রাজনৈতিক বাটখারায় সাহিত্যের বিচার বড় দুর্ভাগ্যের! বড় নির্মম এবং বড় জুলুম! এই দুর্ভাগ্য, নির্মমতা এবং জুলুমের বিষয়টিই প্রবলভাবে লেখা হয়েছে বাংলা সাহিত্যের কপালে। কপালের এই লিখন খণ্ডানোর চেষ্টা কিংবা আয়োজন প্রভাবশালীদের কাছ থেকে কখনো হয়নি। বরং একে রাজনৈতিক রঙ লেপে আরো বিবস্ত্র করা হয়েছে। ফলে রাজনীতির চেয়েও সাহিত্যে বিভাজনটি কখনো কখনো অগ্নিদগ্ধ হয়ে উঠেছে। রাজনীতির ভয়াল আঁচ সাহিত্যে আগুন হয়ে জ্বলেছে নিয়ত। ব্যাপারটি এমনই হয়েছিল-একটি রাজনৈতিক পক্ষ সমর্থন না করলে বাংলাদেশে যেন সাহিত্য করার অধিকারটুকুও ছিল না। বলতে পারেন এতে তোয়াক্কা করার কী আছে! আছে নিশ্চয়! কেননা একটি দেশের ক্ষমতায় বসার অধিকার যেকোনো রাজনৈতিক দলের রয়েছে। জনগণ চাইলে রাষ্ট্রক্ষমতায় আরোহণ যেকোনো রাজনৈতিক দলের জন্য বৈধ। কিন্তু ক্ষমতায় বসে প্রতিপক্ষের নাগরিক অধিকার কেড়ে নেওয়ার বৈধতা পৃথিবীর কোনো আইনে নেই। অথচ বাংলাদেশে আমরা কী দেখলাম। বিশেষ করে গত ষোলো বছর প্রায় এক ভয়ংকর বীভৎসতার ভেতর দিয়ে অতিবাহিত হতে হয়েছে আমাদের। এই বীভৎসতায় শুধু রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়নি, শিল্প-সাহিত্যেও ভয়াবহ ক্ষতির মুখোমুখি হয়েছে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি, বিপক্ষের শক্তির ভয়ংকর তরবারি দিয়ে ভাগ করা হয়েছে জাতিকে। ঠিক তেমনি সাহিত্যেও এই তরবারি আঘাত হেনেছে তীব্র তীক্ষ্ণতায়। ডান-বামের চালবাজিতে সাহিত্যাঙ্গন ভেঙে নদীর দুই তীরের মতো দুভাগ হয়েছিল।
ভাগাভাগির এই নির্মম খেলায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হলেন প্রকৃত প্রতিভাবান কবি-সাহিত্যিকরা। জীবনানন্দের ভাষায়Ñ ‘শেয়াল ও শকুনের খাদ্য আজ তাদের হৃদয়।’ এমনই দাঁড়িয়েছিল বাস্তবতা।
আল মাহমুদের বিষয়টি আরো নির্মম। একটি ভাঙা স্যুটকেসে ভরে তিনি ‘বাংলাদেশের নদী, নিসর্গ, ফুল, পাখি ও পতঙ্গ’ নিয়ে ঢাকায় এসেছিলেন। এসেই তিনি একধরনের অবহেলার শিকার হন। তার সতীর্থরা তাকে ‘গাঁইয়া’ বলে উপহাস করত। অথচ সেই গাঁয়ের শব্দই আল মাহমুদকে আল মাহমুদ করে তুলেছে।
একদা বাংলাদেশে অঘোষিতভাবে প্রায় নিষিদ্ধ ছিলেন আল মাহমুদ। জাতীয় কোনো পত্রপত্রিকা, সাপ্তাহিক, পাক্ষিক এমনকি মাসিকেও ছাপা হতো না তার লেখা। রাষ্ট্রীয় কোনো অনুষ্ঠানে দাওয়াত পেতেন না তিনি। এমনকি সরকারঘেঁষা কবিতা সংগঠনগুলোর কবিতা নিয়ে বড় কোনো আয়োজনেও দাওয়াতের বাইরে রাখা হতো তাকে। আল মাহমুদ নামটি নেওয়াই যেন ছিল অপরাধ! এ অবস্থা শুরু হয় আশির শেষের দিক থেকে। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ তখন প্রেসিডেন্ট। তার পৃষ্ঠপোষকতায় অনুষ্ঠিত হলো এশিয়া কবিতা উৎসব। এ উৎসবের কিছুদিন পর থেকে কবিতাঙ্গনে শুরু হয় ভাগাভাগি। জাতীয় কবিতা কেন্দ্রকে মুখ্য করে শুরু হয় ভাঙনের। সেই ভাঙনের তীব্র আওয়াজ প্রচণ্ডতা পেতে পেতে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান পর্যন্ত দীর্ঘ হয়ে ওঠে। কবিতা কেন্দ্রের সঙ্গে জড়িত ছিলেন সৈয়দ আলী আহসানও। আলী আহসানের মতো অসাধারণ পণ্ডিত ব্যক্তিও ডান-বাম কিংবা স্বাধীনতার পক্ষ-বিপক্ষের ফতোয়া থেকে মুক্ত হতে পারেননি।
