গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ে পুসাবের উত্থান

গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ে পুসাবের উত্থান

২০১৫ সালে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর ৭ দশমিক ৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপের সরকারি সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা আন্দোলন থেকেই জন্ম নেয় Private University Students Alliance of Bangladesh (PUSAB)। তবে একটি আন্দোলনের মধ্যেই এর লক্ষ্য সীমাবদ্ধ ছিল না। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই সংগঠনটির উদ্দেশ্য ছিল বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য একটি জাতীয় প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা, যা তাদের অধিকার রক্ষা, নেতৃত্ব বিকাশ, নীতি প্রণয়নে অংশগ্রহণ এবং শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নে ধারাবাহিকভাবে কাজ করবে। আজ এক দশকেরও বেশি সময় বিভিন্ন কার্যক্রমের মাধ্যমে ‘পুসাব’ নিজেকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের অন্যতম প্রতিনিধিত্বকারী প্ল্যাটফর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করছে।

বিজ্ঞাপন

ভ্যাট আন্দোলন থেকে জাতীয় প্ল্যাটফর্ম

পুসাবের প্রতিষ্ঠার প্রেক্ষাপট ছিল ২০১৫ সালের ভ্যাটবিরোধী আন্দোলন। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আরোপিত ভ্যাটের বিরুদ্ধে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নামলে সেই আন্দোলনের নেতৃত্ব ও সমন্বয়ের প্রয়োজন থেকেই সংগঠনটির যাত্রা শুরু হয়। প্রতিষ্ঠাতাদের মতে, সে সময় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অধিকার নিয়ে কাজ করার মতো কোনো কেন্দ্রীয় সংগঠন ছিল না। এই শূন্যতা পূরণের লক্ষ্যেই পুসাব সাংগঠনিক রূপ লাভ করে।

বর্তমানে সংগঠনটির দাবি অনুযায়ী, দেশের প্রায় ১০০টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে তাদের সাংগঠনিক কার্যক্রম রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক চ্যাপ্টারের পাশাপাশি কেন্দ্রীয় স্থায়ী কমিটি, নির্বাহী কমিটি এবং সদস্যদের সমন্বয়ে পরিচালিত হয় সংগঠনটি। এর সঙ্গে রয়েছে আইনজীবী, প্রকৌশলী, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন পেশাজীবীর ফোরাম এবং দেশের প্রথম জাতীয় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অ্যালামনাই সংগঠন পুসাব।

এক দশকের কার্যক্রম

গত এক দশকে পুসাব বিভিন্ন জাতীয় ও শিক্ষার্থী স্বার্থসংশ্লিষ্ট আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে। ২০১৫ সালের ভ্যাটবিরোধী আন্দোলন, ২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলন, নিরাপদ সড়ক আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সংগঠনটির সদস্যরা সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। একই সঙ্গে করোনা মহামারির সময় চিকিৎসা ও খাদ্য সহায়তা, অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রমে সহযোগিতা, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একাডেমিক সংকট নিরসনে মধ্যস্থতা এবং ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া সহযোগিতা বৃদ্ধির মতো বিভিন্ন উদ্যোগও গ্রহণ করে পুসাব। সংগঠনটির দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে অন্তত ২০ হাজার দক্ষ গ্র্যাজুয়েট তৈরি করা।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সম্পৃক্ততা

পুসাব-এর ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের শুরুতে তারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করলেও ২০১৮ সালের অভিজ্ঞতার কারণে সরাসরি যুক্ত হয়নি। তবে ১৫ জুলাই আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা এবং পরদিন শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার ঘটনার পর সংগঠনটি আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এরপর আন্দোলনের দাবিকে কোটা সংস্কারের গণ্ডি ছাড়িয়ে সরকারবিরোধী একদফা আন্দোলনের দিকে নিয়ে যাওয়ার মূল কার্যক্রমের নেতৃত্ব দেয়।

আন্দোলনের সময় তাদের সবচেয়ে বড় অবদান ছিল তথ্য প্রচার ও সমন্বয়। বহুস্তরীয় নেতৃত্ব কাঠামো এবং দেশ-বিদেশে অবস্থানরত সদস্যদের সমন্বয়ে তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ধারাবাহিকভাবে আন্দোলনের তথ্য প্রচার অব্যাহত রাখে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম, মানবাধিকার সংগঠন এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের কাছেও এসব তথ্য পৌঁছে দেওয়া হয়। ইন্টারনেট বন্ধ থাকার সময় বিদেশে থাকা অ্যালামনাই সদস্যরাই সংগঠনের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম পরিচালনা করেন।

জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালে পতিত স্বৈরাচার সরকার ইন্টারনেট বন্ধ করে গণহত্যা চালায়। তখনো পুসাব-এর সদস্যরা বিভিন্নভাবে আন্দোলন চালিয়ে গেছেন। পুসাব-এর অন্যতম বড় শক্তি ছিল তাদের বিস্তৃত ইনফরমেশন নেটওয়ার্ক ও যোগাযোগ ব্যবস্থা। সারা দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অন্যান্য সংগঠকদের সাথে ছাত্রদল, শিবিরসহ সকলে মিলে ১৩টি সেক্টর বা জোনে ভাগ করে আন্দোলনের পরিকল্পনা সাজায়। ঢাকার মধ্যে রামপুরা, বাড্ডা, বসুন্ধরা, মিরপুর, উত্তরা, ধানমন্ডি, তেজগাঁও ও মহাখালীর মতো এলাকাকে পৃথক জোন করা হয়। একইভাবে ঢাকার বাইরে চট্টগ্রাম, সিলেট, রাজশাহী, খুলনাসহ বিভিন্ন অঞ্চলেও আলাদা সেক্টর গড়ে তোলা হয়। পুসাব এই সকল জোনের তথ্য এবং আন্দোলনের দিকনের্দশনা সারা দেশে ছড়িয়ে দেয়৷ এই কাঠামোর ফলে আন্দোলন কোনো একক ব্যক্তিনির্ভর ছিল না; বরং প্রতিটি জোনেই একাধিক নেতৃত্ব তৈরি করা হয়েছিল। ফলে একজনকে গ্রেপ্তার করা হলেও আন্দোলন থেমে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল না। পরিচিত কোনো একক মুখের পরিবর্তে একটি সমন্বিত দল হিসেবেই তারা কাজ করেছে। "জিরো ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট" পলিসি ফলো করে চলা পুসাবের মূল সংগঠকরা চেয়েছেন গ্রেপ্তার এড়িয়ে থেকে তাদের ভূমিকা চলমান রাখতে। এসময় তারা দেশ ও দেশের বাইরের সদস্যদের সহযোগিতায় নিরবিচ্ছিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করেন।

এই বিস্তৃত সাংগঠনিক কাঠামোর পাশাপাশি কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিদের নিয়ে কেন্দ্রীয়ভাবে ৮ থেকে ১০ সদস্যের একটি সমন্বয়কারী দল গঠন করা হয়েছিল। ইন্টারনেট বন্ধ থাকার সময় এ দলটি মোবাইল ফোনে নির্দিষ্ট কোড ব্যবহার করে যোগাযোগ রক্ষা করত। কখনো মসজিদে, কখনো গভীর রাতে রিকশা বা সিএনজি চার্জিং গ্যারেজের মতো নিরিবিলি স্থানে গোপনে বৈঠক করে পরবর্তী দিনের কর্মসূচি নির্ধারণ করা হতো। এমন সমন্বিত পরিকল্পনা ও গোপন যোগাযোগ ব্যবস্থার মাধ্যমে পুসাব আন্দোলনের পুরো সময় নিজেদের সংগঠিত রাখতে এবং সারা দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ঐক্যবদ্ধভাবে নেতৃত্ব দিতে সক্ষম হয়েছিল।

আন্দোলনের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে সংগঠনটির ওপরও দমন-পীড়নের মাত্রা বাড়তে থাকে। তৎকালীন সাংবাদিকের মাধ্যমে জানা যায় তাদের বিরুদ্ধে ‘শুট অ্যাট সাইট’ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। সংগঠনটির আরো দাবি, সে সময় এনটিএমসি থেকে পুসাব-এর সদস্যদের শনাক্ত করে আটক বা গুলি করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। এর ধারাবাহিকতায় সংগঠনের একাধিক সদস্যকে তুলে নেওয়া, গুম করা এবং জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে পুসাব-এর মূল সমন্বয়কারীদের পরিচয় শনাক্ত করার চেষ্টা করা হয়। তবে এসব চাপ ও দমন-পীড়নের মধ্যেও সংগঠনটি তাদের সাংগঠনিক কার্যক্রম ও আন্দোলনের সমন্বয় অব্যাহত রাখে তারা।

এছাড়াও জুলাই গণ-অভ্যুত্থান চলাকালে তারা ছাত্র-জনতাকে সব ধরণের সহায়তা করে। আহতদের তাৎক্ষনিক চিকিৎসার চেষ্টা, শহীদদের লাশের তথ্য সংগ্রহ ও প্রচার, আন্দোলন জারি রাখা; এই সবকিছুই তারা একসাথে করেছে।

বর্তমান কার্যক্রম

বর্তমানে পুসাব-এর প্রধান লক্ষ্যগুলোর একটি হলো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করা। সংগঠনটির মতে, অনিয়ন্ত্রিতভাবে নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রবণতা বন্ধ করে সরকারকে কঠোর তদারকি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীরা যে বিপুল অর্থ ব্যয় করে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করছে, তার বিনিময়ে যেন তারা আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন শিক্ষা লাভ করতে পারে, সেটিও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

এ লক্ষ্যে পুসাব অন্তর্বর্তী সরকার থেকে শুরু করে বর্তমান সরকারের সঙ্গেও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে একাধিকবার কাজ করেছে। তাদের অন্যতম দাবি হলো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের শিক্ষাব্যয় কমিয়ে আনা এবং বেসরকারি উচ্চশিক্ষার জন্য সরকারি বাজেটে পৃথক বরাদ্দ রাখা। সংগঠনটির মতে, গবেষণা অনুদান, বৃত্তি ও আর্থিক সহায়তা বাড়ানো গেলে আরো বেশি শিক্ষার্থী উচ্চমানের শিক্ষা লাভের সুযোগ পাবে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, সরকার ইতোমধ্যে করের হার কমিয়ে ৫ শতাংশে নামিয়েছে, যা এই দাবির আংশিক প্রতিফলন।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

ভবিষ্যতের জন্য পুসাব কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত প্রস্তাব সামনে এনেছে। সংগঠনটি চায়, আর্থিকভাবে অসচ্ছল কিন্তু মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য সরকার যেন স্বনামধন্য বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিনা খরচে বা পূর্ণ অর্থায়নে অধ্যয়নের সুযোগ নিশ্চিত করে। পাশাপাশি সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যকার বিভাজন দূর করে যৌথ গবেষণা, শিক্ষক বিনিময়, একাডেমিক কার্যক্রম এবং ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া সহযোগিতা বৃদ্ধি করা হোক।

সংগঠনটি আরো মনে করে, অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের প্রতি অযৌক্তিক শাস্তি, প্রশাসনিক হয়রানি এবং সামান্য কারণে বহিষ্কারের মতো ঘটনা ঘটে, যা শিক্ষার পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এসব অনিয়ম বন্ধে কার্যকর নীতিমালা এবং শিক্ষার্থীবান্ধব প্রশাসনিক সংস্কার প্রয়োজন বলে তারা মনে করে।

পুসাব-এর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা ও বর্তমান সভাপতি বলেন, ‘আমরা মূলত দুটি বিষয় নিয়ে কাজ করি। এক. মানবাধিকার, দুই. ইয়ুথ ডেভেলপমেন্ট। মানবাধিকারের জায়গাগুলোয় আমরা আন্দোলন সংগ্রামের যে বিষয়গুলো আছে, এর বাইরেও যেকোনো মানবাধিকার-সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আমরা সবসময় খুব স্পষ্ট ভূমিকা নিই, সরব ভূমিকায় থাকি। আমরা রাষ্ট্রের যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ ক্রাইসিস মোমেন্টে খুব সরব ভূমিকা নিয়েছি এবং আমরা এটি সবসময় বজায় রাখতে চাই। আর ইয়ুথ ডেভেলপমেন্টের ক্ষেত্রে একটা গোল ঠিক করা আছে আমাদের। আমরা ২০৩০ সালের মধ্যে অন্ততপক্ষে ২০,০০০ স্কিলড গ্র্যাজুয়েট তৈরি করতে চাই, যারা আসলে দেশ এবং দেশের বাইরে বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দেবে দক্ষতার মাধ্যমে।’

এক দশকের পথচলায় পুসাব নিজেকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অধিকার, মানসম্মত শিক্ষা এবং নীতিগত সংস্কারের দাবিতে একটি সক্রিয় প্ল্যাটফর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। ভবিষ্যতেও শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে সংগঠনটি তাদের কার্যক্রম অব্যাহত রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে।

এসআর

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন