ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) কলা ভবনসংলগ্ন ডাকসু ক্যাফেটেরিয়ায় বাজারের হিসাবে দীর্ঘদিন ধরে অনিয়মের মাধ্যমে বিপুল টাকা কারচুপির অভিযোগ উঠেছে। বাজারের হিসাব বিশ্লেষণে দেখা গেছে, পণ্যের দাম ভাউচারে বাড়িয়ে দেখানো এবং ভুয়া ভাউচার তৈরির মাধ্যমে প্রতি মাসে লাখ টাকা কারচুপি হচ্ছে।
জানা যায়, টিএসসি পরিচালকের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এই ক্যাফেটেরিয়াগুলোর নিয়ম অনুযায়ী নির্ধারিত বাজারকারীদের মাধ্যমে পণ্য কেনার কথা থাকলেও বাস্তবে তা হচ্ছে না।
ডাকসু ক্যাফেটেরিয়ার বড় অঙ্কের বাজার— বিশেষ করে চাল, মুরগির মাংস ও আলু- মাহমুদুল্লাহ সরকার নামের একজন তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারীর মাধ্যমে করানো হয়। এসব পণ্যের দাম ভাউচারে প্রকৃত বাজারমূল্যের চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি দেখানো হয়।
ভাউচার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মুরগির মাংসের দাম ভাউচারে ২৮০ থেকে ২৯০ টাকা কেজি, যা বাজারে ২৪৫ থেকে ২৫০ টাকা করে বিক্রি হচ্ছে। চালের ভাউচারে প্রতি কেজির দাম ৬০-৬১ টাকা, যা বাজারে ৫০ থেকে ৫১ টাকা, আলুর ভাউচারে প্রতি কেজি ২০ টাকা করে দেখানো হচ্ছে যা বাজারে ১০-১২ টাকা।
এসব বাজারের সংশ্লিষ্ট দোকান— স্বাধীন ব্রয়লার হাউজ, প্রফেসরস অটো রাইস এজেন্সি এবং মেসার্স তিন ভাই বাণিজ্যালয়সহ কয়েকটি ঘুরে ও মালিকদের সঙ্গে কথা বলে এসব অভিযোগের সত্যতা মিলেছে। সংশ্লিষ্ট মুরগির দোকানদার বলেন, বৈশাখ মাস পর্যন্ত ক্যাফেটেরিয়ায় ২৪০ থেকে ২৪৫ টাকা করে মাংস দেওয়া হয়েছে। তবে সম্প্রতি মাংসের দাম একটু বেড়েছে।
এছাড়া আরো অভিযোগ রয়েছে, বাজারের এসব ভাউচার কখনো কখনো সরাসরি দোকান থেকে সংগ্রহ করা হয় না। বরং অফিস বা বাসায় বসেই সেগুলো তৈরি করা হয় এবং দোকানের সিল ব্যবহার করা হয়। এতে ভাউচার জালিয়াতির মাধ্যমে অতিরিক্ত টাকা তুলে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
ক্যাফেটেরিয়া সূত্রের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রতিদিন কেবল মুরগি, চাল ও আলুর হিসাবেই প্রায় দুই থেকে তিন হাজার টাকা অতিরিক্ত দেখানো হয়। যেখানে মুরগিতে দৈনিক ১০০০ থেকে ১৫০০ টাকা, আলুতে প্রায় ৭০০ টাকা, চালে প্রায় ৫০০ টাকার বেশি দেখানো হয়।
এই হিসাবে সপ্তাহে প্রায় ১৫ হাজার টাকা এবং বছরে প্রায় পাঁচ লাখ টাকা কারচুপি করা হচ্ছে। গত দুই বছরে এই অঙ্ক ১০ থেকে ১২ লাখ টাকায় পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা সংশ্লিষ্টদের।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মাহমুদুল্লাহ সরকার প্রথমে অনিয়মের কথা অস্বীকার করেন। পরে তথ্য-প্রমাণ উল্লেখ করলে তিনি দায় এড়িয়ে বলেন, বাজার মূলত আমি করি না; বাবুর্চিরা করে। আমি শুধু হিসাব দেখি। তবে সংশ্লিষ্ট বাবুর্চির অবস্থান জানতে চাইলে তিনি জানান, তিনি ক্যাফেটেরিয়ায় নেই, ছুটিতে আছেন।
তিনি বলেন, এই দাম শুধু আমরাই লিখি না, টিএসসি ক্যাফেটেরিয়াতেও একই দাম ধরা হয়। সন্দেহ হলে আপনি টিএসসির হিসাব চেক করে দেখতে পারেন। আমি আর বেশি কিছু বলতে পারব না। আপনি টিএসসি পরিচালককে জিজ্ঞাসা করেন।
ক্যাফেটেরিয়ার একাধিক কর্মচারীর অভিযোগ, বাজারের হিসাবে অনিয়মের সঙ্গে টিএসসি পরিচালক জড়িত রয়েছেন। ম্যানেজার এবং টিএসসি পরিচালকের ভাগ-বাটোয়ারাতেই এমন অনিয়ম হচ্ছে।
জানতে চাইলে টিএসসির পরিচালক ফারজানা বাশার অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, এ ধরনের অনিয়মের বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। তিনি বলেন, ক্যাফেটেরিয়ার কর্মচারীরা প্রায়ই এ ধরনের অনিয়মে জড়িত থাকে। যে কারণে ক্যাফেটেরিয়ার খাবারের মান তলানিতে চলে যাচ্ছে।
ডাকসুর ক্যাফেটেরিয়া সম্পাদক উম্মে সালমা বলেন, ক্যাফেটেরিয়াগুলোতে বাজার ব্যবস্থাপনা, ভাউচার প্রক্রিয়া এবং আয় সংরক্ষণÑ তিন ক্ষেত্রেই নজরদারির অভাব রয়েছে। এতে একদিকে শিক্ষার্থীরা ন্যায্যমূল্যের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে; অন্যদিকে খাবারের মান আরো নিম্নমুখী হয়ে যাচ্ছে।
এ বিষয়ে উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) সায়মা হক বিদিশা বলেন, ক্যাফেটেরিয়ায় খাবারের মান ও ব্যবস্থাপনা ঠিক রাখতে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

