আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘিরে অস্ট্রেলিয়ার দর্শকদের দেখানো হচ্ছে কালজয়ী নির্মাতা জহির রায়হানের ‘জীবন থেকে নেয়া’ সিনেমাটি। প্রায় তিন বছরের চেষ্টা ও ছয় মাসের পরিশ্রমে ইংরেজি সাবটাইটেলসহ ‘টু-কে’ (স্বচ্ছ রেজ্যুলেশন) সংস্করণে সিনেমাটি দেখাচ্ছেন পরিবেশনা সংস্থা বঙ্গজ ফিল্মসের প্রতিষ্ঠাতা তানিম মান্নান।
তানিম মান্নান আমার দেশকে জানান, শুক্রবার (গতকাল) সিডনিতে হয়েটস ওয়েদারিল পার্কের হয়েটস সিনেমা হলে ও রোববার (কাল) ডুমারেস্ক স্ট্রিট সিনেমা হলে ‘জীবন থেকে নেয়া’ সিনেমার দুটি প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছে।
‘জীবন থেকে নেয়া’ সিনেমাটি চিরচেনা পারিবারিক কাহিনির আবহে পরাধীনতার শেকল থেকে মুক্তিকামী মানুষের অধিকার আদায়ের গল্প, মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি। যে গল্পে দেখানো হয়েছে একটি দেশ, একটি সংসার-চাবির গোছা আর আন্দোলন।
ঐতিহাসিক এই চলচ্চিত্রে তরুণ প্রজন্মকে আরও আগ্রহী করে তুলতে ‘জীবন থেকে নেয়া’ সিনেমাটি দেখানোর উদ্যোগ নিয়েছেন মান্নান। তবে ৫৫ বছর আগে মুক্তিপ্রাপ্ত এই সিনেমাটি দেখাতে গিয়ে কিছুটা কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে এই পরিবেশককে।
সেই চ্যালেঞ্জের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘সিনেমাটি দেখানোর ইচ্ছা তৈরি হয়েছে প্রায় তিন বছর আগে। আমি তো এখানে নিয়মিত বাংলা সিনেমা দেখাই। অর্ধশতাধিক সিনেমা দেখানো হয়ে গেছে। একদিন মনে হল কমার্শিয়াল সিনেমা তো দেখানো হচ্ছে; যদি কালচারাল সিনেমাগুলো নিয়ে কোনো আয়োজন করা যায় ভালো হতো।’
তিনি বলেন, ‘একজন প্রযোজককে বললাম জহির রায়হানের সিনেমাটি দেখাতে চাই। কিন্তু তিনি জানালেন, নির্মাতার পরিবার থেকে অনুমতি পাওয়া সম্ভব হবে না। আমিও দমে গেলাম। কিন্তু কোনোভাবেই দেখানোর ইচ্ছাটা বাদ দিতে পারছিলাম না।’
জহির রায়হানের কাহিনি, চিত্রনাট্য ও পরিচালনায় রাষ্ট্রের অধিকার আদায়ের গল্পের ‘জীবন থেকে নেয়া’ মুক্তি পেয়েছিল ১৯৭০ সালে। সিনেমাটি ইউটিউবে দেখা গেলেও সিনেমার ভিজ্যুয়াল ও অডিও এবং দৃশ্য স্পষ্ট নয়।
মান্নান বলেন, ইউটিউবে দেখলাম ‘জীবন থেকে নেয়া’ সিনেমা আছে, ঘোলা প্রিন্ট; ঠিকমত বোঝা যায় না। সেটা দেখে সিনেমাটি সংস্কার করে দেখানোর ইচ্ছা তীব্রভাবে তৈরি হল। এরপর সিনেমাটি দেখানোর জন্য পরিবারের অনুমতি পেতে সাহায্য করেছেন লেখক ও চলচ্চিত্র সমালোচক বিধান রিবেরু। তিনি জহির রায়হানের ছেলে অনল রায়হানের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দিলেন। অনল ভাই আমাদের শুভকামনা জানিয়ে বললেন, এটা খুব ভালো উদ্যোগ। তিনি তপু রায়হান ভাইয়ের সঙ্গেও কথা বলিয়ে দিলেন।
পরিবারের অনুমতি নিয়ে বিনামূল্যে এবং ব্যক্তিগত উদ্যোগে সিনেমাটি প্রদর্শনের আয়োজন করা হয়েছে।
মান্নান বলেন, ‘আমি তাদের (অনল ও তপু রায়হান) পরিষ্কার করেছি, আমি এই শো থেকে কোনো টাকা নিচ্ছি না। সম্পূর্ণ বিনামূল্যে আমার সামর্থ্য অনুযায়ী এই সিনেমা দেখানোর আয়োজন করছি। একদম ব্যক্তিগত অর্থায়নে, যেন এই উদ্যোগ নিয়ে কেউ প্রশ্ন তুলতে না পারে।’
তিন মাস আগে এফডিসি থেকে সিনেমাটির এফডিএইচ (ফুল হাই ডেফিনেশন) প্রিন্ট সংগ্রহ করেন এই পরিবেশক।
মান্নান বলেন, ‘আমি যে ভার্সন নিয়েছি, সেটা ডিসিপি ভার্সন নয়। দেখলাম রেজ্যুলেশন ভালো নয়, কিছু কিছু দৃশ্যে স্পষ্টতা নষ্ট হয়ে গেছে, অডিও ঠিক নেই। এরপর সেটাকে আমরা ‘টু-কে’ সংস্করণে নিলাম। যেন সিনেমাটি দেখতে ভিজ্যুয়ালি অনেক স্বচ্ছ দেখায়।’
‘এরপর সিনেমার প্রিন্ট অস্ট্রেলিয়া নিয়ে এক মাস ধরে আমি ও আমার ভাই তাহিনুল মান্নান পুরো সংলাপ বাংলায় লিখে সেটাকে ইংরেজি ট্রান্সলেট করে সাবটাইটেল যুক্ত করলাম।’ দেশের ইতিহাসকে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছাতে এ ধরনের সিনেমাগুলো সংস্কারের প্রয়োজন মনে করেন মান্নান।
সেই উদ্যোগ থেকেই তার এই আয়োজন জানিয়ে মান্নান বলেন, ‘আমাদের বাংলা সিনেমার বর্ণালি ইতিহাস যেটা ১৯৭০ সাল থেকে শুরু হয়েছে, সেটা নিয়ে খুব বেশি চর্চা বা জানার চেষ্টা করা হচ্ছে না। এটাকে রিপ্রেজেন্ট করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না। এ প্রজন্মের পরবর্তী যারা আছেন, তারা যেন এই ইতিহাসটা দেখতে পারেন, তাই ইংরেজি সাবটাইটেলও যুক্ত করা হয়েছে। প্রিন্ট সংগ্রহ করে যে মান উন্নয়নের কাজ করা হয়েছে, এটা যে কেউ চাইলে সিনেমা হলেও মুক্তি দিতে পারবেন।’
মান্নান পেশায় একজন প্রকৌশলী। সিনেমা নিয়ে প্রবল আগ্রহ থেকেই অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশি সিনেমা মুক্তি দিয়ে থাকেন তিনি। অস্ট্রেলিয়ায় আট বছরে ৫৩টি সিনেমা মুক্তি দিয়েছেন মান্নান। আনিস ফিল্মস কর্পোরেশনের পরিবেশনায় জহির রায়হান তার সিনেমার কাহিনি তুলে ধরেছেন বড় বোন রওশন জামিল, স্বামী খান আতাউর রহমান, দুই ভাই শওকত আকবর ও রাজ্জাক, দুই ভাইয়ের বউ রোজী সামাদ ও সুচন্দা, বাড়ির গৃহপরিচারক এবং রোজী-সুচন্দার বড় ভাই রাজনীতিবিদ আনোয়ার হোসেনকে ঘিরে।
এই সিনেমায় বড় বোনের চরিত্রে রওশন জামিলকে তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানি শাসক হিসেবে রূপক অর্থে তুলে ধরেছেন নির্মাতা। আর আনোয়ার হোসেন সে সময়ের জনপ্রিয় রাজনৈতিক নেতা, রাজ্জাক প্রতিবাদী বিদ্রোহী ছাত্র আন্দোলনের প্রতিনিধি।
সিনেমাটির সঙ্গে সিনেমায় ব্যবহৃত ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’, ‘এ খাঁচা ভাঙব আমি কেমন করে’, ‘কারার ওই লৌহকপাট’ গানগুলোও অমর হয়ে আছে। সংগীত পরিচালক ছিলেন খান আতাউর রহমান। সিনেমা মুক্তি না দিতে পাকিস্তান সরকার সে সময় নানা ধরনের পাঁয়তারা করে, জহির রায়হানকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তুলে নেওয়া হয় ক্যান্টনমেন্টেও। পরে জনদাবির মুখে ছাড় মেলে সিনেমাটির। ১৯৭০ সালের ১১ এপ্রিল হলে আসে ‘জীবন থেকে নেয়া’।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

