারবিষয়ক বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশের বিপুলসংখ্যক প্রিপেইড মিটার ব্যবহারকারীরা মধ্যবয়স্ক, স্বল্পশিক্ষিত এবং প্রযুক্তিতে অনভিজ্ঞ মানুষ রয়েছেন। তাদের কথা বিবেচনা না করে হঠাৎ এত দীর্ঘ টোকেন চালু করায় গ্রাহক ভোগান্তি বেড়েছে।

রাজশাহীর একজন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা রফিকুল মজুমদার বলেন, সব গ্রাহক তো স্মার্টফোন বা ডিজিটাল প্রযুক্তিতে দক্ষ নন। একজন বৃদ্ধ মানুষকে যদি ২২০ বা ২৫০ ডিজিট লিখে মিটারে প্রবেশ করতে বলা হয়, তাহলে ভুল হওয়াটা স্বাভাবিক। এমন পরিবর্তনের আগে ব্যাপক প্রচার প্রয়োজন ছিল।

নেসকো তাদের ওয়েবসাইটে বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, আবাসিক গ্রাহকদের বিদ্যুৎ বিল ছয়টি ধাপে নির্ধারিত হয়। সম্প্রতি সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বিদ্যুতের মূল্য পরিবর্তন হওয়ায় প্রতিটি ধাপের নতুন মূল্য মিটারে সংযুক্ত করতে হচ্ছে। সেই তথ্য হালনাগাদের জন্যই প্রথমবারের মতো প্রায় ২২০ ডিজিটের বিশেষ টোকেন পাঠানো হচ্ছে।

তবে গ্রাহকদের অভিযোগ, বিষয়টি নিয়ে আগে থেকে পর্যাপ্ত প্রচার চালানো হয়নি। ফলে হঠাৎ করে দীর্ঘ টোকেন পেয়ে অনেকেই বিভ্রান্ত হয়েছেন। কেউ কেউ এটিকে কারিগরি ত্রুটি মনে করে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন।

ভোক্তা অধিকার কর্মীদের মতে, বিদ্যুৎ বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর উচিত ছিল এসএমএস, গণমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আগে থেকেই বিষয়টি জানানো। তাহলে গ্রাহকরা মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকতে পারতেন এবং এমন ভোগান্তির শিকার হতেন না।

বর্তমানে নেসকো, ডিপিডিসিসহ বিভিন্ন বিদ্যুৎ বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানের প্রিপেইড মিটার ব্যবহারকারীদের মধ্যে এ বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে।

নেসকোর নির্বাহী পরিচালক (অপারেশন) মখলেসুর রহমান বলেন, এটি কোনো কারিগরি ত্রুটি বা অতিরিক্ত চার্জ নয়। নতুন ট্যারিফ কার্যকর করার জন্য মিটারে তথ্য পাঠানো হচ্ছে। গ্রাহকরা এসএমএসে দেওয়া টোকেনের প্রতিটি ২০ ডিজিটের অংশ আলাদাভাবে প্রবেশ করে এন্টার চাপলে কাজ সম্পন্ন হবে।

তিনি বলেন, এটি সাময়িক ব্যবস্থা। একবার এই টোকেন সফলভাবে প্রবেশ করানোর পর মিটারে নতুন ট্যারিফ সংরক্ষিত হবে। এরপরের রিচার্জগুলোতে আবার আগের মতো স্বাভাবিক ২০ ডিজিটের টোকেনই পাওয়া যাবে।

তারপরও গ্রাহকদের প্রশ্ন, প্রযুক্তির এই যুগে বিদ্যুতের মতো মৌলিক সেবা নিতে যদি ২২০ থেকে ২৫২ ডিজিটের টোকেন হাতে নিয়ে বসতে হয়, তাহলে ডিজিটাল সেবার মূল উদ্দেশ্য কতটা পূরণ হচ্ছে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন