খলিফা আবু বকরের শাসনকালে পারস্যের হীরা নগরী বিজয়

মাহমুদ আহমাদ

খলিফা আবু বকরের শাসনকালে পারস্যের হীরা নগরী বিজয়

উল্লাইসের যুদ্ধ শেষ করে খালেদ ইবনে ওয়ালিদ আমগেশিয়ার দিকে অগ্রসর হলেন। তার আকস্মিক আগমনের কারণে সেখানকার অধিবাসীরা প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ পেল না। তারা নগরী ত্যাগ করে সাওয়াদে (ইরাকের উর্বর কৃষি-অঞ্চল) ছড়িয়ে পড়ল। সে সময় থেকেই তাদের আখক্ষেত ও বাগানগুলো সাওয়াদের কৃষিভূমির অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়।

খালেদ আমগেশিয়া এবং তার আওতাভুক্ত সব স্থাপনা ধ্বংস করার নির্দেশ দিলেন। আমগেশিয়া হীরার মতোই একটি সমৃদ্ধ নগর ছিল। ফুরাত বাদাকলির (ফোরাতের শাখা নদী বা বাদাকলি খাল) একটি শাখা এসে এখানে শেষ হয়েছে। উল্লাইস ছিল আমগেশিয়ার একটি সীমান্ত প্রতিরক্ষাকেন্দ্র। মুসলমানরা সেখানে বিপুল গনিমত লাভ করল। এত পরিমাণ সম্পদ তারা আগে কখনো পায়নি।

বিজ্ঞাপন

জাতুস-সালাসিল থেকে আমগেশিয়া পর্যন্ত যত অভিযানে মুসলমানরা অংশ নিয়েছে, তার মধ্যে আমগেশিয়ার প্রাপ্ত গনিমতের পরিমাণ ছিল সবচেয়ে বেশি। বীরত্বের স্বীকৃতি হিসেবে প্রদত্ত পুরস্কারের বাইরেও প্রতিজন অশ্বারোহী যোদ্ধা ১ হাজার ৫০০ দিরহাম পেয়েছিল।

আমগেশিয়া বিজয়ের সংবাদ মদিনায় পৌঁছালে খলিফা আবু বকর (রা.) কুরাইশদের উদ্দেশে বলেছিলেন—‘কুরাইশগোত্রের লোকরা শোনো! তোমাদের বীর সিংহ আরেক সিংহের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে এবং তার গুহায় তাকে পরাস্ত করেছে। নারীরা কি আর খালিদের মতো কাউকে জন্ম দিতে পারবে?’

ফোরাত বাদাকলির মোহনা অবরোধ

কিসরার যুগ থেকে আজাজবে ছিলেন হীরার মারজুবান (সীমান্তপ্রধান)। সেকালে সম্রাটের অনুমতি ছাড়া কোনো সীমান্তপ্রধান অন্যকে সাহায্য করতে পারতেন না। তিনি উচ্চমর্যাদার অধিকারী ছিলেন; তার টুপির মূল্যই ছিল ৫০ হাজার দিরহাম।

খালেদ ইবনে ওয়ালিদ যখন আমগেশিয়া ধ্বংস করে ফেললেন। সেখানকার অধিবাসীরা গ্রামাঞ্চলের দেহকানদের (স্থানীয় ভূস্বামী বা জমিদার) কাছে আশ্রয় নিল। আজাজবে তখন বুঝতে পারলেন, তাকেও কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। তাই তিনি মুসলিম সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে শুরু করলেন।

আজাজবে অগ্রগামী বাহিনী হিসেবে ছেলেকে পাঠালেন, তারপর নিজেও বের হয়ে হীরার বাইরে শিবির স্থাপন করলেন। তিনি ছেলেকে ফোরাত নদীতে বাঁধ দিয়ে পানির প্রবাহ বন্ধ করে দেওয়ার নির্দেশ দিলেন।

অন্যদিকে খালেদ ইবনে ওয়ালিদও আমগেশিয়া থেকে হীরার উদ্দেশে যাত্রা করলেন। গনিমত ও ভারী মালপত্র নৌকায় বোঝাই করে নদীপথে পাঠালেন। সামনে এগিয়ে গিয়ে হঠাৎ দেখা গেল, পানিস্বল্পতার কারণে নৌকাগুলো আটকে যাচ্ছে। এতে মুসলমানরা বিচলিত হয়ে পড়লেন। নৌকার মাঝিরা বললেন—‘পারসিকরা নদীর গতিপথ বদলে দিয়েছে। পানি অন্য পথে প্রবাহিত হচ্ছে। নদীর মুখ আবার খুলে দেওয়া না হলে এখানে পানি আসবে না।’

মুসলিম সেনাপতি অশ্বারোহী বাহিনী নিয়ে দ্রুত আজাজবের ছেলের মোকাবিলা করার জন্য এগিয়ে গেলেন। আতিক নদীর মোহনায় তার অশ্বারোহী বাহিনীর একাংশ শত্রুদের মুখোমুখি হলো। আজাজবের সৈন্যরা তখন সম্পূর্ণ নির্ভার ছিল; এমন সময়ে মুসলিমদের আকস্মিক আক্রমণের কথা তারা কল্পনাও করেনি। মুসলিম সেনাবাহিনী সেখানে তাদের পরাজিত করলেন। তারপর বিলম্ব না করে সামনের দিকে এগিয়ে গেলেন। সংবাদ পৌঁছার আগেই তারা আজাজবের ছেলে ও তার সৈন্যদের কাছে ফোরাত বাদাকলির মোহনায় উপস্থিত হলেন। সেখানে দুই বাহিনীর মধ্যে যুদ্ধ হলো। পারসিক বাহিনী পরাজিত হলো। এরপর নদীর বাঁধ খুলে দেওয়া হলো এবং পানি ফোরাত দিয়ে প্রবাহিত হতে শুরু করল।

হীরা শহর অবরোধ

ফোরাত মোহনায় আজাজবের ছেলেকে পরাজিত করার পর খালেদ হীরার দিকে অগ্রসর হলেন। তিনি বিচ্ছিন্ন বাহিনীকে সমবেত করলেন এবং খাওয়ারনাক ও নাজাফের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থান নিলেন।

খালেদ যখন খাওয়ারনাকে পৌঁছালেন, তার আগেই আজাজবে যুদ্ধ না করে ফোরাত পার হয়ে পালিয়ে গিয়েছিল। তার এই পলায়নের প্রধান কারণ ছিল (পারস্য সম্রাট তৃতীয়) আরদাশীরের মৃত্যু এবং তার ছেলের পরাজয়ের সংবাদ। আলগারবিয়্যাইন ও সাদা দুর্গের মধ্যবর্তী স্থানে ছিল তার শিবির।

খালেদের সৈন্যরা খাওয়ারনাকে এসে সমবেত হলো। তিনি এগিয়ে গিয়ে আজাজবের পরিত্যক্ত শিবিরে অবস্থান নিলেন। এদিকে হীরার অধিবাসীরা আত্মরক্ষার জন্য বিভিন্ন দুর্গে আশ্রয় নিল।

সেনাপতি খালেদ মুসলিম বাহিনীকে নিয়ে শহরে প্রবেশ করলেন এবং প্রত্যেক দুর্গ অবরোধের জন্য একজন কমান্ডার নিয়োগ দিলেন। সাদা দুর্গের (আলকাসরুল আসওয়াদ) নেতা ছিলেন ইয়াস ইবনে কুবাইসা, জিরার ইবনে আজওয়ার এই দুর্গ অবরোধ করলেন। আদি ইবনে আদি ইবাদি ছিলেন আদাসিয়্যিন দুর্গের নেতা। এই দুর্গ অবরোধ করলেন জিরার ইবনে খাত্তাব। মাজিন গোত্রের দুর্গের নেতৃত্বে ছিলেন ইবনে আকালের হাতে। এই দুর্গ অবরোধ করেছিলেন জিরার ইবনে মুকাররিন। ইবনে বুকাইলা দুর্গের অবরোধ করেছিলেন মুসান্না ইবনে হারিসা। এখানকার নেতা ছিলেন আমর ইবনে আবদুল মাসিহ।

কমান্ডাররা সবাইকে ইসলামের দাওয়াত দিলেন এবং আত্মসমর্পণের জন্য এক দিনের সময় দিলেন। কিন্তু হীরাবাসী আত্মসমর্পণ করতে অস্বীকার করল। তারা নিজেদের অবস্থানে অনড় রইল। ফলে যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে পড়ল।

খালেদ ইবনে ওয়ালিদ সেনাপতিদের নির্দেশ দিয়ে বলেছিলেন, ‘আপনারা প্রথমে তাদের ইসলামের দাওয়াত দেবেন। যদি তারা দাওয়াত গ্রহণ করে, তাহলে ভালো। আর যদি প্রত্যাখ্যান করে, তবে তাদের এক দিনের সময় দেবেন। শত্রুকে আপনাদের অবস্থা জানার সুযোগ দেবেন না, তাহলে আপনাদের দুর্বলতার সুযোগ তারা নেওয়ার চেষ্টা করবে। বরং দ্রুত তাদের মোকাবিলা করবেন। মুসলিমদের শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা থেকে বিরত রাখবেন না।’

অবকাশের সময় সমাপ্ত হওয়ার পর সর্বপ্রথম যুদ্ধ শুরু করেন জিরার ইবনে আজওয়ার, তিনি সাদা দুর্গ অবরোধের দায়িত্বে ছিলেন। (অবকাশ শেষ হওয়ার) পরদিন সকালে দুর্গের প্রাচীরের উপর দাঁড়িয়ে থাকা লোকদের উদ্দেশে তিনি বললেন, ‘তোমাদের সামনে তিনটি পথ খোলা আছে : ইসলাম গ্রহণ, জিজিয়া প্রদান অথবা যুদ্ধ।’

তারা যুদ্ধকেই বেছে নিল এবং উচ্চ স্বরে চিৎকার করে বলল, ‘তোমাদের বিরুদ্ধে খাজাজিফ (মোড়ামাটির তৈরি নিক্ষেপযোগ্য গোলা) প্রস্তুত আছে!’

কমান্ডার জিরার সৈনিকদের বললেন, ‘তোমরা একটু সরে তাদের নিক্ষেপিত গোলার সীমানার বাইরে দাঁড়াও। তাতে গোলার আঘাত থেকে বাঁচতে পারবে। দেখি তারা কী বোঝাতে চায়।’

অল্পক্ষণের মধ্যেই দুর্গের দেয়ালে লোকজনে ভরে গেল। তারা ঝুড়িভর্তি খাজাজিফ নিক্ষেপ করতে লাগল। এগুলো ছিল পোড়ামাটির তৈরি গোলাকার শক্ত ঢেলা।

জিরার তখন নির্দেশ দিলেন, ‘তাদের ওপর তীর বর্ষণ করো।’ মুসলমানরা এগিয়ে গিয়ে তীর নিক্ষেপ করলে দুর্গপ্রাচীর শূন্য হয়ে গেল। এভাবে তারা আক্রমণ চালিয়ে গেলেন।

পারসিকদের সন্ধি-প্রস্তাব

অন্য সেনাপতিরাও অবরোধ করে রাখা দুর্গের বিরুদ্ধে একই কৌশল অবলম্বন করলেন। তারা আশপাশের বাড়িঘর ও ছোট ছোট আশ্রম-উপাসনালয় দখল করলেন এবং বহু লোককে হত্যা করলেন। তখন যাজক ও সন্ন্যাসীরা চিৎকার করে বলতে শুরু করলেন, ‘হে দুর্গবাসী! তোমাদের একগুঁয়েমির কারণেই আমরা নিহত হচ্ছি!’

অবশেষে আর কোনো উপায় না দেখে দুর্গের লোকরা মুসলিমদের ডেকে বললেন, ‘আরবের লোকরা, শোনো! তোমাদের দেওয়া তিনটি প্রস্তাবের মধ্যে একটা আমরা গ্রহণ করতে রাজি। আমাদের তোমাদের নেতার কাছে নিয়ে চলো এবং যুদ্ধ বন্ধ করো।’

তখন ইয়াস ইবনে কাবিসা ভাইকে নিয়ে জিরার ইবনে আজওয়ারের কাছে এলেন। আদি ইবনে আদি ও জায়েদ ইবনে আদি গেলেন জিরার ইবনে খাত্তাবের কাছে। আর আমর ইবনে আবদুল মাসিহ ও ইবনে আকালের একজন গেলেন দিরার ইবন মুকাররিনের কাছে, অন্যজন মুসান্না ইবনে হারিসার কাছে। সবশেষে তাদের সবাইকে সেনাপতি খালেদের কাছে পাঠানো হলো। মুসলিম বাহিনী নিজ নিজ অবস্থানে অবিচল রইল।

প্রথমে সন্ধির প্রস্তাব উত্থাপন করেন আমর ইবনে আবদুল মাসিহ। তিনি ইবনে বুকাইলা নামে পরিচিত ছিলেন। সন্ধিচুক্তি সম্পাদনের জন্য দুর্গের নেতারা তাকে এবং তাদের প্রত্যেকের পক্ষ থেকে একজন বিশ্বস্ত প্রতিনিধিকে খালিদের কাছে পাঠালেন। খালেদ দুর্গের সব প্রতিনিধির সঙ্গে আলাদাভাবে অন্যদের উপস্থিতি ছাড়া আলোচনা করলেন। তিনি প্রথমে আদি ও তার সঙ্গীদের দিয়ে আলোচনা শুরু করেন।

তিনি তাদের বললেন, ‘ধিক তোমাদের! তোমরা কি আরব নও? যদি আরব হও, তবে আরবদের বিরুদ্ধে তোমাদের অভিযোগ কী? আর যদি অনারব হও, তবে ন্যায় ও ইনসাফের বিরুদ্ধে তোমাদের আপত্তি কী?’

আদি বললেন, ‘আমাদের মধ্যে কেউ বিশুদ্ধ আরব (عرب عاربة), কেউ আবার আরবায়িত আরব (عرب متعربة)।’

খালেদ বললেন, ‘তোমরা যেমন বলছো তেমন যদি হতে, তবে আমাদের বিরোধিতা করতে না এবং আমাদের দাওয়াতকে অপছন্দ করতে না।’

আদি উত্তর দিলেন, ‘আমরা যা বলছি তার প্রমাণ হলো—আরবি ভাষা ছাড়া আমাদের অন্য কোনো ভাষা নেই।

খালেদ বললেন, ‘তুমি সত্য বলেছ।’

এরপর তিনি বললেন, ‘তোমাদের সামনে তিনটি পথ খোলা আছে। আমাদের দ্বীনে প্রবেশ করবে। তাহলে তোমরা হিজরত করো বা নিজ ভূমিতেই অবস্থান করো, উভয় ক্ষেত্রেই আমাদের ও তোমাদের অধিকার এবং দায়িত্ব সমান হয়ে যাবে। জিজিয়া দেবে। যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হবে। আল্লাহর কসম! আমি তোমাদের মোকাবিলার জন্য এমন এক জাতিকে নিয়ে এসেছি, তোমাদের জীবনকে যতটা ভালোবাসো, তার চেয়েও মৃত্যুকে তারা বেশি ভালোবাসে।’

আদি বললেন, ‘আমরা আপনাকে জিজিয়া দেব।’

খালেদ বললেন, ‘ধিক তোমাদের! কুফর হলো এক বিভ্রান্তিকর মরুভূমি। যে এ পথে চলে, সে আরবদের সবচেয়ে নির্বোধ ব্যক্তি। তার সামনে যদি দুজন পথপ্রদর্শক আসে—একজন আরব এবং অন্যজন অনারব আর সে আরবকে ছেড়ে অনারবকে অনুসরণ করে, তবে তার চেয়ে নির্বোধ আর কেউ হতে পারে না!’

অবশেষে বার্ষিক ১ লাখ ৯০ হাজার দিরহামের বিনিময়ে সন্ধিচুক্তি হলো। অন্যরাও তাদের অনুসরণ করলেন। তারা খালেদকে বিভিন্ন উপঢৌকনও দিলেন। খালেদ বিজয়ের সংবাদ এবং উপহারগুলো খলিফা আবু বকর (রা.)-এর কাছে পাঠিয়ে দিলেন।

‘তিনি খালেদকে পত্রে নির্দেশ দিলেন : ‘তারা যে উপহার-উপঢৌকন পেশ করেছে, তা তাদের জিজিয়ার হিসেবে সমন্বয় করো, যদি তা আগে থেকেই জিজিয়ার অন্তর্ভুক্ত না হয়ে থাকে। এরপর তাদের ওপর যা বাকি থাকে, তা আদায় করে নাও এবং সেই অর্থে তোমার সৈন্যদের প্রয়োজন পূরণ করো ও তাদের শক্তি বৃদ্ধি করো।’

(সূত্র : তারিখে তাবারি, অখণ্ড সংস্করণ, পৃষ্ঠা : ৫৩৮-৫৩৯)

(আরবি থেকে অনুবাদ : মাহমুদ আহমাদ)

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন