জুলাইয়ের শহীদ পরিারের সদস্যরা এবং জুলাই মঞ্চের সংগঠকেরা সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালের সামনে সমাবেশ ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছে। দুপুর পৌনে ১টা থেকে বেলা সাড়ে ৩টা পর্যন্ত তারা সেখানে অবস্থান করেন। এসময় তারা আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ করার জোর দাবি জানান। খুনিদের বিচার না হওয়ায় চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলামেরও পদত্যাগ দাবি করেন।
সমাবেশে অন্তত ৫০ শহীদের পরিবারের সদস্যরা অংশ নেন। সবমিলিয়ে কয়েকশ মানুষ সেখানে উপস্থিত ছিলেন। উপস্থিত ছিলেন, আশুলিয়ায় নৃশংসভাবে আগুনে পুড়িয়ে মারা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সাজ্জাদ হোসেন সজলের মা। শাহরিয়ার হাসান আলভী মিরপুর ১০ নম্বরে শহীদ হন। শহীদ গোলাম নাফিসের বাবা। ইমরান হোসেন আকাশ মিরপুর ১০ নম্বরে নিহত হন। তার মা এসেছেন। শহীদ রোহান মারা যান শনির আখড়া এলাকায়। সমাবেশে ছিলেন রোহানের ভাই। চানখারপুলে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় শিক্ষার্থী আনাসকে। শহীদ আনাসের মা সমাবেশে বক্তব্য দেন।
তিনি বলেন, গণহত্যাকারী দল আওয়ামী লীগের বিচার না করে আওয়ামী লীগ পুনর্বাসন করা কথা বলছেন। কখন বিচার হবে? পুনর্বাসন হওয়ার পরে বিচার করবেন? প্রশ্ন রেখে বক্তব্যে তিনি কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। এ সময় তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ ফিরে আসলে ভোটে আসলে নৌকায় ভোট দেওয়ার জন্যে মানুষের কাছে ভোট ভিক্ষা চাইবো। কারণ আপনারা ব্যর্থ। বিচার করতে পারছেন না। এ সময় তিনি কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। উপস্থিত অনেককে তখন অশ্রুসিক্ত দেখা যায়।
বক্তব্য দেন আশুলিয়ায় আগুনে পুড়িয়ে মারা সজলের মা। তিনি বেলেন, নিহত হওয়ার দিন সজল বলে গেছে, ‘আমি মারা গেলে আমার আইডি কার্ড দেখে আমাকে খুঁজে নিও মা’। কান্না জড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘আমার ছেলের শরীরের হাড় ছাড়া কিছু পাইনি। পুড়িয়ে মানুষ মারার পরও এখনো খুনীদের বিচার হয় না’। উল্টো আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের কথা বলা হয়। যাত্রাবাড়ীতে মারা যান মেহেদী হাসান। ছেলের ছবি নিয়ে সমাবেশে যোগ দেন এই শহীদের বৃদ্ধা মা। ময়মনসিংহ থেকে শহীদ সজলের ভাই সমাবেশে যোগ দেন।
ট্রাইবুনালের সামনে অবস্থান করে বক্তব্য এবং নানা ধরনের স্লোগান দেন শহীদ পরিবারের সদস্যরা। ‘আমার ভাই কবরে, চুপ্পু (প্রেসিডেন্ট শাহাবুদ্দিন চুপ্পু) কেন চেয়ারে। রশি (দড়ি) লাগলে রশি নে, শেখ হাসিনার ফাঁসি দে। খুনি হাসিনার বিচার কর করতে হবে। এরকম নানা স্লোগান দেন তারা।
সোহেল রানাকে হত্যা করা হয় যাত্রাবাড়ী কাজলা এলাকায়। অথচ আজ পর্যন্ত ছেলের লাশ পাননি সোহেল রানার মা। তিনিও এসেছেন সমাবেশে। বলেছেন যেখানে শহীদের বিচারের দাবি উঠে সেখানেই উপস্থিত হন।
মিরপুর ১০ নম্বর গোল চত্বর এলাকায় মারা যান মাসুদ রানা। তিন বছর পাঁচ মাস বয়সী আরবি বিনতে মাসুদ বাবা মাসুদ রানার ছবি হাতে এসেছেন মায়ের সাথে। বাবা নেই এ বিষয়টি এখনো জানে না অবুঝ, চটপটে, শিশু বাচ্চাটি। মাসুদ রানার স্ত্রী জানান, কোন উঁচু বিল্ডিংয়ের ছাদ থেকে কিংবা হেলিকপ্টার থেকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে তার স্বামীকে। সাঈমকে হত্যা করা হয় যাত্রাবাড়ী কাজলায়। ছেলের রক্তাক্ত ছবি হাতে তার মা উপস্থিত হন।
সমাবেশ ও অবস্থান কর্মসূচির এক পর্যায়ে সেখানে উপস্থিত হন ট্রাইবুনালের প্রসিকিউশন টিমের একাধিক সদস্য। উপস্থিত সকলের উদ্দেশ্যে প্রসিকিউটর (প্রশাসন) গাজী তামিম বলেন, ২০২৪ সালের ১৪ অক্টোবর বিচারক নিয়োগের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কাজ শুরু করে ট্রাইবুনাল। পাঁচ মাসের কিছু বেশি সময় পার হয়েছে। এ সময়ে একটি মাত্র বেঞ্চ, ১৪ জন প্রসিকিউশন সদস্য নিয়ে দিন রাত কাজ করে যাচ্ছি। স্বল্প জনবল নিয়ে এ পর্যন্ত ১৫০ টি মামলার বিচার কাজ শুরু হয়েছে। এখানে প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের গাফিলতি নেই বলে জানান তিনি। আরেক প্রসিকিউটর ব্যারিস্টার মঈনুল করিম বলেন, আওয়ামী লীগ শাসনামলে আমার ওপরও নির্মম নির্যাতন চালানো হয়েছিল। উপস্থিত শহীদ পরিবারের সদস্যদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ট্রাইবুনালের ওপর আস্থা রাখুন। সময় দিন। ধৈর্য ধারণ করুন। সব অপরাধের বিচার করা হবে।
তাদের বক্তব্যের পরও ২-৩ জন শহীদ পরিবারের সদস্য কর্মসূচি সমাপ্ত না করে চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলামের পদত্যাগ দাবি করেন। এক পর্যায়ে ওই ২-৩ জন তাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে অপরাধীদের সাথে আপস করার অভিযোগ করেন। তারা সমাবেশস্থলে চিফ প্রসিকিউটরের উপস্থিত হওয়ার দাবিতে অনড় থাকেন। পরে ট্রাইবুনালের মূল গেটের সামনে তারা বসে পড়েন। প্রায় ৪০ মিনিট তারা সেখানে বসে নানা ধরনের স্লোগান দিতে থাকেন। বেলা সাড়ে তিনটার কিছু সময় পর আবুল হাসান নামে একজন, চিফ প্রসিকিউটরের পদত্যাগের দাবিতে আল্টিমেটাম দিয়ে বলেন, পদত্যাগ না করলে ঈদের পরে ট্রাইবুনাল ভাঙচুর করা হবে। জুলাই মঞ্চের একজন বলেন, তাজুল ইসলাম আমাদের সাথে দেখা করেননি। কারণ তার সৎসাহস নেই।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

