রাজধানীর শাহজাদপুরে পুরনো দেয়াল ধসে শিশুর মৃত্যু, আহত ২

রাজধানীর শাহজাদপুরে পুরনো দেয়াল ধসে শিশুর মৃত্যু, আহত ২

বিকেলের আলো তখনও ফুরোয়নি। রাস্তার পাশে কয়েকজন শিশুর ছোটাছুটি, খেলাধুলা—সেই চেনা দৃশ্যই মুহূর্তে বদলে গেল আতঙ্ক আর কান্নায়। পাশের নির্মাণাধীন ভবনের পুরনো বাউন্ডারি দেয়ালটি হঠাৎ বিকট শব্দে ধসে পড়ল। ইট-পাথরের নিচে চাপা পড়ে গেল চার বছরের মাহিদ। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত আর ফেরানো গেল না প্রাণের শিশুটিকে। আহত হয়েছে আরও দুই শিশু।

বিজ্ঞাপন

রাজধানীর ভাটারা থানাধীন শাহজাদপুর এলাকায় বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) বিকেলে এ মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেওয়ার পর চিকিৎসক মাহিদকে মৃত ঘোষণা করেন। আহত অন্য দুই শিশু স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বজন ও প্রতিবেশীরা। ভোলার সদর উপজেলার গ্রামের বাড়ি হলেও বাবা-মায়ের সঙ্গে শাহজাদপুরেই থাকত ছোট্ট মাহিদ। বাবা মো. হাবিব পেশায় প্রাইভেটকার চালক। এক ভাই ও এক বোনের মধ্যে মাহিদ ছিল ছোট। মাহিদের মা মৌসুমি বলেন, বিকেলে বাসার কাছের রাস্তায় অন্য শিশুদের সঙ্গে খেলছিল তার ছেলে। কিছুক্ষণ পর খবর আসে, রাস্তার পাশের বাউন্ডারি দেয়াল ধসে মাহিদ চাপা পড়েছে। খবর শুনেই তিনি ছুটে যান। এরপর আহত অবস্থায় ছেলেকে হাসপাতালে নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত তাকে আর বাঁচানো যায়নি।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শাহজাদপুরের ওই প্লটে পাইলিং শেষে নতুন বহুতল ভবনের ফাউন্ডেশনের কাজ জোরকদমে চলছিল। অথচ ভারী যন্ত্রাংশের তোড়জোড়ে পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা জীর্ণ, বিপজ্জনক জরাজীর্ণ পুরাতন সীমানা প্রাচীরটি যে যেকোনো মুহূর্তে ধসে পড়তে পারে—তা দেখার প্রয়োজন মনে করেননি কোনো প্রকৌশলী বা ভবন মালিক। কোনো প্রকার নিরাপত্তাবেষ্টনী বা সতর্কবার্তা ছাড়াই চলছিল নির্মাণকাজ। চরম ঝুঁকি জেনেও নামকাওয়াস্তে দাঁড়িয়ে থাকা সেই দেয়ালই হঠাৎ বিকট শব্দে ভেঙে পড়ে ক্ষুদ্রে শিশু মাহিদের ওপর। রক্তে ভেসে যায় রাজপথ, গুরুতর আহত হয় আরও দুটি নিষ্পাপ শিশু। রক্তাক্ত মাহিদকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসা হলেও শেষ রক্ষা হয়নি। কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

“আমার বাবাটা তো শুধু খেলতে গিয়েছিল, ও তো কারো কোনো ক্ষতি করেনি! ওরা কেন দেয়ালটা ঠিক করেনি?”— ঢাকা মেডিকেলের জরুরী বিভাগের সামনে কান্নাভেজা কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন মাহিদের মা মৌসুমি। কিন্তু এই আকুল প্রশ্নের জবাব দেবে কে?

ঢামেক হাসপাতালে নিহত মাহিদের স্বজনেরা বলেন, আইনের খাতায় হয়তো এটি একটি ‘দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু’ হিসেবেই নথিভুক্ত হবে। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়—বিল্ডারদের এই চরম অবহেলা ও উদাসীনতা কি কোনো অংশে হত্যাকাণ্ডের চেয়ে কম? এক চার বছরের শিশুর জীবনের বিনিময়ে কি তবে ঢাকা শহরের ওই আবাসন ব্যবসায়ীদের হুঁশ ফিরবে, নাকি লাল ফিতার দৌরাত্ম্যে ধামাচাপা পড়ে যাবে এই অকাল প্রস্থান? উত্তর চায় নিহত মাহিদের পরিবার।

ফাটল দেখা দেয়াল, তবু কেন ঝুঁকি কমানো হলো না?

নগরবিদরা বলছেন, একটি শিশুর মৃত্যু শুধু ‘দুর্ঘটনা’ বলে দায় সেরে ফেলার সুযোগ তৈরি করে না। বিশেষ করে নির্মাণাধীন স্থাপনার পাশে যদি আগে থেকেই দুর্বল বা ফাটলধরা দেয়াল থাকে এবং তার পাশেই সাধারণ মানুষের চলাচল থাকে, তাহলে নিরাপত্তার প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) প্রকাশিত আইন ও বিধির তালিকায় ঢাকা মহানগর ইমারত নির্মাণ বিধিমালা ২০২৫সহ বিভিন্ন নির্মাণ-সংক্রান্ত বিধান রয়েছে। বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোডের সংশ্লিষ্ট বিধানেও বাউন্ডারি দেয়ালকে এমনভাবে নির্মাণের কথা বলা হয়েছে, যাতে তা ধসে না পড়ে। নির্মাণ বা অপসারণের সময়ও আশপাশের মানুষের নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্ব পাওয়ার কথা। ফলে শাহজাদপুরের এই ঘটনার পর শুধু মাহিদের পরিবারের কান্না নয়, নির্মাণাধীন স্থাপনার নিরাপত্তাব্যবস্থাও প্রশ্নের মুখে পড়েছে। দেয়ালটি কতটা ঝুঁকিপূর্ণ ছিল, নির্মাণকাজের কারণে সেটির স্থিতিশীলতায় কোনো প্রভাব পড়েছিল কি না, ঘটনাস্থলে নিরাপত্তাবেষ্টনী ছিল কি না—এসব বিষয় খতিয়ে দেখা জরুরি। রাজধানীতে এর আগেও নির্মাণকাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পুরনো বাউন্ডারি দেয়াল ধসে হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। ২০২২ সালে ভাটারার ছোলমাইদ এলাকায় মাটি কাটার সময় পুরনো বাউন্ডারি দেয়াল ধসে এক শ্রমিক নিহত হওয়ার ঘটনাও সংবাদমাধ্যমে এসেছিল।

হাসপাতালে শেষ চেষ্টা-

দেয়ালের নিচ থেকে উদ্ধারের পর গুরুতর আহত মাহিদকে দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। জরুরি বিভাগে চিকিৎসকেরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন। কিন্তু সব চেষ্টা ব্যর্থ করে দেন চিকিৎসকেরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। ঢামেক হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ পরিদর্শক মো. ফারুক বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, শিশুটির লাশ হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে। ঘটনাটি সংশ্লিষ্ট থানাকে জানানো হয়েছে। এদিকে আহত অন্য দুই শিশুর বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি। তারা স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন