ঢাবিতে গণরুম-গেস্টরুমের নামে নির্যাতন হয়েছে: উপাচার্য

ঢাবিতে গণরুম-গেস্টরুমের নামে নির্যাতন হয়েছে: উপাচার্য

বিগত ১৭ বছরে রাষ্ট্র ও সমাজের বিভিন্ন স্তরে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রভাব থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ও মুক্ত ছিল না বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম। তিনি বলেন, গণরুম ও গেস্টরুম সংস্কৃতির নামে শিক্ষার্থীদের ওপর নির্যাতন এবং ভিন্নমত দমনের মতো ঘটনা ঘটেছে।

রোববার (৯ আগস্ট) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদের উদ্যোগে বিশ্ববিদ্যালয়ের আর সি মজুমদার আর্টস অডিটোরিয়ামে ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান: গণতান্ত্রিক পুনর্গঠন, আগামীর বাংলাদেশের প্রত্যাশা’ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

বিজ্ঞাপন

উপাচার্য বলেন, কোনো ব্যক্তি একা একটি রাষ্ট্র বা প্রতিষ্ঠানকে পরিবর্তন কিংবা ধ্বংস করতে পারে না। উপর থেকে তৃণমূল পর্যন্ত একটি সহযোগী কাঠামো তৈরি হলেই স্বৈরাচারী ব্যবস্থা দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারে। বিগত ১৭ বছরে রাষ্ট্র ও সমাজের বিভিন্ন স্তরে এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল, যার প্রভাব থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ও মুক্ত ছিল না।

তিনি বলেন, ‘গণরুম-গেস্টরুম সংস্কৃতির নামে শিক্ষার্থীদের ওপর নির্যাতন করা হয়েছে। ভিন্নমত দমন করা হয়েছে। এ ধরনের সংস্কৃতি কোনোভাবেই একটি গণতান্ত্রিক ও শিক্ষাবান্ধব বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।’

অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ একটি নতুন সম্ভাবনার দ্বারপ্রান্তে এসেছে। এই অর্জনকে অর্থবহ করতে হলে অতীতের স্বৈরাচারী ও ফ্যাসিবাদী রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে শিক্ষা নিতে হবে। একই সঙ্গে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, ন্যায়বিচার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

তিনি বলেন, শিক্ষার্থীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণ। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে কেন তারা রাস্তায় নেমেছিল, কী চিন্তা ও প্রত্যাশা নিয়ে আন্দোলনে অংশ নিয়েছিল এবং আগামী বাংলাদেশ নিয়ে তাদের ভাবনা কী- এসব জানা ও বোঝা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুধু আন্দোলনের স্মৃতিচারণ করলেই হবে না; গণ-অভ্যুত্থানের কারণ এবং তরুণ প্রজন্মের প্রত্যাশাগুলোও অনুধাবন করতে হবে।

নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে উপাচার্য বলেন, অন্যায়ের প্রতিবাদ করায় সে সময় শিক্ষকরা হয়রানি, চাকরিচ্যুতি ও মামলা-মোকদ্দমার শিকার হয়েছেন। শিক্ষক সমিতিতে দায়িত্ব পালনকালে তাকেও নির্দিষ্ট পক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বক্তব্য দেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হয়েছিল। তবে তিনি সবসময় শিক্ষকদের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকেছেন।

তিনি বলেন, ‘ভিন্নমতকে দমন করা কোনোভাবেই গণতন্ত্রের অংশ হতে পারে না। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা থাকতে হবে। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে।’

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদদের স্মরণ করে তাঁদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন উপাচার্য। একই সঙ্গে আন্দোলনে আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করেন তিনি।

অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম বলেন, আন্দোলনের সময় শিক্ষক হিসেবে শিক্ষার্থীদের পাশে থাকা নৈতিক দায়িত্ব ছিল। শিক্ষার্থীরা যখন ন্যায্য দাবিতে রাজপথে রক্ত দিচ্ছিল, তখন শিক্ষকরা অফিসে বসে থাকতে পারেন না। আমরা তাদের পাশে থাকার চেষ্টা করেছি।

তিনি বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সূচনা করেছে। এখন নেতিবাচক রাজনীতি থেকে বের হয়ে ইতিবাচক চিন্তার দিকে এগিয়ে যেতে হবে। দীর্ঘদিনের জঞ্জাল একদিনে দূর করা সম্ভব নয়। এ জন্য সবাইকে ধৈর্য ধরতে হবে এবং নিয়ম ও ন্যায়ের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে।

উপাচার্য বলেন, ক্ষমতা স্থায়ী নয়; দায়িত্বই মুখ্য। ‘আমি’ নয়, ‘দেশ’- এই চিন্তাকে সামনে আনতে হবে। দেশ ভালো থাকলে আমরাও ভালো থাকব।

তিনি আরও বলেন, প্রতিহিংসার রাজনীতি নয়, ন্যায়বিচার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। অপরাধের বিচার হতে হবে, তবে তা প্রতিহিংসার ভিত্তিতে নয়, আইনের ভিত্তিতে। একই সঙ্গে দেশে ফ্যাসিবাদী রাজনীতির পুনরুত্থান কিংবা সামাজিক সম্প্রীতি ও স্থিতিশীলতা নষ্ট হয়- এমন কোনো কর্মকাণ্ডও কাম্য নয়।

‘সবার আগে বাংলাদেশ’- এই চেতনাকে ধারণ করে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে দেশ পুনর্গঠনে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম। তিনি বলেন, আগামী প্রজন্মের জন্য একটি গণতান্ত্রিক, ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে।

অনুষ্ঠানে কলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মো. আবুল কালাম সরকারের সভাপতিত্বে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ছিদ্দিকুর রহমান খান। স্বাগত বক্তব্য দেন উদযাপন কমিটির আহ্বায়ক ও ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ড. এম এ কাউসার। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন উদযাপন কমিটির সদস্য সচিব ও ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. নুরুল আমিন।

কোরআন তেলাওয়াতের মধ্য দিয়ে আলোচনা সভা শুরু হয়। পরে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বিভিন্ন স্মৃতি ও অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন।

এ সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদের সাবেক ডিন ও ইংরেজি বিভাগের অনারারি অধ্যাপক ড. সদরুল আমিন, স্বাধীনতা পুরস্কার ও একুশে পদকপ্রাপ্ত সংখ্যাতিরিক্ত অধ্যাপক ড. সুকোমল বড়ুয়াসহ অনুষদের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন