প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও ঐতিহ্যে গড়া পিক ডিস্ট্রিক্ট

প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও ঐতিহ্যে গড়া পিক ডিস্ট্রিক্ট
হাজার বছরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে গড়া ইংল্যান্ডের পিক ডিস্ট্রিক্ট

হাজার বছরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে গড়া ইংল্যান্ডের পিক ডিস্ট্রিক্ট। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপরূপ এই পিক ডিস্ট্রিক্ট তার সবুজ বন-বনানি, সুবিশাল ম্যানগ্রোভ প্রাচীন ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলো যুগ যুগ ধরে ভ্রমণপিপাসু উৎসাহী পর্যটকদের আকৃষ্ট করে আসছে। ব্রিটেনের প্রথম এবং প্রাচীনতম জাতীয় উদ্যান হলো এই পিক ডিস্ট্রিক্ট। উঁচু উঁচু পাথরের পর্বতশৃঙ্গ, গাঢ় নীল হিমেল আবহাওয়ায় বহে চলা হ্রদ, বিস্তীর্ণ প্রান্তর আর পাহাড়ের পাদদেশে রয়েছে প্রাচীন গুহা, যেখানে পৃথিবীর বিরল প্রকৃতির ব্লু জন পাথরের খনি, যা এক কথায় অদ্ভুত সৌন্দর্য নিয়ে শত শত বছর ধরে দাঁড়িয়ে আছে পিক ডিস্ট্রিক্টের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য সত্যিই অতুলনীয়। এখানকার প্রকৃতি ইতিহাস আর শিল্প একসঙ্গে মিলে তৈরি করেছে স্বর্গীয় সৌন্দর্য। পিক ডিস্ট্রিক্টের নয়নাভিরাম অনন্য স্থানগুলো একবার দেখলে বারবার দেখতে ইচ্ছে করে।

যুক্তরাজ্যের দক্ষিণ ইয়র্কশায়ারের ছোট্ট শহর শেফিল্ড। সাত পাহাড়ে ঘেরা এই শহরের চারপাশজুড়ে রয়েছে সাতটি চূড়া ও মনোরম উপত্যকা। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর এ অঞ্চলের বুক চিরে প্রবাহিত হয়েছে ঐতিহ্যবাহী ‘রিভার ডন’। এর সঙ্গে রয়েছে আরো কয়েকটি ছোট নদী ও উপনদী—শেফ, রিভলিন এবং পোর্টার ব্রুক। আর এই নদী ও পাহাড়চূড়া হাজার বছর ধরে আগত পর্যটকদের কাছে নিসর্গের অনবদ্য সৌন্দর্যের মুগ্ধতা ছড়িয়ে আসছে।

বিজ্ঞাপন

সারা বছরই পাহাড়চূড়ার অপরূপ প্রকৃতিতে মুগ্ধ হয়ে ভিড় করেন প্রকৃতিপ্রেমীরা। নদী ও উপত্যকায় ঘেরা সবুজ-শ্যামল এই শান্ত শহরটি বিশ্বজুড়ে আরেকটি প্রাচীন নামে পরিচিত—‘দ্য স্টিল সিটি’। একসময় এখানেই প্রথম ইস্পাত উৎপাদনের মাধ্যমে শেফিল্ড বিশ্বজুড়ে খ্যাতি অর্জন করেছিল। সে কারণেই আজও অনেকেই শহরটিকে ‘ইস্পাতের শহর’ বলে ডাকেন।

মনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য শেফিল্ডকে সাম্প্রতিক সময়ে আরো জনপ্রিয় করে তুলেছে। শেফিল্ডকে বলা হয় ‘সবুজময় স্টিল সিটি’। এর পেছনে একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো, এটি ইউরোপের অন্যতম সবুজ শহর। শহরজুড়ে রয়েছে ৮০০টি সবুজ স্থান। এছাড়া প্রায় ১৫ মাইলজুড়ে বিস্তৃত গাছবেষ্টিত একটি হাঁটার পথ রয়েছে। বলা হয়ে থাকে, এখানে মানুষের চেয়ে গাছের সংখ্যাই বেশি। শহরটির সীমানার ভেতরেই প্রায় ২৫০টির বেশি পার্ক ও উদ্যান রয়েছে।

অথচ দ্বাদশ শতকের গোড়ার দিকে এ শহরকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল অসংখ্য শিল্পকারখানা। তখন ধারণা করা হয়েছিল, একদিন শেফিল্ড ইংল্যান্ডের অন্যতম পরিবেশদূষিত ও উষ্ণতম শহরে পরিণত হবে। কিন্তু বাস্তবে একবিংশ শতাব্দীতে এসে আশ্চর্যজনকভাবে এটি শীতল, সবুজ ও পরিবেশবান্ধব এক অনন্য শহরে রূপ নিয়েছে। একসময়কার শিল্পনগরী আজ প্রকৃতিপ্রেমীদের অভয়ারণ্য।

পিক ডিস্ট্রিক্টের বিভিন্ন পাহাড়ের বাঁকে বাঁকে আয়নার মতো স্বচ্ছ পানির হ্রদের তীর ঘেঁষে গড়ে উঠেছে ছোট ছোট গ্রাম। যদিও ইংল্যান্ডের স্বাভাবিক আবহাওয়ায় রোদ, বৃষ্টি ও প্রচণ্ড ঠান্ডা—সবই থাকে, তবু এসব উপেক্ষা করে বছরের প্রায় সব সময়ই পিক ডিস্ট্রিক্টে পর্যটকদের ভিড় লক্ষ করা যায়। তবে গ্রীষ্মের শুরুতেই দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড় থাকে।

প্রাকৃতিক-সৌন্দর্য-ও-ঐতিহ্যে-গড়া-পিক-ডিস্ট্রিক্ট-2

এককথায়, পিক ডিস্ট্রিক্ট বিচিত্র প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অপূর্ব সমাহার। এখানকার দুর্গম পাহাড়, ঐতিহাসিক গ্রাম, শান্ত হ্রদ এবং আঁকাবাঁকা নদ-নদীর প্রবাহ প্রকৃতিপ্রেমী ও ভ্রমণপিপাসুদের মন কাড়ে। এটি ডার্বিশায়ার, ইয়র্কশায়ার, চেশায়ার ও গ্রেটার ম্যানচেস্টার অঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা নিয়ে গড়ে উঠেছে। পিক ডিস্ট্রিক্টের প্রতিটি স্থানে প্রকৃতি যেন নতুন নতুন রূপে ধরা দেয়।

এখানকার প্রতিটি মুহূর্তে আপনার মনে হবে, যেন কোনো স্বর্গরাজ্যে এসে পড়েছেন। পাহাড়ের বুক চিরে গড়ে ওঠা গ্রামীণ বাড়িগুলো শত বছরের পুরোনো পাথরে নির্মিত। সেগুলোর সৌন্দর্য ভাষায় প্রকাশ করা সত্যিই কঠিন।

পিক ডিস্ট্রিক্টের বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে মাইলের পর মাইল রাস্তার দুপাশে দেখা মেলে ঘোড়া, গরু ও ভেড়ার খামার। এসব প্রাণী মুক্ত পরিবেশে বিচরণ করে। পর্যটকদের থাকার জন্য রয়েছে নানা স্থানে কটেজ। আধুনিক সব ধরনের সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন এসব স্থাপনা লেক ও পাহাড়ের কিনার ঘেঁষে গড়ে উঠেছে। সেখান থেকে আগত দর্শনার্থীরা উপভোগ করেন চোখধাঁধানো প্রাকৃতিক সৌন্দর্য।

অনিন্দ্যসুন্দর রাতের এই নীরব মাধুর্য দেখে সৌন্দর্যপিপাসুরা চোখ ফিরিয়ে নিতে পারেন না। নারী-পুরুষ নেচে-গেয়ে বর্ণিল আনন্দে গড়ে তোলেন আরেক আবেগঘন অধ্যায়। এখানকার পাহাড়, লেক ও নীরবতার মিলন যেন প্রকৃতির এক নৈসর্গিক মুগ্ধতার হাতছানি দিয়ে সবাইকে আহ্বান জানায়।

প্রথম দেখাতেই অনেকটা পোস্টকার্ডের ছবির মতো মনে হবে। প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য পিক ডিস্ট্রিক্ট একটি অনন্য ভ্রমণস্থান। এখানকার পাহাড়ের পাদদেশের মনোমুগ্ধকর দৃশ্য সবার মন কেড়ে নেয়। এরই মধ্যে পিক ডিস্ট্রিক্টের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত ক্যাসেলটন নামের একটি গ্রাম, যেখানে রয়েছে একটি আকর্ষণীয় গুহা। এর নাম ট্রিক ক্লিক ক্যাভার্ন। এখানে পৃথিবীর একমাত্র ‘ব্লু জন স্টোন’ নামের একধরনের খনিজ পাওয়া যায়, যা শুধু এই অঞ্চলেই মিলেছে।

গুহার ভেতরের পরিবেশ যেন ভীষণ রহস্যময়। প্রচণ্ড ঠান্ডা আর মৃদু আলোয় গা ছমছম করে ওঠে। গুহার প্রবেশদ্বার থেকে শুরু করে বিভিন্ন স্থানে সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড রয়েছে। শুরুতেই লেখা ‘ডেঞ্জার’ শব্দটি দেখে যে কেউই আঁতকে উঠতে পারেন।

ট্রিক ক্লিফ ক্যাভার্নের ভেতরে রয়েছে অসংখ্য সরু ও আঁকাবাঁকা পথ। কোথাও পাথরের সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে হয়, আবার কোথাও নিচে নামতে হয়। প্রথম দেখায় পথগুলো বেশ বিপজ্জনক মনে হতে পারে। এমনকি মনে হতে পারে, যেকোনো সময় পা পিছলে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে বাস্তবে পথগুলো ততটা পিচ্ছিল নয়। পর্যটকদের নিরাপত্তা ও জনসচেতনতার কথা বিবেচনা করেই পুরো গুহাটি সুপরিকল্পিতভাবে সাজানো হয়েছে।

১৭৪৫ সালে পাথর কেটে নির্মিত এই সুড়ঙ্গপথ দিয়ে আজও শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানুষের যাতায়াত অব্যাহত রয়েছে।

গুহার ভেতরের বিভিন্ন অংশের আলাদা আলাদা নাম রাখা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ‘আলাদ্দিনের গুহা’, ‘ড্রিম কেভ’ এবং ‘ফেয়ারি ল্যান্ড’। এসব নাম শুনলেই মনে হয়, যেন কোনো জাদুর জগতে চলে এসেছি।

আমার মতো অনেকেই খনি থেকে উত্তোলিত প্রাকৃতিক পাথরের কথা শুনেছেন। তবে এখানে এলে সরেজমিনে নিজ চোখেই দেখতে পারবেন, ‘ব্লু জন স্টোন’ বা ‘ব্লু জন’ রত্ন কীভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে। এখানকার ব্লু জন পাথরের রয়েছে এক অনন্য সৌন্দর্য। বেগুনি ও নীল রঙের মিশেলে পাথরগুলো দেখতে অনেকটা ব্রিটিশ রাজমুকুটের কোহিনূর রত্নের মতো।

‘ব্লু জন স্টোন’-এর বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, এর ভেতরে বেগুনি ও হলুদ রঙের এক অনন্য মিশ্রণ দেখা যায়। এ কারণেই এই পাথর বিশ্বের অন্যতম বিরল ও অনন্য খনিজ হিসেবে পরিচিত। মাশরুম-আকৃতির ছোট ছোট এসব পাথর প্রথম দেখাতেই যে কাউকে মুগ্ধ করে। এর মধ্যে সবচেয়ে মূল্যবানগুলোর একটি হলো ‘সেভেন ডোয়ার্ফস’।

ব্লু জন’ পাথরের খনি থেকে ফেরার পথে অনেকেই স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে সামর্থ্য অনুযায়ী ব্লু জন পাথর কিনে নিয়ে যান। এখানে দুই-এক হাজার টাকা থেকে শুরু করে কয়েক লাখ টাকা মূল্যের বিভিন্ন ধরনের পাথর পাওয়া যায়। দর্শনার্থীরা নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী সেগুলো কিনে থাকেন।

এই খনিতে প্রবেশের জন্য প্রবেশমূল্য দিতে হয়। প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য টিকিটের মূল্য ১৬ পাউন্ড। তবে পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুদের জন্য প্রবেশ সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। এই দুর্লভ ‘ব্লু জন’ ভূগর্ভস্থ রত্নের খনি এবং আশপাশের মনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখতে প্রতিদিন হাজারো পর্যটকের পদচারণে মুখর থাকে পিক ডিস্ট্রিক্ট। ঐতিহাসিক এই স্থানটি, মনোরম প্রকৃতি ও চমৎকার হাইকিং ট্রেইলের কারণে ভ্রমণপিপাসুদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়।

যারা প্রকৃতিকে ভালোবাসেন, তাদের জন্য এটি যুক্তরাজ্যের অন্যতম সেরা গন্তব্য। লন্ডন থেকে প্রায় তিন ঘণ্টার ড্রাইভ দূরত্বে অবস্থিত এই ন্যাশনাল পার্কে রয়েছে সবুজ পাহাড়, মনোমুগ্ধকর উপত্যকা, শান্ত লেক, ঝরনা, ‘ব্লু জন স্টোন’ বা ‘ব্লু জন’ রত্ন এবং চোখজুড়ানো নানা প্রাকৃতিক দৃশ্য। এসব মিলিয়ে এটি আপনাকে শহরের ব্যস্ততা থেকে দূরে কিছুটা প্রশান্তি এনে দিতে পারে।

প্রতিবছরের গ্রীষ্ম মৌসুমে পিক ডিস্ট্রিক্ট ভ্রমণ প্রকৃতির সঙ্গে মিশে যাওয়ার এক অনন্য অভিজ্ঞতা হতে পারে।

লেখক : সভাপতি, লিভারপুল বাংলা প্রেস ক্লাব ইউকে

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন