২০১২ সালের আগস্টে আল জাজিরায় সাংবাদিক নিকোলাস হক ‘Ancient Mosque Unearthed in Bangladesh’ শিরোনামে গুরুত্বপূর্ণ একটি ভিডিও প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়—‘বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের প্রত্যন্ত গ্রামে টিম স্টিল নামে একজন অপেশাদার প্রত্নতত্ত্ববিদ একটি মসজিদের ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কার করেছেন। ধারণা করা হচ্ছে, মসজিদটি সপ্তম শতকে নির্মিত। প্রথমে স্থানীয় গ্রামবাসী ঘটনাক্রমে স্থানটির সন্ধান পান। সেখানে তারা মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকা প্রাচীন ধনসম্পদ ও ইসলামের ইতিহাস-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন নিদর্শন আবিষ্কার করেন, যার মধ্যে কোরআনের আয়াত-উৎকীর্ণ একটি শিলাও ছিল। আবিষ্কৃত এই নিদর্শনগুলো নিয়ে আরো গভীর গবেষণা ও অনুসন্ধান করা হলে প্রমাণ করা যেতে পারে, এটি দক্ষিণ এশিয়ায় নির্মিত সর্বপ্রথম মসজিদ।’
টিম স্টিল অনুমান করেন, কেরালা ও দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য প্রাচীন মসজিদের চেয়ে এই মসজিদ বেশি পুরোনো। ভালোভাবে অনুসন্ধান করলে এর প্রমাণও পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
একই বছরের অক্টোবর মাসে বাংলাদেশের একটি জাতীয় দৈনিকে এ বিষয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। সেখানে বলা হয়, ‘বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের জেলা লালমনিরহাটের পঞ্চগ্রাম ইউনিয়নের রামদাস গ্রাম। এই গ্রামেই আবিষ্কৃত হয়েছে ৬৯ হিজরি সনে নির্মিত একটি মসজিদ। এলাকার প্রবীণ মানুষের কাছে স্থানটি আজও সাগরের ছড়া নামে পরিচিত। এর অনতিদূরে তিস্তা নদীর অবস্থান। আর ব্রহ্মপুত্র-তিস্তা অববাহিকাকে বলা হয় পৃথিবীর প্রাচীনতম অববাহিকাগুলোর একটি। বাংলাদেশ ভূখণ্ডের উত্তর ও মধ্যাঞ্চল জুড়ে যে প্রাচীন সভ্যতা খ্রিষ্টপূর্ব সময় থেকে গড়ে উঠেছিল, তার সঙ্গে প্রাচীন রোমান ও আরব সভ্যতার সম্পর্ককে টিম স্টিল ইতিহাসের স্বাভাবিক ঘটনা বলে মনে করেন। তাই এই অঞ্চলে ৬৯ হিজরি বা ৬৪৮ খ্রিষ্টাব্দে একটি মসজিদ নির্মাণের ঘটনা বিস্ময় জাগানিয়া হলেও একেবারে অস্বাভাবিক নয়।’ মসজিদের শিলালিপি থেকে নির্মাণ তারিখ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়।
টিম স্টিল বলেছেন, ‘আমরা যদি এটা প্রমাণ করতে পারতাম, তবে এটা হতো দক্ষিণ এশিয়ার সর্বপ্রাচীন মসজিদ। কেননা বলা হয়, মুহাম্মদ (সা.)-এর যুগে কেরালা ও চায়নায় একটি করে মসজিদ তৈরি করা হয়েছে, যদিও এই দাবিগুলোর পক্ষে কোনো প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ পাওয়া যায় না। কিন্তু এখানে (লালমনিরহাটে) একটি মসজিদ রয়েছে, এর প্রাচীনত্বের প্রমাণ পাওয়া যায়, কিন্তু নবীযুগে এই মসজিদ নির্মিত হওয়ার কথা কেউ দাবি করেনি। সময়কাল এটাই বলে, মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবদ্দশায় এটা তৈরি করা হয়েছিল।’
বিভিন্ন মহলের অসহযোগিতায় টিম স্টিল তার গবেষণা ও অনুসন্ধান সমাপ্ত করতে পারেননি। তবে তিনি আমাদের সামনে বড় একটি প্রশ্ন রেখে গেছেন—‘তাহলে কি বাংলার মাটিতে সাহাবিদের আগমন ঘটেছিল?’

