আওয়ামী ফ্যাসিবাদ দাঁড়িয়েছিল লেট লুজ বা লেলিয়ে দেওয়ার ওপর। কতটা ঘৃণ্য ছিল পিতা শেখ মুজিব ও কন্যা শেখ হাসিনার কুশাসন! মুজিব তার কুশাসনের গোড়া থেকেই ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠায় এগোয়। ১৯৭২ সালের ২১ থেকে ২৩ জুলাই ঢাকায় মুজিববাদী গুণ্ডা ছাত্রলীগের সম্মেলনে স্বয়ং মুজিব স্বদম্ভে ঘোষণা দিয়েছিলেন, ‘আজ এরা লম্বা লম্বা কথা বলছে। আমি জাতির পিতা হইয়া খাইছি, নাইলে (আস্তিন গুটাতে গুটাতে) দেখিয়ে দিতাম এসব হাংকিপাংকি কীভাবে ঠাণ্ডা করে দিতে হয়। আমার তা ভালোই জানা আছে।’ ‘সাপ্তাহিক হক কথা’, ২৮ জুলাই, ১৯৭২, শুক্রবার দ্রষ্টব্য। এ থেকেই মুজিবের ফ্যাসিবাদী চরিত্র ও আত্মম্ভরিতা লক্ষণীয়। অথচ মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় দুই মানবরূপী শ্বাপদ বাদে মুজিবকে গুষ্টিসুদ্ধ শেষ হতে হয়েছিল।
মুজিব বলেছিলেন, ‘লাল ঘোড়া দাবড়ায়া দিমু।’ তার ভয়াবহ অসভ্য ও কুখ্যাত উক্তি ছিল—‘নকশাল দেখা মাত্রই গুলি।’ শেখ মুজিবের মতো তার কন্যা খুনি হাসিনারও নির্দেশ ছিল (তার ব্যাখ্যা অনুযায়ী) ইসলামি জঙ্গি, মৌলবাদী দেখা বা ধরামাত্রই পাকড়াও, গুলি, গুম, খুন ও ক্রসফায়ার করতে হবে। বাপ আর বেটির মধ্যে মানসিক বিকৃতির অত্যধিক সাদৃশ্য ছিল! ফ্যাসিস্ট হাসিনা বিরোধীদের রাস্তায় ধরে ‘আদর-আপ্যায়ন’ করতে, অর্থাৎ পেটাতে, দিগম্বর করতে, দাড়ি-টুপি, জোব্বা-কোর্তা ও পায়জামা-পাঞ্জাবি পরিহিতদের অপমান করতে, বিরোধীদের মোবাইল চেক করতে ও পিটিয়ে পুলিশে দিতে, বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোর ছাত্রাবাসে টর্চার সেল বানাতে, হাত পুড়িয়ে দিতে এবং শরীর পুড়িয়ে ফেলতে বলতেন। তিনি বলতেন তার লুচ্চা-গুণ্ডা আওয়ামী সাঙাতদের—‘একটা লাশ পড়লে ১০টা লাশ ফেলে দিবি; না হলে ঘরে চুড়ি পড়ে বসে থাকতে হবে।’ এখন এই খুনি হাসিনা ভারতে পালিয়ে গেছেন। এভাবে পিতা ও কন্যা কেবল ফ্যাসিস্টই ছিলেন না, তারা উভয়ই ছিলেন ভয়ানক রক্তপিপাসু ড্রাকুলা।
এভাবে পিতা ও কন্যা উভয়ের ফ্যাসিবাদী শাসনামলে ভিন্নমতের, বিরোধীদের, সম্ভাব্য ও কল্পিত শত্রুদের, হিংসা ও ক্রোধের জালে আটকে পড়া মানুষদের, প্রতিবাদীদের, ভারতীয় হিন্দুত্ববাদী আধিপত্যবাদের বিরোধিতাকারীদের, অবাধ্য ও পোষ না মানা জ্ঞানীদের, দ্বীনি আলেমদের এবং সমালোচক ও লেখকদের বিরুদ্ধে দলীয় ষণ্ডা-গুণ্ডা, খুনি-সন্ত্রাসী, পুলিশ, প্রশাসন, আদালত, হামলা-মামলা, দখল-ধর্ষণ লেলিয়ে দেওয়া হয়েছে। বর্তমান লেখক শেখ মুজিব আমলে, শেখ হাসিনার প্রথম শাসনামলে এবং শেষ ১৬ বছরে বারংবার ফেরারি রাত, ফেরারি দিন কাটিয়েছেন কেবল তার লেখার কারণে। আওয়ামী ফ্যাসিবাদের রাষ্ট্র হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে ‘আওয়ামী লীগ ও বাকশাল ১৯৭২-৭৫’ বইটি এবং ‘না’ বইটি লেখার কারণে কী ভয়ানক সময় গেছে দুবার। পুলিশ, হোয়াইট হাউস, টিকটিকি ও ডিজিএফআই লেগেছিল পেছনে কত দীর্ঘকাল ধরে। পিস্তল ঠেকানো হয়েছে মাথায়।
গবেষণার মাধ্যমে জিয়াকে স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে শতাধিক সূত্র দ্বারা প্রমাণ করায় রাজনৈতিক মামলা হয়েছে আমার বিরুদ্ধে। পালিয়ে থাকতে হয়েছে। হুলিয়া জারি হয়েছে। বারংবার হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছে টেলিফোনে। মার খেতে হয়েছে প্রচণ্ডভাবে। দুবার দুবছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাজনৈতিক কারণে ফোর্সড লিভ দিয়ে বের করে দেওয়া হয়েছে। স্ত্রীকে তারা বারংবার পানিশমেন্ট ট্রান্সফার করেছে। চিকিৎসক সন্তানকে মেরেছে। কয়েক দফা বদলির শাস্তি দিয়েছে। ২০২৩-২৪ সালে শুধুই টেলিফোন হুমকির মুখে পালিয়ে থাকতে হয়েছে বাসস্থান ছেড়ে কয়েক মাইল দূরে স্ত্রীসহ তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তে। খুব কষ্ট হয়েছে সরে পড়তে, নিরাপদে বাসা জোগাড় করতে। কাউকে বলতেও পারা যায়নি। সাগরপারের অতি গোপনীয় লেখনী-যোগাযোগসমূহ তথা ‘ক্রিটিকাল নোটস’ আজ কেবলই স্মৃতি।
রাতের পর রাত, দিনের পর দিন গোপন মুভমেন্টগুলো ভুলতে পারবেন না এই লেখক তার মৃত্যু অবধি। এজন্য ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের মতো ২০২৪ সালের ৫ আগস্টেও মুক্তির নিঃশ্বাস ছাড়তে পারায় দুই রাকাত নফল সলাহ্ আদায় করেছিলেন বর্তমান লেখক। একসময় কারফিউয়ের মধ্যেও বিভিন্ন স্থানে যাতায়াতের রুদ্ধশ্বাস অভিজ্ঞতা থেকে মুক্তি পাওয়া গেছে ৫ আগস্ট। তার স্মৃতিতে গভীর রাত অবধি গোপন কাজ করা স্থানগুলো—যেমন টঙ্গী, উত্তরা, শ্যামলী, পল্টন, মিরপুর, শাহজাহানপুর, গুলশান, বনানী, নীলক্ষেত, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বনশ্রীতে কাটানো বিপজ্জনক সময় ছিল সেসব রাত-দিন। অথচ সেই সময় আর দিনগুলো আজকের দিনকে নির্মাণে অনেক বেশি সাহায্য করেছে। মনে পড়ে ১৯৯৬ থেকে ১৯৯৭ সালের তিনটি ডকুমেন্ট, ২০১৩ সালের দুটি ডকুমেন্ট ও ২০১৭ থেকে ২০২৩ সালে রচিত ২০টি ডকুমেন্টের গভীর শ্রম, স্বেদ ও উৎকণ্ঠার কথা। শেষের সবকটিই ছিল আওয়ামী ফ্যাসিস্ট উৎখাত এবং নতুন রাষ্ট্র বন্দোবস্ত, গঠন ও নির্মাণ-সম্পর্কিত পরস্পর সংযুক্ত ওয়ান পয়েন্ট চার্টার অব সোশ্যাল কন্ট্রাক্ট। এগুলো পৌঁছানো হয়েছে আন্দোলনরত বিভিন্ন বিরোধী দলের অন্তত ৫০ কেন্দ্রীয় রাজনীতিবিদের কাছে।
দুঃসহ সময়টিতে বহুবার সাবেক ছাত্র এসি রফিকের সাহচর্য পাওয়া গেছে। সে সময় এক বনি আদম সিজেডএইচ বঙ্গোপসাগর বদ্বীপ থেকে কয়েক হাজার মাইল দূরের টিআর, এএম-কে এই দুই সুহৃদকে সংযুক্ত করেছে। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত দিনের পর দিন ছিল ভয়তাল, লগি-বৈঠা, হোগলা-মাদুর সন্ত্রাসীদের রাজত্ব হাসিনার লেট লুজ করা ফ্যাসিবাদের কারণে। এর বিরুদ্ধে ছিল প্রকাশ্য ও লুক্কায়িত লেখনীর, মতবিনিময় ও সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের এবং জনমত গঠনের জন্য এক নিরন্তর সুদীর্ঘ জিহাদ। অসাধারণ এক সৃজনশীল কাজের পাশাপাশি ওই এক ভবন ছাড়িয়ে অ্যাডভান্স পার্টি হিসেবে সারা বাংলাদেশ তখন চষা হয়ে গিয়েছিল। পাঁচ-সাত মিনিটের বক্তৃতা দেশের সব প্রান্তে লাখো মানুষের সামনে দেওয়ার অদ্ভুত অনুভূতি শুধু অন্তরেই থাক। আর ২০২৪ সালে তো অন্যরকম সফর।
এভাবে এদেশের জনগণকে লড়তে হয়েছে লাল বাহিনী, লাল ঘোড়া, মুজিব বাহিনী, রক্ষী বাহিনী আর আওয়ামী গুণ্ডা-মাস্তানদের বিরুদ্ধে। যাদের লেলিয়ে দিয়েছে এককালে পাষণ্ড পিতা, পরের কালে বিশ্ব হারামি কন্যা। এভাবেই শহীদুল্লাহ কায়সার ও জহির রায়হানের গুমের নালিশ করতে গিয়ে তাদের বোন নাফিসা নিরুপায়, অপদস্থ ও হুমকির শিকার হয়েছিলেন ফ্যাসিস্ট শেখ মুজিব কর্তৃক। এভাবেই ৪০ হাজার বিরোধী জীবন দিয়েছিলেন। লাখে লাখে মরেছিলেন ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষে। সেসব লাশ ঢাকার রাস্তায়ও পড়েছিল সর্বত্র। এদিকে বর্তমান লেখক ১৯৭৩ সালের সাধারণ নির্বাচনে ‘হাঁসের পাহাড়ায় শেয়াল’ গাজী গোলাম মোস্তফার বিরুদ্ধপক্ষকে ভোট দিতে গিয়ে গাজীর গুণ্ডাদের দ্বারা আক্রান্ত হয়েছিলেন। তার ভোট ইতোমধ্যে দেওয়ার কাজ সেরে ফেলেছেন মুজিববাদী গুণ্ডারা। তার তৎকালীন ছাত্রাবস্থার লেখালেখির কারণে যে বাকশালী ষণ্ডাটি ১৯৭৫ সালে তাকে শাসিয়েছিলেন ‘তোকে মেরে ফেলা হবে,’ এখন সেই ষণ্ডা কোন গর্তে ঢুকেছে? এজন্য ১৫ আগস্ট ভোরে পাওয়া গিয়েছিল মুক্তির স্বাদ। আল হামদুলিল্লাহ্।
একইভাবে শেষ ১৫ বছরে খুনি হাসিনা ও তার ফ্যাসিবাদ দ্বারা লেট লুজ করা বা লেলিয়ে দেওয়া ষণ্ডা-গুণ্ডা-খুনিদের, ছাত্রলীগের সোনার ছেলেদের এবং তার পোষা কুকুর ঠোলা বাহিনীর মামলা-হামলা সহ্য করতে হয়েছে দেশবাসীকে ক্রীতদাস হিসেবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো, গ্রামগুলো ও নগর-জনপদগুলো হয়ে উঠেছিল দুর্বৃত্তদের, দখলবাজদের, লুটেরাদের ও লেলিয়ে দেওয়া দলদাস সন্ত্রাসী ধর্ষকদের অভয়ারণ্য। এছাড়া অসংখ্য লেট লুজ দৃষ্টান্তের মধ্যে ২০০৬ সালের লগি-বৈঠার তাণ্ডব, কয়েকজনকে হত্যা এবং হিন্দুত্ববাদী বাপ্পাদিত্য বসু নামক পশু কর্তৃক লাশের ওপর উন্মাদ নৃত্যও ঘটেছে ফ্যাসিস্ট আওয়ামীদের দ্বারা।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় আলেমদের হত্যাকাণ্ড, কসাই মোদির আগমনের প্রতিবাদকারী আলেমদের বিরুদ্ধে হায়নাদের ঝাঁপিয়ে পড়া ও ১৭ জন হত্যা, বিডিআর হত্যাকাণ্ড ও ৫৭ অফিসারের নৃশংস হত্যা, কিবরিয়া হত্যাকাণ্ড, ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার প্রকৃত মাস্টারমাইন্ডের সঙ্গে যুক্ত হয়ে বিশ্ব হারামি নটরানির নিজের পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড ও শাপলা চত্বরে হেফাজতের গণহত্যা এখন ইতিহাস। ২০২৪ সালের লেট লুজ করা পুলিশ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের সঙ্গে আনসার, বিজিবি, র্যাব, মিলিটারি, ভারতীয় ‘র’-এর আগত ও ধরা পড়া খুনি বাহিনী, স্নাইপারদের অ্যাটাক ও হেলিকপ্টার থেকে গুলি করে হত্যাকাণ্ড লেট লুজ বা লেলিয়ে দেওয়ার নিকৃষ্টতম প্রমাণ। বাপের মতো বেটিও যাকেই-যাদেরকেই হুমকি বা শত্রু মনে করতেন, কিংবা তাদের নিজেদের হিংসা-অনলের কারণ মনে করতেন, তাদেরই লেলিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়ায় হামলা-মামলা, জেল-জুলুম, দখল-ধর্ষণ, গুম-হাপিশ কিংবা হত্যার মাধ্যমে দুনিয়া থেকে নিকেশ করে দিতেন।
ইলিয়াস আলী, চৌধুরী আলম, আবরার ফাহাদসহ দেশের কয়েক হাজার বিরোধীকে হত্যাকাণ্ড এর জ্বলন্ত উদাহরণ। হাসিনার ফ্যাসিবাদী লেট লুজ করার আরো ভয়ংকর কিছু নমুনা ছিল—নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে ছাত্রলীগের হেলমেট, হাতুড়ি, লাঠি, চাপাতি বাহিনীর হামলা, কোটাবিরোধী আন্দোলনে ছাত্রলীগের অস্ত্রধারী বাহিনীর হামলা, ছাত্রলীগের সোনার ছেলেদের ধর্ষণের সেঞ্চুরি উৎসব পালন করা এবং আয়নাঘরের ভয়ংকর যাতনা ও বর্বরতা।
এভাবেই ফ্যাসিবাদ বাংলাদেশে দীর্ঘকাল টিকে থেকেছে। কিন্তু যখনই এদেশে ছাত্র-জনতা মৃত্যুভয় অতিক্রম করে দানবীয় খুনি হাসিনাসহ খুনি সব বাহিনীকে মোকাবিলা করেছে, পাল্টা প্রতিহত করেছে, তখনই পরাজয় বরণ করেছে ফ্যাসিবাদী বাহিনী আর পালিয়েছে ফ্যাসিস্ট হাসিনা। এবার নতুন সময়ে, নতুন দেশে, নতুন পরিস্থিতিতে আমরা আর কোনো ফ্যাসিস্টকে দেখতে চাই না এবং সবচেয়ে বেশি করে চাই ফ্যাসিবাদী মানসিকতার অবসান। আমলাতন্ত্র, পুলিশ, র্যাব, গণমাধ্যম, সামরিক বাহিনী, ব্যবসায়ী গোষ্ঠী, বাজার ব্যবস্থাপক, সরকার ও প্রশাসনসহ সব দল, নেতা, অনুসারীদের সব কথায়, কাজে ও আচরণে ফ্যাসিবাদী মনোবৃত্তির কবর রচনা করতে হবে।
লেখক : প্রফেসর (অব) রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

