ইসলামের আবির্ভাবের পর অল্প সময়ের ব্যবধানেই বাংলা-পাক-ভারত উপমহাদেশের সঙ্গে মুসলিম বিশ্বের যোগাযোগের সূত্রপাত ঘটে। মহানবী (সা.)-এর যুগ থেকেই ব্যবসা-বাণিজ্য, দাওয়াত তাবলিগ ও বিভিন্ন ঐতিহাসিক অভিযাত্রার মাধ্যমে এ ভূখণ্ডে ইসলামের বাণী পৌঁছাতে শুরু করে। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন পর্যায়ে সাহাবায়ে কেরামের আগমন এই অঞ্চলের ইতিহাসে অনন্য তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়। তাদের বরকতময় পদধূলিতে ধন্য এই উপমহাদেশে ইসলাম কেবল একটি ধর্ম হিসেবেই আত্মপ্রকাশ করেনি; বরং একত্ববাদ, ন্যায় ইনসাফ, মানবিকতা ও নৈতিকতার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছিল। তাদের আদর্শ, চরিত্র ও দাওয়াতের মেহনতের ধারাবাহিকতায় বিস্তীর্ণ এই জনপদের অনেকাংশ ধীরে ধীরে ইসলামের সুশীতল ছায়ায় স্নাত হয় এবং পরবর্তীকালে মুসলিম সভ্যতা ও সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে বিকশিত হওয়ার ভিত্তি রচিত হয়।
১৫ হিজরি সনে খলিফা উমর (রা.)-এর শাসনামলে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ইন্তেকালের মাত্র চার বছর পর উপমহাদেশের সঙ্গে সাহাবিদের প্রত্যক্ষ যোগাযোগের সূচনা হয়। সে বছর তিনি উসমান ইবনে আবুল আসকে বাহরাইন ও ওমানের গভর্নর নিযুক্ত করেন। গভর্নর হওয়ার পর তিনি ভাই হাকাম ইবন আবুল আসকে একটি বাহিনীর নেতৃত্ব দিয়ে ভারতের থানা ও ভারুচ বন্দরের দিকে পাঠান। অপরদিকে তার আরেক ভাই মুগীরা ইবনে আবুল আস সাকাফিকে একটি সেনাদলসহ দেবলের (বর্তমান করাচি , থাট্টা ও লাহারি বন্দর) দিকে পাঠান।
তবে এসব অভিযান ছিল সীমিত পরিসরের সামরিক মহড়া; স্থায়ী বিজয়াভিযান বা পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ নয়। এ কারণেই ইতিহাসের অনেক গ্রন্থে এসব ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায় না। একইভাবে বেলুচিস্তান, সিন্ধ ও পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন অঞ্চলেও সাহাবায়ে কেরামের আগমনের কথা বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে, যার অন্যতম প্রমাণ ওয়ারুদে মাসউদ গ্রন্থ।
নিচে ইসলামের বিভিন্ন যুগে ভারতবর্ষে আগমনকারী সাহাবায়ে কেরামের সংক্ষিপ্ত পরিচয় তুলে ধরা হলো।
আলী ইবনে আবু তালিবের শাসনকাল
খলিফা উসমানের শাহাদাতের পর আলী ইবনে আবু তালিব খেলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তার খিলাফতকাল ছিল প্রায় ৪ বছর ৯ মাস। ৪০ হিজরির ১৭ রমজানে তার শাহাদাতের মধ্য দিয়ে রাশিদিন খলিফাদের শাসনকাল সমাপ্ত হয় এবং মুসলিম বিশ্বের শাসনের দায়িত্ব উমাইয়া রাজবংশের হাতে চলে যায়।
যদিও তার শাসনকাল অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা ও রাজনৈতিক সংকটে পরিপূর্ণ ছিল, তবুও মুসলিম রাষ্ট্রের সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলোয় বিজয়াভিযান অব্যাহত ছিল। এ সময় উপমহাদেশে আগমনকারী সাহাবিদের একজন হলেন খিররিয়্যিত ইবনে রাশেদ নাজির নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
তিনি ওমানের বনু সামাহ গোত্রের অন্তর্গত বনু নাজিয়া শাখার একজন বিশিষ্ট ব্যক্তি ছিলেন। বনু সামাহর একটি প্রতিনিধিদল মক্কা ও মদিনার মধ্যবর্তী এক স্থানে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাদের বক্তব্য মনোযোগ দিয়ে শুনে কুরাইশদের উদ্দেশে বলেন, ‘তারা তোমাদেরই সম্প্রদায়ভুক্ত।’ এরপর কুরাইশরা তাদের যথাযোগ্য আতিথেয়তা প্রদান করেন।
খলিফা আবু বকরের শাসনামলে তিনি বনু নাজিয়ার নেতা হিসেবে ধর্মত্যাগীদের বিরুদ্ধে অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। পরবর্তী সময়ে খলিফা উসমানের আমলে আবদুল্লাহ ইবন আমির তাকে পারস্যের শাসক নিযুক্ত করেন। ৩৭ হিজরি বা তার কিছু পরে আলী ইবনে আবু তালিবের খেলাফতকালে রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে তিনি মাকরান অঞ্চলে চলে আসেন। (আলইসাবাহ, খণ্ড: ২, পৃ. : ২৩৫; খিলাফতে রাশেদাহ আওর হিন্দুস্তান, পৃ. : ২৪০-২৪১)
মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ানের শাসনকাল
খলিফা আলী ইবনে আবু তালিবের শাহাদাতের পর হাসান ইবনে আলীর সঙ্গে সম্পাদিত সমঝোতা চুক্তির মাধ্যমে মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান মুসলিম বিশ্বের সর্বসম্মত খলিফা হন। এর আগে তিনি প্রায় ২০ বছর সিরিয়ার গভর্নর ছিলেন। ৬০ হিজরির ২২ রজবে দামেশকের তার ইন্তেকাল হয়। গভর্নর ও খলিফা উভয় দায়িত্ব মিলিয়ে তিনি প্রায় ৪০ বছর রাষ্ট্র পরিচালনায় নিয়োজিত ছিলেন। তার শাসনামলে ভারতবর্ষে আগমনকারী সাহাবিদের মধ্যে সিনান ইবনে সালামা ইবনে মুহাব্বিক হুজালি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
একটি বর্ণনা অনুযায়ী, তিনি মক্কা বিজয়ের দিন এবং অন্য একটি বর্ণনা অনুযায়ী হুনাইনের যুদ্ধের সময় জন্মগ্রহণ করেন। যুদ্ধ চলাকালে তার বাবা সালামা ইবন মুহাব্বিককে সন্তানের জন্মসংবাদ দেওয়া হলে তিনি বলেছিলেন, ‘আল্লাহর পথে যে বর্শা হাতে নিয়ে আমি যুদ্ধ করছি, তা আমার কাছে সন্তানের জন্মসংবাদের চেয়েও অধিক প্রিয়।’ রাসুলুল্লাহ (সা.) তার এই ঈমানদীপ্ত উক্তি শুনে নবজাতকের নাম রাখেন ‘সিনান’।
ঐতিহাসিকরা সিনান ইবনে সালামার বীরত্ব, সাহসিকতা ও নেতৃত্বের বিশেষ প্রশংসা করেছেন। তিনি একাধিকবার ভারত ও সিন্ধ সীমান্তবর্তী অঞ্চল শাসন করেছেন। ৪২ হিজরিতে রাশেদ ইবনে আমরের শাহাদাতের পর তাকে ভারতের একটি অঞ্চলের দায়িত্ব দেওয়া হয়। পরে ৪৭ হিজরিতে আবদুল্লাহ ইবনে সাওওয়ার আল-আবদীর শাহাদাতের পর তার স্থলাভিষিক্ত হন।
ঐতিহাসিক খলিফা ইবনে খাইয়াত উল্লেখ করেন, ৫০ হিজরিতে রাশেদ ইবন আমরের শাহাদাতের পর জিয়াদ তাকে ভারতের শাসক নিযুক্ত করেন। ভারতীয় সীমান্তে তার বীরত্বগাথা ইতিহাসে বিশেষভাবে আলোচিত। (তাহজিবুল কামাল, খণ্ড ১২, পৃ. ১৫১)
চাচনামা-এর বর্ণনা অনুযায়ী, বুধিয়া নামক স্থানে প্রতারণার মাধ্যমে তাকে শহীদ করা হয়। তার শাহাদাতের সাল সম্পর্কে ৯০, ৯৪ ও ৯৫ হিজরির বিভিন্ন মত পাওয়া যায়। (উসদুল গাবাহ, খণ্ড ২, পৃ. ৫৬০; খিলাফতে রাশেদাহ আওর হিন্দুস্তান, পৃ. : ২৪৩-২৪৬)
অন্য একটি বর্ণনা থেকে জানা যায়, হাজ্জাজ ইবন ইউসুফের শাসনামলের শেষ দিকে তিনি ইরাকে ইন্তেকাল করেন। (উসদুল গাবাহ, খণ্ড : ২, পৃ. : ৫৬১)
ইয়াজিদ ইবনে মুআবিয়ার শাসনকাল
মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ানের ইন্তেকালের পর তার পুত্র ইয়াজিদ খেলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তার শাসনকাল ছিল প্রায় তিন বছর আট মাস। ৬৪ হিজরির ১০ রবিউল আউয়ালে তিনি ইন্তেকাল করেন। তার শাসনামলে ভারতবর্ষে আগত সাহাবিদের একজন ছিলেন মুনজির ইবন জারুদ আবদী।
তিনি ছিলেন বনু আবদুল কাইস গোত্রের প্রধান এবং তৎকালীন আরব সমাজের একজন খ্যাতিমান ব্যক্তিত্ব। খলিফা আলী ইবনে আবু তালিব তাকে ইস্তাখারের শাসক নিযুক্ত করেছিলেন। পরবর্তীকালে ইয়াজিদের শাসনামলে উবাইদুল্লাহ ইবনে জিয়াদের অনুরোধে তাকে ভারতীয় সীমান্তে পাঠানো হয়।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


