ভোরবেলা গ্রামবাংলার আকাশে যখন পাখিরা গান গায়, তখনো কেউ কেউ হাতে মুঠোফোন ধরে বসে থাকে। তেমনই একজন রুপা, খুলনার এক গৃহবধূ। তার দিন শুরু হয় রান্নাঘরের হাঁড়িপাতিলের শব্দ দিয়ে। কিন্তু যখন একটু অবসর মেলে, তখন তিনি ফেসবুক খুলে দেখেন, নতুন কোন শাড়ি এসেছে অনলাইন দোকানে। মুগ্ধ হয়ে দেখেন এক ডিজিটাল প্রিন্ট শাড়ির ছবি। আরেকটু দেখেন, আরেকটু ভাবনায় পড়েন। দামটা ঠিকঠাক। ডেলিভারিও বাড়িতে। এমন সুযোগ কি আর হাতছাড়া করা যায়? তাই তিনি অর্ডার দিয়ে দেন এবং কদিনের মধ্যে গ্রামের পথ ধরে রুপার উঠোনে হাজির হয় সেই শাড়ি।
এই গল্প আজকাল আর অবাক করে না কাউকে। শহর থেকে গ্রাম সবখানে বদলে যাচ্ছে কেনাকাটার ধরন। একসময় যেখানে বাজার মানে ছিল বাজারে গিয়ে ঘুরে ঘুরে কেনাকাটা করা, আজ সেই বাজারই ফোনের স্ক্রিনে এসে ধরা দিচ্ছে। আর মানুষ শুধু দেখছে না, অর্ডার দিচ্ছে, দাম দিচ্ছে ডিজিটাল পেমেন্টে। আর অপেক্ষা করছে কুরিয়ারম্যানের ডাকের।
বাংলাদেশে প্রযুক্তির এই ছোঁয়া আস্তে আস্তে শুধু শহরেই নয়, ছড়িয়ে পড়ছে গ্রামের কোনায় কোনায়। আগে যেখানে মানুষ ঢাকায় এসে বড় দোকান থেকে কিছু কিনে নিয়ে যেত, এখন সেখানে তারা নিজের ঘরেই বসে কিনছে। কখনো শীতের কম্বল, কখনো ঈদের জামা। আর এই বদলে যাওয়া পৃথিবী গড়তে সাহায্য করেছে ইন্টারনেট, স্মার্টফোন আর সোশ্যাল মিডিয়া।
বিশেষ করে করোনা মহামারির সময় মানুষের মধ্যে এক নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়। বাজারে যাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ, অথচ প্রয়োজন থেমে নেই। সেই জায়গা থেকেই যেন চুপিসারে গড়ে ওঠে এক ডিজিটাল বাজার। মানুষ ফেসবুক পেজ খুলে পণ্য বিক্রি শুরু করে—কেউ রান্না করা খাবার, কেউ ঘরোয়া পণ্য, কেউবা গ্রামের খাঁটি ঘি বা গাভীর দুধ। শহরের মানুষ খুঁজে পায় গ্রামের স্বাদ, গ্রামের মানুষ পায় শহরের চাহিদা। এই লেনদেনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকে মোবাইল পেমেন্ট বিকাশ, নগদ, রকেট প্রভৃতি। সব যেন এক নতুন কেনাবেচার ভাষা হয়ে উঠেছে ।
কিন্তু শুধু জামাকাপড় বা ঘরোয়া পণ্যই নয়, বাংলাদেশে ডিজিটাল হাটের ধারণা এক নতুন মাত্রা পেয়েছে কোরবানির সময়। কেউ হয়তো মোবাইলে গরুর ছবি দেখে এবং ভিডিও কল করে গরু দেখে পছন্দ করছে। আর দাম মিটিয়ে বাড়িতে গরু পাচ্ছে। এমন অভিজ্ঞতা যাদের আগে ছিল না, তারাও যেন প্রযুক্তির ওপর ভরসা করতে শিখছে।
আর শহরগুলোয় তো আরো গতিশীল এ পরিবর্তন। অফিসে বসেই কেউ কিনছে সবজি, কেউ খাবার, কেউ বই। Daraz, Chaldal, Rokomari, Foodpanda, Pathao—এমন অসংখ্য অনলাইন প্ল্যাটফর্ম আজ মানুষের নিত্যদিনের সঙ্গী। শুধু প্রোডাক্ট নয়, অনেকেই এখন ‘এক্সপেরিয়েন্স’ কিনছে। লাইভ ভিডিওতে পণ্য দেখে নেয়, উপস্থাপককে প্রশ্ন করে, আর ঠিক তখনই অর্ডার করে দেয়। যেন এক বাজারই বসে গেছে মোবাইল স্ক্রিনে।
এই নতুন বাজার ব্যবস্থায় শুধু ভোক্তাই বদলাচ্ছে না, উদ্যোক্তারাও তৈরি করছেন নতুন গল্প। সিলেটের রাইসা, যার ছোট্ট একটা হোম ডেকর পেজ, এখন তিনি দেশের নানা প্রান্তে পণ্য পাঠান। বা বগুড়ার সাহেদ, যিনি আগে স্কুলের শিক্ষক ছিলেন, এখন ইউটিউব আর ফেসবুকে খেজুর গুড় বিক্রি করে মাসে লক্ষাধিক টাকা আয় করছেন। এসব উদাহরণ প্রমাণ করে প্রযুক্তির ছোঁয়ায় শুধু কেনাকাটার অভ্যাস নয়, জীবন বদলে যাওয়ার পথও তৈরি হয়েছে।
তবে এর সঙ্গে এসেছে কিছু সমস্যাও। প্রতারণা, ভুল পণ্য, সময়মতো ডেলিভারি না পাওয়া—এসব এখনো চ্যালেঞ্জ। কিন্তু প্রযুক্তির গতির কাছে এসব সমস্যাও একসময় অতিক্রম হয়ে যাবে বলে বিশ্বাস করে মানুষ। সরকারের পক্ষ থেকেও ই-কমার্স নীতিমালা তৈরি হয়েছে। ক্রেতা-উদ্যোক্তা উভয়ের স্বার্থ রক্ষার জন্য।
ভবিষ্যতের দিকে তাকালে দেখা যায়, এই পরিবর্তন কেবল শুরু। কল্পনা করুন, ঘরে বসেই আপনি ভার্চুয়াল শোরুমে ঢুকলেন, পণ্যের চারদিকে ঘুরে দেখলেন। জামা পরে দেখে নিলেন কেমন লাগছে, তারপর অর্ডার দিলেন। এমন প্রযুক্তি আর কল্পনা এখন আর দূরে নয়। রোবটিক ডেলিভারি, ড্রোনে পণ্য পাঠানো—সবই বাস্তবতার কাছাকাছি।
একসময় ছিল যখন মানুষ বাজারে গিয়ে দৌড়ঝাঁপ করত। এখন মানুষ সময় বাঁচাতে এবং আরাম খুঁজতে প্রযুক্তিকে বেছে নিয়েছে। আর সেই প্রযুক্তি দিয়েছে তাদের নতুন এক কেনাকাটার স্বাধীনতা, যে স্বাধীনতা শুধু আর্থিক নয়, সময়ের, অভিজ্ঞতার, আর ভরসার।
এই পুরো রূপান্তরটাই আসলে একটা নিঃশব্দ বিপ্লব, যেটা শুরু হয়েছে আমাদের হাতের ফোনে; কিন্তু পৌঁছে গেছে জীবনযাত্রার গভীরে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

