মালয়েশিয়ার একটি আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের নেতৃত্বে উঠে আসা এক তরুণের কণ্ঠে উচ্চারিত এই কথাগুলো আমাদের প্রজন্মের সম্ভাবনার প্রতিধ্বনি। গাজীপুরের মাটিতে বেড়ে ওঠা সেই তরুণ উমায়ের ইবনে জহির সম্প্রতি মালয়েশিয়ার আলবুখারি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ছাত্র সংসদের ভাইস প্রেসিডেন্ট (ভিপি) নির্বাচিত হয়েছেন। বিদেশের মাটিতে একজন বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর এই অর্জন কেবল তার ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, এটি বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের তরুণদের মেধা, নেতৃত্ব ও সক্ষমতার উজ্জ্বল স্বাক্ষর।
গাজীপুরে জন্ম ও বেড়ে ওঠা উমায়েরের শৈশব কেটেছে গ্রামের সরল পরিবেশে। সবুজ প্রকৃতি, পরিবার ও মানুষের কাছাকাছি থাকার অভিজ্ঞতা তার মানসিক গঠনকে প্রভাবিত করেছে। পরে শহুরে জীবনের সঙ্গে পরিচয় ঘটলেও শেকড়ের সেই শিক্ষা তাকে আজও পথ দেখায়। শিক্ষাজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় কেটেছে তা’মিরুল মিল্লাত কামিল মাদরাসা, টঙ্গী শাখায়। পাশাপাশি তুরাগ শিল্পীগোষ্ঠীসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততা তার নেতৃত্ব, দায়িত্ববোধ ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিকে সমৃদ্ধ করেছে।
২০২৪ সালের মে মাসে আলবুখারি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির স্কলারশিপের জন্য আবেদন করেন উমায়ের। কয়েক মাসের অপেক্ষার পর জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের উত্তাল সময় পেরিয়ে একই বছরের নভেম্বরে হাতে আসে কাঙ্ক্ষিত স্কলারশিপ অফার লেটার। ডিসেম্বর মাসে শুরু হয় তার নতুন যাত্রা, এক আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেকে গড়ে তোলার পথচলা।
বিশ্ববিদ্যালয়টিতে বর্তমানে ৬৫টিরও বেশি দেশের শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে। বহুজাতিক ও বৈচিত্র্যময় এই পরিবেশ উমায়েরের দৃষ্টিভঙ্গিকে আরো বিস্তৃত করেছে। নোবেলবিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন এই বিশ্ববিদ্যালয়কে সোশ্যাল বিজনেস ও থ্রি জিরো থিওরির দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় কেন্দ্র হিসেবেও বিবেচনা করা হয়।
উমায়ের বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচটি মূল শিক্ষা, অর্থাৎ Aqidah, Akhlak, Adab, Amanah ও Amalan আমার চিন্তাধারা, নেতৃত্বগুণ ও নৈতিক মূল্যবোধকে সমৃদ্ধ করেছে এবং এখনো করছে।’
নেতৃত্বে আসার গল্প
ছাত্র সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার সিদ্ধান্ত ছিল তার দীর্ঘমেয়াদি স্বপ্নেরই অংশ। উমায়েরের ভাষায়, তার জীবনের বড় লক্ষ্য একটি ‘মেগা কালচারাল রেভল্যুশন’ এবং একটি সুন্দর, সুস্থ ও বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ে তোলার স্বপ্ন। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে নেতৃত্ব, ব্যবস্থাপনা দক্ষতা এবং সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা অর্জনকে তিনি গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন।
তবে ব্যক্তিগত স্বপ্নের পাশাপাশি বন্ধু ও সহপাঠীদের উৎসাহও তাকে নির্বাচনে অংশ নিতে অনুপ্রাণিত করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে গড়ে ওঠা বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের একটি ঘনিষ্ঠ বুদ্ধিবৃত্তিক পরিমণ্ডল তার প্রতি আস্থা রেখেছিল। সেই আস্থা থেকেই শুরু হয় নির্বাচনি যাত্রা।
শিক্ষার্থীদের জন্য কাজ করার অঙ্গীকার
নির্বাচনি প্রচারণায় উমায়েরের মূল বার্তা ছিল শিক্ষার্থীদের সমস্যার সমাধান, ব্যক্তিগত উন্নয়ন এবং মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করা। তিনি শিক্ষার্থী ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের মধ্যে কার্যকর সেতুবন্ধ তৈরির প্রতিশ্রুতি দেন।
‘শিক্ষার্থীদের সমস্যা চিহ্নিত করা, সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া, তাদের নেতৃত্ব ও দক্ষতা বৃদ্ধি করা এবং মানসিক সুস্থতার বিষয়ে কাজ করাই ছিল আমার প্রচারণার মূল লক্ষ্য,’ বলেন তিনি।
তবে নির্বাচনি পথ মোটেও সহজ ছিল না। বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন, তাদের মতামত শোনা এবং দীর্ঘ সময় ধরে প্রচারণার উদ্যম ধরে রাখা ছিল বড় চ্যালেঞ্জ।
যেভাবে নির্বাচিত হন উমায়ের
আলবুখারি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ছাত্র সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের প্রচলিত ছাত্ররাজনীতির চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন।
এখানে প্রথমেই একজন শিক্ষার্থীকে প্রার্থী হওয়ার জন্য মনোনয়ন নিতে হয়। এরপর তার একাডেমিক ফলাফল, আচরণগত রেকর্ড ও অন্যান্য বিষয় যাচাই করা হয়। এসব ধাপ সফলভাবে অতিক্রম করার পরই বৈধ প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ মেলে। উমায়েরও প্রতিটি পর্যায়ে উত্তীর্ণ হয়ে নির্বাচনি প্রক্রিয়ায় এগিয়ে যান।
নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় দুটি ক্যাটাগরিতে—জেনারেল সিট ও স্কুল রিপ্রেজেন্টেটিভ সিট। উমায়ের জেনারেল সিটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে নির্বাচিত হন। তবে সরাসরি ভিপি পদে নির্বাচন করার সুযোগ নেই। প্রথম ধাপে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মধ্য থেকে নেতৃত্বের বিভিন্ন পদের জন্য আবার মনোনয়ন গ্রহণ করা হয়। এরপর ভোট ও সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে প্রার্থীদের নেতৃত্বের যোগ্যতা মূল্যায়ন করা হয়। উমায়ের এসব ধাপেও সফলভাবে উত্তীর্ণ হন এবং শেষ পর্যন্ত ছাত্র সংসদের ভাইস প্রেসিডেন্ট (ভিপি) হিসেবে দায়িত্ব লাভ করেন।
‘বাংলাদেশ আমার পরিচয়’
একজন বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিপি হলেও নিজের পরিচয় নিয়ে তিনি অত্যন্ত সচেতন। তার মতে, প্রতিটি বাংলাদেশি বিশ্বের বুকে দেশের প্রতিনিধি।
তিনি বলেন, ‘আমি নিজেকে বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে দেখি। তবে আমার স্বপ্ন পুরো মানবজাতিকে নিয়ে। মানুষে মানুষে বিভেদ কমাতে পারলে সেটাকেই আমি সাফল্য মনে করব।’
আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য তার পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে শিক্ষার্থীদের সামগ্রিক উন্নয়ন। একাডেমিক উৎকর্ষ, নেতৃত্বের বিকাশ, সহশিক্ষা কার্যক্রমে অংশগ্রহণ এবং নৈতিক মূল্যবোধ চর্চার পাশাপাশি তিনি মানসিক সুস্থতার বিষয়টিকেও বিশেষ গুরুত্ব দিতে চান।
পরিবার থেকে পাওয়া শক্তি
উমায়েরের সাফল্যের পেছনে পরিবারের অবদান অনেক। তার বাবা ও মা দুজনেই দীর্ঘদিন শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত ছিলেন। ছোটবেলা থেকেই তারা সন্তানদের শিক্ষার সর্বোচ্চ সুযোগ নিশ্চিত করার চেষ্টা করেছেন।
উমায়ের স্মরণ করেন, ‘আম্মু ছোটবেলা থেকেই ইংরেজির ভিত্তিটা তৈরি করে দিয়েছেন। আর আব্বু অক্লান্ত পরিশ্রম করে আমাদের ভালো প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনার সুযোগ করে দিয়েছেন। তাদের দোয়া, সমর্থন ও ত্যাগ ছাড়া আজকের অবস্থানে আসা সম্ভব হতো না।’
তরুণদের উদ্দেশে
উমায়ের মনে করেন, জুলাই অভ্যুত্থান শুধু একটি ঘটনার নাম নয়, এটি একটি প্রজন্মের চেতনা ও দায়িত্ববোধের প্রতীক। তার ভাষায়, ‘জুলাই অভ্যুত্থান আমাদের স্পিরিট। এই স্পিরিটকে ধরে রাখা, হারাতে না দেওয়া এবং জুলাইকে নিজের করে নেওয়া আমাদের কর্তব্য।’
তিনি আরো বলেন, ‘বাংলাদেশ আমাদের পরিচয়। আমরা প্রত্যেকেই বাংলাদেশের একজন প্রতিনিধি। আমাদের প্রতিটি কাজ, প্রতিটি আচরণ ও প্রতিক্রিয়া দেশের পরিচয় বহন করে। তাই এই পরিচয়কে আরো সমৃদ্ধ করতে নিজেকে যোগ্য করে গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই। একই সঙ্গে কারা আমাদের দেশ ও জাতির উন্নয়নের পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়, তাদেরও চিনতে হবে।’
দেশের তরুণদের প্রতি তার আহ্বান—‘আজকের তরুণরাই আগামী দিনের নেতা। নিজেদের নৈতিকতাকে এতটাই দৃঢ় করতে হবে, যেন একটি সুন্দর রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলার পথে ব্যক্তিগত নৈতিক অবক্ষয় কখনো বাধা হয়ে না দাঁড়ায়।’
গাজীপুরের এক তরুণের এই পথচলা শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়; এটি স্বপ্ন, মূল্যবোধ, নেতৃত্ব ও দায়িত্ববোধের এক অনুপ্রেরণাময় যাত্রা। বিদেশের মাটিতে নেতৃত্বের আসনে পৌঁছেও তিনি ভুলে যাননি নিজের শেকড়, নিজের দেশ এবং মানুষের প্রতি দায়িত্বের কথা। তার গল্প নতুন প্রজন্মকে মনে করিয়ে দেয়, বড় স্বপ্ন দেখতে হলে আকাশের দিকে তাকাতে হয়, কিন্তু সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের শক্তি খুঁজে নিতে হয় নিজের মাটি থেকেই।
এসআর
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

