কবিতা, প্রবন্ধ, নাটক, অনুবাদ কিংবা উপন্যাস—সাহিত্যের কোনো একটি পরিচয়ে অ্যান কারসনকে বেঁধে রাখা কঠিন। প্রাচীন গ্রিক পুরাণের চরিত্র তার লেখায় ফিরে আসে আধুনিক মানুষের প্রেম, নিঃসঙ্গতা ও আকাঙ্ক্ষার গল্প হয়ে। কখনো কবিতার ভেতর ঢুকে পড়ে গবেষণাধর্মী প্রবন্ধ, কখনো ইতিহাসের বহু পুরোনো কোনো চরিত্র কথা বলতে শুরু করে আজকের মানুষের ভাষায়। সাহিত্যের প্রতিষ্ঠিত কাঠামো ভেঙে এমন স্বতন্ত্র এক জগৎ নির্মাণ করেছেন কানাডীয় এই কবি, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক ও ধ্রুপদি সাহিত্যের গবেষক।
তার লেখায় প্রাচীন গ্রিসের জ্ঞান ও কল্পনা সমকালীন মানুষের জটিল অনুভূতির সঙ্গে মিশে যায়। তার সাহিত্য পাঠককে শুধু গল্পের ভেতরে নিয়ে যায় না, বরং গল্প বলার প্রচলিত পদ্ধতি নিয়েও নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। প্রেমের গল্প বলতে গিয়ে তিনি অনুসন্ধান করেন আকাঙ্ক্ষার প্রকৃতি, পুরাণের চরিত্র নির্মাণ করতে গিয়ে তুলে আনেন মানুষের ভঙ্গুরতা আর ব্যক্তিগত শোকের বিবরণে খুঁজে ফেরেন স্মৃতি ও সময়ের সম্পর্ক।
কারসনের সাহিত্যিক স্বাতন্ত্র্য এখানেই। তিনি প্রাচীন সাহিত্যকে শুধু অতীতের নিদর্শন হিসেবে দেখেন না। তার কাছে ধ্রুপদি সাহিত্য এমন এক জীবন্ত জগৎ, যেখানে বর্তমানের মানুষের প্রশ্ন, দ্বন্দ্ব ও অনুভূতির সঙ্গে কথোপকথন চালানো যায়। সেই কথোপকথনে কখনো হাস্যরস থাকে, কখনো তীক্ষ্ণ বুদ্ধিবৃত্তিক অনুসন্ধান, আবার কখনো এমন এক নীরব বেদনা, যা পাঠ শেষ হওয়ার পরও থেকে যায়।
প্রেমের দর্শন থেকে মানুষের আকাঙ্ক্ষার পাঠ
কারসনের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ বইগুলোর একটি ‘ইরোস দ্য বিটারসুইট : অ্যান এসে’। ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত বইটিতে প্রাচীন গ্রিক কবিতা ও দর্শনের আলোকে তিনি অনুসন্ধান করেছেন মানুষের আকাঙ্ক্ষা কীভাবে জন্ম নেয়, অনুপস্থিতি কীভাবে আকর্ষণকে তীব্র করে এবং প্রেমের সাথে অপূর্ণতার সম্পর্ক কোথায়।
প্রেমের ক্ষেত্রে মানুষ শুধু যা পেয়েছে, তার দ্বারাই পরিচালিত হয় না; যা পায়নি, যা হারিয়েছে কিংবা যা নাগালের বাইরে রয়ে গেছে, তা-ও অনুভূতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। কারসনের সাহিত্যিক অনুসন্ধানে এই অনুপস্থিতি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আকাঙ্ক্ষা তার কাছে নিছক কোনো কিছুকে পাওয়ার ইচ্ছা না; এর মধ্যে আছে দূরত্ব, অভাব, কল্পনা এবং নিজের অজানা অংশের মুখোমুখি হওয়ার অভিজ্ঞতা।
এই আলোচনার জন্য তিনি প্রাচীন গ্রিক কবি স্যাফোর কবিতাসহ ধ্রুপদি সাহিত্যের নানা উপাদান ব্যবহার করেছেন। তার গবেষণাধর্মী লেখার বৈশিষ্ট্য হলো, তাত্ত্বিক আলোচনা কখনো শুষ্ক ব্যাখ্যায় আটকে থাকে না। যুক্তি, কবিতা ও ব্যক্তিগত অনুভবের মধ্যে চলতে থাকে একধরনের আদান-প্রদান। বইটি তাকে ধ্রুপদি সাহিত্য গবেষণার পরিসরের বাইরে বৃহত্তর সাহিত্যজগতেও পরিচিত করে তোলে।
কারসনের কাছে প্রেম তাই শুধু আবেগের বিষয় নয়, চিন্তারও বিষয়। মানুষ কেন অন্য একজনের প্রতি আকৃষ্ট হয়, ভালোবাসার মধ্যে কেন অনিশ্চয়তা থাকে, বিচ্ছেদ কেন কখনো সম্পর্কের চেয়েও দীর্ঘস্থায়ী হয়ে ওঠে—এ ধরনের প্রশ্ন তার নানা রচনায় বিভিন্ন আঙ্গিকে ফিরে আসে। উত্তর দেওয়ার চেয়ে প্রশ্নটির ভেতর প্রবেশ করাই যেন তার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
এ কারণেই তার লেখায় বুদ্ধিবৃত্তিক অনুসন্ধান ও মানবিক অনুভূতি আলাদা হয়ে থাকে না। গ্রিক সাহিত্য নিয়ে গভীর জ্ঞান তার কবিতাকে গবেষণাপত্রে পরিণত করেনি; বরং সেই জ্ঞানকে ব্যবহার করে তিনি মানুষের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার নতুন ভাষা খুঁজেছেন।
‘অটোবায়োগ্রাফি অব রেড’ : পুরাণের চরিত্র যখন হয়ে ওঠে আধুনিক মানুষ
অ্যান কারসনের সাহিত্যিক পরিচয়ের কথা উঠলে যে বইটির নাম বিশেষভাবে সামনে আসে, সেটি ‘অটোবায়োগ্রাফি অব রেড’। ১৯৯৮ সালে প্রকাশিত এ গ্রন্থকে একদিকে কবিতার উপন্যাস, অন্যদিকে উপন্যাসের বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন দীর্ঘ কবিতা বলা যায়। প্রচলিত সাহিত্যিক শ্রেণিবিভাগ দিয়ে বইটিকে পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা কঠিন। আর সেই কঠিন কাজটিই বইটির অন্যতম আকর্ষণ।
বইটির ভিত্তি প্রাচীন গ্রিক কবি স্টেসিকোরাসের গেরিয়নকে নিয়ে রচিত পুরাণকাহিনি। মূল কাহিনিতে গেরিয়ন লাল ডানাওয়ালা এক দানব। হেরাক্লিসের অভিযানের অংশ হিসেবে সে নিহত হয়। প্রাচীন কাহিনিতে গেরিয়নের পরিচয় নির্ধারিত হয় তার দানবীয় সত্তা ও পরিণতির মধ্য দিয়ে। কারসন সেই পরিচয়কে নতুন করে নির্মাণ করেন।
তার রচনায় গেরিয়ন আধুনিক সময়ের এক সংবেদনশীল তরুণ। তার শরীরে লাল ডানা রয়েছে, কিন্তু তার ভেতরের জগৎ মানুষের মতোই জটিল। শৈশবের অসহায়তা, পরিবারের অভিজ্ঞতা, নিজের পরিচয় নিয়ে দ্বিধা, ভালোবাসার আকাঙ্ক্ষা এবং প্রত্যাখ্যানের বেদনা তাকে তাড়িত করে। সে ছবি তোলে, নিজের অভিজ্ঞতা ধরে রাখতে চায় এবং নিজের জীবনকে বোঝার চেষ্টা করে।
অন্যদিকে হেরাক্লিসও এখানে শুধু পুরাণের বীর নন। তিনি আধুনিক সময়ের এক আকর্ষণীয়, কিছুটা বেপরোয়া তরুণ। গেরিয়নের সঙ্গে তার সম্পর্ক তৈরি হয়, আসে প্রেম ও ঘনিষ্ঠতা। কিন্তু দুই মানুষের অনুভূতি এক রকম থাকে না। যে ভালোবাসা গেরিয়নের কাছে গভীর ও সর্বগ্রাসী, হেরাক্লিসের কাছে তা একই মাত্রায় স্থায়ী হয় না। সম্পর্কের ভেতর জন্ম নেয় অসমতা আর সেই অসমতা শেষ পর্যন্ত গেরিয়নের হৃদয়ভাঙার অভিজ্ঞতার সঙ্গে জড়িয়ে যায়।
এখানে কারসনের বড় কৃতিত্ব হলো, তিনি পুরাণের কাহিনিকে আধুনিক পোশাক পরিয়ে থেমে থাকেননি। তিনি কাহিনির আবেগগত কেন্দ্রটিই বদলে দিয়েছেন। প্রাচীন গল্পে যে চরিত্রকে দানব হিসেবে দেখা হয়, তার রচনায় সেই চরিত্রের ভেতরের মানুষটি দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। আর যে বীরকে ঘিরে পুরাণের মহিমা, তার মধ্যেও প্রকাশ পায় সম্পর্কের অনিশ্চয়তা ও ব্যক্তিগত সীমাবদ্ধতা।
গেরিয়নের লাল ডানা তার অস্বাভাবিকতার চিহ্ন হলেও সেটিই তার পরিচয়ের সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা নয়। সে ভালোবাসে, কষ্ট পায়, স্মৃতি ধরে রাখতে চায় এবং নিজের অস্তিত্বকে ভাষায় প্রকাশ করতে চায়। তার অস্বাভাবিক শরীরের আড়ালে যে মানবিক অভিজ্ঞতা রয়েছে, কারসন পাঠককে সেদিকেই তাকাতে শেখান।
এই উপন্যাসে ফটোগ্রাফির উপস্থিতিও তাৎপর্যপূর্ণ। ছবি তোলার মাধ্যমে গেরিয়ন মুহূর্তকে ধরে রাখতে চায়। কিন্তু ছবি যেমন কোনো ঘটনার সম্পূর্ণ সত্য ধারণ করতে পারে না, তেমনি স্মৃতিও জীবনের সব অভিজ্ঞতাকে অক্ষত রাখতে পারে না। প্রেমের মানুষটি চলে যেতে পারে, সম্পর্ক বদলে যেতে পারে; থেকে যায় কিছু দৃশ্য, কিছু অনুভূতি এবং সেগুলোকে বোঝার অসমাপ্ত চেষ্টা।
কারসনের রচনায় এই অসমাপ্তির মূল্য রয়েছে। জীবনকে একটি সুশৃঙ্খল কাহিনিতে পরিণত করার বদলে তিনি তার অসংলগ্নতা, ভাঙন ও অনিশ্চয়তাকে জায়গা দেন। ‘অটোবায়োগ্রাফি অব রেড’ তাই শুধু পুরাণের পুনর্লিখন নয়; পরিচয়, প্রেম, স্মৃতি ও সৃষ্টিশীলতার এক স্বতন্ত্র অনুসন্ধান।
২০১৩ সালে প্রকাশিত ‘রেড ডক’ বইয়ে তিনি গেরিয়নের গল্পে আবার ফিরে আসেন। পুরোনো চরিত্রকে নতুন রূপে ফিরিয়ে আনার মধ্য দিয়ে কারসন দেখিয়েছেন, কোনো গল্প একবার বলা হয়ে গেলেই তার সম্ভাবনা শেষ হয়ে যায় না। সময়ের পরিবর্তনে একই চরিত্র ও অভিজ্ঞতার ভেতর নতুন অর্থ আবিষ্কার করা সম্ভব।
কবিতা, প্রবন্ধ ও নাটকের সীমানা ভাঙার শিল্প
অ্যান কারসনের সাহিত্যকর্মের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো, তিনি বিভিন্ন ঘরানার মধ্যে অনায়াসে চলাচল করেন। তার কোনো বইয়ে কবিতা ও প্রবন্ধ পাশাপাশি থাকে, কোথাও নাটকের সংলাপের সঙ্গে মিশে যায় দার্শনিক আলোচনা। আবার কোনো রচনায় প্রাচীন গ্রিক সাহিত্যের অনুবাদই হয়ে ওঠে নতুন সাহিত্য সৃষ্টির ভিত্তি।
‘গ্লাস, আয়রনি অ্যান্ড গড’, ‘প্লেইনওয়াটার’, ‘মেন ইন দ্য অব আওয়ার্স’ এবং ‘ডিক্রিয়েশন’ তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে। এসব বইয়ে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, সাহিত্যসমালোচনা, ইতিহাস, দর্শন ও কবিতার নানা উপাদান একসঙ্গে কাজ করে। ‘মেন ইন দ্য অব আওয়ার্স’ গ্রন্থে কবিতা, স্মৃতিচারণ, প্রেমের কবিতা ও অন্যান্য আঙ্গিকের পাশাপাশি সময়, জীবন ও মৃত্যুর প্রশ্নও উঠে এসেছে। বইটি গ্রিফিন পোয়েট্রি প্রাইজ লাভ করে।
কারসনের কাছে সাহিত্যিক আঙ্গিক কোনো স্থির নিয়মের বিষয় নয়। একটি অভিজ্ঞতা যে ধরনের ভাষা ও কাঠামো দাবি করে, তিনি সেই অনুযায়ী লেখার রূপ নির্মাণ করেন। ফলে তার রচনায় প্রচলিত কবিতার ছন্দের বদলে কখনো দেখা যায় গদ্যের মতো বাক্যবিন্যাস, আবার প্রবন্ধের যুক্তি হঠাৎ ভেঙে প্রবেশ করে কাব্যিক কোনো দৃশ্য।
এই পদ্ধতি পাঠকের কাছে বাড়তি মনোযোগ দাবি করে। তার লেখা পড়তে গিয়ে কাহিনির পরিণতি জানার পাশাপাশি বাক্য কীভাবে নির্মিত হচ্ছে, একটি উদ্ধৃতি কেন ব্যবহৃত হয়েছে কিংবা কোনো দৃশ্য হঠাৎ অন্য প্রসঙ্গে চলে গেল কেন—এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
তার সাহিত্যকে দুর্বোধ্য বলে মনে হওয়ার একটি কারণও এটি। প্রচলিত উপন্যাসে পাঠক সাধারণত চরিত্র, ঘটনা ও পরিণতির ধারাবাহিকতা অনুসরণ করেন। কারসনের রচনায় সেই ধারাবাহিকতা কখনো ভেঙে যায়। পাঠককে নিজেকেই বিভিন্ন অংশের মধ্যে সম্পর্ক তৈরি করতে হয়। তবে এই ভাঙন নিছক চমক সৃষ্টির কৌশল নয়; মানুষের স্মৃতি, অনুভূতি ও চিন্তা যেভাবে সরল পথে চলে না, তার সাহিত্যিক কাঠামোও সেই জটিলতাকে ধারণ করে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

