বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রতিটি মিছিলে যুক্ত থাকতেন শুভ শীল। উত্তাল জুলাইয়ের ২০ তারিখ বিকেলে সাভার বাসস্ট্যান্ডে পুলিশ তাকে গুলি করে। তিন দিন পর সাভার এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন তিনি।
হাসপাতালের বেডে কাতরাতে কাতরাতে কিছু কথা তার ভাই সোহাগ শীলকে বলে গেছেন। তিনি বলেন, আমি হয়তো বাঁচব না, দেশের জন্য রাস্তায় নেমে জীবন দিলাম এটাই আমার জীবনের পরম পাওয়া।
শুভ শীলের বয়স হয়েছিল মাত্র ২০ বছর। ঝিনাইদহ সদর উপজেলার ঘোড়শাল ইউনিয়নের মুনুড়িয়া গ্রামে জন্ম শুভ শীলের। দুই ভাইয়ের মধ্যে শুভ ছোট। জীবিকার তাগিদে বাবা বিকাশ শীল, মা সাধনা রানী শীল, বড় ভাই সোহাগ শীলসহ শুভর পরিবার থাকত সাভারের আশুলিয়া এলাকায়। বিকাশ শীল সেলুনে কাজ করেন আর তার দুই ছেলে সোহাগ ও শুভ গার্মেন্টসে চাকরি করতেন।
এসএসসি পাস করলেও সংসারে অভাবের কারণে শুভর উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তি হওয়া সম্ভব হয়নি। জুলাইয়ে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে ছাত্রছাত্রীরা রাস্তায় নামলে শুভ গার্মেন্টসের চাকরি ছেড়ে তার সহপাঠীদের সঙ্গে রাস্তায় নেমে পড়েন এক দফার দাবিতে।
২০ জুলাই সকাল থেকেই সাভার এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। ফ্যাসিবাদের দোসর পুলিশ সেদিন কোনোভাবেই সেদিন ছাত্রদের সাভার এলাকায় সমবেত হতে দিচ্ছিল না। শুভ আশ্রয় নেন সাভার বাসস্ট্যান্ডের সামনে একটি বন্ধ মার্কেটের ভেতরে। দুই পুলিশ তাকে রাস্তায় এনে বেধড়ক মারধর করে। অচেতন শুভকে মৃত ভেবে ফেলে যাওয়ার সময় এক পুলিশ শুভর পেট লক্ষ্য করে গুলি চালায়।
পুলিশ আহতদের ব্যাপারে এতই ক্ষুব্ধ ছিল যে, আহত শুভকে হাসপাতালে লোহার বেডের সঙ্গে হাতকড়া পরিয়ে রাখে। এভাবে তিন দিন পর সাভার এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২৩ জুলাই ভোরে মৃত্যুর কাছে হার মানে শুভ।
শুভর বড় ভাই সোহাগ শীল জানান, শুভ মারা যাওয়ার পর ২৩ জুলাই সারা দিন পুলিশের সঙ্গে চলে দরকষাকষি। কোনোভাবেই হাসপাতাল থেকে লাশ বের করতে দিতে রাজি হয়নি পুলিশ। সাভার থানার সেই সময়ের ওসিসহ ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তারা একপর্যায়ে শুভর লাশ হাসপাতাল থেকে থানায় নিয়ে যাওয়ার জন্য উদ্যোগী হয়। ওই দিন সন্ধ্যায় পুলিশ গ্রামের বাড়িতে না নিয়ে যাওয়ার শর্তে শুভর পরিবারের কাছ থেকে মুচলেকা নিয়ে লাশ হস্তান্তর করে। রাতের বেলা তড়িঘড়ি করে শুভর লাশ সাভার মহাশ্মশানে পুলিশের লোকজনের উপস্থিতিতে দাহ করা হয়।
মুনুড়িয়া গ্রামের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য অশোক কুমার বিশ্বাস জানান, শুভর লাশ আসবে বলে গভীর রাত পর্যন্ত শত শত গ্রামবাসী অপেক্ষায় ছিল। পরে জেনেছি পুলিশ লাশ দেয়নি, সাভারে শেষকৃত্য অনুষ্ঠিত হয়েছে।
সোহাগ শীল আরো বলেন, হিন্দু বা সংখ্যালঘু মানেই আওয়ামী লীগ নয়। তা না হলে স্বৈরাচার হাসিনাকে পদত্যাগে বাধ্য করতে তার আপন ছোট ভাইকে জীবন দিতে হতো না। তিনি শুভর হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন। ফ্যাসিস্ট হাসিনার বিচারও দাবি করেন তিনি। সোহাগ জানান, শুভ মারা যাওয়ার পর থেকে তার মা সাধনা রানী শয্যাশায়ী। ছেলের শোকে তিনি একরকম পাথর হয়ে গেছেন।
জেলা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ঝিনাইদহ জেলা যুগ্ম আহ্বায়ক আনিচুর রহমান জানান, আহত ও নিহতদের ব্যাপারে আরো যাচাই-বাছাই চলছে। এরই মধ্যে জুলাই স্মৃতি ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে নিহতদের পরিবারকে ৫ লাখ ও ঝিনাইদহ জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ৫০ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে। যাচাই-বাছাই চূড়ান্ত হলে আহত ও নিহতদের ব্যাপারে সরকারের আরো বড় পরিকল্পনা হাতে রয়েছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

