দেশের প্রায় ৩৭ শতাংশ মানুষ শহরাঞ্চলে বসবাস করেন। পোশাক শ্রমিক থেকে শুরু করে অন্যান্য পেশার শ্রমজীবীর বেশিরভাগই থাকেন শহরে। কিন্তু সরকারের পুষ্টি কার্যক্রম ও কর্মসূচির অধিকাংশই প্রান্তিক অঞ্চলের মানুষকে ঘিরে। এতে করে পুষ্টিহীনতায় শহরাঞ্চলের মানুষের মাঝে কমছে উৎপাদন সক্ষমতা (প্রোডাক্টিটিভিটি), চ্যালেঞ্জ বাড়ছে এসডিজির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে। এমতাবস্থায় শহরাঞ্চলের মানুষের পুষ্টিসেবা নিশ্চিতে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে একটি কৌশলপত্র তৈরি করেছে বাংলাদেশ জাতীয় পুষ্টি পরিষদ (বিএনএনসি) কার্যালয়।
এই কৌশল বাস্তবায়নে অংশীজনদের সঙ্গে বৈঠক করেছে বিএনএনসি। কৌশলটির নীতিগত অনুমোদনের পর বাস্তবায়নের জন্য পাঠানো হবে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে। সেখান থেকে নির্ধারণ হবে কোন কোন বিষয়কে প্রাধান্য দিয়ে গঠিত হবে চূড়ান্ত কর্মপরিকল্পনা।
মঙ্গলবার (২৫ মার্চ) রাজধানীর সিরডাপের সিআইসিসি হলে “মাল্টিসেক্টরাল আরবান নিউট্রিশন স্ট্রেটেজি (শহর পর্যায়ে পুষ্টি কৌশল)” শীর্ষক কর্মশালায় এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
বিএনএনসি’র মহাপরিচালক (দায়িত্বপ্রাপ্ত) ডা. মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমানের সভাপতিত্বে এতে প্রধান অতিথি ছিলেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগে সচিব সাইদুর রহমান। যদিও তিনি হঠাৎ অসুস্থ হওয়ায় অংশ নিতে পারেননি।
বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন, স্থানীয় সরকার বিভাগের নগর উন্নয়ন অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব এ এইচ এম কামরুজ্জামান , স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের জনস্বাস্থ্য বিভাগের অতিরিক্ত সচিব এ টি এম সাইফুল ইসলাম, হাসপাতাল শাখার অতিরিক্ত সচিব মো. খোরশেদ আলম, ইন্টারন্যাশনাল নিউট্রিশনের কান্ট্রি ডিরেক্টর সাইকা সিরাজ।
অনুষ্ঠানে কৌশলপত্রের বিস্তারিত তুলে ধরেন বিএনএনসি’র উপপরিচালক ডা. নুসরাত জাহান। উম্মুক্ত আলোচনা পরিচালনা করেন ইন্টারন্যাশনাল নিউট্রিশনের সিনিয়র উপদেষ্টা ড. রুহুল আমিন তালুকদার। সঞ্চালনা করেন বিএনএনসি’র উপপরিচালক ডা. ফারজানা রহমান।
কর্মশালায় জানানো হয়, দেশের ১৮ কোটি মানুষের পুষ্টিসেবা নিশ্চিতে ২২টি মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর ও বিভিন্ন সংস্থা কাজ করছে। সরকারি ও বেসরকারি যেসব কর্মসূচি রয়েছে তাতে গ্রামাঞ্চলের মানুষের পুষ্টিসেবাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। তবে গুরুত্ব পায়নি শহরাঞ্চলের পুষ্টিসেবা। এজন্য স্বাস্থ্য, শিক্ষা, খাদ্য, লিঙ্গ সমতা ও সামাজিক নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে পুষ্টি কার্যক্রম বাস্তবায়নের রূপরেখা তৈরা করা হয়েছে।

বক্তারা বলেন, শহরাঞ্চলের শিশুদের অপুষ্টি ও স্থুলতার হার বাড়ছে, এতে করে এসডিজির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন চ্যালেঞ্জের হবে। যেখান থেকে বাংলাদেশ এখনো বহুদূরে। গ্রামাঞ্চলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় পুষ্টির বিষয়টিতে গুরুত্ব দিলেও শহরে নেতৃত্ব থাকছে স্থানীয় সরকারের হাতে। তাদের অনেককিছু করার আছে। অর্থায়ন, সমন্বয় এবং সচেতনার বিষয়গুলোকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। স্থানীয় সরকারের বরাদ্দ বাড়াতে হবে। এছাড়া সিএসআরের একটা অংশ এই খাতে ব্যয় করা এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদ্বারিত্বেও কাজ করা যেতে পারে।
তারা বলেন, সমন্বয়ের ক্ষেত্রে আরবান নিউট্রিশন ফোরামের কথা বলা হচ্ছে। এটি ভাল হতে পারে। তবে সিটি করপোরেশনগুলোতে বিভিন্ন স্টান্ডিং কমিটি রয়েছে, সেভাবে পুষ্টিসেবার জন্য আলাদা কমিটি গঠন করা গেলে ইতিবাচক ফল আসতে পারে। এছাড়াও নগরাঞ্চলের মানুষের সেবা যেসব গভমেন্ট আউটডোর ডিসপেনসারি (জিওডি) প্রস্তাবনা ভাল ফল দিতে পারে। বেসিক পুষ্টিসেবার বিষয়গুলো সেখানে থাকবে। এছাড়া ইউপিএসসি (আরবান প্রাইমারি হেলথ কেয়ার সেন্টার) করার পরিকল্পনা করছে সরকার। সেখানে পুষ্টির জন্য আলাদা কর্ণার রাখা যেতে পারে বলেও জানান বক্তারা।
স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব এটিএম সাইফুজ্জামান বলেন, ‘পোশাক শ্রমিকদের পুষ্টিসেবা নিশ্চিতে গ্রীন ফ্যাক্টিগরির আইডিয়া দারুণ উদ্যোগ হতে পারে। পুষ্টিসেবা নিশ্চিতে ২২টি মন্ত্রণালয় কাজ করছে। এছাড়া অনেকগুলো বিভাগ ও সংস্থাও জড়িত। এক্ষেত্রে কৃষি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জমি নির্বাচন থেকে শুরু করে পছন্দমতো ফসল নির্বাচন, খাদ্য বাছাই সব পর্যায়ে পুষ্টি ওতপ্রোতভাবে সম্পৃক্ত। এজন্য কৃষিকে গুরুত্ব দিতে হবে। ভেজাল খাদ্য থেকে বাঁচার এটি বড় উপায়। একই এখানে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।’
তিনি বলেন, ‘শ্রমের সঙ্গে জড়িত অন্তত দুই কোটি মানুষ। যার ৪৩ শতাংশই পুষ্টিহীনতায় ভুগছে। এর মধ্যে ১৫ লাখের মতোই পোশাক শ্রমিক রয়েছে। বিপুল সংখ্যক এই মানুষকে পু্ষ্টিহীন রেখে আপনি ন্যাশনাল গ্রোথ ডেভলপমেন্ট অর্জন করতে পারবেন না। এখানে কর্মদক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা সরাসরি জড়িত। সংবিধান অনুযায়ীও রাষ্ট্রকে তার জনগণের পুষ্টিসেবা নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক, এটি তার অধিকার। এসডিজিতেও পুষ্টির কথাগুলো বার বার এসেছে। তাই আমরা এগুলো বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। পরবর্তী এগুলো ধরে যে একশন প্ল্যান হবে আশা করি সেই পর্যায়ে আমরা সবাই ভূমিকা রাখতে পারবো। এটি নিশ্চিত করা গেলে পুষ্টিটর চাহিদা পূরণ সম্ভব।’
আরেক অতিরিক্ত সচিব মো. খোরশেদ আলম বলেন, ‘প্রোপার ডকুমেন্টস হলে যেকোনো বিষয়ে সুস্পষ্টভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়। পুষ্টিকে আমরা গুরুত্ব দিলেও তা অনেকটা প্রান্তিক অঞ্চলকে প্রাধান্য রেখে হয়েছে। অথচ শহরেও বিশেষ করে বস্তি ও নিম্ন আয়ের মানুষের বসবাস বেশি, এমন এলাকায় বসবাসরতদের পুষ্টির ঘাটতি প্রকট। এগুলো নিয়ে যত আলোচনা হবে, সমস্যা সমাধানে কার্যকর পদ্ধতি ও পদক্ষেপ নেওয়া সহজ হবে।’
ইন্টারন্যাশনাল নিউট্রিশনের কান্ট্রি ডিরেক্টর সাইকা সিরাজ বলেন, ‘পুষ্টি নিয়ে সরকারের যত পরিকল্পনা অধিকাংশই তা প্রান্তিক অঞ্চলের মানুষের জন্য ডিজাইন করা। যা দেখে থাকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। কিন্তু শহরে এই দায়িত্ব স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের। তাদের মাধ্যমে যেসব কাজ হয়, তাতে পুষ্টির বিষয়ে খুব একটা জোর দেওয়া হয়না। মাল্টিসেক্টরাল বিষয়ে শুধু মাত্র স্থানীয় সরকার করতে পারবেনা। এজন্য বিভিন্ন মন্ত্রণালয় কিভাবে শহরের মানুষদের পুষ্টি নিশ্চিয়তায় কাজ করতে পারবে সেটাকে গুরুত্ব দিয়ে রূপরেখা তৈরি করা হয়েছে। প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, খাদ্য, লিঙ্গ সমতা ও সামাজিক নিরাপত্তাকে। এরপর দরকার একটা ওপারেশন প্লান, যে কিভাবে এগুলো মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়ন হবে। এরপর এটির পর্যালোচনা করা, যে কোনো সংশয়, কিছু গ্যাপ রয়েছে কিনা।’
তিনি বলেন, ‘২০২২ সাল থেকে আরবান হেলথের পুষ্টি নিয়ে কাজ চলছে। বাংলাদেশের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পুষ্টিসেবার প্রতিশ্রুতি রয়েছে। সেটি নিশ্চিতে শুধু প্রান্তিক অঞ্চলকে গুরুত্ব দিলে হবেনা, সমানভাবে শহরাঞ্চলেও একইভাবে দেখতে হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ড অনুযায়ী শিশুদের খর্বতার হার যদি ৩০ শতাংশের মধ্যে নামিয়ে আনতে না পারা যায়, তাহলে আরও দেড় লাখ শিশু খর্বাকৃতির শিকার হবে। প্রায় চার হাজার শিশুর মৃত্যুর কারণ হবে। ফলে প্রোডাক্টিভিটি হিসেবে আমরা অনেক পিছিয়ে যাব। এগুলো থেকে উত্তোরণে শহর এবং গ্রামঞ্চলে সমানভাবে পুষ্টিসেবায় গুরুত্ব দিতে হবে।’
বিএনএনসির মহাপরিচালক মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘স্বতঃস্ফূর্ত আলোচনার মাধ্যমে শহরাঞ্চলের মানুষের পুষ্টিসেবার কাঠামো রূপরেখার সুন্দর সমাধান হবে। পর্যায়ক্রমে অন্যান্য অংশীজনদের সঙ্গে বসে দ্রুত অ্যাকশন প্ল্যানের জন্য পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

