নিজ কওমের সমালোচনা খঞ্জর দিয়ে নিজের রানের গোশত কাটার মতোই কষ্টকর। কিন্তু আফসোস যে, আমরা আমাদের সেরা মানুষগুলোকে এই সমাজে রাখতে পারি না। কারণ বাংলাদেশে জ্ঞানী মানুষকে পদে পদে আপস করতে হয়, জনরুচির বাহক হতে হয়, নইলে বেইজ্জতির শেষ নাই; আর কেউ যদি এক বিষয়ের বিশেষজ্ঞ না হয়ে বহু বিষয়ে গভীর জানাশোনা রাখেন, নিজস্বভাবে চিন্তা করেন—হায় আল্লাহ, তাহলে তো তার বেইলই নেই।
কথাগুলো মনে আসছে, সৈয়দ মুজতবা আলীর জীবন স্মরণ করে। আলী সাহেবকে ‘রম্যলেখক’, ‘উইটি আড্ডাবাজ’ পরিচয়ে আটকে যে অপমান করা হয়, সেটা তার প্রমত্ত প্রজ্ঞা ও বিচিত্র দুনিয়াব্যাপী ছড়ানো জীবনের প্রতি অনাগ্রহ থেকে যতটা, ততটাই তার বাংলাদেশি জীবনে ধনসম্পদ ও প্রভাব-প্রতিপত্তি অর্জন করতে না পারার প্রতি তাচ্ছিল্য থেকেও হতে পারে।
শুরুতেই সালাম শাহ সৈয়দ আহমদ মোতাওয়াক্কিল (র.) পীর বংশের মহান ব্যর্থ ছাওয়াল সৈয়দ মুজতবা আলীকে! সালাম যারা নানা কিছু শিখছেন জানার আনন্দে, অসীম অবজ্ঞা ও ব্যর্থতা হাসিল করতে!
ছবিতে সুদর্শন ও সুবেশী যুবক আলী সাহেবকে দেখছি। তিনি তখন এক জার্মান স্বর্ণকেশীর সঙ্গে গভীর প্রণয়ে লিপ্ত; এই প্রেম পারিবারিক বাধার মুখে পরিণতি পায়নি। ততদিনে তিনি ১৮টি ভাষা জেনেছেন এবং খোজাদের নিয়ে লেখা তার পিএইচডি থিসিস প্রায় শেষ।
এখানে বলে রাখি, সৈয়দ মুজতবা
আলী ও মুহম্মদ শহীদুল্লাহ সাহেবের পিএইচডি থিসিস উপযুক্ত টীকাটিপ্পনীসহ অনুবাদ করে ছাপানোর বহু চেষ্টা করে এককালে আমি হাল ছেড়ে দিয়েছি। বাংলা একাডেমিসহ কোনো প্রতিষ্ঠানকেই রাজি করতে পারিনি।
এবং তখন থেকেই লক্ষ করছি, এই পণ্ডিত আপনভোলা সরল মানুষটি বাঙালি মুসলমান সমাজে যে অপদস্তটা হয়েছেন জীবনভর; আমাদের দেওয়া ধিক্কার ও অপমান সহ্য করতে না পেরে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব ত্যাগ করে স্বজনহীনভাবে অবহেলায় ভুগতে হয়েছে তার, শেষ জীবনের একটা সময়, কলকাতার পার্ল রোডের বাড়িতে।
অমিতাভ চৌধুরীর ১৯৯৩ ঈসায়ীতে ছাপা একটি লেখায় সৈয়দ সাহেব মারা যাওয়ার আগের মাসের দু-একটা ভোগান্তির বর্ণনা পড়ে আমার মতো হৃদয়হীন পাষাণের মনেও বিষাদ ঘনিয়ে আসে। আবু রুশদের ছোট ভাই, আরেক সুদর্শন ও অসম্ভব মেধাবী ঔপন্যাসিক রশীদ করীমকে সৈয়দ সাহেব ও আবু সয়ীদ আইয়ুব দুজনেই খুব স্নেহ করতেন। রশীদ করীম বিভিন্ন সময় আমাকে বলেছেন, লিখেছেনও, সৈয়দ সাহেবের ঢাকা জীবনের একাকিত্ব ও বেদনা নিয়ে।
তবে আমাকে সবচেয়ে ব্যথিত করে সৈয়দ সাহেবের প্রেয়সীকে প্রত্যাখ্যান করার সিদ্ধান্তটি। ১৯৩২ ঈসায়ীর বসন্তে বার্লিনে তোলা আলী সাহেব ও তার সুন্দরী প্রেমিকা মারিয়ানার কিছু ছবি আমি সংগ্রহ করেছি। ছবিগুলো বারবার দেখি। সে সময় মারিয়ানা বন বিশ্ববিদ্যালয়ে সৈয়দ সাহেবের সহপাঠিনী ছিলেন। তারা একে অপরকে গভীরভাবে ভালোবাসলেও তাদের প্রেম পরিণতি পায়নি।
সৈয়দ সাহেব মারা যান ১৯৭৪ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি, সোমবার, সকাল ১১টা ৫০ মিনিটে পিজি হাসপাতালের ১২৭নং কক্ষে। নিজেদের দিকে একটু আয়না ঘুরিয়ে দেখে আপনারা কেউ কি আমাকে বলবেন, ২০২৬-এর ফেব্রুয়ারি মাসে তাকে কীভাবে স্মরণ করছি, তাকে কীভাবে মূল্যায়ন করছি আমরা?
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


এক মাসে ১০ বার ভূমিকম্প, জনমনে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা