ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, দুধকুমার ও তিস্তা নদীর ভয়াবহ ভাঙনে গত ৩০ দিনে রংপুর বিভাগে অন্তত ৪০০টি বসতবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। একই সময়ে অন্তত ৫০ একর আবাদি জমিও নদীতে হারিয়ে গেছে। ভিটেমাটি হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছেন শত শত পরিবার। নতুন করে ভাঙনের আশঙ্কায় অনেকেই ঘরবাড়ি খুলে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিচ্ছেন।
প্রায় দেড় মাস ধরে তিস্তার ভাঙন অব্যাহত থাকলেও কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা না নিয়ে কেবল পরিদর্শনেই সীমাবদ্ধ থাকার অভিযোগ উঠেছে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বিরুদ্ধে। এর প্রতিবাদে নদী পাড়ের ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দারা জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি দেওয়ার পাশাপাশি রংপুর পানি উন্নয়ন বোর্ড কার্যালয় ঘেরাও করেন।
গত এক মাসে গাইবান্ধায় ৩০টি, কুড়িগ্রামে ১৫০টি, লালমনিরহাটে ১৫টি, রংপুরের গঙ্গাচড়ায় ১৭টি এবং নীলফামারীতে প্রায় ২০০টি বসতবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। পাশাপাশি অন্তত ৫০ একর আবাদি জমিও হারিয়ে গেছে।
তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী ও রংপুর জেলার অন্তত ৪০টি স্থানে নতুন করে নদীভাঙন দেখা দিয়েছে। এসব এলাকার বহু পরিবার চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।
চোখের সামনে ভেসে যাচ্ছে আজীবনের সঞ্চয়
গঙ্গাচড়া উপজেলার লোহানী ইউনিয়নের কাচারীপাড়া এলাকার বাসিন্দা ৭০ বছর বয়সি সুলতানা বেগম বলেন, আল্লাহ ছাড়া এখন আমাদের পাশে দাঁড়ানোর মতো কেউ নেই। নদী আমার সোনার বাড়ি-ঘর সবকিছু কেড়ে নিয়েছে। এখন আমার ছোট ছোট সন্তানগুলো কী খেয়ে বাঁচবে? আমাদের সুন্দর সাজানো সংসার মুহূর্তেই নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেল। এখন আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ভরসা নেই।
একই এলাকার মোত্তালেব হোসেন জানান, ২০০৮ সালে প্রায় ১০ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত পাকা বাড়িটি মুহূর্তের মধ্যে নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। এখন পরিবার নিয়ে কীভাবে জীবন চলবে, তা নিয়ে তিনি শঙ্কিত। রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার লোহানি ইউনিয়নের চর বাগডোহার গ্রামের বাসিন্দা সবুজ মিয়া বলেন, প্রতি বছর বন্যা মৌসুমে তিস্তার ভাঙন শুরু হয়। এ বছরও নদীর তীব্র ভাঙনে বসতভিটা ও আবাদি জমি হুমকির মুখে পড়েছে। ভাঙন ঠেকাতে নদীর তীরে জিও ব্যাগ ফেলার কাজ চললেও আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকা ইতিমধ্যে পানিতে তলিয়ে গেছে। ফলে জনদুর্ভোগে পড়েছে স্থানীয়রা।
বাগডহরা এলাকার বাসিন্দা বেলাল হোসেন অভিযোগ করেন, পানি উন্নয়ন বোর্ডের উদাসীনতায় মানুষের দুর্ভোগ বাড়ছে। তারা শুধু সামান্য কিছু জায়গা দেখে চলে যায়। মানুষের বাড়িঘর, আবাদি জমি নদীতে বিলীন হলেও তারা কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেয় না। সময়মতো কার্যকর নদীশাসন করা হলে এত ক্ষতি হতো না।
৭৫ বছর বয়সি সাবেক গ্রাম পুলিশ (চৌকিদার) ইনতাজ আলী বলেন, জীবনে ২৮ বার বাড়ি সরিয়েছেন। এখন আর নতুন করে কোথায় ঘর তুলবেন, সেটাই জানেন না।
বাগডহরা এলাকার আরেক বাসিন্দা আব্দুল রশিদ বলেন, নদী ভাঙনের কারণে আমাদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। দেশের অন্য এলাকায় ধানের আবাদ শুরু হলেও আমরা ঘরবাড়ি ও জমি রক্ষা করতেই ব্যস্ত। বাঁধের পাশাপাশি বসতভিটাও নদীতে বিলীন হয়ে যাচ্ছে।
দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নিজের বসতভিটা নদীগর্ভে চলে যাওয়া দেখছেন মৌসুমি আক্তার। তিনি বলেন, আগে নদী তাদের সব কৃষিজমি কেড়ে নিয়েছে। এখন শেষ সম্বল বসতভিটাটুকুও হারানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। নদী পাড়ের নিচের বালুটা সরে যাওয়ার কারণে চোখের সামনে জায়গাটুকু নদীতে চলে গেছে। যদি বাঁধটা রক্ষা করা না যায় তাহলে ইউনিয়ন ও মসজিদ নদীতে চলে যাবে।
মিনার বাজারের ৮৫ বছর বয়সি তৈয়ব আলী কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, জীবনে ১১ বার বাড়ি সরাতে হয়েছে। বার্ধক্যে এসে আর নতুন করে ঘর নির্মাণের সামর্থ্য নেই। খাওয়ারও কষ্ট। নদী সব নিয়ে যাচ্ছে। এখন বাঁচার কোনো পথ দেখি না। আমাদের একটা ব্যবস্থা করুক, না হয় আমাদের আর যাবার পথ নেই।
নদী পাড়ের মানুষের অভিযোগ, গত দুই মাস ধরে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা বারবার এলাকা পরিদর্শন করলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেননি। কোথাও কোথাও জিও ব্যাগ দেওয়া হলেও মাটি ভরাট, সেলাই ও শ্রমিকের ব্যয় বহন না করায় সেগুলোও কাজে লাগানো সম্ভব হচ্ছে না।
প্রশাসনের বক্তব্য
রংপুরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রুহুল আমিন বলেন, নদীভাঙনে সড়কসহ বিভিন্ন অবকাঠামোর ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তরা স্মারকলিপি দিয়েছেন। এলজিইডিকে ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক দ্রুত সংস্কারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি চরাঞ্চলের সড়ক মেরামতে বিশেষ বরাদ্দ চেয়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে।
এদিকে, নতুন করে বিভিন্ন এলাকায় ভাঙন দেখা দিলে সেখানে জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙন রোধের চেষ্টা করছে পাউবো। এ বিষয়ে রংপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রবিউল ইসলাম বলেন, তিস্তার অববাহিকার নোহালী, কোলকোন্দ, আলমবিদিতর, লক্ষ্মীটারী, চর বাগডোবরা এলাকায় কাজ শুরু হয়েছে। এর আগে নদী ভাঙন এলাকায় বস্তা দিয়েছি। সেগুলো ডাম্পিং করা হয়েছে। নতুন করে যেসব এলাকায় ভাঙন দেখা দিচ্ছে, সেখানেও দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
নদী পাড়ের মানুষের দাবি, সাময়িক প্রতিরোধ নয়, টেকসই নদীশাসন প্রকল্প বাস্তবায়ন করলেই কেবল বন্ধ হবে ঘরবাড়ি হারানোর এই দীর্ঘশ্বাস। এরই মধ্যে তিস্তার ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক সংস্কার ও বাঁধ রক্ষাসহ তিন দফা দাবিতে জেলা প্রশাসককে স্মারকলিপি দিয়েছেন গঙ্গাচড়া উপজেলার ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাবাসী।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


