জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে গোষ্ঠীস্বার্থ রক্ষার চেষ্টা

জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে গোষ্ঠীস্বার্থ রক্ষার চেষ্টা

জনদাবিকে উপেক্ষা করে জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন রিপোর্টে ক্ষমতাধর একটি গোষ্ঠীর নিরঙ্কুশ ক্ষমতা আরও বৃদ্ধির প্রয়াস লক্ষ্য করা গেছে। এই রিপোর্ট পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে রাষ্ট্র সংস্কারের প্রচেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে এবং প্রশাসন ক্যাডারের নিরঙ্কুশ ক্ষমতায়নের মাধ্যমে প্রশাসনিক ফ্যাসিজম আরও শক্তিশালী হবে।

শনিবার আন্তঃক্যাডার বৈষম্য নিরসন পরিষদের উদ্যোগে ‘জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন ও সেবামূলক রাষ্ট্র গঠনে করণীয়’ বিষয়ে মতবিনিময় সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন।

বিজ্ঞাপন

রাজধানীর খামারবাড়িস্থ কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন (কেআইবি) মিলনায়তনে সকালে সাংবাদিকদের সাথে এক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন কৃষিবিদ মোঃ আরিফ হোসেন। এ সময় আন্তঃক্যাডার বৈষম্য নিরসন পরিষদের সমন্বয়ক ও সহ-সমন্বয়করা উপস্থিত ছিলেন।

সভায় জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনের বিশ্লেষণে বলা হয়, বিদ্যমান জনপ্রশাসনকে জনবান্ধব করা, জনকল্যাণমূলক করা এবং জবাবদিহিতার আওতায় আনার জন্য সংস্কারের লক্ষ্যে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করেছিলেন 'জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন'। বিভিন্ন পেশার কাজের অভিজ্ঞতায় জনবান্ধব সিভিল সার্ভিস বিনির্মাণে কমিশনকে সহযোগিতা করার নিমিত্তে ২৫টি ক্যাডারের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠিত হয় 'আন্তঃক্যাডার বৈষম্য নিরসন পরিষদ'। সেবামূলক সিভিল সার্ভিস তৈরির রূপরেখা তৈরিতে সভা, সেমিনার, গোল টেবিল বৈঠকের মত নানামুখী বুদ্ধিবৃত্তিক কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে আন্তঃক্যাডার বৈষম্য নিরসন পরিষদ। পরিষদের অন্তর্ভুক্ত ২৫টি ক্যাডারের সদস্যদের নিকট হতে মতামত গ্রহণ করে তা লিপিবদ্ধ করতঃ সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের মতামতের ভিত্তিতে মডিফাই করে প্রস্তাব প্রস্তুত করেছিলো পরিষদ, যা জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনে লিখিত আকারে জমা দেয়া হয়েছিলো। জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের সাথে সাক্ষাৎকারে পরিষদের অন্তর্ভুক্ত ২৫টি ক্যাডারের নেতৃবৃন্দও একই ধরনের মতামত প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু, প্রশাসন ক্যাডারের সদস্যদের মাধ্যমে গঠিত পক্ষপাতদুষ্ট জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের উপস্থাপিত রিপোর্টে সেই সব দাবির কোনো প্রতিফলন ঘটেনি। জনদাবিকে উপেক্ষা করে রিপোর্টে একটি গোষ্ঠীর নিরঙ্কুশ ক্ষমতা বজায় রাখার প্রয়াস স্পষ্ট হয়েছে। আন্তঃক্যাডার বৈষম্য নিরসন পরিষদ মনে করে এই সুপারিশ জনগণের ভাগ্যের কোন পরিবর্তনের জন্য নয়, বরং প্রশাসন ক্যাডারের ভাগ্যের উন্নয়নে করা হয়েছে। সুপারিশে রাষ্ট্র ও জনগণের স্বার্থকে উপেক্ষা করে গোষ্ঠীস্বার্থ রক্ষার চেষ্টা সুস্পষ্ট। জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের সাথে সাক্ষাৎকারে বিদ্যমান ২৬টি ক্যাডারের মধ্যে ২৫টি ক্যাডারের পক্ষ থেকেই পেশাভিত্তিক মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা এবং উপসচিব পদে কোটা বাতিলের প্রস্তাব করা হয়েছিলো। সমাজের বিভিন্ন স্তর হতে সিভিল সার্ভিসে পেশাদারিত্বকে গুরুত্ব দেবার জন্য আহ্বান করা হয়েছে।

জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনের উল্লেখযোগ্য বিষয়:

বর্তমান যুগ বিশেষায়িত ক্ষেত্রের যুগ। অথচ, স্বগোত্রের স্বার্থে কমিশন বিশেষায়িত ক্ষেত্রকে অবজ্ঞা করে জনকল্যাণকে সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করেছে। একজন ক্যাডার কর্মকর্তার যতই দক্ষতা থাকুক, তিনি সব বিষয়ে দক্ষ হতে পারেন না। তাই স্ব-স্ব ক্ষেত্রে পেশাদার এবং অভিজ্ঞ কর্মকর্তারা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় পরিচালনা করলে তা হবে অধিক জনকল্যাণমুখী। তাছাড়া, ভারসাম্যহীন সিভিল সার্ভিস ও একটি ক্যাডারের সীমাহীন আধিপত্যের মাধ্যমে রাজনৈতিক সরকারের নৈকট্য লাভ করা সহজ হয়। ফলে, রাজনীতিতে স্বৈরাচারিত্ব কায়েম করার পরামর্শ দিয়ে এবং তা বাস্তবায়নে সর্বাত্মক সহযোগিতা করে নিজেদের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা যায়। ক্ষমতা পৃথকীকরণ সুষম হলে প্রশাসনে একক কারো কর্তৃত্ব থাকবে না। সেজন্য আন্তঃক্যাডার বৈষম্য নিরসন পরিষদ ও সিভিল সার্ভিসের ২৫টি ক্যাডারের পক্ষ থেকে শুরু হতেই জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনে পেশাভিত্তিক মন্ত্রণালয় (ক্যাডার যার মন্ত্রণালয় তার) প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিলো, যা কমিশন পুরাই এড়িয়ে গেছে।

বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রতিটি সেক্টরের নীতিনির্ধারণ ও পরিকল্পনা প্রণয়ন করেন উপসচিব থেকে তদূর্ধ্ব পদের কর্মকর্তাগণ। এ কারণে আমরা উপসচিব পদে কোটা বাতিল করে সকল সেক্টর হতে পরীক্ষার মাধ্যমে মেধার ভিত্তিতে শতভাগ নিয়োগের দাবি করেছি, যেন মেধাবী ও বিভিন্ন সেক্টরের অভিজ্ঞদের দ্বারা কাঙ্ক্ষিত পরিকল্পনা নিশ্চিত হয়। এর মাধ্যমে বিভিন্ন ক্যাডারের সম্মিলন থাকায় সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে যেমন সহজ হবে, আমলাতান্ত্রিক সিন্ডিকেটও কম হবে। আমলাতন্ত্রে চেক এন্ড ব্যালেন্স থাকবে। কিন্তু জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন সাংখ্যিক পরিবর্তন করে কোটা পদ্ধতি অব্যাহত রাখার হাস্যকর প্রজার উপস্থাপন করেছে, যা জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনার পরিপন্থী। একটি মন্ত্রণালয়ে উপসচিব ছাড়াও প্রায় ২৫ ভাগ সরকারি সচিব ও সিনিয়র সহকারি সচিব পদ রয়েছে।

ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে চাকরিতে প্রবেশের পর একটি কোটামুক্ত, বৈষম্যহীন কর্মপরিবেশ উপহার দেওয়া আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। অথচ, সরকারের উপসচিব পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে ২৫টি ক্যাডারের প্রায় ৬০ হাজার কর্মকর্তার জন্য শতকরা ৫০ ভাগ আর মাত্র সাড়ে ৫ হাজার প্রশাসন ক্যাডার কর্মকর্তার জন্য ৫০% কোটার সুপারিশ অযৌক্তিক ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। এর চেয়ে বৈষম্যমূলক নীতি শুধু বাংলাদেশ নয় বরং বিশ্বের কোথাও নাই। ২০২৪ সালে আমাদের বীর ছাত্ররা চাকরিতে প্রবেশকালের যে ৫৬% 'কোটা বৈষম্য' দূর করতে তাদের বুকের রক্ত ঝরালো, তারাই যখন চাকরিতে প্রবেশের পর ৫০% বৈষম্যমূলক কোটার সম্মুখীন হবে তখন তাদের এই আত্মত্যাগ বৃথা মনে হবে। হয়ত এ নিয়ে ভবিষ্যতে নতুন করে রক্ত ঝরবে। মেধার ভিত্তিতে নিয়োগের প্রথা পুনরায় চালু করে এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান করতে হবে।

মতবিনিময় সভায় নানো হয়, সকল ক্যাডারের সমতা নিশ্চিত করার প্রস্তাব দিয়েছিলো আন্তঃক্যাডার বৈষম্য নিরসন পরিষদ এবং সিভিল সার্ভিসের ২৫টি ক্যাডারের নেতৃবৃন্দ। সংস্কার কমিশনের রিপোর্টে সে বিষয়ে তেমন কিছু উল্লেখ না থাকলেও প্রশাসন ক্যাডারের আরও কিছু ক্ষতায়নের প্রস্তাব লক্ষ্য করা যায়। সুপিরিয়র এক্সিকিউটিভ সার্ভিসে (এসইএস) প্রশাসন ক্যাডারকে বৈষম্যমূলক সুবিধা প্রদান: এসইএস-এ নিয়োগ প্রদানের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে যে, কোন কর্মকর্তা একবার এসইএস-এ প্রবেশের পর তিনি আর তার পূর্বতন সার্ভিসে ফেরত যেতে পারবেন না। কিন্তু, প্রশাসন ক্যাডারের ক্ষেত্রে এই নিয়ম প্রযোজ্য নয়। প্রশাসন ক্যাডারের নিজস্ব পদে এবং সুপিরিয়র এক্সিকিউটিভ সার্ভিসে তাদের আধিপত্য ধরে রাখতে কমিশন সুচতুরভাবে সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। যার ফলে প্রশাসন ক্যাডার আবারও নিজেদের অবস্থানগত সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে রাষ্ট্রে ফ্যাসিজম কায়েমের সুযোগ পাবে।

এ সময় আরও জানানো হয়, সম্প্রতি ফেসবুকে লেখালেখির মত তুচ্ছ কারণে ২৫ ক্যাডারের ১৩ জন কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। একই ধরনের কাজ প্রশাসন ক্যাডারের সদস্যরা করলেও তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। বৈষম্যপূর্ণ রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাকে কাজে লাগিয়ে প্রশাসন ক্যাডার ২৫ ক্যাডারের কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করতে এমন ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন। প্রশাসন ক্যাডার কর্তৃক পক্ষপাতিত্বপূর্ণভাবে বিভিন্ন ক্যাডার কর্মকর্তাদের সাময়িক বরখাস্তের প্রতিবাদে এবং আন্তঃক্যাডার বৈষম্য নিরসনের দাবিতে আজ রোববার ২০২৫ পরিষদভুক্ত সকল ক্যাডার পূর্ণ দিবস কর্মবিরতি পালন করবে। সকাল সাড়ে ১০টা থেকে সাড়ে ১১ টা পর্যন্ত কর্মকর্তারা নিজ নিজ দপ্তরের সামনে কালো ব্যাজ পরে ব্যানারসহ অবস্থান কর্মসূচি পালন করবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন