সপ্তাহে অন্তত ৩০ ধরনের উদ্ভিজ্জ খাবার খাওয়ার প্রবণতা দিনে দিনে জনপ্রিয় হচ্ছে। পুষ্টিবিদদের মতে, খাবারে উদ্ভিদের বৈচিত্র্য বাড়ালে অন্ত্রের উপকারী অণুজীবের বৈচিত্র্যও বাড়তে পারে। বিষয়টি নিজে পরীক্ষা করতে গিয়ে বিবিসির স্বাস্থ্যবিষয়ক জ্যেষ্ঠ সংবাদদাতা মেলিসা হোগেনবুম এক সপ্তাহে খেয়েছেন ৫১ ধরনের উদ্ভিজ্জ খাবার। তার অভিজ্ঞতায়, সামান্য পরিকল্পনা আর পরিচিত খাবারে কিছু পরিবর্তন আনলেই এই লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব।
সুস্থ থাকতে প্রতিদিন ১০ হাজার পা হাঁটা কিংবা দিনে পাঁচ ধরনের ফল ও সবজি খাওয়ার পরামর্শের কথা অনেকেই শুনেছেন। এবার স্বাস্থ্যসচেতন মানুষের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে সপ্তাহে অন্তত ৩০ ধরনের উদ্ভিজ্জ খাবার খাওয়ার ধারণা। ফলমূল, শাকসবজি, শস্য, ডাল, বাদাম, বীজ, ভেষজ ও মসলার বৈচিত্র্য বাড়িয়ে খাদ্যাভ্যাসকে আরো পুষ্টিকর করাই এর উদ্দেশ্য।
বিষয়টি বাস্তবে কতটা সহজ, তা পরীক্ষা করতে এক সপ্তাহের জন্য এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেন বিবিসির স্বাস্থ্যবিষয়ক জ্যেষ্ঠ সংবাদদাতা মেলিসা হোগেনবুম। শুরুতে তার মনে হয়েছিল, প্রতিদিন এত ধরনের খাবার খাওয়া বেশ কঠিন হবে। কিন্তু সপ্তাহ শেষে দেখা গেল, ৩০ ধরনের লক্ষ্য ছাড়িয়ে তিনি খেয়েছেন মোট ৫১ ধরনের উদ্ভিজ্জ খাবার। তার মতে, খাবারের পরিকল্পনায় কিছুটা মনোযোগ দিলেই পরিচিত খাদ্যতালিকায় বৈচিত্র্য আনা সম্ভব। এমনকি প্রতিদিনের খাবারে ছোটখাটো পরিবর্তন আনলেও সাপ্তাহিক লক্ষ্য পূরণ করা যেতে পারে।
সপ্তাহে ৩০ ধরনের খাবারের ধারণা যেভাবে এল
সপ্তাহে ৩০ ধরনের উদ্ভিজ্জ খাবার খাওয়ার প্রবণতার পেছনে রয়েছে ২০১৮ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণা। এতে দেখা যায়, যারা সপ্তাহে অন্তত ৩০ ধরনের উদ্ভিজ্জ খাবার খাওয়ার কথা জানিয়েছেন, তাদের অন্ত্রের অণুজীবের বৈচিত্র্য সাধারণত তাদের তুলনায় বেশি, যারা সপ্তাহে ১০টিরও কম ধরনের উদ্ভিজ্জ খাবার খান। পরবর্তী কিছু গবেষণাতেও খাদ্যতালিকায় বিভিন্ন ধরনের উদ্ভিজ্জ খাবার যুক্ত করার সঙ্গে অন্ত্রের অণুজীবের বৈচিত্র্য বৃদ্ধির সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
অন্ত্রে বসবাসকারী এসব অণুজীব মানুষের স্বাস্থ্যের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। তাদের বৈচিত্র্য ও ভারসাম্য হজমপ্রক্রিয়া এবং শরীরের বিভিন্ন কার্যক্রমে ভূমিকা রাখতে পারে। স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে প্রদাহ কমানো এবং দীর্ঘমেয়াদে সুস্থ থাকার সম্ভাব্য সম্পর্কও রয়েছে। তবে সপ্তাহে ৩০ ধরনের খাবার খাওয়াকে সবার জন্য বাধ্যতামূলক বা নির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসাগত লক্ষ্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। গবেষণায় ৩০ সংখ্যাটি একটি নির্দেশক হিসেবে জনপ্রিয় হলেও, এর চেয়ে কম বৈচিত্র্যপূর্ণ খাদ্যতালিকা থেকেও উপকার পাওয়া সম্ভব।
ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সান ডিয়েগো ক্যাম্পাসের সেন্টার ফর মাইক্রোবায়োম ইনোভেশনের পরিচালক রব নাইট এ বিষয়ে বলেন, ৩০ সংখ্যাটি কিছুটা ইচ্ছানির্ভর। তার নেতৃত্বে পরিচালিত গবেষণায় সপ্তাহে ৩০টির বেশি ধরনের উদ্ভিজ্জ খাবার খাওয়া অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা বেশি ছিল না। তাই সপ্তাহে ২০ বা ২৫ ধরনের খাবার খেলেও কাছাকাছি ধরনের উপকার পাওয়া যেতে পারে বলে তিনি মনে করেন। তার মতে, যারা আগে খুব কম ধরনের উদ্ভিজ্জ খাবার খেতেন, তাদের খাদ্যতালিকায় বৈচিত্র্য বাড়ালে পরিবর্তন তুলনামূলক বেশি দেখা যেতে পারে।
কোন কোন খাবার গণনায় আসবে?
এই চ্যালেঞ্জে শুধু ফলমূল ও শাকসবজি নয়, উদ্ভিদ থেকে পাওয়া বিভিন্ন ধরনের খাবারই গণনায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। প্রধান ছয়টি বিভাগ হলো—
• ফলমূল: আপেল, কলা, কমলা, আঙুর, বেরি জাতীয় ফলসহ বিভিন্ন ধরনের ফল।
• শাকসবজি: পালংশাক, বাঁধাকপি, গাজর, টমেটো, ফুলকপি, বেগুন ও অন্যান্য সবজি।
• পূর্ণ শস্য: ওটস, লাল চাল, কুইনোয়া, পূর্ণ শস্যের রুটি ও অন্যান্য শস্য।
• ডাল ও শিমজাতীয় খাবার: ছোলা, মসুর ডাল, মটরশুঁটি, বিভিন্ন ধরনের বিনস ও অন্যান্য ডাল।
• বাদাম ও বীজ: কাজুবাদাম, চিনাবাদাম, চিয়া সিড, কুমড়ার বীজ, তিলসহ বিভিন্ন বীজ।
• ভেষজ ও মসলা: ধনেপাতা, রসুন, আদা এবং রান্নায় ব্যবহৃত নানা ধরনের মসলা।
এ ছাড়া চা, কফি ও কোকো থেকেও উদ্ভিদজাত উপাদান পাওয়া যায়। এসব খাবারে থাকা বিভিন্ন যৌগ, যেমন অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী হতে পারে।
তবে এই চ্যালেঞ্জে প্রতিটি খাবারকে কীভাবে গণনা করা হবে, তা নিয়ে বিভিন্ন নির্দেশনায় কিছু পার্থক্য রয়েছে। কোনো কোনো নির্দেশনায় ভেষজ, মসলা, চা ও কফিকে পূর্ণ পয়েন্টের পরিবর্তে এক-চতুর্থাংশ পয়েন্ট হিসেবে ধরা হয়।
লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজের পুষ্টিবিজ্ঞানী ফেদেরিকা আমাতির মতে, প্রতিদিনের খাবারে বিভিন্ন ধরনের মসলা যোগ করলেও অন্ত্রের অণুজীবের ওপর পরিমাপযোগ্য পরিবর্তন দেখা যেতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদি উপকারের জন্য নিয়মিত খাদ্যতালিকায় বৈচিত্র্য বজায় রাখা জরুরি।
এক সপ্তাহের খাবার তালিকায় যা ছিল
মেলিসা হোগেনবুমের পরীক্ষায় সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় ছিল, তাকে প্রতিদিন একেবারে নতুন বা জটিল খাবার তৈরি করতে হয়নি। বরং পরিচিত খাবারের উপকরণে বৈচিত্র্য এনেই তিনি লক্ষ্য ছাড়িয়ে যান।
সোমবার: সকালের নাশতায় ছিল ওটস, চিয়া সিড ও দইয়ের সঙ্গে ব্লুবেরি। রাতের খাবারে ছোলা দিয়ে তৈরি ট্যাজিনের সঙ্গে যোগ করেন মটরশুঁটি। এ ছাড়া বাঁধাকপি, কুসকুস, টমেটো, পেঁয়াজ, কিশমিশ ও বিভিন্ন মসলা ছিল তার খাদ্যতালিকায়।
মঙ্গলবার: সকালের খাবারে ফলের বৈচিত্র্য বজায় রাখেন। দুপুরে স্যান্ডউইচের সঙ্গে সালাদ খান। রাতের খাবারে ছিল কুইনোয়া, সবুজ মসুর ডাল, অ্যাসপারাগাস ও গ্রিল করা স্যামন। এ দিনের তালিকায় ছিল রাস্পবেরি, ছোট কমলা, আপেল, ব্রকলি, পালংশাক, লেবু, রসুন ও পেঁয়াজপাতার মতো উপকরণ।
বুধবার: পরিবারের পরিচিত তরকারি তৈরির ধরনে কিছু পরিবর্তন আনেন। মিষ্টি আলু, লাল ক্যাপসিকাম, বরবটি বা সবুজ শিমজাতীয় সবজি এবং বিভিন্ন মসলা দিয়ে রান্না করেন তরকারি। সঙ্গে ছিল লাল চাল। সকালের কফি, কলা ও কাজুবাদামও তাঁর উদ্ভিজ্জ খাবারের তালিকায় যুক্ত হয়।
বৃহস্পতিবার: সপ্তাহের মাঝামাঝি পৌঁছেই ৩০ ধরনের লক্ষ্যের কাছাকাছি চলে আসেন তিনি। রাতের খাবারে তৈরি করেন পেঁয়াজ, রসুন, গাজর, মসুর ডাল ও মিষ্টি আলু দিয়ে সবজির স্যুপ। সঙ্গে ছিল টক স্বাদের প্রাকৃতিকভাবে গাঁজানো রুটি ও সালাদ। পরে কলা, কোকো পাউডার ও কাজুবাদাম দিয়ে তৈরি করেন মিল্কশেক। এ দিন চা, কুমড়ার বীজ, লাল মসুর ডাল ও রকেট সালাদও তালিকায় যুক্ত হয়।
শুক্রবার: পরিবারের পছন্দের টাকো তৈরি করেন কালো বিনস ও গরুর মাংস দিয়ে। সঙ্গে ছিল পূর্ণ শস্যের গমের রুটি, শসা, অ্যাভোকাডো ও তাজা ধনেপাতা। অ্যাভোকাডো দিয়ে তৈরি করেন গুয়াকামোলে এবং অন্যান্য উপকরণ দিয়ে সালসা।
শনিবার: ব্যস্ততার কারণে দ্রুত রান্না করা যায়, এমন খাবার বেছে নেন। টেম্পে দিয়ে তৈরি করেন নুডলসের স্টার-ফ্রাই। টেম্পে হলো গাঁজানো সয়াবিন থেকে তৈরি একটি খাবার। এ দিনের তালিকায় ছিল শুকনো আম, চিনাবাদাম, জলপাই, পাক চয়, বেবি কর্ন ও তিল।
রবিবার: সপ্তাহের শেষ দিনে ওভেনে মুরগির মাংস ও বিভিন্ন সবজি একসঙ্গে রান্না করেন। সঙ্গে ছিল সালাদ। ফ্রিজে থাকা বেগুন, জুকিনি, আলু ও গাজর ব্যবহার করে খাবারে বৈচিত্র্য আনেন।
এভাবে সপ্তাহজুড়ে ফল, সবজি, ডাল, পূর্ণ শস্য, বাদাম, বীজ, মসলা, চা ও কফির মতো নানা উপকরণ তাঁর তালিকায় যুক্ত হয়। একই ধরনের খাবার বারবার খেলে নতুন পয়েন্ট পাওয়া যায় না বলে তিনি যতটা সম্ভব নতুন উপকরণ বেছে নেওয়ার চেষ্টা করেন।
খরচ না বাড়িয়েও বৈচিত্র্য আনা সম্ভব
শুরুতে হোগেনবুমের আশঙ্কা ছিল, এত ধরনের খাবার কিনতে গেলে বাজারের খরচ বেড়ে যাবে। কিন্তু পরীক্ষার সপ্তাহে তার কেনাকাটায় তেমন ব্যয় বাড়েনি। কারণ, তিনি শুধু তাজা ফলমূল ও সবজি কেনেননি; ঘরে থাকা শুকনো খাবার, ডাল, বাদাম, বীজ এবং হিমায়িত সবজিও ব্যবহার করেছেন।
এ ছাড়া প্রতিদিনের খাবার আগেভাগে কিছুটা পরিকল্পনা করায় আগের রাতের অবশিষ্ট খাবার দুপুরে খেতে পেরেছেন। এতে খাবারের অপচয় কমেছে। নতুন রেসিপি তৈরি করার কারণে পরিবারের সদস্যরাও স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ধরনের খাবার চেখে দেখেছেন।
তবে প্রতিদিন নতুন খাবার তৈরি করার বিষয়টি কিছুটা চ্যালেঞ্জিং ছিল। ব্যস্ত দিনের শেষে রান্নার জন্য সময় বের করা এবং কোন উপকরণ আগে খাওয়া হয়েছে, তার হিসাব রাখাও সহজ ছিল না। বিশেষ করে মসলা ও ভেষজের সংখ্যা মনে রাখা কঠিন হয়ে উঠেছিল।
খাবারে বৈচিত্র্য বাড়াতে কী করবেন?
লন্ডনের কিংস কলেজের পুষ্টিবিদ সেলেনা উয়ের পরামর্শ, প্রতিদিনের খাবারে বাড়তি আঁশ বা ফাইবার যোগ করার সুযোগ খুঁজতে হবে। সকালের সিরিয়ালে বাদাম ও বীজ যোগ করা কিংবা দুপুরের স্যান্ডউইচের সঙ্গে সালাদ খাওয়ার মতো ছোট পরিবর্তন দিয়েই শুরু করা যায়।
এ ক্ষেত্রে ব্যয়বহুল বা দুর্লভ খাবার কেনার প্রয়োজন নেই। স্থানীয় বাজারে সহজলভ্য বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি, মৌসুমি ফল, ডাল, ছোলা, মটরশুঁটি, বাদাম ও পূর্ণ শস্য দিয়েই খাদ্যতালিকায় বৈচিত্র্য আনা সম্ভব। উদাহরণ হিসেবে, প্রতিদিন একই ধরনের ডাল না খেয়ে কখনো মসুর, কখনো মুগ বা ছোলা খাওয়া যেতে পারে। একইভাবে, রান্নায় বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি ও মসলা ব্যবহার করলে আলাদা উপাদান যুক্ত হবে। ঘরে থাকা খাবার পরিকল্পনা করে ব্যবহার করলে খরচ ও অপচয়—দুটিই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
তবে শুধু ৩০ ধরনের সংখ্যা পূরণ করাই মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত নয়। খাদ্যতালিকায় পর্যাপ্ত পুষ্টি, ভারসাম্য ও সামগ্রিক স্বাস্থ্যকর খাবারের উপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ। কারও বিশেষ খাদ্যসংক্রান্ত চাহিদা বা অসুস্থতা থাকলে নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী খাদ্যাভ্যাস ঠিক করাও জরুরি।
৩০ ছাড়িয়ে ৫১, অভ্যাসে থাকবে বৈচিত্র্য
সপ্তাহ শেষে হোগেনবুমের হিসাবে মোট উদ্ভিজ্জ খাবারের সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ৫১। তার কাছে সবচেয়ে বড় বিস্ময় ছিল, লক্ষ্য পূরণের জন্য যতটা কঠিন প্রস্তুতির কথা ভেবেছিলেন, বাস্তবে ততটা প্রয়োজন হয়নি। তিনি মনে করেন, পরিচিত খাবারে সামান্য পরিবর্তন আনা, নতুন উপকরণ ব্যবহার করা এবং কেনাকাটায় বৈচিত্র্য রাখলেই অনেক দূর এগোনো সম্ভব। তার রান্নাঘরে এখন বিভিন্ন ধরনের বাদাম ও বীজের মজুতও বেড়েছে, যেগুলো ভবিষ্যতে নিয়মিত খাবারে যোগ করতে চান তিনি।
সপ্তাহে ৩০ ধরনের উদ্ভিজ্জ খাবার খাওয়ার ধারণার মূল শিক্ষা তাই শুধু একটি সংখ্যা অর্জন নয়; বরং প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় আরো বেশি ধরনের উদ্ভিদজাত উপাদান অন্তর্ভুক্ত করা। একই খাবার বারবার খাওয়ার বদলে বিভিন্ন ফল, সবজি, ডাল, পূর্ণ শস্য, বাদাম ও বীজ বেছে নেওয়ার অভ্যাস গড়ে উঠলে তা দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখতে সহায়ক হতে পারে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

