স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ৩১ হাজার ৯৯ কোটি টাকার বরাদ্দ

স্টাফ রিপোর্টার

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ৩১ হাজার ৯৯ কোটি টাকার বরাদ্দ

নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও প্রযুক্তিনির্ভর ও আধুনিক করার লক্ষ্য নিয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ কিছুটা বাড়িয়েছে সরকার। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, সীমান্ত সুরক্ষা জোরদার, সাইবার অপরাধ মোকাবিলা এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সক্ষমতা বাড়াতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জন্য ৩১ হাজার ৯৯ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার (১১ জুন) জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব উপস্থাপনকালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জন্য এ বরাদ্দের প্রস্তাব দেন। এর আগে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ মন্ত্রণালয়ের মূল বরাদ্দ ছিল ২৭ হাজার ১ কোটি টাকা এবং সংশোধিত বরাদ্দ দাঁড়ায় ২৭ হাজার ১৭৪ কোটি টাকা।

বিজ্ঞাপন

গত অর্থবছরের সংশোধিত বরাদ্দের তুলনায় বৃদ্ধি পাওয়া এ বাজেটে পুলিশ, বিজিবি, কোস্ট গার্ড, ফায়ার সার্ভিস ও মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের আধুনিকায়নকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে গত অর্থবছরের তুলনায় কিছুটা বাড়লেও তা খুব বেশি উল্লেখযোগ্য পরিমাণে নয়।

নতুন বাজেটের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো জননিরাপত্তা ও সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের বিনিয়োগ। বাজেট নথি অনুযায়ী, জননিরাপত্তা বিভাগের মূল দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা, সন্ত্রাস ও উগ্রবাদ দমন, সীমান্ত সুরক্ষা, চোরাচালান প্রতিরোধ, কারাগার ব্যবস্থাপনা, মাদক নিয়ন্ত্রণ, পাসপোর্ট ও ভিসা সেবা এবং অগ্নি ও দুর্যোগ মোকাবিলা কার্যক্রম। এসব ক্ষেত্রেই ব্যয় বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে বাংলাদেশ পুলিশ। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীটির সক্ষমতা বৃদ্ধির অংশ হিসেবে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের জন্য আধুনিক সরঞ্জাম সংগ্রহ, সন্ত্রাস দমন ও আন্তর্জাতিক অপরাধ প্রতিরোধ কেন্দ্র নির্মাণ এবং জাতীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ে ডিজিটাল তদন্ত সক্ষমতা বাড়ানোর প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। সাইবার অপরাধ, অনলাইন জালিয়াতি ও ডিজিটাল নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবিলায় পুলিশকে আরও প্রযুক্তিনির্ভর বাহিনীতে রূপান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাম্প্রতিক সময়ে অনলাইন প্রতারণা, সাইবার হামলা ও ডিজিটাল নিরাপত্তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা দেখা গেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাজেটে ডিজিটাল তদন্ত সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় নতুন গতি আসতে পারে।

সীমান্ত নিরাপত্তাও এবার বাজেটের অগ্রাধিকারের তালিকায় রয়েছে। সীমান্ত এলাকায় ৭৩টি আধুনিক কম্পোজিট বর্ডার অবজারভেশন পোস্ট (বিওপি) নির্মাণ, নবগঠিত ৬৩ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অবকাঠামো উন্নয়ন এবং সীমান্ত নজরদারি জোরদারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সীমান্তে চোরাচালান, অবৈধ অনুপ্রবেশ ও আন্তঃসীমান্ত অপরাধ নিয়ে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, নতুন বাজেটে তার প্রতিফলন স্পষ্ট।

উপকূলীয় নিরাপত্তা ও সামুদ্রিক সম্পদ রক্ষায় বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের জন্যও নতুন প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। বাহিনীর সক্ষমতা বাড়াতে প্রতিস্থাপক জাহাজ সংগ্রহের উদ্যোগ রাখা হয়েছে। বঙ্গোপসাগরকে ঘিরে বাণিজ্যিক ও কৌশলগত গুরুত্ব বাড়ায় সামুদ্রিক নিরাপত্তা জোরদারকে সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

দুর্যোগ ও অগ্নিকাণ্ড মোকাবিলায় ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগও রয়েছে। দেশের ২০টি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে নতুন ফায়ার স্টেশন নির্মাণ এবং পুরোনো স্টেশন পুনর্নির্মাণের প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য আবাসিক ভবন নির্মাণ করা হবে। সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানী ও শিল্পাঞ্চলগুলোতে বড় কয়েকটি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ফায়ার সার্ভিসের সক্ষমতা বাড়ানোর দাবি আরও জোরালো হয়েছে।

মাদক নিয়ন্ত্রণেও গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। সাতটি বিভাগীয় শহরে ২০০ শয্যাবিশিষ্ট মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মাদকবিরোধী অভিযান জোরদারের পাশাপাশি পুনর্বাসন কার্যক্রম সম্প্রসারণের মাধ্যমে সমস্যাটিকে সামাজিক ও স্বাস্থ্যগত দৃষ্টিকোণ থেকেও মোকাবিলার পরিকল্পনা রয়েছে।

কারাগার ব্যবস্থার উন্নয়নেও বরাদ্দ রাখা হয়েছে। ময়মনসিংহ কেন্দ্রীয় কারাগার পুনর্নির্মাণ, নরসিংদী জেলা কারাগার নির্মাণ এবং পুরান ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের ঐতিহাসিক স্থাপনা সংরক্ষণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। সরকারের লক্ষ্য কারাগারগুলোকে ধীরে ধীরে আধুনিক সংশোধনাগারে রূপান্তর করা।

এদিকে পাসপোর্ট ও অভিবাসন ব্যবস্থার আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট সেবাকে আরও ডিজিটাল ও সহজ করার পরিকল্পনা রয়েছে। ভিসা, ওয়ার্ক পারমিট, দ্বৈত নাগরিকত্ব এবং অভিবাসন-সংক্রান্ত সেবার ক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ মোকাবিলার চ্যালেঞ্জ বিবেচনায় নিয়ে এবারের বাজেটে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ বৃদ্ধি করা হয়েছে। বাস্তবায়ন দক্ষতা নিশ্চিত করা গেলে এই বিনিয়োগ দেশের নিরাপত্তা অবকাঠামোকে আরও শক্তিশালী ও আধুনিক করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপস্থিতিতে এই বাজেট প্রস্তাব পেশ করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এটি দেশের ৫৫তম বাজেট এবং বর্তমান সরকারের মেয়াদে অর্থমন্ত্রী হিসেবে এটি আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর প্রথম বাজেট উপস্থাপন।

এআরবি

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন