বিচারক নিয়োগের নীতি
আবু বকর (রা.) বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে শুধু ব্যক্তির পাণ্ডিত্য দেখতেন না, বরং তার তাকওয়া (খোদাভীতি), নৈতিক চরিত্র এবং মানসিক বুদ্ধিমত্তাকে সমান গুরুত্ব দিতেন। তিনি জানতেন যে, একজন অযোগ্য বা দুর্নীতিগ্রস্ত বিচারক পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দিতে পারে । নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রধান মানদণ্ড ছিল দ্বীনের ‘ইলম’ বা গভীর জ্ঞান। একজন বিচারককে কোরআন এবং সুন্নাহর বিধানে পারদর্শী হতে হতো। যখন কোনো বিষয়ে স্পষ্ট বিধান না পাওয়া যাবে, তখন তার ‘ইজতিহাদ’ বা মূলনীতির ভিত্তিতে স্বাধীন আইনি চিন্তা করার সক্ষমতা থাকতে হতো। কিন্তু জ্ঞানের চেয়েও বেশি গুরুত্ব দেওয়া হতো ‘তাকওয়া’কে। তাকওয়াসম্পন্ন একজন বিচারক আল্লাহর কাছে জবাবদিহির ভয়ে কোনোভাবেই অন্যায় রায়ের পথে হাঁটতেন না। আবু বকর (রা.), পরে উমর (রা.) সচ্ছল ব্যক্তিদের বিচারক নিয়োগের চেষ্টা করতেন, যাতে অভাবের কারণে তারা অনেতিকতার পথে পা না বাড়ান।
আবু বকর (রা.) বিচার বিভাগীয় অনেক কাজ নিজে করলেও তিনি হজরত উমর (রা.)-কে মদিনার প্রধান বিচারকের দায়িত্ব প্রদান করেছিলেন। উমর (রা.)-এর কঠোর ইনসাফ এবং আবু বকর (রা.)-এর অভিভাবকত্বের কারণে সেই সময়টি ইনসাফের সোনালি সময় হিসেবে পরিচিত। বিচারক নিয়োগে এই যে ‘পাওয়ার অ্যান্ড ট্রাস্ট’ বা সক্ষমতা ও বিশ্বাসের মেলবন্ধন, তা আধুনিক বিচারিক সংস্কারের জন্য একটি বড় অনুপ্রেরণা হতে পারে। বিচারকদের আর্থিক স্বাধীনতা এবং সামাজিক সুরক্ষা প্রদান করে তাদের প্রশাসনিক প্রভাবমুক্ত রাখার যে ভ্রূণ আবু বকর (রা.) রোপণ করেছিলেন, তা পরে উমর (রা.)-এর আমলে পূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে।
আবু বকর (রা.)–এর যুগে বিচারকরা
আবু বকর (রা.)-এর শাসনকালে অধিকাংশ ক্ষেত্রে তিনি নিজেই বিচার-ফয়সালা করতেন। কারণ বিচারকার্যকে তিনি সাধারণ শাসন অধিকারের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে গণ্য করতেন। সে সময়ে বিচার বিভাগ স্বতন্ত্র কোনো দপ্তর বা প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ছিল না। তবে তিনি খিলাফত রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় শহর মদিনা মুনাওয়ারায় বিচারকার্যের দায়িত্ব উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর ওপর অর্পণ করেছিলেন। তবে বিচার বিভাগীয় সার্বিক অধিকার ও কর্তৃত্ব উমর (রা.)-এর ছিল না।
আবু বকর (রা.)-এর শাসনামলে খিলাফত রাষ্ট্রের বিভিন্ন অঞ্চলে নিয়োজিত গভর্নরদের ওপর প্রশাসন, শাসনকার্য, ইমামতি এবং জাকাত আদায়ের সমন্বিত দায়িত্ব অর্পিত ছিল। সে সময় প্রাদেশিক প্রশাসন-কাঠামো মূলত নববি ব্যবস্থার ধারাবাহিকতায়ই পরিচালিত হতো। বিচারব্যবস্থা-সংক্রান্ত পৃথক দপ্তর, স্বতন্ত্র বিচারিক কাঠামো বা বিচারকদের দায়িত্ব নির্ধারণ করে আবু বকর (রা.)-এর পক্ষ থেকে গভর্নরদের উদ্দেশে পাঠানো কোনো আলাদা প্রশাসনিক দলিলের প্রমাণ পাওয়া যায় না।
