সরকারি উপজেলা, জেলা, বিভাগীয় ও বিশেষায়িত হাসপাতালের বাইরে সারাদেশে ১১ হাজারের বেসরকারি ডায়াগনোস্টিক সেন্টার রয়েছে। এছাড়াও ব্লাড ব্যাংক আছে দুই শতাধিক। প্রতিদিন কয়েক লাখ মানুষের সেবা দেওয়া এসব স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের ল্যাবরেটরিতে মেডিকেল বায়োকেমিস্ট তথা চিকিৎসকের সংখ্যা একেবারে অপ্রতুল। উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে একমাত্র ভরসা টেকনোলজিস্টরা। রোগ নির্ণয়ে যাদের সবচেয়ে বড় ভূমিকা সেই বায়োকেমিস্ট রয়েছে হাতেগোনা কিছু শীর্ষস্তরের ডায়াগনোস্টিক সেন্টার ও হাসপাতালে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সঠিকভাবে রোগ নির্ণয়ে ৯০’র দশকে চিকিৎসকদের পাশাপাশি সরকারি হাসপাতালগুলোতে বায়োকেস্টিদের পদ ছিল। তবে কতিপয় চিকিৎসক ও আমলাদের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিতে সেই ধারাবাহিকতা রাখেনি পরবর্তী সরকারগুলো। অথচ বর্তমানে চিকিৎসা ব্যবস্থা বলতেই সঠিক রোগ নির্ণয়কেই ধরা হয়। যেখানে উপেক্ষিত হাজার হাজার বায়োকেমিস্ট। এমনকি এতদিন রোগ নির্ণয় প্রতিবেদনে ডাক্তারের বিকল্প হিসেবে তারা স্বাক্ষর দিতে পারলেও সেই অধিকারও খর্ব করা হয়েছে। গত বছরের স্বাস্থ্য সুরক্ষা অধ্যাদেশের ৯নং ধারা চার নম্বর উপাধারার মাধ্যমে সেই অধিকার কেড়ে নেওয়ার প্রতিবাদ জানিয়েছেন বায়োকেমিস্টিরা।
তাঁরা বলছেন, ক্লিনিক্যাল চিকিৎসা দিয়ে থাকেন চিকিৎসকেরা, সে অনুযায়ী তাদের শিক্ষা কারিকুলাম। বিপরীতে রোগ নির্ণয়ের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণসহ সর্বোচ্চ ডিগ্রি অর্জন করেন দেশের বায়োকেমিস্টরা। তারপরও রোগ নির্ণয় ফলাফল প্রতিবেদনে স্বাক্ষরের ক্ষমতা কেবল চিকিৎকদের হাতে দেওয়া সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। এটি বায়োকেমিস্টদের অধিকার কেড়ে নেওয়ার পাশাপাশি অসম্মান।
শনিবার রাজধানীর বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বায়োকেমিস্টরা এসব কথা বলেন।
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ক্লিনিক্যাল বায়োকেমিস্টসের ব্যানারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. হোসাইন উদ্দিন শেখর। বিশেষ অতিথি ছিলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) ও বাংলাদেশ মেডিকেল রিসার্চ কাউন্সিলের (বিএমআরসি) নির্বাহী কমিটির সাবেক সদস্য ড. সোহেল আহমেদ। বক্তব্য রাখেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মুখপাত্র উমামা ফাতেমা। এ সময় সংগঠনের পক্ষ থেকে সাত দফা দাবি জানানো হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে অ্যাসোসিয়েশনের আহ্বায়ক মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘বর্তমানে দেশে সর্বোচ্চ মানের বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে রোগ নির্ণয়ের সবগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষার (বায়োকেমিস্ট্রি, ইমিউনোলজি ও মলিকুলার) প্রতিবেদনে আমাদের কাজের স্বীকৃতি হিসেবে স্বাক্ষর থাকছে। কিন্তু সেটি নিয়ম করে তুলে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। যা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। এটি হলে এ পেশায় নতুন কেউ আর আসবেনা। সরকার যেখানে বলছে আমার দক্ষ লোক লাগবে, সেখানে রোগ নির্ণয়ে যারা সবচেয়ে বেশি ভূমিকা পালন করে, তারাই বঞ্চিত হচ্ছে। সম্মান নিয়ে কাজ করতে না পারলে একদিকে যারা কাজ করছে তারা পিছিয়ে যাবে, নতুরা আসতে আগ্রহী হবেনা।
তিনি বলেন, ‘৯০’র পরে মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে সে সময় বায়োকেমিস্টের পদ ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে পদগুলো বৃদ্ধি করা হয়নি, এমনকি তুলে নেওয়া হয়েছে। অথচ ক্লিনিক্যাল চিকিৎসক আর রোগ নির্ণয় এক জিনিস নয়। চিকিৎসকদের ও বায়োকেমিস্টদের কারিকুলাম এক নয়। বামোকেমিস্টদের শিখে আসতে হয়। ফলে স্কয়ার, বারডেম, আইসিডিডিআর’বির মতো আন্তর্জাতিক মানুষের প্রতিষ্ঠানে বায়োকেমিস্টরা কাজ করে। ফলে সেখানকার পরীক্ষার রিপোর্টের মান অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য। কাজেই আমাদের কাজরে পূর্ণ মযার্দা চাই।’
মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘চিকিৎসায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ সঠিকভাবে রোগ নির্ণয়। এটি না হলে ভুল চিকিৎসা হবে। আমাদের চিকিৎসার ব্যবস্থার প্রতি আস্থাহীনতার এটাও একটা কারণ। দেশের অধিকাংশ মানুষ বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নেয়। একেবারে ঠেকায় না পড়লে সরকারি হাসপাতালে গরিবরাও যাননা। ফলে সরকারি হাসপাতালে বায়োকেমিস্টদের নিয়োগ অত্যন্ত জরুরি। এটি যদি করা গেলে দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা যেমন বদলাবে, একইভাবে কমবে বিদেশমুখিতা।’
এ সময় তিনি বিএমডিসির বাইরে বায়োকেমিস্টদের জন্য পৃথক কাউন্সিল গঠনের বিষয়ে জোর দেন। যৌক্তিকতা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘বিএমডিসি চিকিৎসকদের নিবন্ধন দেয়। আমরা গবেষণা, ওষুধ তৈরিসহ বিভিন্নখাতে কাজ করি। মেডিকেল ডায়াগনোস্টিকে কাজ করতে গেলে কী ধরনের যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, প্রশিক্ষণ থাকতে হবে তার একটি নির্দেশনা থাকা জরুরি। যেটি বিএমডিসি দিতে পারেনা, সংশ্লিষ্ট কাউন্সিলের অনুমতি দরকার।’
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) ও বিএমআরসি’র নির্বাহী কমিটির সাবেক সদস্য ড. সোহেল আহমেদ ‘দেশের বিভিন্ন হাসপাতালের ল্যাবরেটরিতে রোগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে সব প্রতিবেদনে বায়োকেমিস্টদের স্বাক্ষর হয়ে আসছে এতদিন। কারণ, পরীক্ষা-নিরীক্ষার মান যাচাই, নির্ণয় সব হয় তাদের হাত ধরে। কিন্তু গত বছর স্বাস্থ্যসেবা সুরক্ষার এক অধ্যাদেশে বিএমডিসির নিবন্ধিত চিকিৎসকেরাই কেবল স্বাক্ষর দিতে পারবেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। যা দুঃখজনক। দেশের প্রথমসারীর সব প্রতিষ্ঠানে বায়োকেমিস্টরাই মূল, সেখানে এমন সিদ্ধান্ত এ খাতের বিজ্ঞানীদের অধিকার খর্ব করারই শুধু নয়, সম্মান কেড়ে নেওয়া।
তিনি বলেন, ‘বিএমডিসির বলছে চিকিৎসক হতে হবে কিন্তু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা কথা বলেনি। অথচ আমরা নির্দিষ্ট বিষয়ে সর্বোচ্চ ডিগ্রি ও বাস্তবে প্রয়োগকারী। ইউরোপ, আমেরিকা এমনকি আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত, শ্রীলঙ্কায় ও সিঙ্গাপুরে বায়োকেমিস্টরাই এটি দেখছেন। কারণ চিকিৎসা দেওয়া ডাক্তারের কাজ রোগ নির্ণয় বায়োকেমিস্টদের। দু-জনের দুই কাজ। তাহলে ডাক্তারের স্বীকৃতি থাকলেও আমাদের থাকবেনা কেন? মানুষকে চিকিৎসায় আস্থা ফেরাতে হলে বায়োকেমিস্টদের লাগবেই। প্রতিবছর সরকারি ২১টি বিশ্ববিদ্যালয়ে হাজারের বেশি শিক্ষার্থী বের হচ্ছে কিন্তু দেশে সুযোগ না থাকায় বেসরকারি এবং বিদেশে চলে যাচ্ছে। যা দেশের জন্য বড় ক্ষতি।’
এ সময় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মুখপাত্র উমামা বলেন, ‘স্বাস্থ্য খাত শুধু ডাক্তারদের ওপর নির্ভরশীল হয়। বিগত সরকারের সময়ে পুরো স্বাস্থ্য খাতকে কুক্ষিগত করে রাখা হয়েছিল। সবখানে চিকিৎসক নতুন করে এ খাতকে গড়ে তুলতে পারে সরকার। আমরা উপদেষ্টাসহ তার সহযোগীদের কাছে স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বায়োকেমিস্টিদের বিষয়টিও যাতে যুক্ত করা সেই দাবি জানাই। কারণ, স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নতি করতে হলে সঠিকভাবে নির্ণয়ের বিকল্প নেই।’
প্রধান অতিথির বক্তব্যে উপাচার্য শেখর বলেন, ‘আমাদের দুর্ভাগ্য যেকোনো স্বীকৃত অধিকার প্রতিষ্ঠায় আন্দোলনে নামতে হয়। কারণে, নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে এমনকিছু মানুষ বসে রয়েছেন, তাদের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক জটিল পরিস্থিতিরি সৃষ্টি হয়। যার একটি স্বাস্থ্য সুরক্ষা আইনের ৯ ধারার ৪ নম্বর উপধারা। চল্লিশ বছর ধরে আন্দোলন চলে আসছে। আগে সংখ্যায় কম হওয়ায় হয়তো আলোচনায় আসেনি, বায়োকেমিস্টিরা সবসময়ই উপেক্ষিত।’
তিনি বলেন, ‘বায়োকেমিস্টদের মূল অংশই দেশের বাইরে চলে যায়। মেডিকেল কলেজগুলোতে ব্লক পোস্ট করে রাখা হয়েছে। উন্নত ও পার্শ্ববর্তী দেশে এগুলো প্রতিষ্ঠিত। কারণ, এটা রাষ্ট্রেরই প্রয়োজন। রোগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে ডাক্তারদের কিছুই করার নেই, এটি বায়োকেমিস্টদের কাজ। যেহেতু স্বাস্থ্য ব্যবস্থা শুধু চিকিৎসকদের ওপর নির্ভর করে না, তাই এখানে যার যার অবদান সেটি স্বীকৃতি দিতে হবে। আমরা আশা করি রাস্তায় নামার আগে সরকার অধিকার ফিরিয়ে দেবে।’
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

