অগুনতি চড়াই-উতরাই পেরিয়ে খুন-গুম ও অবর্ণনীয় রাজনৈতিক হয়রানির পর ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী অভূতপূর্ব বিপ্লবের মাধ্যমে শেখ হাসিনার সরকারকে হটিয়ে বাংলাদেশ এখন নতুন এক অধ্যায়ের মুখোমুখি। বৈষম্যে ভরা অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় ধরে চলে আসা অরাজকময় পরিস্থিতি থেকে আপাতত উত্তরণের পর নতুন বাংলাদেশকে নিয়ে গণমানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা পাহাড়সম। সেই সঙ্গে বহির্বিশ্বও আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছে বিপ্লবোত্তর বাংলাদেশ কোন পথে যায়।
মূলত ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে চারদলীয় জোট সরকারের ক্ষমতা হস্তান্তরের দিন আওয়ামী লীগ জোট লগি-বইঠা দিয়ে রাজধানীতে তাণ্ডব চালিয়ে কয়েকজনকে পিটিয়ে হত্যা করে। পরিকল্পিত এই পটভূমি তৈরির পর ২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দেশি-বিদেশি মহলের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ যোগসাজশে একটি দলকে ক্ষমতায় আরোহণের সুযোগ করে দেওয়ার মাধ্যমে দেশে সংকটের শুরু ও স্বৈরাচারের উত্থান ঘটে। কেউ কেউ বলেন, সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা শুরু হয় বিদেশি ছত্রছায়ায় ২১ আগস্ট, ২০০৪-এ গ্রেনেড হামলা নামক ফলস ফ্ল্যাগ অপারেশনের মাধ্যমে।
অনেকেই মনে করেন, ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় আনার মাধ্যমে নতুন সরকারের সমর্থনে ও বিদেশি কূটচালে বিডিআর বিদ্রোহের নামে ২০০৯ সালে ৫৭ জন চৌকস সেনা কর্মকর্তা হত্যা করা হয়। এরপর জুডিশিয়াল কিলিংয়ের মাধ্যমে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের ফাঁসি দেওয়ার মূল উদ্দেশ্য ছিল স্বৈরাচারের গদি পাকাপোক্ত করা। সেই সঙ্গে প্রতিবেশী দেশের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার পথ সুগম করা। কাঙ্ক্ষিত সফলতাও পায় তারা পরবর্তী ২০১৪ সালের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে। বিরোধী দলগুলো নির্বাচন বয়কট করায় ১৫৩টি আসনে কোনো নির্বাচন হয়নি, তবু সরকারদলীয় প্রার্থীদের নির্বাচিত ঘোষণা করা হয় এবং আওয়ামী লীগ আবার সরকার গঠন করে। বিরোধী দলের আন্দোলন দমন ও ক্ষমতার মসনদ মজবুত করার জন্য সরকার গুম-খুন-জেল-নির্যাতনসহ প্রশাসন দলীয়করণ করে।
শত শত সরকারি চাকরিতে কোটা পদ্ধতির মাধ্যমে নিজদলীয় লোকজন নিয়োগ দেওয়া হয়। সব সেক্টরে দুর্নীতি দেশকে চরমভাবে গ্রাস করে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা কোটা সংস্কারের আন্দোলনে নামেন। এ আন্দোলন দেশব্যাপী ব্যাপক সাড়া ফেলে। পুলিশ ও ছাত্রলীগের হামলা-মামলা ও গ্রেপ্তারসহ ব্যাপক নিপীড়ন সত্ত্বেও ছাত্ররা আন্দোলন অব্যাহত রাখেন। একপর্যায়ে সরকার বাধ্য হয়ে দাবি মেনে নেয় ও কোটাপ্রথা বাতিলে সম্মত হয় এবং ৪ অক্টোবর সরকার এ-সংক্রান্ত পরিপত্র জারি করে। ২০১৮ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৮ জুলাই পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদের এই কোটা বাতিলের আন্দোলনের মশাল যে আলোকিত করে রেখেছে তাদের নিজ অনুজদের, এ কথা হয়তো তারা নিজেরাই জানতেন না।
একই বছরের জুলাই মাসে ঢাকার সড়কে দুটি যাত্রীবাহী বাসের প্রতিযোগিতার মাঝে চাপা পড়ে দুজন শিক্ষার্থী নিহতের ঘটনায় বিক্ষোভে নামে এবার স্কুলশিক্ষার্থীরা। সেই বিক্ষোভ একপর্যায়ে পরিণত হয় দেশব্যাপী সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার এক অভূতপূর্ব জাতীয় আন্দোলনে। কোমলমতি স্কুলছাত্রদের নিরীহ এ আন্দোলন দমাতেও সরকার পুলিশ, ছাত্রলীগ ও পরিবহন শ্রমিকদের লেলিয়ে দিয়েছিল এবং তারা সশস্ত্র তাণ্ডব চালায়। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিরা আন্দোলনকারীদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেন এবং ছাত্র-ছাত্রীদের ওপর সরকারের দমন-পীড়ন দেশ-বিদেশে তীব্রভাবে নিন্দিত হয়। বাধ্য হয়ে ৬ আগস্ট তৎকালীন মন্ত্রিসভা একটি খসড়া ট্রাফিক আইন অনুমোদন করে। ২৯ জুলাই থেকে ৮ আগস্ট ২০১৮Ñএই ১১ দিনের আন্দোলন প্রথমবারের মতো ছাত্র-যুবাদের মননে পরিবর্তনের বীজ রোপণ করে। তারা এই প্রথম দেশের জুলুমবাজ স্বৈরশাসকের কার্যকলাপ স্বচক্ষে অবলোকন করেন ও প্রতিহিংসার শিকার হন।
২০১৮ সালের ডিসেম্বরে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজন করে সরকার। জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে এ কথা সর্বমহলে স্বীকৃতি পায় যে, সরকারদলীয় কর্মীরা প্রশাসনের সহযোগিতায় নির্বাচনের পূর্ববর্তী রাতে ব্যালটে সিল দিয়ে বক্স ভর্তি করে রাখে। দেশজুড়ে প্রতিবাদ বিক্ষোভ ও বিশ্বজুড়ে এই ভোটচুরির নিন্দার পরও আওয়ামী লীগ আবার সরকার গঠন করে। এরপর আসে ২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নির্বাচনী পরিবেশ না থাকায় বিরোধী দল বর্জনের ডাক দিলে একতরফা নির্বাচন আয়োজন করে সরকার। নিজ দলের ডামি প্রার্থীদের দাঁড় করিয়ে তারা কোনো রকমে নির্বাচনী বৈতরণি পার হয়।
এরই মধ্যে পরিবারতন্ত্র, অপশাসন, দুর্নীতি, দলবাজি ও দলীয় নিয়োগ, মানবাধিকার পরিস্থিতি ও আইনশৃঙ্খলার অবনতি, আদালতের ওপর নিয়ন্ত্রণ, গণমাধ্যমের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ, মানুষের কণ্ঠরোধ, ব্যাংক দখল ও অর্থ পাচার, গুম-খুন-নির্যাতন-গণগ্রেপ্তারসহ নানা বিশৃঙ্খলায় নৈরাজ্য সর্বকালের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যায়। মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের পরিসংখ্যানে (২৩ আগস্ট ২০২৪) দেখা যায়, আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের শাসনামলে দেশে ২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন ২ হাজার ৬৯৯ জন। এ সময় গুম হন ৬৭৭ জন, কারাগারে মারা যান ১ হাজার ৪৮ জন।
একই সময়ে অবৈধভাবে বিদেশে পাচার হয়েছে ২৩ হাজার ৪০০ কোটি ডলার। বর্তমান বাজারদরে এর পরিমাণ ২৮ লাখ কোটি টাকা। এই হিসাবে প্রতিবছর গড়ে ১ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, আর্থিক খাতের কর্তা ব্যক্তিরা, আমলা ও মধ্যস্বত্বভোগীরা বিপুল অঙ্কের এই অর্থ পাচার করেছেন।
২০২৪ সালের ৫ জুন একটি আপিলের রায়ে হাইকোর্ট ২০১৮ সালের ৪ অক্টোবর সরকারের জারি করা কোটা সংস্কার-সংক্রান্ত পরিপত্র অবৈধ ঘোষণা করে। এই সংবাদে ছাত্ররা বুঝে যায়, সরকারি সবুজসংকেত ছাড়া এ সিদ্ধান্ত হয়নি। তৎক্ষণাৎ কোটা সংস্কার আন্দোলন আবার নতুনভাবে শুরু হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে এই মুভমেন্ট ধাপে ধাপে জুলাইজুড়ে চলতে থাকে। দেশব্যাপী শিক্ষার্থীদের মধ্যে এ আন্দোলন সাড়া জাগায়।
আন্দোলন দমন করতে ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সারাদেশে ছাত্রদের সমাবেশে ছাত্রলীগ ও পুলিশ যৌথভাবে হামলা করে, ছাত্রদের হল ও ক্যাম্পাস থেকে বের করে দেয়। সেই সঙ্গে সরকারি নেতানেত্রীদের হুমকি-ধমকি-তাচ্ছিল্য চলতে থাকে ছাত্রদের লক্ষ্য করে। অভিযোগ আছে, ওইদিন রাতের বেলা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হলে অবস্থানরত সাধারণ ছাত্রীরা নির্যাতনের শিকার হন। এ ঘটনার পর সারাদেশের শিক্ষাঙ্গনগুলোয় বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। ১৫ জুলাই দেশব্যাপী হামলা-গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন পরের দিন ১৬ জুলাই সারাদেশে প্রতিবাদ-বিক্ষোভের ডাক দেয়। পুলিশ ও দলীয় কর্মীরা হামলা চালায় নিরস্ত্র ছাত্র-ছাত্রীদের ওপর। পুলিশের গুলিতে এদিন রংপুরে আবু সাঈদ, চট্টগ্রামে ফয়সাল শান্ত, ওয়াসিমসহ সারাদেশে ছয়জন শহীদ হন। আবু সাঈদকে পুলিশ সরাসরি গুলি করে হত্যার ভিডিও ক্লিপ মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বে।
ছাত্রদের ওপর সরকার ও তার লেলিয়ে দেওয়া বাহিনীর এমন জুলুম-অত্যাচার মেনে নিতে পারেনি জনগণ। ছাত্রদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে রাজপথে দাঁড়িয়ে যান সব শ্রেণিপেশার মানুষ। শুরু হয় প্রবল গণ-আন্দোলন। এভাবেই রচিত হলো অবিস্মরণীয় জুলাই আন্দোলনের ভিত ও বিপ্লবের পদযাত্রা।
লেখক : মেরিন সার্ভেয়ার ও কনসালট্যান্ট, প্রকাশক, সংগঠক
Email: sakhawat.komol29th@gmail.com
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