আল মাহমুদ প্রায়ই বলতেনÑকবিকে কালের অক্ষর নির্মাণ করতে হয়। যিনি কালের অক্ষর নির্মাণ করেন, কালের ঊর্ধ্বে উঠে যান তিনি। হয়ে যান মহাকালের। সমকাল তাকে গ্রহণ করল কী করল নাÑএ নিয়ে কবির ভাবনা থাকে না। তার সময় তাকে নিষিদ্ধ করলেও কবির কিছু যায় আসে না। তার কবিতায় যদি বারুদ থাকে একদিন না একদিন তা জ্বলে উঠবেই। প্রজ্বলিত হবেই সেই বারুদগন্ধী কবিতা। হলোও তাই। আল মাহমুদকে যতই নিষিদ্ধের ঘোরতর ঘূর্ণিতে নিক্ষেপ করুক না কেন, তার কবিতার বারুদ ঠিকই জ্বলে উঠেছে। এই বারুদ নেভানোর মতো কোনো লোয়াজিমা আল মাহমুদের প্রতিপক্ষ শক্তির ছিল না।
তার সমসাময়িক কবিদের তালিকায় ত্রিশের পর থাকত আল মাহমুদের নাম। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে আল মাহমুদ লাফিয়ে পার হলেন ত্রিশ সংখ্যাটি। তালিকা হয়ে গেল শামসুর রাহমান আল মাহমুদ। তারপর শুধু আল মাহমুদ। পয়লা নম্বরে উঠে আসা আল মাহমুদ, তার সময়ের চেয়ে অনেক বেশি পঠিত এখন। রাষ্ট্র এবং ক্ষমতাশালীরা যতই নিষিদ্ধের খেলা খেলুক, এ দেশের তরুণ-তরুণীরা সাদরে নিয়েছে আল মাহমুদের কবিতা। শুধু কি বাংলাদেশের তারুণ্য! আল মাহমুদকে গ্রহণ করেছে বাংলা ভাষার তরুণ সমাজ। বিশেষ করে কলকাতার কবিদের সার্টিফিকেট পাওয়ার তৃষ্ণায় যারা কাতর, বিস্ময়ে তারা দেখল পুরো কলকাতা উপুড় হয়ে পড়েছে আল মাহমুদের কবিতায়। এ বিস্ময়ের ঘোর আল মাহমুদবিরোধীদের কখনো কাটেনি। আজও কাটছে না।
দিন যত গড়াচ্ছে, আল মাহমুদ ততই পাঠ্য হয়ে উঠেছে। ততই জ্বলে উঠছে আল মাহমুদের কবিতা। ততই উজ্জ্বল হচ্ছেন আল মাহমুদ। আল মাহমুদ নিজেই বলেছেনÑ‘এ দেশের তরুণ-তরুণীদের পড়তে হবে আমাকে।’ এ এক কঠিনতম উচ্চারণ। কীভাবে এ উচ্চারণ করলেন আল মাহমুদ! কোন দৃঢ়তা তাকে প্ররোচিত করল এমন কথা উচ্চারণের! সত্যি হচ্ছে আল মাহমুদ জানতেনÑতিনি কী পুরে দিয়েছেন কবিতার শরীরে। কী ভাষা গেঁথেছেন কবিতার মালায়।
আল মাহমুদ দেখলেন, দিনের আলোয় যারা তার বিরুদ্ধে মৌলবাদের খই ফোটায়, কুৎসা রটায়, ঠিক রাতের অন্ধকারে তারাই এসে আল মাহমুদের পায়ে হাত রেখে আশীর্বাদ চাইত। অকপটে বলতÑমাহমুদ ভাই, আপনি আমাদের হৃদয়ের কবি। আপনার কবিতা না পড়লে বাংলা আধুনিক কবিতা অপূর্ণ থেকে যায়। এভাবেই আল মাহমুদ অসম্ভব আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠেন।
তার কবিতাগ্রন্থ ‘দ্বিতীয় ভাঙন’-এ এমনই আভাস দিয়েছেনÑ‘এখন মনে হয়
একশ বছর আমি হেঁটেছি
দ্যাখো আরও শত বছরের জন্য
আমার চরণ প্রস্তুত
কেনো আকাশের ধ্রুবতারাকে
আমি ভুলের দিশারী বলব?
তোমাদের একবিংশ শতাব্দীতে
আমার ভুলের দিগ্বিজয়।’ (ভুলের দিগন্তে)
একই গ্রন্থে একটি কবিতার নাম ‘বাতাসের মুখে লাগাম দিয়ে’। এ কবিতার পঙক্তিÑ
‘আমি নামহীন সমাধি প্রান্তর পেছনে ফেলে আমার পতাকা উড়িয়ে দিলাম।’
‘শুধু চোখ আর পায়ের পিষ্টন’ আরেকটি কবিতা। এ কবিতার একটি পঙ্ক্তিÑ
‘আমি পৃথিবীর কবি
নিস্পৃহ কালের পথিক।’
‘কলকবজার ঘষটানি’ কবিতায়-
‘কে আমাকে থামাবে?
আমার উদ্দেশ্য এক অদৃশ্য ঠিকানার দিকেই ধাবমান।
আমার পথ তো সব জনপদের ভেতর দিয়ে
সব গ্রামের পাশ কাটিয়ে
সব নদী সমুদ্রের তরঙ্গে লাফিয়ে ওঠা ফসফরাসের মত।’
একই সঙ্গে আল মাহমুদের কাছে প্রতিপক্ষের ঘুণে খাওয়া চর্বিত শব্দের বস্তাপচা রচনার খবরও ছিল। ‘বাতাসের মুখে লাগাম দিয়ে’ কবিতার শেষাংশ পাঠ করা যাকÑ
‘যোদ্ধার মুখোশপরা শেয়ালের হুক্কাহুয়ায় নগরবাসী নিথর।’ কিংবা-
‘পান্থশালাগুলো গিজ গিজ করছে মুখোশধারী প্রমোদলোভীদের ভিড়ে
কবিদের পচা পদ্যে কেবল ভাঁড়ামি ও হালুয়া রুটির গন্ধ।
মানচিত্রের বেসাতকারীদের গায়ে পাণ্ডিত্যের পোশাক। আর
শীতের পাখি বিক্রেতার মতো কে যেন বাংলাদেশকে হাত বাঁধা
হাঁসের মতো ঝুলিয়ে হাঁক দিচ্ছে, সস্তা, খুব সস্তা, আসুন।’
এভাবেই আল মাহমুদ নিজেকে এবং প্রতিপক্ষকে চিহ্নিত করেছেন।
একজন প্রকৃত কবি জাতির ক্রান্তিলগ্নে জ্বলে ওঠেন। সময়ের প্রয়োজনে ব্যবহৃত হন তিনি। জাতির সংগ্রাম, লড়াই, প্রতিবাদ এবং প্রতিরোধে সামনে এসে দাঁড়ায় তার কবিতা। চব্বিশের বিপ্লবে আমাদের তারুণ্যের সঙ্গে রাজপথে দাঁড়ালেন কবি নজরুল। নজরুলের পর উল্লেখযোগ্য কবিদের একজন আল মাহমুদ। আল মাহমুদের কবিতার পঙ্ক্তি বিপ্লবের ধ্বনি হয়ে বেজে উঠল। তার কটি পাঠ করা যাক-‘মাঝে মাঝে হৃদয় যুদ্ধের জন্য হাহাকার করে ওঠে’,‘ঘুমের ভেতর জেহাদ জেহাদ বলে জেগে উঠি’, ‘বখতিয়ারের ঘোড়া আসছে’, ‘মানুষ মানুষ করে যারা মানুষ তারা কে’, ‘মানুষ গড়ার শাসন দেখে বুক কাঁপে থরথর’। আরো আরো পঙ্ক্তি জুলাই বিপ্লবের গ্রাফিতি হয়ে জেগে উঠল দেয়ালে। সেই জাগরণ উষ্ণতা জুগিয়েছে বিপ্লবী জনতার উত্তাল সমুদ্রে। এভাবে আমাদের সময়ের উচ্চারণ হয়ে উঠেছেন আল মাহমুদ।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

