টঙ্গী সরকারি কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র ফাহমিন জাফর। ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে বন্ধুদের সঙ্গে উত্তরা এলাকায় যোগ দেন। ছাত্র-জনতার আন্দোলনে পুলিশ গুলি চালালে গুরুতর আহত হয়ে উত্তরার একটি মার্কেটের সিঁড়িতে লুটিয়ে পড়েন ফাহমিন। ছররা গুলিতে তার সারা শরীর ঝাঁজরা হয়ে যায়। পরে আন্দোলনের সহযোগীরা তাকে উত্তরার একটি হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সেখানে মারা যান তিনি।
বাবা-মায়ের চার সন্তানের সবার ছোট ফাহমিন জাফর। নওগাঁ জেলার আত্রাই উপজেলার তারাটিয়া গ্রামের বাসিন্দা তারা। ইচ্ছে ছিল বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) পড়াশোনা করবেন। সেই স্বপ্ন বোনার অদম্য লক্ষ্যে মা মোসাম্মৎ শিল্পীর সঙ্গে ঢাকায় মামাবাড়িতে থেকে পড়াশোনা করতেন ফাহমিন।
বাবা শেখ আবু জাফর বলেন, ‘ইঞ্জিনিয়ার হয়ে পরিবারের হাল ধরতে চেয়েছিল ফাহমিন। ১৮ জুলাই ছেলের সঙ্গে সকাল ১০টার দিকে মুঠোফোনে তার শেষ কথা হয়। জানতে চাই কোথায় আছ। উত্তর দিল, আন্দোলনে আছি বাবা। তাকে তাড়াতাড়ি ঘরে ফিরে যেতে বলেছি। কিন্তু ছেলে ফিরল ঠিকই, তবে লাশ হয়ে।’
ফাহমিনের ফোনের কলতালিকায় সবার শেষে ছিল বাবার নম্বর। কেউ একজন ওই নম্বরে ফোন করে জানান, ‘ফাহমিন আহত হয়েছে, জরুরিভাবে আপনারা হাসপাতালে আসুন।’ ফাহমিনের বাবা ওই সময় তাদের রাজশাহীর বাসায় অবস্থান করছিলেন। খবর পেয়ে তিনি ঢাকায় ফাহমিনের মা শিল্পী ও মামা মোকতাদিরকে ফোন করে ওই হাসপাতালে যেতে বলেন। তারা হাসপাতালে গিয়ে ছেলের লাশ বিছানায় পড়ে থাকতে দেখেন। এ সময় কান্নায় ভেঙে পড়েন স্বজনরা। মা ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন।
ওই রাতেই তারা ফাহমিনের লাশ নিয়ে গ্রামের বাড়ি আত্রাইয়ের উদ্দেশে রওনা দেন। পরদিন ১৯ জুলাই জুমার নামাজের পর পারিবারিক গোরস্তানে ফাহমিনকে দাফন করা হয়।
মা শিল্পী জানান, ১৮ জুলাই সকালে বাবু (ফাহমিন) নাশতা করে আন্দোলনে যায়। যাওয়ার সময় সে বলে, ‘স্বৈরাচার পতনের আন্দোলনে গিয়ে যদি আমার মৃত্যু হয়, তাহলে তোমরা আমার লাশ ঘরে আনবা না; যতক্ষণ না হাসিনার পতন হচ্ছে।’
শিল্পী আরও বলেন, ‘ফাহমিনের জন্ম ২০০৬ সালের ১০ জুলাই। সেই জুলাই মাসেই আমার কোল খালি করে রক্তপিপাসা নিবৃত্ত করেছে খুনি হাসিনা।’
এর আগে হাসপাতালে যাওয়ার পথে পথে পুলিশি হয়রানির শিকার হন ফাহমিনের স্বজনরা। সেই বর্ণনা দিয়ে মা শিল্পী আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, ফাহমিনের গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হওয়ার খবর পেয়ে হাসপাতালে যাওয়ার পথে সেদিন হাসিনার পেটোয়া পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা আমাকে পদে পদে বাধা দেয় ও অশালীন আচরণ করে। তারপরও আমি পুলিশের সঙ্গে বাগ্বিতণ্ডা করে হাসপাতালে পৌঁছে দেখি আমার বাবুটা (ফাহমিন) আর নেই। হাসপাতালের কর্তব্যরত একজন চিকিৎসক দ্রুত লাশ নিয়ে যাওয়ার জন্য তাড়া দেন এবং বলেন, ‘দেরি করলে পুলিশ আপনার ছেলের লাশ গায়েব করে দিতে পারে।’
এ সময় আক্ষেপ করে মা শিল্পী বলেন, ‘পুলিশের গুলিতে ঝাঁজরা হয়ে যাওয়া আমার বাবুর ছবি চোখে ভেসে ওঠে। সেটি মনে পড়লে আমি ঠিতমতো ঘুমাতে পারি না।’ এ সময় সন্তান হত্যার বিচার চেয়ে ফাহমিনের মা শিল্পী বলেন, ‘আমার বাবুসহ অন্য সব মায়ের কোল খালি করা সন্তান হত্যার বিচার চাই এবং খুনি হাসিনার ফাঁসি চাই।’
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

