যে সামনে হাজির নাই তার কাছে কথা পৌঁছানোর জন্য লেখার সৃষ্টি। আদিম কালে ছবি-মার্কা এইগুলা দিয়া মানুষ তার কথা অনুপস্থিত মানুষকে বুঝাইত। সেই অনুপস্থিত মানুষটা বা মানুষগুলা অইসব ছবি-মার্কা দেইখা বুইঝা নিত এইগুলাতে কী বলা হইছে।
এইভাবে ধাপে ধাপে মার্কা, ছবি, প্রতীক আর অক্ষরের চলের মাধ্যমে শত শত বা হাজার বছরের চর্চার মধ্য দিয়া আধুনিক লেখার জন্ম হইছে। লেখার শুরু বহু আগের ঘটনা। এখন পর্যন্ত ইরাকের মেসোপোটামিয়া সভ্যতার লেখারে সবচেয়ে পুরানা মনে করা হয়, যার বয়স ধরা হইছে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার বছর (খ্রি.পূ. ৩৪০০-৩১০০)।১-২
গোছগাছ করা লেখার কায়দা বাইর হওনের পরে লেখার কাজ হইল মুখের কথাগুলারে বিভিন্ন চিহ্নে এমনভাবে সাজানো, যাতে এই চিহ্নগুলা দেইখা মানুষ কথাগুলা বুঝে এবং দরকার মনে করলে মুখে মুখে হুবহু বলতে পারে। তখন থাইকা লেখার কাম হইল মুখের কথার বা মুখের ভাষার নকল করা।
যে ধরনের লেখারে গদ্য কয়, সেইটার শুরু হইছিল এই কাজে, একজনের কথাটা আরেকজনের কাছে হুবহু পৌঁছায়া দেয়ার জন্য। এইজন্য মুখের কথা কিছুটা সাজায়া-গুছায়া লেখার দরকার পরে। নগরায়ণ ও অন্যান্য কারণে মানুষের চিন্তা ও বুঝে প্যাঁচগোছ আসে, তাই লেখাও জটিল হয়। বলা যায়, গদ্য লেখা হইল কিছু চিহ্নের মাধ্যমে মুখের ভাষার নকল করা। ষোল, সতর ও আঠার শতকের গদ্যলেখার নমুনা তা-ই প্রমাণ করে। এইসব লেখা পড়লে মনে হয় একজন মানুষ যেন আরেক জনের লগে কথা বলতেছে।
বাংলা গদ্যের শুরুর সময়টাতে ভাষার এই স্বভাবরে পুরা এড়ায়া যাওয়া হইছে। সাধারণ মানুষের মুখের ভাষারে সাজায়া-গুছায়া লেখায় রূপ দেয়ার বদলে গদ্য তৈয়ার করা হয়। সংস্কৃত শব্দ ও ব্যাকরণের নিয়ম কর্জ কইরা আইনা বানানো হয় এমন এক আজব বাংলা গদ্য, যা বাংলাভাষী মানুষের মুখের ভাষা না, তারা বোঝেও না। ইংরেজ মালিকের নির্দেশে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে বইসা সেই গদ্য লেখেন একদল সংস্কৃতজ্ঞ পণ্ডিত, হরপ্রসাদ শাস্ত্রী যাদের নাম দিছেন—‘শাস্ত্রাদি অধ্যয়নকারী সংস্কৃত ব্যবসায়ী’। তারা জানতেন না যে, বাংলা গদ্য চালু আছে, ষোল, সতর, আঠার শতকের চিঠিপত্রে তার নমুনা আছে। তারা বাংলা গদ্যের খবর জানতেন না, জানতেন সংস্কৃত ভাষা। তাই তাদের জানার মধ্যে সংস্কৃতের আছরে তৈয়ার হয় তাদের ভাষা; বঙ্কিমচন্দ্রের কথায়—‘সংস্কৃতানুযায়ী ভাষা’।
এইখানে আরেকটা বিষয় আছিল। সংস্কৃত হইল অইসব পণ্ডিতদের ধর্মকর্ম করার ভাষা। তারা দেখে যে, এই সুযোগে বাংলা ভাষারে নিজেদের ধর্মের ভাষার মতো কইরা সাজায়া নিতে পারলে ভালোই হয়। তাইলে তাদের ধর্মের ভাষা সংস্কৃতের মান বাড়বে। এইটা আছিল তাদের জন্য সুন্দর সুযোগ, আর বাংলাদেশের মানুষের জন্য এক বিরাট ভাষিক-সাংস্কৃতিক বিপদ।
ইংরেজ মালিকের দরকারে আর আয়োজনে উনিশ শতকের শুরুতে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের বাংলা-না-জানা সংস্কৃতজ্ঞ পণ্ডিতরা যে বাংলা ভাষা চালু করলেন, সেই ভাষা আর তাতে লেখা সাহিত্যের সঙ্গে বিচ্ছেদ ঘটল সাধারণ মানুষদের। কারণ সাধারণ মানুষ এই ভাষা বুঝে না, এইটা তাদের ভাষা না। পরের প্রায় ৫০ বছর ধইরা এই ভাষারেই তালিম দেন বিদ্যাসাগর-বঙ্কিম-মধুসূদনসহ আরো অনেকে। ১৮৬০ সাল নাগাদ যে বাংলা ভাষা আমরা পাইলাম, তা আর বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের বুঝের মধ্যে থাকল না, হয়া উঠলো কলিকাতার উচ্চশ্রেণির কিছু মানুষের লেখার ও রস আস্বাদনের জিনিস।
এই নতুন ভাষা থাইকা বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকল দেশের বিশেষ কইরা বাংলাদেশের বিপুল মানুষ। তয় উচ্চ শ্রেণির হিন্দুরা পারিবারিকভাবে সংস্কৃত পড়ত। সেই কারণে সংস্কৃতের মতো কইরা বানানো এই নতুন বাংলা ভাষা রপ্ত করতে তাদের খুব একটা সময় লাগে না। কিন্তু সাধারণ হিন্দু, বৌদ্ধ আর মুসলমানসহ দেশের অন্যান্য মানুষ এর বাইরেই থাইকা যায়। তাদের কাছে এই ভাষা হয়া উঠে আজকের দিনে কোন বিদেশি ভাষা রপ্ত করার মতো বিষয় প্রায়।
নতুন বাংলা ভাষার সঙ্গে জনমানুষের যে বিচ্ছিন্নতার কথা বললাম, বাস্তবে সেইটা কেমন ছিল? অইকালে সাধারণ মানুষের কাছে সংস্কৃতজ্ঞ পণ্ডিতদের বানানো সংস্কৃতানুযায়ী বাংলা ভাষা কেমন লাগত তার ধারণা দেওয়া দরকার সেই কালের লেখা থাইকা। উনিশ শতকের কবি মোহাম্মদ দানিশ তার চাহার দরবেশ-এ লেখেন:
চলিত বাঙ্গালায় কেচ্ছা করিনু তৈয়ার।
সকলে বুঝিবে ভাই কারণে ইহার॥
আসল বাঙ্গালা সবে বুঝিতে না পারে।
এ খাতেরে না লিখিলাম শোন বেরাদরে॥৩
এই চাইর লাইনে বলা আছে খুব জরুরি কথা। প্রথম কথাটা হইল দানিশ কইতেছেন তার বইটা চলিত বাঙ্গালা, অর্থাৎ সেই সময়ের সাধারণ মানুষের মুখের ভাষায় লেখা। এই ভাষাই আরো শত শত বছর আগে থাইকা মানুষের মুখের ভাষারূপে কওয়া হইতে হইতে দানিশের কাল পর্যন্ত আসছে। পরের কথাটাও বিশেষ জরুরি: ‘আসল বাঙ্গালা’ মানুষ বুঝতে পারে না। এইজন্য তিনি আসল বাঙ্গালা না লেইখা, জনমানুষের বাংলা ভাষায় কবিতা লেখছেন।
এই আসল বাঙ্গালা জিনিষটা হইল ইংরেজ মালিক আর সংস্কৃতজ্ঞ পণ্ডিত কর্মচারীর কারিগরিতে বানানো সংস্কৃতায়িত বাংলা ভাষা। সেইটা উনিশ শতকের শুরুতে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে জন্ম নিয়া দানিশের কালে আইসা ইস্কুল-কলেজের পড়ার বই, পত্রিকা, অন্যান্য বইপত্রে পোক্তা হয়ে বসছে।
তখনো কিন্তু মূলধারার বাংলা ভাষা অর্থাৎ জনমানুষের বাংলা বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মুখের ভাষা হিসাবেই কওয়া হইত। এখনো সেই ভাষা বাংলাদেশের বেশিরভাগ মানুষের সাধারণ মুখের বুলি। সেই কালের মানুষ মোহাম্মদ দানিশ সংস্কৃতায়িত বাংলা আর জনমানুষের বাংলা ভাষার যে পার্থক্যের কথা বলছেন, সেইটা কোন যুক্তিতে অস্বীকার করব আমরা?
দানিশ যেটারে কইছেন চলিত বাঙ্গালা সেই ভাষারেই হরপ্রসাদ শাস্ত্রী বলছেন ‘বিষয়ী লোকের ভাষা’ যা বৃহত্তর বাংলাদেশের মুখের ভাষা। হরপ্রসাদ লেখছেন, “আমাদের সমাজে সেকালে ভদ্র সমাজে তিন প্রকার বাঙ্গালা প্রচলিত ছিল। মুসলমান নবাব ও ওমরাহদিগের সহিত যে সকল ভদ্রলোকের ব্যবহার করিতে হইত, তাঁহাদের বাঙ্গালায় অনেক উর্দ্দু মিশান থাকিত। যাঁহারা শাস্ত্রাদি অধ্যয়ন করিতেন তাহাদের ভাষায় অনেক সংস্কৃত শব্দ ব্যবহৃত হইত। এই দুই ক্ষুদ্র সম্প্রদায় ভিন্ন বহুসংখ্যক বিষয়ী লোক ছিলেন। তাহাদের বাঙ্গালায় উর্দ্দু ও সংস্কৃত দুই মিশান থাকিত। কবি ও পাঁচালিওয়ালারা এই ভাষায় গীতি বাঁধিত। মোটামুটি ব্রাহ্মণ পণ্ডিত, বিষয়ী লোক ও আদালতের লোক—এই তিন দল লোকের তিন রকম বাঙ্গালা ছিল। বিষয়ী লোকের যে বাঙ্গালা তাহাই পত্রাদিতে লিখিত হইত, এবং নিম্ন-শ্রেণির লোকেরা ঐরূপ বাঙ্গালা শিখিলেই যথেষ্ট জ্ঞান করিত। কথক মহাশয়েরা বহুকালাবধি বাঙ্গালায় কথা কহিয়া আসিতেছেন। তাহারা সংস্কৃত ব্যবসায়ী, কিন্তু তাহারা যে ভাষায় কথা কহিতেন তাহা প্রায়ই বিশুদ্ধ বিষয়ীলোকের ভাষা।”৪
এই ভাষার আলাপ করতে গিয়া শ্রীপ্রমথনাথ বিশী তার বাংলা গদ্যের পদাঙ্ক বইয়ে ১১৯৪ সালে গভর্নর জেনারেলের কাছে ভদ্রলোক বাঙালিদের লেখা এক আর্জির নমুনা দেখায়া লেখছেন, “খুব সম্ভবত এই হচ্ছে তৎকালীন শিষ্ট সমাজের ভাষা, হরপ্রসাদ শাস্ত্রী যাকে বলেছেন বিষয়ী লোকের ভাষা। এতে ফারসি, বাংলা, সংস্কৃত (এবং ইংরেজি) সমস্ত মিশেল ঘটেছে আর কোন একটা দিকে ঝোঁক না থাকায় ভারসাম্য ঘটে আগের নমুনাগুলোর (ধর্মীয় রচনা ও আদালতের চিঠিপত্রর) চেয়ে সরল ও সুবোধ্য হয়ে উঠেছে। আরও একটি কথা—পরবর্তী কালের ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের লেখকদের অনেকের ভাষার চেয়ে এ ভাষা সরলতর।” ৫
যারা উনিশ শতকের বাংলা সাহিত্যে মুসলমানের বিশেষ অবদান না-থাকার কারণ খোঁজেন, তাদেরকে অনুরোধ করি যেন আজগুবি ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ না করেন। বরং বুঝার চেষ্টা করেন যে, সেই কালে লেখার জন্য সংস্কৃতায়িত যে-বাংলা ভাষা চাপায়া দেয়া হয়, ধর্মীয় কারণে সেই ভাষায় উচ্চশ্রেণির হিন্দুরা আগে থাইকা কিছুটা দক্ষ আছিলেন। তাই প্রথম দিকে তাদের হাতেই বইপত্র লেখা হইছে। আর মুসলমান ও সাধারণ হিন্দু, বৌদ্ধ বা অন্য ধর্মের লোকদেরকে রীতিমতো ছাত্রগিরি কইরা সেই ভাষা আয়ত্ত করতে হইছিল। এজন্য মুসলমানরা সেই সংস্কৃতায়িত বাংলা আয়ত্ত কইরা লেখালেখি শুরু করতে চইলা গেছে আরও দুই-তিন দশক। ১৮৬৯ সালে মীর মোশারফ হোসেন লেখলেন রত্নবতী উপন্যাস। অন্যদিকে, বাংলাদেশের গরিব মুসলমান, বৌদ্ধ ও নিম্নশ্রেণির হিন্দুরা তো ইস্কুল-কলেজে পড়ার টাকাই জোগাড় করতে পারত না। সেই কারণে নতুন সংস্কৃতায়িত বাংলা রপ্তও করতে পারে নাই। তাই উনিশ শতকের শেষ পর্যন্ত বাংলা সাহিত্যের চালক হয়া আছিল সংস্কৃতায়িত বাংলা ভাষার কারিগর কলিকাতাকেন্দ্রিক ব্রাহ্মণ্য শ্রেণির কিছু মানুষ ও তাদের তাঁবেদাররা।
এই চালকেরা আছিলেন সংখ্যায় কম, কলিকাতা ও দু-একটা বড় বড় টাউনে মেলবন্দি। তাই সারাদেশের বিপুলসংখ্যক মানুষের মুখের ভাষা রাতারাতি বদলায়া যায় নাই। বরং সময় সময় তার উপভাষাগুলা লেখায় আসার চেষ্টাও করছে। যেমন প্যারীচাঁদ মিত্রের আলালের ঘরের দুলাল (১৮৫৮) উপন্যাসের আলালী ভাষা এবং কালীপ্রসন্ন সিংহের হুতোম প্যাঁচার নকশায় কলিকাতা শহরের মুখের ভাষা। এই দুই রীতিরও প্রশংসা হইছিল, এখনো হয়। কিন্তু স্থায়ী লেখনরীতি হিসাবে এইগুলা জায়গা পায় নাই। এর বড় কারণ তখন কলিকাতাকেন্দ্রিক উচ্চশ্রেণির হিন্দু বাবুদের হাতে স্কুল-কলেজ, পত্রপত্রিকা, স্কুল বুক সোসাইটি, মুদ্রণযন্ত্র জাতীয় সব নিয়ামক প্রতিষ্ঠান। তাদের বানানো সংস্কৃতায়িত বাংলায় দেদার বই পত্র লেখা হইছে, ইস্কুলগুলাতে ছাত্ররা বাধ্য হয়া সেইগুলা পড়তেছে। কলিকাতার সমাজ তখন তাদের আন্দোলন-আলোড়নে প্রত্যেকদিন বেসামাল। তাই সংস্কৃতায়িত বাংলাই টিইকা থাকে। মিত্র বা সিংহের রীতি টিকে নাই।
বরং পুরা উনিশ শতক ধইরা রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র, বঙ্কিমচন্দ্র, দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, অক্ষয়কুমার দত্ত, রাজনারায়ণ বসু, ভূদেব মুখোপাধ্যায়, কালীপ্রসন্ন ঘোষ, সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়—এরা সংস্কৃতানুযায়ী ভাষার যথেষ্ট উন্নতি করেন, প্রচার-প্রসার করেন। খুব চেষ্টা চরিত্র কইরা এই ধারায় শামিল হইতে পারেন কিছু মুসলমানও। যেমন মীর মোশারফ হোসেন, রেয়াজউদ্দীন আহমদ মাশহাদী, শেখ আবদুর রহিম, মোহাম্মদ মেজাম্মেল হক, মোহাম্মদ রেয়াজুদ্দীন আহমদ, মোহামদ মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী প্রমুখ।
এদের কেউ কেউ আবার বাংলাদেশের মুখের ভাষার পক্ষে মিনমিইনা গলায় আলাপ তোলার চেষ্টাও করছেন। যেমন আবদুল হামিদ খান ইউসুফজয়ী উদাসী কাব্যের ভূমিকায় লেখেন, “বাস্তবিক বাঙ্গালীদের বাঙ্গালীত্ব প্রাণের ভিতরের প্রশংসার্হ ও উল্লেখযোগ্য যে সকল খাঁটি জিনিস আছে তন্মধ্যে দেশীয় প্রাচীন সংগীতও একটি। প্রকৃত প্রস্তাবে সাদাসিদে সরল ভাবের গ্রাম্য সংগীতগুলিই জাতীয় ভাষার প্রাণ...।৬
বিদেশি সাহিত্যের ভাবাদর্শ নয়, তিনি সরল গ্রাম্য ভাষা ও পরিমার্জিত সাধু ভাষার সংমিশ্রণে দেশীয় ও জাতীয় ভাবাদর্শকে অনুসরণ করার পক্ষপাতী।”৭
যে-মৌখিক ভাষা রীতি থাইকা আলালী বা হুতুমী রীতি তৈয়ার হইছিল, তা মূলত নদীয়া-কলিকাতা ও আশপাশের অঞ্চলের মানুষের মুখের ভাষা। এই কারণে আলালী রীতি ও হুতুমী রীতির সঙ্গেও বাংলাদেশের মানুষের মনের যোগ হয় নাই। বিশ শতকের শুরুতে প্রমথ চৌধুরী নদীয়া-কলিকাতার মানুষের মুখের ভাষা নিয়া তৈয়ার করলেন বীরবলী রীতি, যা পরে চলিত রীতি বা প্রমিত রীতি নামে পরিচিত হয়। এইবার কবি রবীন্দ্রনাথ প্রমথ চৌধুরীর সাথী হইলেন। ফলে মুখের ভাষার আদলে লেখার দাবিরে আর ফালায়া দেয়া সম্ভব হয় নাই। বিশ শতকের প্রথম দুই দশকেই কলিকাতা ও আশপাশের অঞ্চলের কথ্যরীতির আদলে প্রচলিত চলিত রীতি বাংলা সাহিত্যে প্রতিষ্ঠিত হয়া যায়।
কিন্তু পরিবর্তনটা হয় মূলত ক্রিয়াপদের রূপে। অন্যান্য শব্দ আগের মতো সংস্কৃত বা সংস্কৃতঘেঁষাই থাইকা যায়। অনেক শব্দ মধ্যযুগে সহজ রূপ নিছিলো। যেমন চান, সুরুজ, ধরম, মূরতি, চক্কর ইত্যাদি। ফোর্ট উইলিয়ামের পণ্ডিতরা আগেই সেইগুলারে সরায়া সংস্কৃত শব্দ চন্দ্র, সূর্য, ধর্ম, মূর্তি, চক্র—এইগুলা বসায়া দিছিলেন। তারা মনে করতেন, আরবি-ফারসি শব্দ বাংলা ভাষার জাত মারছে। তাই আরবি-ফারসি শব্দ বাদ দিয়া তার বদলে আনা হয় সমার্থক সংস্কৃত শব্দ। প্রমথর চলিত রীতিতে সব সংস্কৃত শব্দ রাইখা দেয়া হয়। কেবল তাই না, পরের কালের লেখোয়ারা (নিজ নিজ ধারণা অনুযায়ী) গাম্ভীর্য আনার জন্য আরো বেশি সংস্কৃত শব্দ ব্যবহার করতে থাকলেন। এই অভ্যাস এখনো আছে। বাংলাদেশে এখনো তথাকথিত পণ্ডিতমনস্ক লেখোয়া আছেন, যারা মনে করেন প্রবন্ধের ভাষায় বেশি বেশি সংস্কৃত শব্দ ব্যবহারে লেখার সৌন্দর্য ও পণ্ডিতি বাড়ে।
এইসব কারণে প্রমথ ও রবীন্দ্রনাথ যে চলিত ভাষা প্রচার করেন, সেইটাতে থাইকা যায় প্রচুর সংস্কৃত শব্দ, কলিকাতা নগরজীবনের স্বভাব এবং কলিকাতা-নদীয়ার আশপাশের সমাজ ও ধর্মীয় জীবনযাপনের চিহ্ন। বাংলাদেশের জীবন ও অভিজ্ঞতার বাহন জনমানুষের বাংলা ভাষা লেখার বাইরেই রয়া যায়।
যে-কাণ্ডজ্ঞানের পরিচয় দিলেন প্রমথ-রবীন্দ্রনাথ, সেই কাণ্ডজ্ঞান কিন্তু বাংলাদেশের লেখকদের মধ্যে জাগলো না। তারা একবারও ভাবলেন না জনমানুষের ভাষার আদলে লেখার রীতি চালু করলে তা সাধারণ মানুষের মনের কাছে পৌঁছতে পারবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

