বৃষ্টিভেজা শৈশবের স্মৃতি

মাসুদ রানা

বৃষ্টিভেজা শৈশবের স্মৃতি

আষাঢ় আর শ্রাবণ এলেই আকাশজুড়ে জমে উঠত কালো কালো মেঘ। দূরে কোথাও মেঘের গর্জন শোনা যেত, বাতাসে ভেসে আসত ভেজা মাটির গন্ধ। মনে হতো, এই বুঝি বৃষ্টি নামল! কখনো দুপুরে, কখনো গভীর রাতে, আবার কখনো সারা দিন ঝুমঝুম করে বৃষ্টি ঝরত। চারপাশ ভরে যেত এক অন্যরকম স্নিগ্ধতায়। মনে হতো প্রকৃতি যেন নিজেই গান গাইছে।

সাত-আট বছর বয়সের সেই দিনগুলো আজও চোখের সামনে ভেসে ওঠে। বৃষ্টি শুরু হলেই ঘরে বসে থাকার ইচ্ছা হতো না। মা-বাবা যতই বারণ করুন, বন্ধুদের ডাক শুনলেই ছুটে বেরিয়ে যেতাম। খালি পায়ে কাদামাটির পথে দৌড়ানো, বৃষ্টির জলে ভিজে একাকার হয়ে যাওয়া, ছোট ছোট ডোবা আর মাঠে নেমে হইচই করা—এসবেই ছিল আমাদের আনন্দ।

বিজ্ঞাপন

গ্রামের কাঁচা রাস্তা বৃষ্টিতে পিচ্ছিল হয়ে যেত। আমরা সেই রাস্তায় দৌড়ে গিয়ে হোঁচট খেতাম। জামাকাপড় কাদা মেখে নষ্ট হয়ে যেত, কিন্তু তাতে কোনো দুঃখ ছিল না; বরং মনে হতো—এটাই যেন বৃষ্টির আসল উৎসব।

বৃষ্টির দিনে ফুটবল খেলার আনন্দ ছিল একেবারেই আলাদা। মাঠে হাঁটু পর্যন্ত কাদা—বলে কাদা লেগে ভারী হয়ে গেছে, তবু খেলা থামত না। কেউ পড়ে গেলে সবাই হেসে গড়িয়ে পড়ত। গোল করার চেয়ে কাদায় গড়াগড়ি খাওয়ার আনন্দটাই বেশি ছিল। খেলা শেষে কে কতটা কাদা মেখেছে, সেটাই ছিল আমাদের গর্বের বিষয়।

বিকাল হলেই ছুটে যেতাম নদীর ধারে কিংবা পুকুরে। ঝিরঝিরে বৃষ্টি মাথায় নিয়ে সাঁতার কাটতাম। কখনো ডুব দিয়ে উঠে বলতাম, ‘উপরে বুঝি খই ভাজছে, মুড়ি ভাজছে!’ এই ছোট্ট কথাতেই সবাই হেসে উঠত। সেই হাসি, সেই আনন্দ, সেই নির্ভেজাল বন্ধুত্ব আজও হৃদয়ের গভীরে রয়ে গেছে।

বৃষ্টির আরেকটি বড় আনন্দ ছিল পাকা আম কুড়ানো। ঝোড়ো বাতাস আর বৃষ্টির মধ্যে গ্রামের বিভিন্ন বাড়ির আমগাছের নিচে দাঁড়িয়ে ‘কখন একটা পাকা আম টুপ করে পড়বে’ সেই অপেক্ষায় থাকতাম। ভেজা হাতে সেই মিষ্টি আম খাওয়ার স্বাদ আজও জিভে লেগে আছে। বৃষ্টির দিনে পুকুরপাড়ের কাঁঠালগাছ, বরইগাছ কিংবা শিশুগাছ ছিল আমাদের সাহসের পরীক্ষা দেওয়ার জায়গা। গাছে উঠে এক লাফে পুকুরে পড়া ছিল অসাধারণ এক রোমাঞ্চ। কেউ দূর থেকে লাফ দিত, কেউ আবার গাছের ডাল ধরে ঝুলে ঝুলে পানিতে নামত। চারদিকে বৃষ্টির শব্দ, পুকুরের ঢেউ আর বন্ধুদের হাসি মিলিয়ে এক অপূর্ব দৃশ্য তৈরি হতো।

বৃষ্টিতে ভিজে বাড়ি ফিরলে মায়ের বকুনি ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। মা রাগ করে বলতেন, ‘এত ভিজিস কেন? ঠান্ডা লাগবে।’ বাবা মুখ গম্ভীর করে তাকিয়ে থাকতেন। কিন্তু পরক্ষণেই মা গরম পানি এনে দিতেন, শুকনো কাপড় পরিয়ে দিতেন আর আদা-চা কিংবা গরম ভাত খেতে দিতেন। সেই বকুনির মধ্যেও লুকিয়ে ছিল অগাধ ভালোবাসা, যা বড় হয়ে বুঝতে শিখেছি।

আজ শহরের ব্যস্ত জীবনে সেই দিনগুলো অনেক দূরে সরে গেছে। এখন বৃষ্টি এলেই মানুষ ছাতা খোঁজে, আশ্রয় খোঁজে। কিন্তু আমার মন খোঁজে সেই কাদামাখা মাঠ, সেই বন্ধুদের হাসি, সেই নদীর ঢেউ আর সেই পুকুরপাড়ের গাছগুলো। মনে হয়, যদি আরেকবার ফিরে পাওয়া যেত সেই ছোট্ট শৈশব!

সময় বদলে যায়, মানুষ বড় হয়, জীবন ব্যস্ত হয়ে ওঠে; কিন্তু কিছু স্মৃতি কখনো পুরোনো হয় না। আষাঢ়ের কালো মেঘ দেখলেই আজও মনে পড়ে সেই কাঁচা রাস্তা, সেই ফুটবল খেলা, পুকুরে লাফ দেওয়া, পাকা আম কুড়ানো আর মায়ের স্নেহভরা বকুনি। মনে হয়, শৈশব আসলে কোথাও হারিয়ে যায় না, সে বেঁচে থাকে স্মৃতির গভীরতম কোণে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...