অমর একুশে বইমেলা শুরু হয়েছে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। নানা জটিলতা, প্রস্তুতির সীমাবদ্ধতা এবং এক শ্রেণির প্রকাশকদের অনাগ্রহ ও আপত্তি সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত শুরু হয়েছে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বইয়ের উৎসব। প্রতিবছরের মতো এবারও বইপ্রেমী মানুষের প্রাণের টানে জমে উঠেছে মেলার পরিবেশ। কেউ বই দেখছে, কেউ বই কিনছে; আবার চলছে বই নিয়ে আড্ডা। রোজার মাস হওয়ায় মেলার পরিবেশে যুক্ত হয়েছে আরেকটি ভিন্নমাত্রা। ইফতারের সময় ঘনিয়ে এলে মেলা নতুনভাবে প্রাণ ফিরে পায়। অনেকেই বইমেলা ঘুরে দেখার ফাঁকে সেখানেই ইফতারের আয়োজন করছেন। ফলে বই, পাঠক, আড্ডা আর ইফতারের মিলিত আবহে বইমেলা হয়ে উঠেছে এক অন্যরকম ধর্মীয় আবহের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উৎসব।
বইমেলায় আসা লেখক, পাঠক ও দর্শনার্থীদের জন্য আরেকটি দর্শনীয় স্থান হতে পারে ঢাকার ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ‘মীর জুমলা গেট’ অথবা ‘ঢাকা গেট’। বাংলা একাডেমি থেকে দোয়েল চত্বরের দিকে যাওয়ার পথে অথবা চানখাঁরপুল-হাইকোর্ট থেকে মেলায় প্রবেশের পথে স্বমহিমায় দাঁড়িয়ে আছে এই স্থাপনা। মোগল আমলে বাগে বাদশাহি নামক সুসজ্জিত বাগানের পাশে এই দীর্ঘ গেট নির্মাণ করেছিলেন মহান সুবেদার, যার নাম ছিল মীর জুমলা।
মীর মুহাম্মদ সৈয়দ আর্দিস্তানি ছিলেন মীর জুমলার পিতৃপ্রদত্ত নাম। তিনি ইরানের আর্দিস্তান শহরে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। নানা ঘাত-প্রতিঘাত, সাফল্য ও ব্যর্থতার নানা পর্ব অতিক্রম করার পর মোগল সম্রাট শাহজাহানের দেওয়ানে কুল (প্রধানমন্ত্রী) নির্বাচিত হন।
মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেবের শাসনক্ষমতা গ্রহণের পর, ১৬৬০ সালে তিনি বাংলার সুবেদার নিযুক্ত হন। বাংলায় তার শাসনকাল দীর্ঘ ছিল না, তবে সেই সময়ে তিনি এ অঞ্চলে অবস্থান করেছিলেন এবং নিজের কীর্তির স্বাক্ষর রেখেছিলেন। তার শাসনকালে রাজধানী ঢাকা বুড়িগঙ্গা নদীকে কেন্দ্র করে ব্যাপকভাবে বিস্তৃত হয়।
ঢাকার বেশ কয়েকটি নির্মাণকাজের সঙ্গে মীর জুমলার নাম জড়িয়ে আছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো পাগলা ব্রিজ এবং ঢাকা গেট। শহরের উত্তরদিক থেকে শহরটিকে রক্ষার জন্যই এই গেট নির্মাণ করা হয়েছিল। মীর জুমলা মোগল দস্যুদের আক্রমণ থেকে শহর ও শহরতলিকে রক্ষার জন্য প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিলেন।
১৬৬০ থেকে ১৬৬৩ সালের মধ্যে মীর জুমলা এই গেটটি নির্মাণ করেছিলেন। সুবেদারের মূল উদ্দেশ্য ছিল শহর ঢাকার সীমানা চিহ্নিত করা এবং স্থলপথে শত্রুদের আক্রমণ প্রতিহত করা। মোগল আমলে এই গেটের নিরাপত্তা প্রাচীর পেরিয়ে রাজধানী ঢাকায় প্রবেশ করতে হতো। এই ব্যবস্থা ১৭ শতক থেকে শুরু করে ১৯ শতক পর্যন্ত কার্যকর ছিল।
মীর জুমলা গেটের কাঠামো সমান মাপের তিনটি পিলার এবং তাদের মধ্যে সংযুক্ত অলংকারধর্মী দেয়াল নিয়ে গঠিত। পিলারগুলো সারিবদ্ধভাবে স্থাপন করা হয়েছে এবং প্রতিটি পিলারের মাঝের অংশে অর্ধবৃত্তাকার শীর্ষযুক্ত দেয়াল-প্যানেল রয়েছে। এই প্যানেলগুলোর ভেতরে ছোট ছোট ছিদ্রযুক্ত জালির মতো নকশা করা হয়েছে, ফলে কাঠামোটি দৃষ্টিনন্দন হয়ে উঠেছে। পিলারগুলোর মাথায় ছোট অলংকার থাকায় পুরো গেটটি একটি সুষম ও শৈল্পিক স্থাপত্যরূপ ধারণ করেছে।
মীর জুমলা গেটের নির্মাণকাল নিয়ে কিছুটা ভিন্নমত পাওয়া যায়। কিংবদন্তির ঢাকা গ্রন্থের লেখক নাজির হোসেন লিখেছেন, ‘রমনায় তিন নেতার মাজারের কাছে, ময়মনসিংহ রোডের মাথায় রমনা গেট, যাকে ঢাকার উত্তর গেট নামেও অভিহিত করা হয়, সেটি ঊনবিংশ শতাব্দীতে ঢাকার ম্যাজিস্ট্রেট চার্লস ডি অলির প্রচেষ্টায় নির্মিত হয়েছিল বলে জানা যায়। বর্তমান যে আকৃতিতে রয়েছে, সেটিই মূল রূপ। যদিও তা পাকিস্তান আমলে রানি এলিজাবেথের আগমনকালে রাস্তা চওড়া করতে গিয়ে ব্রিটিশ আমলের গেটটি ভেঙে নতুন করে অনুরূপ ডিজাইন ও রঙ দেওয়া হয়েছে।’ আহমদ হাসান দানিও এই মন্তব্যটি করেছেন।
তবে আধুনিক ইতিহাসবিদদের মতে, এই গেটটি ১৭ শতকে সুবেদার মীর জুমলার সময়ে নির্মিত হওয়াই স্বীকৃত।
বিবি মরিয়মের কামান
মীর জুমলা গেটের পাশে থাকা আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নসম্পদ হলো বিবি মরিয়মের কামান।
বাংলার সুবেদার মীর জুমলা আসাম অভিযানে ৬৪ হাজার ৮১৫ পাউন্ড ওজনের এই কামানটি ব্যবহার করেছিলেন। পরে তিনি এটি ঢাকার বড় কাটরার সামনে সোয়ারীঘাটে স্থাপন করেন। সময়ের সঙ্গে এর অর্ধাংশ বালুর নিচে চাপা পড়ে যায়। ১৮৪০ খ্রিষ্টাব্দে ব্রিটিশ ম্যাজিস্ট্রেট ওয়াল্টার্স প্রকৌশলীদের সহায়তায় এটি সোয়ারীঘাট থেকে তুলে চকবাজারে স্থাপন করেন। পরে ১৯১৭ (অথবা অনেকের মতে ১৯২৫) সালে ঢাকা জাদুঘরের পরিচালক নলিনীকান্ত ভট্টশালীর উদ্যোগে কামানটি সদরঘাটে স্থানান্তর করা হয়। ১৯৫৭ সালে এটি গুলিস্তানে স্থাপন করা হয়, ১৯৮৩ সালে ওসমানী উদ্যানে নেওয়া হয় এবং দীর্ঘদিন সেখানে থাকার পর ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে আবার ঢাকা গেটের সামনে স্থানান্তর করা হয়। তবে মীর জুমলার ব্যবহৃত এই ঐতিহাসিক কামানটি কে, কবে এবং কীভাবে বিবি মরিয়মের কামান নামে প্রসিদ্ধি পেয়েছিল, সে বিষয়ে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
বর্তমান অবস্থা
দীর্ঘদিন অযত্নে-অবহেলায় পড়ে থাকার পর ২০২৩ সালে ঢাকা সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে ঐতিহাসিক মীর জুমলা গেট সংস্কার করা হয়। আশপাশে গজিয়ে ওঠা আগাছা কেটে পরিষ্কার করা হয়। নতুন করে আস্তর লাগিয়ে রঙ করা হয় এবং ওসমানী উদ্যানে থাকা বিবি মরিয়মের কামানটি গেটের পাশে স্থাপন করা হয়।
তবে বর্তমানে ঐতিহাসিক এই স্থাপনাটি আবারও বেশ অযত্নে পড়ে আছে। রক্ষণাবেক্ষণ ও তত্ত্বাবধানের অভাবে এটি ধীরে ধীরে আগের রূপে ফিরে যাচ্ছে। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ভবঘুরে লোকজন গেটের আশপাশে আস্তানা গেড়ে বসেছে এবং মূল কাঠামোর পাশে মলমূত্রও পড়ে থাকতে দেখা গেছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

