আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

খেলাফত রাষ্ট্রে খলিফা নির্বাচন : নীতি ও পদ্ধতি

মাহমুদ আহমদ

খেলাফত রাষ্ট্রে খলিফা নির্বাচন : নীতি ও পদ্ধতি

খেলাফত রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহী বা সর্বোচ্চ দায়িত্বশীল ব্যক্তি (খলিফা) নির্বাচনের জন্য কোনো সুনির্দিষ্ট, একক ও বাধ্যতামূলক প্রক্রিয়া নির্ধারণ করা হয়নি। কোরআন ও হাদিসে খলিফা নির্বাচনের ক্ষেত্রে কোনো নির্দিষ্ট পদ্ধতির স্পষ্ট নির্দেশনা পাওয়া যায় না। আল্লাহর রাসুল (সা.) তার ইন্তেকালের আগে কাউকে সরাসরি উত্তরসূরি মনোনীত করেননি এবং রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব হস্তান্তরের কোনো নির্দিষ্ট কাঠামোও নির্ধারণ করে যাননি।

ফলে তাঁর ইন্তেকালের পর প্রতিষ্ঠিত খেলাফত রাষ্ট্রে নেতৃত্ব নির্বাচন একটি অভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক পদ্ধতিতে সম্পন্ন হয়নি। বরং সময়, পরিস্থিতি ও রাজনৈতিক বাস্তবতার আলোকে সাহাবায়ে কেরামের ইজতিহাদ ও শূরার ভিত্তিতে বিভিন্ন পদ্ধতির আশ্রয় নেওয়া হয়। এই প্রেক্ষাপটে প্রথম চার খলিফার প্রত্যেকের নির্বাচন পৃথক পৃথক পদ্ধতিতে সম্পন্ন হলেও, সব ক্ষেত্রেই যোগ্যতা, শূরা এবং উম্মাহর সম্মতির মৌলিক নীতিগুলো কার্যকর ছিল। কাজেই, খেলাফত রাষ্ট্রে প্রধান নির্বাহী নির্বাচনের বৈধতা কোনো নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার ওপর নয়, বরং ন্যায়সংগত নেতৃত্ব, যোগ্যতা, পরামর্শভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং সামষ্টিক সম্মতির মতো মৌলিক নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল।

বিজ্ঞাপন

আবু বকর : যোগ্য ও প্রভাবশালী নেতাদের সিদ্ধান্ত এবং জনতার সমর্থন

যোগ্য, প্রভাবশালী নেতাদের ঐকমত্যের ভিত্তিতে এবং সাধারণ জনতার স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থনে প্রথম খলিফা হিসেবে আবু বকর (রা.) নির্বাচিত হন। নবীজি (সা.)-এর ইন্তেকালের পর মুসলমানরা বনু সাইদার প্রাঙ্গণে একত্র হন। সেখানে মুহাজির ও আনসারদের কয়েকজন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি সমবেত হন। এ সময় উভয় পক্ষের মধ্যে আলোচনা ও মতবিনিময় হয় এবং প্রত্যেক দলই খেলাফতের জন্য কে অধিক উপযুক্তÑসে বিষয়ে নিজেদের মতো তুলে ধরেন। শেষ পর্যন্ত সাহাবাদের মধ্যে জ্যেষ্ঠ ও বিশিষ্ট ব্যক্তিরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, আবু বকর (রা.) অন্য সবার তুলনায় খেলাফতের অধিক হকদার, কারণ মুসলিমদের মধ্যে মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্বের দিক থেকে তিনি সবার চেয়ে অগ্রগামী ছিলেন। অতঃপর সব সাহাবি তার হাতে বাইয়াত হন। পরে সাধারণ মুসলমানরাও তাকে খলিফা হিসেবে মেনে নেয়।

আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর এই ইচ্ছা ছিল। ইবনে তাইমিয়া (রাহি.) বলেছেন, ‘সত্য হলো, আবু বকরকে খলিফা হিসেবে গ্রহণ করার জন্য নবীজি (সা.) সাহাবিদের বিভিন্ন ইঙ্গিত দিয়েছিলেন এবং কথা ও কাজের মাধ্যমে নানা উপায়ে তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন। তিনি আবু বকরের খেলাফতের দায়িত্ব গ্রহণের সংবাদ এমনভাবে দিয়েছিলেন, তাতে সন্তুষ্টি ও প্রশংসা প্রকাশ পেয়েছিল। এমনকি তিনি এ বিষয়ে একটি লিখিত অঙ্গীকারনামা (দলিল) রচনা করার মনোস্থিরও করেছিলেন। পরে তিনি নিশ্চিত হলেনÑমুসলমানরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে আবু বকরকেই খলিফা নির্বাচন করবে, তাই তিনি এ কাজ থেকে বিরত রইলেন।’ (মিহাজুস সুন্নাহ, খণ্ড : ১, পৃষ্ঠা : ৫১৬-১২৫)

উমর ইবনে খাত্তাব : পূর্ববর্তী খলিফার মনোনয়ন ও জনতার সমর্থন

উপদেষ্টা পরিষদের পরামর্শে আবু বকর (রা.)-এর মনোনয়ন ও সাধারণ জনতার সমর্থনের মাধ্যমে উমর (রা.) দ্বিতীয় খলিফা নির্বাচিত হন।

আবু বকর (রা.) দুই বছর খেলাফতের দায়িত্ব পালন করেন। জীবনের অন্তিম দিনগুলোয় তিনি প্রবীণ সাহাবির সঙ্গে খেলাফতের উত্তরাধিকার নির্ধারণের বিষয়ে পরামর্শ চাইলেন। তারা নিজেদের মধ্যে পরামর্শ করে জানাল, আবু বকর (রা.) যাকে নির্বাচন করবেন, তাকেই তারা মেনে নেবে। তখন তিনি উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-কে প্রার্থী হিসেবে পরবর্তী খলিফা হিসেবে মনোনীত করলেন। আহলে উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যদের কাছে এই প্রস্তাব গ্রহণযোগ্য হলো এবং তারা এতে সন্তুষ্ট হলেন। আবু বকর (রা.) ইন্তেকাল করার পর মসজিদে উমর (রা.) সাধারণের বাইয়াত গ্রহণ করলেন। এর মাধ্যমে তার খেলাফত প্রতিষ্ঠিত হয় এবং তিনি মুসলমানদের অভিভাবক হলেন।

উমর (রা.) ১০ বছর খেলাফত রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহীর দায়িত্ব পালন করেছিলেন। উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর শাসনকাল খেলাফত রাষ্ট্রের রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বিকাশের সর্বোচ্চ পর্যায় হিসেবে পরিগণিত হয়। এ সময় রাষ্ট্রীয় কাঠামো একটি সুসংহত ও পূর্ণাঙ্গ রূপ লাভ করে, আইন এবং বিচারব্যবস্থা প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তিতে সুদৃঢ় হয় এবং শাসন ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা সুস্পষ্ট নিয়মনীতি এবং কার্যকর কাঠামোর অধীনে সংগঠিত হয়। এর ফলে খেলাফত রাষ্ট্র একটি কার্যকর, দায়িত্বশীল ও বিস্তৃত শাসনব্যবস্থা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

উসমান ইবনে আফফান : ছয় সদস্যের উপদেষ্টা পরিষদের সিদ্ধান্তে নির্বাচন

ছয় সদস্যের উপদেষ্টা পরিষদের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে খেলাফত রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্বশীল হিসেবে উসমান ইবনে আফফান (রা.) নির্বাচিত হয়েছিলেন। আঁততায়ীর হামলায় আহত হওয়ার পরও খলিফা উমর তিন দিন জীবিত ছিলেন। সে সময় তিনি পরবর্তী খলিফা নির্বাচনের একটি নতুন পদ্ধতি প্রস্তাব করেন। তিনি সম্মান, মর্যাদা ও অবস্থানের দিক থেকে অগ্রগণ্য ছয়জন সাহাবিকে মনোনীত করেন। তারা প্রত্যেকেই নবী (সা.)-এর যুগে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে নিযুক্ত ছিলেন। তারা হলেন উসমান ইবনে আফফান, আলি ইবনে আবু তালেব, আবদুর রহমান ইবনে আওফ, তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহ, জুবাইর ইবনুল আওয়াম এবং সাদ ইবনে আবু ওয়াক্কাস (রা.)।