বাংলাদেশে আগত সাহাবিদের প্রসঙ্গে যার নাম সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয়, তিনি হলেন সাদ ইবনে আবু ওয়াক্কাস (রা.)। তিনি ইসলামের প্রাথমিক পর্যায়ে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। তিনি বলেছেন, ‘আমার ইসলাম গ্রহণ করার দিন অন্য কেউ ইসলাম কবুল করেনি। সাত দিন পর্যন্ত আমি ইসলামের তিনের এক ভাগ (তিন সদস্যের একজন) ছিলাম।’ (সিফাতুস সফওয়া, ইবনে জাওজি, খণ্ড : ১, পৃষ্ঠা : ১৩৪)
বিভিন্ন সূত্রে দাবি করা হয়, তিনি হাবশা থেকে নদীপথে চীনের উদ্দেশে রওনা হন। পথিমধ্যে বাংলাদেশে যাত্রাবিরতি করেন এবং বেশ কয়েক বছর এই অঞ্চলে অবস্থান করেন। তারপর চীনের উদ্দেশে যাত্রা করেন। তিনি চীনের গুয়াংজু (ক্যান্টন) শহরে একটি মসজিদ নির্মাণ করেন। মসজিদটি বর্তমানে হুয়াইশেং মসজিদ (লাইটহাউস মসজিদ) নামে পরিচিত। সেখানেই তার কবর অবস্থিত। চীনের প্রচলিত ইতিহাসে সাদ ইবনে আবু ওয়াক্কাস গুরুত্বপূর্ণ ও সম্মানিত চরিত্র। তাদের ইতিহাসের সূত্র ধরেই বাংলায় তার আগমনের বিষয়টি আলোচিত হয়।
কিন্তু মূলধারার ইতিহাসের সঙ্গে এই তথ্যের ফারাক অনেক। সাদ ইবনে আবু ওয়াক্কাস (রা.) হাবশায় হিজরত করেননি; বরং প্রাথমিক পর্যায়ে যারা মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করেছিলেন, তাদের অন্যতম ছিলেন। ইসলামের ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাদিসিয়া ও মাদায়েন যুদ্ধে তিনি সেনাপতির দায়িত্ব পালন করে অসাধারণ নেতৃত্বের পরিচয় দেন। তিনি কাদিসিয়া, মাদায়েনের মতো ইসলামের ইতিহাসে গুরুত্ব ও তাৎপর্যপূর্ণ যুদ্ধে সেনাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। ৫৫ হিজরি (৬৭৪ খ্রিষ্টাব্দ) সনে মদিনা মুনাওয়ারার নিকটবর্তী আতিক নামক স্থানে তিনি ইন্তেকাল করেন।
তাহলে কী করে চীন এবং বাংলার ইতিহাসের কিংবদন্তির সঙ্গে সাদ ইবনে আবু ওয়াক্কাস যুক্ত হলেন? এ সম্পর্কে তিনটি দাবি রয়েছে—
এক. সাদ ইবনে আবু ওয়াক্কাস (রা.) সঙ্গীদের নিয়ে ৬১৭ থেকে ৬২৫ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত বাংলাদেশে অবস্থান করেছেন। এরপর ৬২৫ খ্রিষ্টাব্দে অর্থাৎ ৩ হিজরিতে তারা চীনে পৌঁছান। কিন্তু নবীজি (সা.)-এর পূর্বে তার মদিনায় হিজরত এবং বদর উহুদ যুদ্ধে তার উপস্থিতি এই দাবি নাকচ করে দেয়।
দুই. তিনি ৬৩৭ খ্রিষ্টাব্দে তিনজন সাথি—সুহেলা আবু আরজা, ওয়াইজ করনি ও হাসান ইবনে সাবিত (রা.)-কে নিয়ে চীনে পাড়ি দেন। ফিরতি পথে তারা ‘ইউনান-মণিপুর-চট্টগ্রাম’ রুট হয়ে চট্টগ্রাম আসেন। পরে চট্টগ্রাম থেকে জাহাজযোগে আরবে ফিরে যান। (প্রাচীন বাংলার সমাজ সংস্কৃতি ধর্ম, ব্যারিস্টার মোহাম্মদ রওশন আলী—এর সূত্রে বাংলায় প্রথম সাহাবি, শহীদুল বারি মামুন।)
খলিফা উমর (রা.)-এর শাসনকালে সাদ ইবনে আবু ওয়াক্কাস ছিলেন মুসলিম জাহানের প্রধান সেনাপতি। খেলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করে খলিফা খালেদ ইবনে ওয়ালিদকে অপসারণ করেন এবং সাদ ইবনে আবু ওয়াক্কাসকে দায়িত্ব প্রদান করেন। তিনি ৬৩৭ খ্রিষ্টাব্দে ইরাকের প্রান্তরে যুদ্ধরত ছিলেন। ফলে তার বাংলায় আগমনের বিষয়ে এই দাবিটিও অগ্রহণযোগ্য।
তিন. খলিফা উসমান (রা.)-এর শাসনকালে ৬৫০ খ্রিষ্টাব্দে তাকে চীনে তাং রাজবংশের কাছে ইসলামের বার্তাবাহক হিসেবে পাঠানো হয়। সে বছর তিনি চীনে প্রথম মসজিদ নির্মাণ করেন। তাবারি ও অন্যান্য সূত্রে জানা যায়, উসমান (রা.)-এর খেলাফতকালে তাকে কুফার গভর্নরের দায়িত্ব থেকে অপসারণ করা হয়। এরপর তিনি সরকারি কোনো দায়িত্ব গ্রহণ করেননি। বিদ্রোহীরা যখন খলিফা উসমানকে ঘরের মধ্যে অবরুদ্ধ করে রেখেছিল, তখন সাদ ইবনে আবু ওয়াক্কাস তার সাহায্যে এগিয়ে গিয়েছিলেন।
এসব আলোচনা থেকে বোঝা যায়, বাংলায় যে সাহাবি এসেছিলেন, ইসলামের সঙ্গে বাংলার মানুষের পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন, তিনি সাদ ইবনে আবু ওয়াক্কাস নন। তাহলে কে ছিলেন তিনি? এই প্রসঙ্গে লেখক ও গবেষক শহীদুল বারী মামুন বলেছেন, তিনি ছিলেন সাদ ইবনে আবু ওয়াক্কাসের পিতা আবু ওয়াক্কাস মালেক ইবনে ওহাইব (রা.)। নামের মিলের কারণে পিতার স্থানে পুত্রের নাম চলে এসেছে। এই মতটাই আমার কাছে বেশি গ্রহণযোগ্য মনে হয়।
আবু ওয়াক্কাস মালেক ইবনে ওহাইব সম্পর্কে ইসলামের প্রাথমিক ও মৌলিক গ্রন্থগুলোয় তেমন কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। উসদুল গাবাহ ফি মারিফাতিস সাহাবাহ গ্রন্থে ইবনুল আসির বলেছেন, তিনি মালেক ইবনে ওহাইব ইবনে আবদে মানাফ ইবনে জোহরা ইবনে কিলাব ইবনে মুররা ইবনে কাব ইবনে লুয়াই। আবু ওয়াক্কাস তার উপনাম। তিনি সাদ ইবনে আবু ওয়াক্কাসের পিতা। আবদান তাকে সাহাবি বলে উল্লেখ করেছেন এবং বলেছেন, তিনি হাবশায় (আবিসিনিয়া) হিজরত করেছিলেন। তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনকালে ইন্তেকাল করেন। (খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ১০৮০, দারে ইবনে হাজাম এর সংস্করণ)। আল ইসাবাহ ফি তাময়িজিস সাহাবা গ্রন্থে ইবনে হাজার আসকালানিও প্রায় একই তথ্য দিয়েছেন। (খণ্ড: ৬, পৃষ্ঠা: ২৫৪, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ সংস্করণ)
ধারণা করা হয়, তিনি হাবশা থেকে সমুদ্রপথে চীন গিয়েছিলেন। পথে বেশ কয়েক বছর বাংলাদেশে অবস্থান করেছিলেন। কাজেই আবু ওয়াক্কাস মালেক ইবনে ওহাইব (রা.)-এর বাংলায় আগমনের যে অনুমান, সেটাকে অমূলক বলা যায় না।
বাংলাদেশে ইসলাম প্রচারের ধারাবাহিকতা অনেক প্রাচীণ। নদীমাতৃক ও সমুদ্রতট বিধৌত এই ভূমি ছিল ইসলাম প্রচারের উর্বর ক্ষেত্র। প্রাচীণ কাল থেকে বানিজ্য রূট হিসেবে এই অঞ্চল নাবিকদের মনযোগ বিশেষ ভাবে আকর্ষণ করেছিল। তাই ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে আরবরাও বাংলার বিভিন্ন বন্দরে পা রেখেছিল। এই অঞ্চলে তাদের নিয়মিত আগমনের ইতিহাস অনেক পুরোনো। ইসলামের আগমনের পরে আরব বণিকদের হাত ধরেই বাংলার মানুষরা ইসলামের সঙ্গে পরিচিত হয়েছিল। আর নবীজি (সা.) এর জীবনকালে বাংলায় সাহাবিদের আগমণের অনুমাণ এই অঞ্চলে ইসলামের ঐতিহ্যকে আরো সমৃদ্ধ করে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


