জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রদত্ত প্রথম ভাষণটি শুধু একজন রাষ্ট্রনায়কের প্রথাগত কূটনৈতিক বক্তব্য নয়, বরং এটি দীর্ঘ দেড় দশকের ফ্যাসিবাদের অন্ধকার কাটিয়ে উঠে দাঁড়ানো একটি স্বাধীন, সার্বভৌম ও স্বাবলম্বী বাংলাদেশের নতুন আত্মপ্রকাশের দলিল। নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘের বিশ্বমঞ্চে দাঁড়িয়ে বাংলায় প্রদত্ত এই ভাষণ একদিকে যেমন বাঙালি জাতির গৌরবোজ্জ্বল মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত করেছে, অন্যদিকে চার দশক পর সাধারণ পরিষদের সভাপতিত্বের আসনে বাংলাদেশের আসীন থাকা, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে দেশের বলিষ্ঠ উপস্থিতির প্রমাণ দেয়।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে এই ভাষণের একটি বিশেষ ঐতিহাসিক ও মনস্তাত্ত্বিক তাৎপর্য রয়েছে। এটি একটি পারিবারিক ও জাতীয় রাজনীতির বিরল তিন প্রজন্মের ইতিহাসকে স্পর্শ করেছে। এর আগে এই সর্বোচ্চ বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের মানুষের অধিকার ও সার্বভৌমত্বের কথা তুলে ধরেছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশ বিনির্মাণের রূপকার শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং পরে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া; আজ তাদেরই উত্তরসূরি হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের মানুষের আস্থা ও শান্তিময় বিশ্বের প্রত্যাশা নিয়ে বিশ্বমঞ্চে কথা বলেছেন। ভাষণের সূচনায় তিনি একাত্তরের মহান স্বাধীনতা সংগ্রামের শহীদদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানানোর পাশাপাশি ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ফ্যাসিবাদবিরোধী ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের সব বীর শহীদ ও আহতদের অকৃত্রিম আত্মত্যাগকে স্মরণে এনে জাতীয় সংহতির এক অনন্য নজির স্থাপন করেছেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক আন্দোলন ও চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ জাতীয় নির্বাচনে জনগণের প্রাপ্ত ভোটাধিকার এবং বিএনপি সরকারের রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণকে তিনি বিশ্ব দরবারে তুলে ধরেছেন গণতন্ত্র ও ‘জনগণই ক্ষমতার উৎস’—এই চিরন্তন সত্যকে নতুন করে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করেছেন।
একজন রাজনৈতিক বিশ্লেষক হিসেবে বিগত দেড় যুগের স্বৈরাচারী ও ফ্যাসিবাদী শাসনের পর্যালোচনা না করলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উত্থাপিত রূপরেখার গভীরতা উপলব্ধি করা অসম্ভব। গত দেড় দশকে বাংলাদেশে যে শাসনব্যবস্থা কায়েম ছিল, তা মূলগতভাবে রাষ্ট্রযন্ত্রের নৈতিক ও অর্থনৈতিক ভিত্তিকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিয়েছিল। ফ্যাসিবাদী শাসনামলে গুম, খুন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, অপহরণ, বিরোধী মত দমন, অবারিত দুর্নীতি, মেগা-প্রকল্পের নামে অবাধ লুটপাট এবং দেশ থেকে বিপুল অঙ্কের টাকা পাচার নিত্যদিনের স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হয়েছিল।
আইনের শাসন ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেশকে মূলত একটি তলাবিহীন ঝুড়ির দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল, যেখানে রাষ্ট্রের নাগরিকরা নিজ ভূমিতেই অধিকারহীন ও ক্ষমতাহীন হয়ে পড়েছিল। ব্যাংক-বীমা, আর্থিক খাত ও অবকাঠামো ক্ষেত্রগুলো পরিকল্পিত লুটপাটের শিকার হয়ে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই ক্ষতবিক্ষত, ধসে পড়া এবং ধ্বংসপ্রাপ্ত রাষ্ট্রকাঠামোকে পুনর্গঠন করাই ছিল ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী নতুন সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ।
জাতিসংঘে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশকে মেরামতের যে মাস্টারপ্ল্যান তুলে ধরেছেন, তার মূল ভিত্তি হলো ‘থ্রি-আর’ কৌশল—রিকভারি (পুনরুদ্ধার), রেস্টোরেশন (পুনর্বহাল) এবং রিকনস্ট্রাকশন (পুনর্গঠন)। এই তিনটি শব্দ শুধু তিনটি প্রশাসনিক পদক্ষেপ নয়, বরং এটি একটি বিধ্বস্ত রাষ্ট্রকে পুনরুজ্জীবিত করার বৈজ্ঞানিক ও সুনির্দিষ্ট রাষ্ট্রদর্শন।
ফ্যাসিবাদী শাসনে দেউলিয়া ও ধ্বংসপ্রাপ্ত অর্থনৈতিক, প্রশাসনিক এবং বিচারিক কাঠামোকে অভিশপ্ত অবস্থা থেকে বের করে আনাই হলো রিকভারির মূল লক্ষ্য। বিগত সরকারের লুটপাট ও টাকা পাচারের ফলে সৃষ্ট অর্থনৈতিক স্থবিরতা, মূল্যস্ফীতি এবং আর্থিক খাতের চরম বিশৃঙ্খলা থেকে জাতীয় অর্থনীতিকে দ্রুত উদ্ধার করা এই ধাপের প্রাথমিক অগ্রাধিকার।
আইনের শাসন, ভোটাধিকার, মানবাধিকার, বাকস্বাধীনতা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মৌলিক নীতি ও সক্ষমতা পুনর্বহাল করাই হলো রেস্টোরেশনের মূল সারবত্তা। রাষ্ট্রের নাগরিকদের ক্ষমতাহীন রেখে রাষ্ট্র কখনোই শক্তিশালী হতে পারে না—এই দর্শনে উদ্বুদ্ধ হয়ে জনগণের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার মাধ্যমে রাষ্ট্রযন্ত্রের হারানো ভারসাম্য ফিরিয়ে আনাই এই ধাপের লক্ষ্য।
ধ্বংসপ্রাপ্ত অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান ও প্রযুক্তি খাতকে আধুনিক এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতিতে নতুন করে গড়ে তোলাই হলো রিকনস্ট্রাকশন। এটি নিছক পুরোনো ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়া নয়, বরং বৈষম্যহীন, আধুনিক ও টেকসই ‘উৎপাদনশীল ম্যানুফ্যাকচারিং হাব’ হিসেবে বাংলাদেশকে নতুন রূপ দেওয়ার সুদূরপ্রসারী প্রচেষ্টা।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মূল স্পিরিট বা আকাঙ্ক্ষা ছিল একটি বৈষম্যহীন, স্বনির্ভর ও মানবিক বাংলাদেশ নির্মাণ, যেখানে জনগণের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অধিকার সুরক্ষিত থাকবে। এই আকাঙ্ক্ষাকে বাস্তবে রূপ দিতে প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে জাতীয় নির্বাচনের আগে জনগণের সামনে দেওয়া ৩১ দফা কর্মসূচির বাস্তবায়নের বিষয়টি দৃঢ়তার সঙ্গে তুলে ধরেছেন।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যন্ত আকর্ষণীয় বিষয় হলো—বাংলাদেশ সরকারের এই ৩১ দফা কর্মসূচির সঙ্গে জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (SDGs) ‘লিভ নো ওয়ান বিহাইন্ড’ মূলনীতির প্রায় ৭৩ শতাংশ কার্যক্রমের সরাসরি এবং ২৭ শতাংশ কার্যক্রমের পরোক্ষ সংগতির রয়েছে। এর মাধ্যমে শহর ও গ্রামের মধ্যকার উন্নয়ন বৈষম্য দূর করে ২০৩০ এজেন্ডা অনুযায়ী অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল প্রতিটি পরিবারে পৌঁছাতে সরকার ফ্যামিলি কার্ড, ফার্মার্স কার্ড, স্পোর্টস কার্ড এবং ই-হেলথ কার্ড চালু করেছে, যা পরে একটি সর্বজনীন ‘ইউনিভার্সাল কার্ডে’ সমন্বিত হবে। বিশেষ করে, প্রতিটি পরিবারের নারীপ্রধানের নামে ইস্যুকৃত ‘ফ্যামিলি কার্ড’ নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের এক অনন্য প্রতীক।
দেশের ইতিহাসে শিক্ষা খাতে সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এবং আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে তা জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে। প্রথম শ্রেণি থেকে প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের জন্য ব্যাগ, পোশাক ও বিনামূল্যে দুপুরের খাবার সরবরাহ, খেলাধুলাকে পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্তকরণ এবং ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডকে কাজে লাগাতে তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য ৫০ মিলিয়ন ডলারের স্টার্টআপ ফান্ড গঠন বাংলাদেশকে একটি দক্ষ জনশক্তির দেশে পরিণত করবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার বাংলাদেশের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগানো, ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন, তিস্তা মহাপরিকল্পনা এবং সুন্দরবনে মিঠাপানির প্রবাহ বৃদ্ধিতে ‘পদ্মা ব্যারাজ’ প্রকল্প বাস্তবায়নের ঘোষণা বিশ্বব্যাপী ক্লাইমেট জাস্টিস দাবির বাস্তব রূপায়ণ।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাতিসংঘের এই ভাষণে বৈশ্বিক ভূরাজনীতি ও আন্তর্জাতিক শান্তি রক্ষায় বাংলাদেশের সুস্পষ্ট অবস্থান প্রতিফলিত হয়েছে। মারণাস্ত্র নয়, বরং যুক্তি-তর্ক, কূটনীতি, শিক্ষা ও মানবিক সহমর্মিতাই হবে বিশ্ব পরিবর্তনের প্রধান হাতিয়ার—এই বিশ্বদর্শনের কথা তিনি পুনর্ব্যক্ত করেছেন। পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ, অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ এবং স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের অধিকার ও আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের প্রতি অবিচল সমর্থন জানিয়ে বাংলাদেশ তার নৈতিক অবস্থান স্পষ্ট করেছে।
৬ থেকে ৯ বছর ধরে ১২ লাখের বেশি বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিতে গিয়ে বাংলাদেশের সম্পদ, পরিবেশ ও নিরাপত্তার ওপর যে তীব্র চাপ সৃষ্টি হয়েছে, তা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, রোহিঙ্গা সংকটের উৎপত্তি মিয়ানমারে এবং এর সমাধানও মিয়ানমারে নিরাপদ প্রত্যাবাসনের মধ্যেই নিহিত। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বিচার নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হলে এটি বড় ধরনের মানবিক সংকটে রূপ নেবে বলে তিনি সতর্ক করেন। চতুর্থ শিল্পবিপ্লব ও এআই যুগে ডিজিটাল বিভাজন যেন আন্তর্জাতিক বৈষম্যে রূপ না নেয়, সে বিষয়ে জাতিসংঘকে কার্যকর নীতিমালা গ্রহণের যে আহ্বান তিনি জানিয়েছেন, তা উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রতিনিধি হিসেবে বাংলাদেশের দূরদর্শী নেতৃত্ব নির্দেশ করে।
সবার আগে বাংলাদেশ : সবার জন্য বাংলাদেশ। অর্থাৎ জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার পাশাপাশি দল-মত, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে প্রতিটি নাগরিকের নিরাপদ, গণতান্ত্রিক ও সম্মানজনক জীবনের নিশ্চয়তা দানই এই সরকারের মূল রাজনৈতিক অঙ্গীকার।
চার দশকের অধ্যাপনা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণের অভিজ্ঞতা থেকে আমি স্পষ্ট দেখতে পাই, জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দেওয়া ভাষণটি শুধু সাময়িক কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য নয়। বক্তব্যটি মূলত একুশ শতকের উপযোগী একটি গতিশীল রাষ্ট্রচিন্তার দলিল।
শেখ হাসিনার দেড় যুগের ফ্যাসিবাদের ধ্বংসস্তূপ, অনিয়ম, দুর্নীতি ও অপশাসনের কালো অধ্যায় পার হয়ে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে অর্জিত নতুন বাংলাদেশে ‘থ্রি-আর’—পুনরুদ্ধার, পুনর্বহাল এবং পুনর্গঠন নীতিই হতে পারে টেকসই গণতন্ত্র ও অর্থনৈতিক মুক্তির একমাত্র কার্যকর পথপ্রদর্শক। এই দূরদর্শী কৌশল ও বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের সাহসী এবং সুনির্দিষ্ট উপস্থিতি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের মর্যাদা বহুলাংশে বৃদ্ধি করেছে। একটি স্বনির্ভর, শান্তিময়, ন্যায়ভিত্তিক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার যে অঙ্গীকার এই ভাষণে ধ্বনিত হয়েছে, তা বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ বৈশ্বিক মানচিত্রে এক আত্মমর্যাদাশীল রাষ্ট্র হিসেবে নিজের অবস্থান চিরস্থায়ী করতে সক্ষম হবে।
লেখক : অধ্যাপক (অব.), সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন



