ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানি ও পরীক্ষায় নম্বর কমিয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল ২০২৪ সালে। গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক নাদির জুনাইদের বিরুদ্ধে তখন তদন্তও শুরু হয়। বিষয়টি খতিয়ে দেখে দুই মাসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশও দিয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এক বছর পেরিয়ে গেলেও মেলেনি সেই প্রতিবেদন।
জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের দ্বাদশ ব্যাচের শিক্ষার্থীরা অধ্যাপক নাদিরের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত আক্রোশ থেকে পরীক্ষার ফলে অস্বাভাবিক কম নম্বর দেওয়ার অভিযোগ তোলেন। পরে ১০ ফেব্রুয়ারি তার বিরুদ্ধে যৌন হয়রানি ও মানসিক নিপীড়নের অভিযোগ করেন একই বিভাগের এক ছাত্রী।
পর দিন নাদিরের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টার অভিযোগ করেন বিভাগের আরেক নারী শিক্ষার্থী। ২৮ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক নারী শিক্ষার্থীও তার বিরুদ্ধে যৌন হয়রানি ও মানসিক নিপীড়নের অভিযোগ করেন। এ নিয়ে বিভাগের শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে নাদিরকে বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানো হয়।
অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গত বছরের ৩ মার্চ দুটি ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটি গঠন করে দুই সপ্তাহের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলে বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট । যৌন হয়রানির অভিযোগ খতিয়ে দেখতে গঠিত ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটি ভুক্তভোগী ও অভিযুক্তের সঙ্গে কথা বলে যৌন হয়রানির প্রাথমিক সত্যতা পায়। পরে নাদির জুনাইদকে প্রশাসনিক ও একাডেমিক কার্যক্রম থেকে অব্যাহতি দেয় সিন্ডিকেট। একই সঙ্গে তৎকালীন উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. সীতেশ চন্দ্র বাছারের নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয় এবং দুই মাসের মধ্যে তদন্ত শেষ করতে বলা হয়। তবে বছর পেরিয়ে গেলেও তদন্ত শেষ করতে পারেনি সেই কমিটি। প্রতিবেদনের জন্য তাদের তাগাদাও দেয়নি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা বলেন, ৫ আগস্ট পটপরিবর্তনের পর অধ্যাপক নাদিরের এক নিকটাত্মীয় সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের প্রধান নিযুক্ত হয়েছেন। তার ক্ষমতাবলেই তদন্তকে প্রভাবিত করছেন অধ্যাপক নাদির। এ কারণে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনও তদন্তে আগ্রহ দেখাচ্ছে না। শিক্ষার্থীদের আশঙ্কা, তদন্ত বিলম্বের মাধ্যমে অধ্যাপক নাদিরকে আবারও ফিরিয়ে আনা হবে।
ভুক্তভোগী এক নারী শিক্ষার্থী বলেন, ‘তদন্ত কমিটি আমার সঙ্গে সর্বশেষ জুলাইয়ের আগে বসেছিল। কিন্তু এরপর থেকে আর কোনো অগ্রগতি নেই। তদন্ত কমিটিতে ডেকে সেখানেও আমাকে হেনস্তা ও মানসিক নির্যাতন করা হয়। এরপর আমি অনেক দিন ট্রমাটাইজড ছিলাম। আমি চাই, ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত হোক।
ভুক্তভোগীর অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দায়িত্বশীল এক শিক্ষকের সঙ্গে কথা বললে নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বিষয়টি নিশ্চিত করেন ।
অন্যদিকে, ফলাফলে ধস নামানোর অভিযোগের তদন্তেরও কোনো অগ্রগতি নেই। ভুক্তভোগী ব্যাচের এক শিক্ষার্থী বলেন, গত ২৮ অক্টোবর তাদের ডেকে বক্তব্য শোনেন বিশ্ববিদ্যালয়ের চার প্রতিনিধি। সেখানে তদন্ত কমিটির বর্তমান প্রধান উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) ও অন্য দুই সদস্য উপস্থিত ছিলেন। পরদিন অভিযুক্ত শিক্ষকের সঙ্গে বৈঠকের কথা থাকলেও অজানা কারণে তা আর হয়নি। এখানে স্পষ্টত প্রশাসনের গাফিলতি রয়েছে।
আরেক শিক্ষার্থী জানান, ফলাফল নিষ্পত্তি না হওয়ায় তারা কোথাও চাকরির আবেদন করতে পারছেন না। তাদের পেশাগত জীবন ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তদন্ত কমিটির প্রধান ড. মামুন আহমেদ বলেন, ‘অধ্যাপক নাদিরের বিষয়ে তদন্ত প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। কিছুদিনের মধ্যে প্রতিবেদন দেওয়া হবে। তবে তদন্ত কাজে প্রভাব খাটানোর বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না বলে দাবি করেছেন।
উপাচার্য অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমদ খান বলেন, ‘আমি এই নির্দিষ্ট বিষয়টি নিয়ে আপাতত কিছু বলতে পারছি না। আমাদের অনেকগুলো রিপোর্ট তৈরি হয়ে আছে সিন্ডিকেটের অপেক্ষায়। আমি এটি নিয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলব। তদন্তে প্রভাব বিস্তারের বিষয়ে তিনি বলেন, বর্তমান প্রশাসনে এটি সম্ভব হবে না, আমাকে এভাবে কাবু করা কঠিন। তবে আমি এ বিষয়ে খোঁজ রাখব।’
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