তবে তার খিলাফত-গ্রহণের খুতবায় ন্যায়বিচার-নীতির একটি মৌলিক কাঠামো স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়। সেখানে তিনি ঘোষণা করেন, অধিকার পাওয়া পর্যন্ত একজন দুর্বল ব্যক্তিও তার কাছে শক্তিশালী। আবার অধিকার প্রদান না করা পর্যন্ত যেকোনো শক্তিশালী ব্যক্তিই তার কাছে দুর্বল। একই সঙ্গে তিনি নিজেকে শরিয়তের অনুসারী শাসক হিসেবে উপস্থাপন করেন এবং প্রিন্সিপাল অব অ্যাকাউন্টেবল লিডারশিপ ঘোষণা করেন। তার এই বক্তব্য সমতাভিত্তিক বিচারনীতি, জবাবদিহি এবং মজলুমের পক্ষে অবস্থানের মৌলিক ধারণা প্রতিষ্ঠা করে।
উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-কে উত্তরসূরি মনোনয়নের যে পত্র তিনি প্রেরণ করেছিলেন, তাতেও আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা পাওয়া যায়। সেখানে তিনি ন্যায় প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন এবং জানান, উমরকে খলিফা মনোনীত করার মূল উদ্দেশ্যই হলো ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা। এর থেকে বোঝা যায়, আবু বকর (রা.)-এর দৃষ্টিতে ন্যায়বিচারের গুরুত্ব অনেক বেশি ছিল। ন্যায়পরায়ণতার গুণের কারণেই তিনি উমর (রা.)-কে খলিফা মনোনীত করেছিলেন।
খিলাফত রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রদেশে যারা বিচারের দায়িত্ব প্রলন করতেন, তাদের তালিকা এখানে তুলে ধরা হলো।
১. মদিনা : উমর ইবনুল খাত্তাব।
২. মক্কা : আত্তাব ইবনে আসিদ।
৩. তায়েফ : উসমান ইবনে আবুল আস।
৪. সানআ : মুহাজির ইবনে আবু ইমাইয়া।
৫. হাজরামাওত : জিয়াদ ইবনে লাবিদ।
৬. জাবিদ ও রিমা (ইয়েমেন) : আবদুল্লাহ ইবনে কায়েস ও আবু মুসা আশআরি।
৭. খাওলান : ইয়ালা ইবনে মানিয়্যাহ।
৮. নাজদ : মুআজ ইবনে জাবাল।
৯. বনু ইয়াগুছ : আবদুল্লাহ ইবনে সাওর।
১০. বাহরিইন : আলা হাজরামি।
১১. ওমান : হুজাইয়া কালআনি।
১২. ইয়ামামাহ : সালিত ইবনে কায়েস।
১৩. শাম : এই অঞ্চলে একাধিক ব্যক্তি দায়িত্ব পালন করেছেন। তাদের কয়েকজন হলেন—আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ, শুরাহবিল ইবনে হাসানাহ, ইয়াজিদ ইবনে আবু সুফিয়ান, আমর ইবনুল আস, খালিদ ইবনে ওয়ালিদ প্রমুখ।
ব্যক্তিগত জীবনে ন্যায়বিচারের বাস্তব প্রতিফলন
আবু বকর (রা.)-এর ন্যায়বিচারের সবচেয়ে বড় এবং শক্তিশালী প্রমাণ পাওয়া যায় তার ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনে। তিনি খলিফা হওয়ার পরও নিজের জীবনযাত্রায় কোনো রাজকীয় পরিবর্তন আনেননি। তিনি ক্ষমতাকে ব্যক্তিগত লাভের উৎস মনে করতেন না; বরং এটিকে আল্লাহর দেওয়া একটি ভার বা ‘আমানাত’ হিসেবে দেখতেন । খলিফা হওয়ার পরও আবু বকর (রা.) তাঁর পাড়ার বিধবা নারীদের ছাগল দোহন করে দিতেন। এটি ছিল তার প্রাক-খিলাফত জীবনের নিয়মিত কাজ। তার এই গুণগুলোই বিচারকের আসনে বসে তাকে নির্মোহ ও নিরপেক্ষ থাকতে সাহায্য করত।
নববি বিচারব্যবস্থার ধারাবাহিকতা
আবু বকর (রা.)-এর শাসনকাল ছিল মূলত রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রদর্শিত বিচারব্যবস্থার সার্থক সম্প্রসারণ। তিনি নিজেকে কোনো উদ্ভাবক বা নতুন আইনের প্রবর্তক মনে করতেন না; বরং তিনি ছিলেন রাসুল (সা.)-এর সুন্নাহর অতন্দ্র প্রহরী। তিনি নিজেকে ‘খলিফাতু রাসুলিল্লাহ’ বা রাসুলের উত্তরাধিকারী বলতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন । তার প্রতিটি বিচারিক সিদ্ধান্তের পেছনে ছিল কোরআন ও সুন্নাহর অকাট্য দলিল।
আধুনিক যুগে সিদ্দিকী বিচার দর্শনের প্রাসঙ্গিকতা
আবু বকর (রা.)-এর বিচারিক দর্শন শুধু সপ্তম শতাব্দীর আরবের জন্য ছিল না, বরং এটি আধুনিক গণতান্ত্রিক ও বিচারিক ব্যবস্থা এবং যুগ যুগান্তরে সর্বকালের জন্যও এক আলোকবর্তিকা। আজকের বিশ্বের বিচারব্যবস্থায় যে সংকটগুলো পরিলক্ষিত হয়, তার অনেক সমাধান আবু বকর (রা.)-এর ১৩০০ বছর আগের শাসন পদ্ধতিতে খুঁজে পাওয়া সম্ভব।
বর্তমান বিশ্বে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। আবু বকর (রা.) নির্বাহী প্রধান হয়েও বিচার বিভাগীয় স্বাধীনতাকে সম্মান করতেন এবং উমর (রা.)-এর মতো নিরপেক্ষ ব্যক্তিকে বিচারক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন, যিনি খলিফাকে জবাবদিহির আওতায় আনতে পারতেন। এই ‘চেক অ্যান্ড ব্যালান্স’ আধুনিক শাসনব্যবস্থার মূল ভিত্তি। আইনের দৃষ্টিতে শাসক ও শাসিত সবার সমান হওয়া যে আধুনিক গণতন্ত্রের অঙ্গীকার, আবু বকর (রা.) তা সার্থকভাবে কার্যকর করেছিলেন।
আধুনিক ফৌজদারি আইন শাস্ত্রে সাক্ষ্যগ্রহণের যে জটিলতা, আবু বকর (রা.)-এর ‘সতর্ক সাক্ষ্যগ্রহণ নীতি’ তা নিরসনে পথ দেখাতে পারে। তার নীতি ছিল যে নিশ্চিত প্রমাণ ছাড়া কাউকে দণ্ড দেওয়া যাবে না। এটি আধুনিক মানবাধিকারের মূল কথা। এছাড়া তার প্রবর্তিত বায়তুল মালের হিসাব রাখার পদ্ধতি আধুনিক অডিটিং বা হিসাব নিরীক্ষণ ব্যবস্থার আদিরূপ । জনগণের তথ্য অধিকার রক্ষায় তিনি যে অগ্রগামী ছিলেন, তা আজকের ‘রাইট টু ইনফরমেশন’ আইনের সঙ্গে সরাসরি তুলনীয়।
আবু বকর (রা.)-এর বিচার দর্শনের অন্যতম আধুনিক শিক্ষা হলো—আইন শুধু শাসনের হাতিয়ার নয়, বরং এটি ইনসাফ বা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার মাধ্যম। যখনই আইনকে শাসনের চেয়ে ন্যায়ের ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়া হয়, তখনই রাষ্ট্রের ভিত্তি মজবুত হয়। আজকের ক্ষয়িষ্ণু বিশ্বব্যবস্থায়, যেখানে বিচার বিভাগ প্রায়ই ক্ষমতাশালীদের হাতিয়ারে পরিণত হচ্ছে, সেখানে আবু বকর (রা.)-এর জীবন থেকে শিক্ষা নেওয়া অপরিহার্য।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

