বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) প্রতি পাঁচজন শিক্ষার্থীর একজন সপ্তাহে একদিনও ফল খাওয়ার সুযোগ পায় না। যারা ফল খায়, তাদের বেশির ভাগই কলা ও মৌসুমি ফলের ওপর নির্ভরশীল। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনুষদের ১৮৬ জন শিক্ষার্থীর ওপর পরিচালিত এক জরিপে এমন তথ্য উঠে এসেছে।
বৃহস্পতিবার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক কমপ্লেক্সের সভাকক্ষে বাকৃবি শিক্ষক সমিতির উদ্যোগে আয়োজিত ‘শিক্ষার্থীদের পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশ্ববিদ্যালয়ের খামারগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি ও সমন্বিত ব্যবস্থাপনা’ শীর্ষক কর্মশালায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. মো. আসাদুজ্জামান সরকার এসব তথ্য তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, জরিপে অংশ নেওয়া ২০ শতাংশ শিক্ষার্থী সপ্তাহে একদিনও ফল খাওয়ার সুযোগ পায় না। ফল গ্রহণের ক্ষেত্রে ছাত্রীদের অংশগ্রহণ তুলনামূলক বেশি হলেও অধিকাংশ শিক্ষার্থী পুষ্টিকর ফলের পরিবর্তে কলা ও মৌসুমি ফলের ওপর নির্ভরশীল।
অধ্যাপক আসাদুজ্জামান সরকার বলেন, শিক্ষার্থীদের খাদ্যাভ্যাসে আরও উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। মাত্র ৩৬ দশমিক ৭ শতাংশ শিক্ষার্থী সপ্তাহের সাত দিন নিয়মিত সকালের নাস্তা করে। প্রায় ৯ শতাংশ শিক্ষার্থী নিয়মিত দুপুরের খাবার এবং প্রায় ১৫ শতাংশ শিক্ষার্থী নিয়মিত রাতের খাবারও গ্রহণ করে না। দুপুরের খাবারে অনেক শিক্ষার্থীর কোনো প্রাণিজ প্রোটিন থাকে না; তারা মূলত ডাল, ভর্তা ও সবজি দিয়েই খাবার সম্পন্ন করে।
তিনি আরও বলেন, ৫৩ দশমিক ৮ শতাংশ শিক্ষার্থী সপ্তাহে মাত্র ১ থেকে ৫টি ডিম খায়, যা প্রয়োজনীয় পুষ্টি চাহিদার তুলনায় অনেক কম। মাত্র ১ দশমিক ৯ শতাংশ শিক্ষার্থী নিয়মিত দুধ পান করে, অথচ ৪১ দশমিক ৯ শতাংশ শিক্ষার্থী একেবারেই দুধ পান করে না। বিপরীতে কোমল পানীয় গ্রহণের প্রবণতা তুলনামূলক বেশি।
জরিপের তথ্য অনুযায়ী, একজন শিক্ষার্থী মাসে গড়ে ৪ হাজার ১০০ টাকা খাদ্যের পেছনে ব্যয় করে। এই ব্যয় নির্বাহ করতে অনেক শিক্ষার্থীকে টিউশনি বা খণ্ডকালীন কাজের ওপর নির্ভর করতে হয়। শিক্ষার্থীদের গড় ওজন ৬৩ দশমিক ৩ কেজি এবং ৬৪ শতাংশের বিএমআই স্বাভাবিক পর্যায়ে থাকলেও ছাত্রীদের মধ্যে কম ওজনের প্রবণতা বেশি। অন্যদিকে প্রায় ৩ শতাংশ শিক্ষার্থীর মধ্যে স্থূলতার লক্ষণ পাওয়া গেছে।
সমাধানের বিষয়ে অধ্যাপক আসাদুজ্জামান সরকার বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব খামারগুলোকে আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগানো প্রয়োজন। জরিপে অংশ নেওয়া ৯৩ দশমিক ৬ শতাংশ শিক্ষার্থী ভর্তুকি মূল্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের খামার থেকে দুধ, ডিম, মাংস ও ফল কিনতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এছাড়া ৮৪ দশমিক ৫ শতাংশ শিক্ষার্থী খামারে ইন্টার্ন বা কর্মী হিসেবে কাজ করার বিনিময়ে পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণের পাশাপাশি ব্যবহারিক দক্ষতা অর্জনের আগ্রহ দেখিয়েছে।
তিনি বলেন, আবাসিক হলের খাবারে বৈচিত্র্য আনা, নিরাপদ ও মানসম্মত খাদ্য নিশ্চিত করা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের খামারগুলোর উৎপাদিত পণ্য শিক্ষার্থীদের জন্য সহজলভ্য করা গেলে তাদের পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা শারীরিক ও মানসিকভাবে আরও সুস্থ থাকবে, পড়াশোনায় অধিক মনোযোগী হবে এবং ভবিষ্যতে দক্ষ, সুস্থ ও মানবিক নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে পারবে।
কর্মশালায় প্রধান পৃষ্ঠপোষক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ কে ফজলুল হক ভূঁইয়া। বিশেষ অতিথি ছিলেন ছাত্রবিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মো. শহীদুল হক।
বাকৃবি শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. মো. রফিকুল ইসলাম সরদারের সভাপতিত্বে এবং অধ্যাপক ড. জাভিদুল হক ভূঁইয়ার সঞ্চালনায় আয়োজিত কর্মশালায় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনুষদের ডিন, হল প্রভোস্ট, শিক্ষক, কর্মকর্তা এবং শিক্ষার্থী প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
প্রধান পৃষ্ঠপোষকের বক্তব্যে উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ কে ফজলুল হক ভূঁইয়া বলেন, বর্তমান আর্থসামাজিক বাস্তবতায় শিক্ষার্থীদের পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। এ লক্ষ্য অর্জনে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব খামারগুলোর উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, সমন্বিত ব্যবস্থাপনা এবং সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতার দরকার। একই সঙ্গে মূল প্রবন্ধে উত্থাপিত বিভিন্ন সুপারিশ বাস্তবায়নের আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

