‘একজন কবির ক্ষমতাদর্পীর কাছ থেকে নেওয়ার কিছুই নেই।’
এটি হুট করে বলা জীবনবিচ্ছিন্ন কোনো উক্তি নয়। মুখস্থ আওড়ানো কথাও নয়। এবং নয়—না পাওয়ার অভিমান থেকে বলা। বরং বলা, লোভনীয় নানা প্রাপ্তিকে প্রবল প্রতাপে প্রত্যাখ্যান করেই। অগ্রাহ্য করে চারপাশের অজস্র লালায়িত সত্তার সরব উপস্থিতি। কিন্তু কীসের বলে?
কবি ফররুখের কী এমন ছিল যে, পরাক্রান্ত ক্ষমতাদর্পীদের ‘তীব্র ভ্রুকুটি’ কোনো রূপ চিত্তচাঞ্চল্য ছাড়াই ছুড়ে ফেলতে পারেন? নির্দ্বিধায় খান্নাস বলতে পারেন জালিমকে, তা সে যতই শক্তিমান হোক! তারপর তাদের নিবেদনকৃত যেকোনো অভিধা, উপঢৌকন প্রত্যাখ্যান করে যান অবলীলায়! হোক তা প্রেসিডেন্স পুরস্কার ‘প্রাইড অব পারফরম্যান্স’ কিংবা ‘সিতারা-ই-ইমতিয়াজ’! এত সাহস কোথায় পান ফররুখ?
এ প্রশ্ন, চারপাশে চাটুকার মোসাহেব আর পুরস্কার-ভিক্ষার এই যুগে, আরো প্রকট হয়ে ওঠে।
কবি ফররুখ আহমদের এই অতলান্ত রহস্যের কাছাকাছি যেতে হলে আমাদের ফররুখ-সত্তার বিনির্মাণ বুঝতে হবে। বুঝতে হবে, তাঁর ব্যক্তিত্বের বৈভব কোন আলোর বিচ্ছুরণে উত্তাল এবং উত্তাপময়।
দুই.
ফররুখ-সত্তার এ বিনির্মাণ এবং তাঁর প্রজ্বলিত বৈভব বোঝার জন্য সম্ভবত সবচেয়ে ফলপ্রদ মাধ্যম হলো ‘সিরাজাম মুনীরা’। কবির দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ। যদিও ইতিহাসের গণনা বলছে, কবিতাগুলো প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘সাত সাগরের মাঝি’তে গ্রন্থিত কবিতাগুলোর রচনাকালেরই সমসাময়িক। প্রশ্ন হলো, ‘সিরাজাম মুনীরা’ কোন অর্থে ফররুখ-সত্তার বিনির্মাণ বুঝতে আমাদের সাহায্য করে?
এখানে কয়েকজন ইতিহাস-নির্মাতা ব্যক্তিবর্গের নাম এসেছে। সেসব নামকে শিরোনামে তুলে তিনি পঙ্ক্তি সাজিয়েছেন। তাই সেসব মহামানবদের জানলেই কি আমরা ফররুখকে জানতে পারব? কিংবা সেইসব ব্যক্তির জীবনদর্শন, সংগ্রাম ও সাধনা বুঝলেই কি ফররুখ-সত্তার বৈভব তৈরির মূল উপাদান বুঝে ফেলতে পারব? ‘না।’
‘সিরাজাম মুনীরা’য় রাসুলুল্লাহ (সা.), খিলাফাতে রাশিদার খলিফাগণ, শহীদে কারবালা, সুলতানুল হিন্দ, মুজাদ্দিদে আলফেসানি প্রমুখকে নিয়ে রচিত কাব্যে সাজানো।
তিন.
ফররুখকে কেউ কেউ ভুল বুঝেছেন। ধরুন, ফররুখ আহমদ ইসলামের নবীকে নিয়ে ‘সিরাজাম মুনীরা’ কবিতা লিখেছেন; লিখেছেন তাঁর ঘনিষ্ঠতম চার সহচরকে নিয়ে—আবু বকর ছিদ্দিক, উমর দারাজ দিল, উসমান গণি এবং আলী হায়দর। ফররুখ যেহেতু তাঁদের প্রসঙ্গ-অনুষঙ্গ নিয়ে কবিতা লিখেছেন, সুতরাং ফররুখ ইসলামের কবি। আর যেহেতু ইসলামের জাগরণ চেয়েছেন, তাই ইসলামি রেনেসাঁর কবি। এসব সরল সিদ্ধান্ত ইউরোপীয় কানা জ্ঞানতত্ত্বের ফল। এই ফল কেউ অগাস্ট কোত, হার্বার্ট স্পেন্সার প্রমুখের সামাজিক বিবর্তনের তত্ত্ব থেকে নিয়েছেন। কেউ নিয়েছেন মার্কসের ঐতিহাসিক বস্তুবাদ থেকে।
এরা ফররুখকে তাঁর প্রতিভা কিংবা কবিতার অন্তর্নিহিত তাৎপর্যের আলোকে, নিদেনপক্ষে নন্দনতত্ত্বের দিক থেকে দেখছেন না। দেখছেন স্রেফ ইউরোপীয় অভিজ্ঞতার অন্ধ উন্মাদনা নিয়ে। এদের বিবেচনাবোধ ফররুখ কাব্যের শিরোনামও ঠিকঠাক অতিক্রম করতে পারেনি।
ফররুখ আহমদ বাঙালি মুসলমান কবি। বিশ্বমুসলিমের অধঃপতনকালে মুসলিম জাতির জাগরণ তাঁর স্বাভাবিক আরাধ্য ছিল। যেভাবে এখনো কোনো কোনো কবি সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব কামনা করেন।
চার.
এ কথা ধরে নেওয়াটা নিতান্তই অসংগত যে, ফররুখ অধ্যাপক আবদুল খালেকের মাধ্যমে প্রচ্ছন্ন বামপন্থা থেকে ইসলামে প্রভাবিত হয়ে কবিতাগুলো রচনা করেছেন। ‘সিরাজাম মুনীরা’ কোনো প্রগল্ভ প্রেমিক বা অন্ধভক্তের সৃষ্টি নয়। এটা প্রবল মানবিক এক পরাক্রান্ত কবির নির্মিত উষ্ণ, সুপেয় ঝরনাধারা।
ফররুখ যে ক্ষণিকের আবেগে বিহ্বল হয়ে কিছু লেখেন না, কিছু করেন না—তার সাক্ষী তাঁরই এক সময়ের ঘনিষ্ঠ বন্ধু সুভাষ মুখোপাধ্যায়। তাঁর ভাষায়—‘ফররুখ যদি কোনো আদর্শ গ্রহণ করে, তা একান্ত মন থেকেই গ্রহণ করেছে, কোনো লোভ কিংবা প্রলোভনে নয়...।’
সুতরাং, এটা স্পষ্ট যে, ফররুখকে শুধু ইসলামি রেনেসাঁর কবি বলে হালকাচালে উপস্থাপন করা একটি অনুদার মানসিকতারই প্রকাশ। হয়তো কোনো বিশেষ পরিকল্পনারই ফসল। সেদিক থেকে বিবেচনা করলে কবি ফররুখকে ঠিকঠাক বুঝতে পারা আমাদের জন্য আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
ফররুখকে ইউরো-মার্কিন পুঁজিবাদসৃষ্ট নিকষ অন্ধকার ও অভিশপ্ত সভ্যতার মোকাবিলায় ‘সিরাজাম মুনীরা’ বা উজ্জ্বল আলোয় উদ্ভাসিত একটি সুবাসিত মানবিক সভ্যতার স্বপ্ন হিসেবে পাঠ করতে হবে। একইসঙ্গে সংগ্রাম, প্রেরণা ও পথরেখা হিসেবেও।
ফররুখ তাঁর কাব্যে যাদের এনেছেন, যেসব প্রতীক ও উপমার অবতারণা করেছেন, বিশেষত ‘সিরাজাম মুনীরা’তে, তাঁরা মূলত এই অমানবিক সংস্কৃতি এবং লাশের সভ্যতার বিপরীতে নতুন মানবিক সভ্যতা প্রতিষ্ঠার নায়ক এবং দিকনির্দেশক।
কবির ভাষায়—
উষর রাতের অনাবাদি মাঠে ফসল ফলাবে যারা
দিক-দিগন্তে তাদের খুঁজিয়া ফিরেছে সর্বহারা।
যাদের হাতের দোররা অশনি পড়ে জালিমের ঘাড়ে
যাদের লাঠির ধমক পৌঁছে অত্যাচারীর হাড়ে।
পাঁচ.
ফররুখ একটি অমানবিক ধারার মোকাবিলায় মানবিক সমাজের স্বপ্নবাদক। একে ঘিরেই তাঁর সাহিত্যসাধনা। ড. সুনীলকুমার মুখোপাধ্যায়ের ভাষায়—‘কবি ফররুখ আহমদ তাঁর কবিকর্মকে নেহাৎ শিল্পকর্ম বলে ভাবেননি বা জীবনসংগ্রামের একটা বড় হাতিয়ার মাত্র করে তুলতে চাননি। তিনি বিশ্বপথিক মানুষের চলার পথে একটি আদর্শের দীপবর্তিকা তুলে ধরতে চেয়েছিলেন।’
‘সিরাজাম মুনীরা’য় তিনি যাদের এনেছেন, তাঁদের আগমন নতুন সভ্যতা বিনির্মাণের দিশারি হিসেবে। তাঁর কবিতা থেকে উদাহরণ কিছু দেওয়া যাক—
‘অন্ধ রাতের তুমি নও, তুমি নও মৃত স্থবিরতার
সব আকাশের দুয়ার খুলেছ, খুলেছ সকল মনের দ্বার’
...
‘কে আসে, কে আসে নতুন সাড়া
জাগে সুষুপ্ত মৃত জনপদ, জাগে শতাব্দী-ঘুমের পাড়া’...
তারপর—
‘মূক পশুসম মার খেয়ে মরে খরিদা গোলাম-বাঁদির দল
শিশুহত্যার মৌসুমি যেন পাপে কেঁপে ওঠে জলস্থল
শরাব-শোণিতে মাতাল মানুষ মানবতাহীন নর্দমায়
পুঁজে মাথায় শুভ্র ললাটে কদর্য রুচির পশুর প্রায়’
...
‘পথে কেঁদে ফেরে এতিম শিশুরা সর্বহারার বিরাট দল
জালিমের হাতে মার খেয়ে খেয়ে বৃথা মোছে তারা নয়নজল’
...
‘তখন তোমার বিশাল হৃদয় বুঝেছে দুঃখ দীন-দুখীর’
...
‘জেনেছে বন্দী বনি আদমের দুঃখ; কোথায় ব্যথা নারীর’
...
‘সেদিন তমসা-শিখরে নুরানী জয়তুন চারা করি রোপণ
প্রোজ্জ্বল দীপ এলে সিরাজাম মুনীরা জাগায়ে অযুত মন।
মানবমুক্তি পণ নিয়ে তুমি ওঠো দুর্গম শিলা-শিখরে
প্রতি পাথরের প্রাকার পারাতে আহত তোমার রুধির ঝরে
হে বীর! সেখানে পাথরের মতো অটল তোমার পদক্ষেপ
শিলা পার হয়ে পীড়িতের বুকে ঝরনাধারার দাও প্রলেপ।’
নবী এখানে শুধু ধর্মদিশারি নন, বরং দলিতের বন্ধু, নিপীড়িতের পরম সুহৃদ। ফররুখের ইসলাম দেখার দৃষ্টি এখানে এসে প্রচলিত ধর্মবেত্তা এবং ধর্মহীনদের অতিক্রম করে। ফররুখকে বোঝার জন্য এই সূক্ষ্ম কিন্তু মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের আত্মস্থ করতে হবে এবং তা গভীর এবং আন্তরিকভাবেই।
‘অনুপ্রাণিত সে মহান আদর্শে চিত্ত যে তার সুরভি ‘লালা’
সব শ্রমিকের সঙ্গে সে সমান খলিফা মহান ফেরিওয়ালা।’
(আবুবকর সিদ্দিক)
‘...সে খলিফাতুল মুসলেমিন
সত্য, ন্যায়ের মাঠে এনেছিল
সব মানুষের মুক্ত দিন।’
…
‘উমর! তোমার বিশাল হৃদয় দেখে নিতে সাধ জাগে
কেমন করে এ জনতারে তুমি নিয়েছিলে পুরো ভাগে,
কেমন করে এ নির্যাতিতের বিরাট ভাঙা মিছিল,
সঙ্গে নিয়ে তুমি চলেছ সুদূর পথে, হে দারাজ দিল!’
...
‘দুর্ভিক্ষের দুর্দিন তুমি
কাটাও ক্ষুধিত অর্ধাহারে,
শত মুসাফিরখানার খাদিম
দাও জিন্দিগি মানবতারে।’
...
‘হে মদিনা মসজিদের খাদিম! সুমহান ঝাড়ুদার
তোমার ঝাড়ুর ঝড়ে উড়ে যায় ক্লেদ মানবাত্মার,’
(উমর দারাজ দিল)
‘...মানবের শিরদাঁড়া বেয়ে
মানবীর তনু ছেয়ে,
অতল তিমিরে সুর তুলি;
জনতার অঙ্গে মিশে ধুলি হলো কত ম্লান ধুলি।
শুধু যে রুহানি লোকে পেল তার চরম পূর্ণতা
মদিনার মুসাফির বলে যায় আজও যার কথা।
সেই সত্য,—ত্যাগের অশনি,
: ওসমান, ওসমান গণি॥'
(ওসমান গণি)
‘কেঁপে মরে তার বজ্রের রবে শঙ্কিত আজাজিল
চৌচির হয় সঙ্গদিল যত পিশাচের কালো দিল।’
...
‘এই পিশাচের পদলেহীদের অনেক ঊর্ধ্বে থেকে
মহামানবের পথ চলিবার আদর্শ গেছে রেখে...
যার বল্লম চাষ করে গেছে লাখো জালিমের খুলি
বদর আকাশে মেঘ হয়ে যার জমেছে পায়ের ধুলি,’
তারপর—
‘জানি না অত্যাচারীর এ কোন আজরাইল
তুলার মতো ওড়ে যার ডরে পাথর-দিল’
...
‘আল্লাহর কাছে করেছে সে তার পূর্ণ সমর্পণ
তাই সে মানে না অত্যাচারীর, জালিমের বন্ধন’
...
‘তার তাকবির শোনা যায়, পিছে ওঠে জনতার স্বর:
আলী হায়দর! আলী হায়দর! আসে আলী হায়দর!’
(আলী হায়দর)।
‘শহীদে কারবালা’ থেকে দেখব, ফররুখ-সত্তার বৈভব কোথা হতে কীভাবে বিনির্মিত হয় এবং সেই সত্তা কীভাবে ‘সিরাজাম মুনীরা’য় বিচ্ছুরিত হয়েছে—
‘উতারো সামান, দাঁড়াও সেনানী নির্ভীক-সিনা বাঘের মতো।
আজ এজিদের কঠিন জুলুমে হয়েছে এ প্রাণ ওষ্ঠাগত,
কওমি ঝান্ডা ঢাকা পড়ে গেছে স্বৈরাচারের কালো ছায়ায়,
পাপের নিশানি রাজার নিশান জেগে ওঠে আজ নভঃনীলায়,’
ছয়.
ফররুখের দেখার দৃষ্টি এবং সেইসঙ্গে মানবসভ্যতাকে মানবিক উৎকর্ষে উন্নীত করার আকাঙ্ক্ষা থেকে উল্লেখিত মহামানবদের উপস্থাপন ফররুখকে অনন্য করে তুলেছে। সেই অনন্যতায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে মানুষের প্রতি তাঁর নিঃসীম এবং প্রশ্নাতীত ভালোবাসা, মানুষের দুঃখে-বেদনায় জর্জরিত হওয়ার যোগ্যতা।
এ যোগ্যতার ভেতর দিয়ে যারাই পরম অদৃশ্য সত্তার সন্ধান পেয়েছেন, তাঁরা তাঁদের সমকালের সমস্ত বাধা উপেক্ষার শক্তিতে উপনীত হতে পেরেছেন। কবি ফররুখের সত্তার বিনির্মাণও সেই পরমে বিশ্বাসী অপরাজেয় মানবসত্তাসমূহের আবিষ্কারের ভেতর দিয়েই শুরু হয়েছে। মানবিক সংগ্রামের বাতিঘর আগলে রাখার প্রাণপণ প্রচেষ্টার ভেতর দিয়েই মানবতার কবি মানবতার শাহানশাহের নিকট পৌঁছেছেন। তাঁর কাছে পৌঁছার এর চেয়ে উৎকৃষ্ট পথ মানবাত্মার জানা আছে কি?
‘সিরাজাম মুনীরা’ এখানেই ইউনিক। কবিতার শেষ পঙক্তি—
‘তাদের সঙ্গে সালাম জানাই, হে মানবতার শাহানশাহ
হে নবী! সালাম: সাল্লাল্লাহু আলাইকা ইয়া রাসুলুল্লাহ।’
উক্তিসূত্র
০১. কবি ফররুখ আহমদের কী অপরাধ —প্রবন্ধ, আহমদ ছফা
০২. ফররুখ আহমদের স্বাতন্ত্র ও বৈশিষ্ট্য —মুহাম্মদ মতিউর রহমান সম্পাদিত
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