আবদুর রহমান ইবনে আওফ (রা.) নির্বাচন প্রক্রিয়া পরিচালনার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তিনি ছয়জন প্রার্থীর কাছে প্রস্তাব রাখেন, তারা চাইলে নিজের নাম প্রত্যাহার করে নিতে পারেন। এতে করে প্রার্থীর সংখ্যা করবে এবং নির্বাচন প্রক্রিয়া আরো সহজ হবে। তখন জুবাইর ইবনুল আওয়াম আলিকে সমর্থন দিয়ে এবং তালহা বাকনে উবাইদুল্লাহ উসমান ইবনে আফফানকে সমর্থন দিয়ে নিজেদের নাম প্রত্যাহার করে নিলেন। আর সাদ ইবনে আবু ওয়াক্কাস আবদুর রহমান ইবনু আওফের সমর্থন দিলেন। ফলে প্রার্থীর সংখ্যা তিনজনে নেমে এলো।

নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব নিয়ে আবদুর রহমান ইবনে আওফ প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নিলেন। তিনি সর্বশেষ দুই প্রার্থীÑউসমান ও আলির কাছে অঙ্গীকার নিয়েছিলেন, তার গৃহীত সিদ্ধান্ত মানতে তারা দুজন বাধ্য থাকবেন।

এরপর তিনি তিন দিন ধরে উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যদের সঙ্গে এবং মদিনার অন্য বাসিন্দাদের সঙ্গে পরামর্শ করলেন। তাদের কাছে মতামত জানতে চাইলেন। তিনি নারীদের থেকেও মতামত নিলেন, মদিনায় আগত মুসাফিরদের তাদের কাছেও এই বিষয়ে জানতে চাইলেন।

চতুর্থ দিন সকালে তিনি মদিনায় উপস্থিত মুহাজির, আনসার এবং সেই সঙ্গে খলিফা উমর (রা.)-এর সঙ্গে হজ আদায় করার কারণে তখন মদিনায় উপস্থিত সেনাপতিদেরও সমবেত করলেন। এরপর তিনি খেলাফত রাষ্ট্রের নতুন খলিফা হিসেবে উসমান (রা.)-এর নাম ঘোষণা করলেন।

আলি ইবনে আবু তালেব : রাজনৈতিক সংকট ও ক্ষমতার শূন্যতার পরিপ্রেক্ষিতে সাধারণ বাইয়াত

উসমান (রা.)-এর খেলাফত বারো বছর স্থায়ী হয়। এর মধ্যে প্রথম ১০ বছর ছিল সচ্ছলতা, প্রাচুর্য ও কল্যাণে পরিপূর্ণ। এরপর শুরু হয় খেলাফতবিরোধী ফেতনা। ষড়যন্ত্রকারী একদল বেদুইন ও উচ্ছৃঙ্খল জনতা উসমান (রা.)-এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। শরিয়তের বিধানে পরিবর্তন আনার অভিযোগে তারা বিভিন্ন দিকে থেকে মদিনায় আসে এবং খলিফার বাসগৃহ অবরোধ করে। তারা উসমান (রা.)-কে খেলাফতের দায়িত্ব থেকে অপসারণের দাবি করতে থাকে। উসমান (রা.)-এর পক্ষ নিয়ে সাহাবিরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করতে থাকে। একসময় বিদ্রোহীদের হামলায় খলিফা শাহাদতবরণ করেন।

তখন খেলাফতের দায়িত্ব কাকে দেওয়া হবে, সে বিষয়ে মতভেদ দেখা দেয়। উসমান (রা.)-কে অপসারণ ও হত্যার বিষয়ে একমত হলেও বিদ্রোহীরা কাকে খলিফা নিয়োগ করবে, সে বিষয়ে একমত ছিল না। তাদের পক্ষ থেকে বিভিন্নজনের নাম প্রস্তাব করা হয়। কিন্তু সাহাবিদের কেউ খেলাফতের দায়িত্ব গ্রহণে সম্মত হলেন না।

বিদ্রোহীরা বুঝতে পারল, বিদ্রোহ করে খলিফাকে হত্যা করতে পারলেও কাউকে খলিফা হিসেবে নিযুক্ত করার অধিকার এবং সক্ষমতা কোনোটাই তাদের নেই। কারণ খলিফা নির্বাচনের অধিকার উপদেষ্টা পরিষদের। মানুষ প্রকৃতপক্ষে তাদেরই অনুসরণ করে।

শেষ পর্যন্ত তারা আলি (রা.)-এর কাছে গেলে। কিন্তু কোনোভাবেই তাকে সম্মত করতে না পেরে বলল, মুসলিমরা এভাবে অভিভাবকহীন হয়ে থাকতে পারে না। তাদের একজন খলিফা অবশ্যই দরকার। আপনিই খেলাফত রাষ্ট্রের দায়িত্ব গ্রহণের জন্য অধিক উপযুক্ত।

তখন আলি (রা.) বিশেষ একটি পদ্ধতি গ্রহণ করলেন, যার মাধ্যমে খেলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ সর্বজনবিদিত ও জনসম্মুখে হবে এবং কোনো বিশেষ গোষ্ঠী বা বিদ্রোহী পক্ষ গোপনে একতরফাভাবে বাইয়াত সম্পন্ন করে নিজেদের নীতিনির্ধারক হয়ে যাওয়ার সুযোগ পাবে না। এর ফলে খলিফা নির্বাচনের সিদ্ধান্ত মদিনার সাধারণ জনগণের ওপর ন্যস্ত হয়।

এই প্রেক্ষাপটে আলি (রা.) স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছিলেন, ‘তোমরা যদি আমাকে দায়িত্ব গ্রহণে বাধ্য করো, তবে তা গোপনে নয়; প্রকাশ্যে সম্পন্ন হবে। আমি মসজিদে উপস্থিত হব, তখন যার ইচ্ছা বাইয়াত গ্রহণ করবে, আর যার ইচ্ছা করবে না।’

এরপর মদিনার মুসলিমরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে ও পূর্ণ সন্তুষ্টির সঙ্গে আলি (রা.)-এর হাতে বাইয়াত গ্রহণ করে। এই সর্বজনীন ও প্রকাশ্য বাইয়াতের মাধ্যমেই আলি ইবনু আবি তালিব (রা.)-এর ইমামত ও খেলাফত প্রতিষ্ঠিত হয়।

শেষকথা

খেলাফত রাষ্ট্রের একজন দায়িত্বশীল নির্বাচনের ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয়ের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হতো।

ক. সর্বসম্মতি : খেলাফত রাষ্ট্রের খলিফা নির্বাচিত হয়েছিল সবার সম্মতিতে। খুলাফায়ে রাশেদিনের কেউ জোর করে ক্ষমতা দখল করেননি। উপদেষ্টা পরিষদের মনোনয়ন ছিল প্রস্তাব আর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হতো জনগণের প্রকাশ্য বাইয়াতের মাধ্যমে।

খ. যোগ্যতা : যোগ্যতাই ছিল চূড়ান্ত মানদণ্ড, গোত্র বা স্বজনপ্রীতি নয়। সাহাবিরা সর্বোত্তম ব্যক্তিকেই খলিফা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। তারা কখনোই গোত্রীয় পক্ষপাত বা ব্যক্তিগত আবেগকে প্রশ্রয় দেননি, বরং উম্মতের কল্যাণ ও ব্যক্তির গুণাবলিকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন।

গ. শান্তি ও ঐক্যের সুরক্ষা : শান্তি ও ঐক্য রক্ষা ছিল প্রধান লক্ষ্য। খলিফা নির্বাচন হয়েছে আলোচনা ও পরামর্শের মাধ্যমে, রক্তপাত ছাড়া। এমনকি গৃহযুদ্ধ পরিস্থিতি যেন তৈরি না হয়, সে জন্য উসমান (রা.) নিজের প্রাণ উৎসর্গ করেছিলেন।

ঘ. দায়িত্ববোধ : ক্ষমতা ছিল দায়িত্ব, লোভের বস্তু নয়। সাহাবিরা শাসনক্ষমতা চাইতেন না, বরং এ দায়িত্বকে ভয় করতেন। আবু বকর, উমর ও আলি (রা.) সবাই প্রথমে খেলাফত গ্রহণে অনাগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন। তারা শুধু উম্মতের প্রয়োজনে এই দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন