বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী এ মুহূর্তে বাংলাদেশে সক্রিয় বড় দুটি রাজনৈতিক দল। জুলাই বিপ্লবের মধ্য দিয়ে গঠিত তরুণদের দল এনসিপি জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের সঙ্গে নির্বাচনি সমঝোতায় গিয়ে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছে। ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যক্রম স্থগিত থাকায় এবং দলীয়প্রধান শেখ হাসিনাসহ অধিকাংশ নেতা ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পালিয়ে থাকা, কিছুসংখ্যক দেশে আত্মগোপনে ও আটক থাকায় তারা নির্বাচনের বাইরে রয়েছেন। ফ্যাসিবাদের সহযোগী স্বৈরাচারী এরশাদের দল জিএম কাদেরের নেতৃত্বে জাতীয় পার্টি নির্বাচনে অংশ নিলেও তাদের অবস্থান খুবই নড়বড়ে।
এরকম এক পরিস্থিতিতে নির্বাচনের মাত্র ৪০ দিন আগে বিএনপি ও জামায়াত-এনসিপি জোটের দিকেই সব মানুষের দৃষ্টি।
এবার কে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করবে; কীভাবে তারা দেশ পরিচালনা করবে এ নিয়ে চলছে নানা গুঞ্জন। অন্যদিকে এবারের নির্বাচনে ‘গণভোট’ একটি বাড়তি ইস্যু হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। তবে এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ এক ইস্যু। জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশের চেহারা কি হবেÑ গণভোটের মাধ্যমে সংস্কার প্রস্তাবগুলো চূড়ান্তকরণের প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তা আরো এক ধাপ এগিয়ে যাবে।
একাত্তর-পরবর্তী বাংলাদেশের ইতিহাসে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান কেবল একটি ক্ষমতার পরিবর্তনই ছিল না, বরং তা ছিল রাষ্ট্র সংস্কারের এক মহাপ্রাণ। সেই অভ্যুত্থানের পথ ধরে দীর্ঘ ১৬ বছরের আওয়ামী ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান এবং পরবর্তী অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থার অধীনে ২০২৫ সালটি দাঁড়িয়েছিল এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে। ‘বাংলাদেশ টু’, ‘নতুন বন্দোবস্ত, ‘সংবিধান নতুন করে লেখা’ এবং বহুল প্রচারিত ‘রাষ্ট্র সংস্কার’ বা ‘সংস্কার’ নিয়ে বছরজুড়েই ছিল আলোচনা।
সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে দীর্ঘ আলোচনার মাধ্যমে ঐকমত্য কমিশনের মাধ্যমে মোটামুটি সমঝোতায় পৌঁছেছে বিএনপি, জামায়াত, এনসিপিসহ মোট ৩০টি রাজনৈতিক দল। সংস্কার প্রস্তাবগুলো অন্তর্ভুক্ত করে জুলাই সনদ স্বাক্ষর ও জুলাই সনদ বাস্তবায়ন অধ্যাদেশ জারির মধ্য দিয়ে এখন এটা গণভোটে যাচ্ছে। যদিও স্বাক্ষরিত জুলাই সনদ ও জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশের মধ্যে কিছুটা ফারাক রয়েছে।
৩১ দফা সংস্কার প্রস্তাব বিএনপির পক্ষ থেকে ২০২৩ সালেই ঘোষণা করা হয়েছিল। বিএনপি ঘোষিত এই সংস্কার প্রস্তাবের মূল বিষয়গুলো জুলাই সনদে অন্তর্ভুক্ত সংস্কার প্রস্তাবে স্থান পেয়েছে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বিএনপির ৩১ দফার মূল ১৭ দফাই জুলাই সনদে রয়েছে।
জুলাই সনদে অন্তর্ভুক্ত মূলত সাংবিধানিক ও অন্যান্য সংস্কার মিলে মোট ৪৮টি প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত আছে। এগুলো নিয়ে বিএনপির বড় দাগে কোনো আপত্তি না থাকলেও ৯টি সংস্কার প্রস্তাবের বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় বিএনপির আপত্তি থাকায় তারা নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছে। যেমন—তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন প্রক্রিয়ার র্যাঙ্ক চয়েজ পদ্ধতি, সাংবিধানিক পাঁচটি কমিটি/পদে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কমিটি গঠন পদ্ধতিতে বিএনপি আপত্তি জানিয়েছে।
জুলাই সনদ যেভাবে নোট অব ডিসেন্টসহ স্বাক্ষরিত হয়েছিল, আদেশে তার কিছু ব্যত্যয় ঘটেছে। নোট অব ডিসেন্টের একটি অংশ অন্তর্বর্তী সরকার গণভোটে পাঠিয়েছে। এখানেই বিএনপির মূল আপত্তি।
গণভোট প্রসঙ্গ
সরকার জানিয়ে দিয়েছে, মাত্র একটি প্রশ্নে চারটি বিষয়ের ওপর গণভোট হবে। প্রশ্নটি হলো ‘আপনি কি জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ এবং জুলাই জাতীয় সনদে লিপিবদ্ধ সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত নিম্নলিখিত প্রস্তাবগুলোর প্রতি সম্মতি জ্ঞাপন করছেন?’
চারটি বিষয় হলোÑ
১. নির্বাচনকালীন সময়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়ার আলোকে গঠন করা হবে।
২. আগামী সংসদ হবে দুই কক্ষবিশিষ্ট। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ সদস্যবিশিষ্ট একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হবে এবং সংবিধান সংশোধন করতে হলে উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন দরকার হবে।
৩. সংসদে নারীর প্রতিনিধি বৃদ্ধি, বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার ও সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচন, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিতকরণ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি, মৌলিক অধিকার সম্প্রসারণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও স্থানীয় সরকারসহ বিভিন্ন বিষয়ে যে ৩০টি প্রস্তাবে জুলাই জাতীয় সনদে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্য হয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়নে আগামী নির্বাচনে বিজয়ী দলগুলো বাধ্য থাকবে।
৪. জুলাই সনদ বর্ণিত অন্যান্য রাজনৈতিক দলের প্রতিশ্রুতি অনুসারে বাস্তবায়ন করা হবে।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, গণভোটের দিন এই চারটি বিষয়ের ওপর একটি মাত্র প্রশ্নে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট দিয়ে সাধারণ মানুষ তাদের মতামত জানাবে।
যতটুকু জানা গেছে, এক নম্বর প্রশ্নেই বিএনপির মূল আপত্তি। তবে ২ নম্বর প্রশ্ন তথা উচ্চকক্ষে পিআর নিয়েও বিএনপি আপত্তি জানিয়ে আসছে।
গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে এনসিপি প্রচার চালাচ্ছে। জামায়াতও মোটামুটি ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে রয়েছে। বিএনপি এখনো এ নিয়ে নীরব ভূমিকা পালন করছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছেÑজুলাই সনদে শুধু সংস্কার প্রস্তাব নয়, পুরো জুলাই বিপ্লবটাই আছে। কোনো কারণে ‘না’ জয়ী হলে এটা জুলাই বিপ্লবকে ম্লান করে দেবে। হয়তো একই দিনে অনুষ্ঠিত ভোটে যে দল জয়ী হবে, তাদের কোনো সমস্যা হবে না। তবে জুলাই বিপ্লবের ফসল এই নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যাবে। দেশে অরাজকতাও দেখা দিতে পারে। বিএনপি নিশ্চয়ই এটা চাইবে না। এখন পর্যন্ত যে ট্রেন্ড, তাতে নির্বাচনে বিএনপি জয়ী হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। তাহলে বিএনপির কি উচিত হবে এরকম একটি প্রশ্নবিদ্ধ অবস্থায় জয়ী হয়ে সরকার গঠন করা? অন্যদিকে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে বিএনপির নোট অব ডিসেন্ট দেওয়া কয়েকটি বিষয়ে বিএনপিকে তার অবস্থান পরিবর্তন করতে হবে। তবে এখানে একটি কথা বিশেষভাবে উল্লেখ্য, যতই সনদ, গণভোট ও আদেশ থাকুক না কেন, সংবিধান অনুযায়ী সার্বভৌম সংসদে আলোচনার মাধ্যমে যেভাবে সংবিধান সংশোধন হবে, সেটিই চূড়ান্ত। সংস্কার বাস্তবায়নে বিএনপি কমিটেড থাকলে এবং গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার খুঁটিনাটি বিষয়ে তেমন কোনো জটিলতা সৃষ্টি করবে বলে মনে হয় না। বরং ‘না’ জয়ী হওয়ার চেয়ে সেটা শতগুণ ভালো হবে।
দেশের মানুষ সংস্কারের পক্ষে, বিএনপিসহ রাজনৈতিক দলগুলো সংস্কারের পক্ষে। এ অবস্থায় গণভোটে ‘না’ ভোটের ক্যাম্পেইনের মতো আত্মঘাতী সিদ্ধান্তের দিকে কেউ যাবে না বলেই জনগণের প্রত্যাশা। আর যদি এরকম আত্মঘাতী সিদ্ধান্তের দিকে কেউ যায়, তবে এটা সংসদ নির্বাচনেও প্রভাব ফেলবে তা চোখ বন্ধ করেই বলা যায়। একবার সংস্কারের পক্ষ-বিপক্ষ আওয়াজ উঠে গেলে সুইং ভোট একদিকে চলে যেতে সময় লাগবে না।
বাঙালিরা বড়ই আবেগপ্রবণ জাতি। শেখ হাসিনাকে পালিয়ে যেতে বাধ্য করা, হাদির মৃত্যুর পর জনগণের প্রতিক্রিয়া; সর্বশেষ সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার জানাজায় বাঁধভাঙা মানুষের ঢল আবেগপ্রবণ বাঙালির সর্বশেষ বহির্প্রকাশ। ফ্যাসিবাদী হাসিনাকে ক্ষমতা থেকে বিতাড়নে বাংলাদেশের মানুষ যেমন দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠে চব্বিশের ৫ আগস্ট রাজপথে নেমে এসেছিল, তেমনি গণতন্ত্রের নেত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর তাকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে জানাজায় ঢাকার রাজপথে নেমেছিল স্মরণাতীতকালের মানব ঢল, যার একটি ক্ষুদ্র অংশই ছিল বিএনপির কর্মী-সমর্থক। সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণই ছিল বেশি।
মনে রাখতে হবে, তারা জুলাই বিপ্লবের সমর্থক। তারা কিন্তু চায় সাংবিধানিক সংস্কার, রাষ্ট্রকাঠামোর সংস্কার, বিচার বিভাগের সংস্কার, নির্বাচন কমিশনের সংস্কার, প্রশাসনিক সংস্কারসহ নানা ধরনের সংস্কার। তারা ভারতীয় আধিপত্যবাদসহ সব ধরনের আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে। ধর্মীয় গোঁড়ামি নয়, কিন্তু তারা ধর্মীয় মূল্যবোধে বিশ্বাস করে। তারা বাংলাদেশপন্থি। এই পন্থিদের মনের ভাষা পাঠ করার ক্ষমতা আমাদের রাজনীতিবিদরা যত বেশি অর্জন করবেন, ভোটের মাঠে তারা তত বেশি লাভবান হবেন।
রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমান বিএনপিতে নানা মত ও পথের মানুষের সমন্বয় ঘটিয়েছিলেন। মশিউর রহমান যাদু মিয়ার মতো লোক যেমন বিএনপির জন্মলগ্নে জোটে ও দলে ভিড়েছিলেন, তেমনি শাহ আজিজুর রহমানও ছিলেন। এমনকি রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমান একজন সেক্টর কমান্ডার হয়েও শাহ আজিজুর রহমানকে কেবল দলেই টেনে নেননি, তাকে প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত করেছিলেন। তিনি প্রতিনিয়তই বিভিন্ন পথ ও মতের লোককে বঙ্গভবনে ডেকে নিয়ে তাদের কথা শুনতেন। সিদ্ধান্ত নিতেন নিজের মতো করে। বেগম খালেদা জিয়াও বলতেন কম, শুনতেন বেশি। রাশেদ খান মেনন, ড. কামাল হোসেন, এমনকি শেখ হাসিনার স্বামী ড. ওয়াজেদ মিয়ার বক্তব্যও ধৈর্য ধরে তিনি (খালেদা জিয়া) শুনেছেন প্রধানমন্ত্রীর টেবিলে বসে। আমার মতো তরুণ সাংবাদিকেরও প্রধানমন্ত্রীর বিট কাভারের সুবাদে বহুবার তার সঙ্গে সরাসরি কথা বলার ও পরামর্শ দেওয়ার সুযোগ হয়েছিল।
১৯৯৫ সালের শেষদিকে এরকম একটি দিনের কথা আমার খুব মনে পড়ে। বিট কাভার করেন এমন জনাদশেক সাংবাদিককে তিনি প্রধানমন্ত্রীর অফিসরুমে ডাকলেন। তখন মোজাম্মেল ভাই ছিলেন প্রেস সচিব আর আবদাল ভাই ছিলেন উপ-প্রেস সচিব। বয়সে সর্বকনিষ্ঠ সংবাদকর্মী হিসেবে আমিও ছিলাম সেই দলে। এক পর্যায়ে ৬ষ্ঠ সংসদ নির্বাচন নিয়ে কথা উঠল। ম্যাডাম খালেদা জিয়া বললেন, সংবিধান অনুযায়ী শুধু নির্বাচন নয়, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত করতে হলে আমাকে গণভোটও করতে হবে। একটি ভোটই যেখানে কঠিন হয়ে পড়েছে ওদের আন্দোলনের কারণে; সেখানে দুটি ভোট করব কীভাবে? সংবিধানে সংশোধনী আনার সময় দ্বিতীয় ভোটটি (গণভোট) ‘করা লাগবে না’ বলে সংশোধনীতে ঢুকিয়ে দিলে একটি সমাধান হতে পারে। এটা বলার সঙ্গে সঙ্গে বেগম জিয়া সেটি ক্যাচ করলেন। সঙ্গে সঙ্গে এডিসিকে ডেকে তার আইনজীবী প্যানেলকে আসতে বললেন। সেদিন সাংবাদিক দলের সঙ্গে প্রায় দুই ঘণ্টা তিনি কথা বলেন এবং নানা পরামর্শ নেন। সেসব পরামর্শের কিছু তিনি বাস্তবায়নও করেছিলেন।
আওয়ামী লীগের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবির আন্দোলন তখন তুঙ্গে, সঙ্গে জামায়াতও। খালেদা জিয়া বললেন, ওরা তো দল বেঁধে সংসদ থেকে পদত্যাগ করে চলে গেছে। বলেছিলাম, ত্রয়োদশ সংশোধনী বিল পাস করে দিতে সংসদে ফিরতে; কিন্তু তারা রাজি হয়নি। পদত্যাগ করেছে। এখন নির্বাচন করা ছাড়া বিকল্প নেই। সংবিধানে যদি ‘তত্ত্বাবধায়ক’ অন্তর্ভুক্ত না করে যাই, তবে তারা ক্ষমতায় গেলে সেটা আর রাখবে না। সেটা ষষ্ঠ সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন খালেদা জিয়া। এর সুফল হিসেবে ২০০১ সালের নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে তিনি আবার ক্ষমতায় আসতে পেরেছিলেন।
তারেক রহমানকেও রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমান এবং খালেদা জিয়ার মতো নানা পথ-মতের লোকের কথা শুনতে হবেÑযদি তিনি ভালো করতে চান। সিদ্ধান্ত তিনি নিজেই নেবেন। আমার কথা হচ্ছে, প্রাথমিক পদক্ষেপগুলোতে মনে হচ্ছে তারেক রহমান হয়তো নতুন প্রেক্ষাপটে সেদিকে হাঁটবেন। এটা তার পথ চলাকে মসৃণ করবে এবং দেশের জন্য মঙ্গল বয়ে আনবে।
দেশবাসীর মনের ভাষা তারেক রহমান কী বুঝতে পারছেন?
দেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল বিএনপির কাণ্ডারি এখন তারেক রহমান। দেশে ফিরেই মা খালেদা জিয়াকে হারিয়েছেন। তার আগে ওয়ান-ইলেভেনের সময় কারা নির্যাতনের ফলে ছোট ভাই আরাফাত রহমান কোকো গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং ফ্যাসিবাদী হাসিনার আমলে বিদেশে চিকিৎসারত অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। ২০১৫ সালে খালেদা জিয়াও তখন অবরুদ্ধ ছিলেন গুলশান কার্যালয়ে। তারেক রহমান ছিলেন লন্ডনে, নির্বাসনে। তাই ভাইয়ের জানাজায় শরিক হতে পারেননি। ১৯৮১ সালে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে কিছু বিপথগামী সেনার হাতে মৃত্যুবরণ করেন বাংলাদেশের উন্নয়নের রূপকার রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান।
রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার বিশাল দুই জানাজায় লাখ লাখ মানুষের উপস্থিতি প্রমাণ করে তারা দুজন বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ে কতটা স্থান করে নিয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধের ঘোষক, সেক্টর কমান্ডার ও জেড ফোর্সের প্রধান জিয়াউর রহমান ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সিপাহি-জনতার বিপ্লবে এক ক্রান্তিকালে দেশের দায়িত্বভার নিয়েছিলেন। স্বল্প সময়ের শাসনকালে শহীদ জিয়া সততা, দেশপ্রেম, পরিশ্রম এবং বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের দর্শনে বাংলাদেশের মানুষকে যেভাবে আকৃষ্ট করেছিলেন, তেমনি তার মৃত্যুর পর গৃহবধূ থেকে রাজনীতিতে এসে চার দশক ধরে খালেদা জিয়া বাংলাদেশে জাতীয়তাবাদের ঝাণ্ডা যেভাবে উড্ডীন রেখেছেন, আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে লড়ে গেছেন, ইসলামি মূল্যবোধকে লালন করেছেন, নারী শিক্ষায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছেন, গোঁড়ামির পরিবর্তে ধর্মীয় মূল্যবোধ ও আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার যে সুন্দর এক সমন্বয় ঘটিয়েছেনÑবাংলাদেশের মানুষ সেটাকে আন্তরিকভাবে গ্রহণ করেছেন। রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার প্রশংসায় পঞ্চমুখ চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান এবং জুলাই বিপ্লবের নায়ক শহীদ শরীফ ওসমান হাদিও তার স্বল্পকালীন কিন্তু ‘ইমপ্যাক্ট’ সৃষ্টিকারী জীবনে বাংলাদেশের বর্তমান তরুণ সমাজের হৃদয় ছুঁয়ে গেছেন। তার জানাজায়ও ভিন্ন এক মাত্রা দেখেছে দেশবাসী। হাদিও যে তার অবস্থান থেকে রাষ্ট্রপতি জিয়া কিংবা খালেদা জিয়ার মতো দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে বর্তমান তরুণ সমাজের প্রতিনিধি হয়ে উঠেছিলেন, তার জানাজায় লাখ লাখ মানুষের উপস্থিতি সে প্রমাণই বহন করে।
গণভোট ও জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে এখন প্রশ্ন হচ্ছে বাংলাদেশের আগামী নেতৃত্ব কি জনগণের মনের এই ভাষা পড়তে-বুঝতে বা উপলব্ধি করতে পারছেন? দেশের মানুষ কী চায়, কেন চায়, কখন চায়, কীভাবে চায় সেটা দলীয় গণ্ডির মধ্যে থেকে সব সময় বোঝা যায় না। কিছু ঘটনা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় কীভাবে দেশকে এগিয়ে নিতে হবে।
দেশ-বিদেশে রেকর্ড সৃষ্টিকারী খালেদা জিয়ার জানাজার উপস্থিতি সেরকমই এক ঘটনা।
আশার কথা হলো, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এটা উপলব্ধি করতে পেরেছেন বলে মনে হয়। গত শনিবার রাতে তারেক রহমানের ফেসবুক পেজের পোস্টে তার এই মনোভাবের প্রতিফলন ঘটেছে। তারেক রহমানের নবনিয়োগকৃত প্রেস সচিব সালেহ শিবলীও দায়িত্ব নেওয়ার পর তার প্রথম প্রতিক্রিয়ায় যা বলেছেন, তাতে এর সমর্থন মেলে।
এছাড়া গত শনিবার রাতে আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান যখন গুলশান কার্যালয়ে খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে খোলা শোক বইয়ে স্বাক্ষর ও তারেক রহমানকে সমবেদনা জানাতে যান, তখন আমিও সঙ্গে ছিলাম। আরো ছিলেন আমার দেশ-এর নির্বাহী সম্পাদক ও খালেদা জিয়ার একসময়ের উপ-প্রেস সচিব সৈয়দ আবদাল আহমদ, আমার দেশ-এর যুগ্ম সম্পাদক (বর্তমানে সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টের এমডি) এম আবদুল্লাহ এবং চিফ রিপোর্টার বাছির জামাল।
শনিবার রাতে বিএনপির গুলশান কার্যালয়ে খালেদা জিয়ার প্রতি আনুষ্ঠানিক শোক জানাতে গিয়ে নতুন এক তারেক রহমানকে লক্ষ করা গেছে। আমরা শোক বইতে স্বাক্ষরের পর তারেক রহমানকে সমবেদনা জানাতে সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের সঙ্গে দোতলায় একটি সাক্ষাৎরুমে তারেক রহমান প্রবেশের পরই মাহমুদুর রহমান তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দেন। দুজনের কোলাকুলির পর তারেক রহমান সৌজন্যতা দেখাতে গিয়ে তার হেড টেবিলের চেয়ারটি টেনে নিলেন এক পাশে। মাহমুদুর রহমানের মতো বয়োজ্যেষ্ঠ একজন সম্পাদককে সম্মান দেখাতে গিয়েই তিনি এটি করেছিলেন। আলাপচারিতায় তারেক রহমান বললেন, আম্মুর জানাজায় এত মানুষের উপস্থিতি আমার দায়িত্ব বাড়িয়ে দিয়েছে। নিজেই বললেন, দল-মতের বাইরে লাখ লাখ লোক জানাজায় যোগ দিয়েছেন। জনগণের ভোটে নির্বাচিত হলে দেশের অর্থনীতিকে কীভাবে সামাল দেবেন এ নিয়ে এখনই পেরেশান তিনি। মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা, তরুণ সমাজের চাহিদা সব ব্যাপারেই জানার-বোঝার চেষ্টা করছেন এখন থেকেই। তারেক রহমান ও মাহমুদুর রহমান অল্পদিনের ব্যবধানেই তাদের মমতাময়ী মাকে হারিয়েছেন। সেই স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন দুজন। তারা বলেন, নিজ হাতে আমরা আমাদের মাকে কবরে নামাতে পেরেছি, জুলাই বিপ্লব না হলে এটা সম্ভব হতো না।
মাহমুদুর রহমানের পাশে বসে মাঝেমধ্যে দু-চার বাক্যে স্মৃতিচারণ করছিলাম। তারেক রহমানকে বললাম, মনে পড়ে ২০০৭ সালে ওয়ান-ইলেভেনে মইনুদ্দিন-ফখরুদ্দিনের সরকার ক্ষমতা দখলের পর আপনাকে গ্রেপ্তারের মাত্র দুদিন আগে আমি আর রাশেদুন্নবী বাবু ভাই (আমার দেশ-এর তৎকালীন নির্বাহী সম্পাদক, বর্তমানে মরহুম) হাওয়া ভবনে গিয়েছিলাম। প্রায় দুই ঘণ্টা কথা বলেছিলাম। তারেক রহমান যে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তার হতে যাচ্ছেনÑসেই সুনির্দিষ্ট বার্তাসহ আরো কিছু জরুরি খবর পৌঁছে দিতে সেদিন সব নিরাপত্তা ঝুঁকি উপেক্ষা করে তারেক রহমানের কাছে ছুটে গিয়েছিলাম। একজন সাংবাদিক হয়েও গণতন্ত্রের পক্ষে ও আধিপত্যবাদের ছোবলের আশঙ্কা থেকেই নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়েও সেদিন হাওয়া ভবনে ছুটে যাওয়া। প্রায় ১৯ বছর পর গত শনিবার রাতে তারেক রহমানের সঙ্গে আমার সরাসরি সাক্ষাৎ। প্রথম সরাসরি দেখা ও কথা হয়েছিল ১৯৯৮ সালের মার্চে, বিএসইসি ভবনের ৯ তলায় যেটি এখন এনটিভি ভবন। প্রায় ১১ বছর আমার দেশ-এর অফিসও ছিল ওই ভবনের ১১ তলায়। কিন্তু আমি যখন ১৯৯৮-এর ফেব্রুয়ারিতে মানবজমিন পত্রিকার জন্মলগ্নে (১৫ ফেব্রুয়ারি) চ্যালেঞ্জিং অ্যাসাইনমেন্ট হিসেবে তার সাক্ষাৎকারটি নিয়েছিলাম, ২৬ মার্চ ১৯৯৮ সালে মিডিয়ায় প্রথমবারের মতো বড় কাভারেজ দিয়ে তারেক রহমানের সেই সাক্ষাৎকার প্রচারের ফলে সেটি তখন বেশ আলোড়ন তুলেছিল। তখনও তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপিতে যোগ দেননি। ৯৯ সালে লেডিস ক্লাবে আমার বিয়েতে খালেদা জিয়া এবং সপরিবারে তারেক রহমানের যোগদান থেকে শুরু করে চার দশকের বেশি সময় খালেদা জিয়া ও প্রায় দুই দশক ধরে তারেক রহমানের সঙ্গে পেশাগত কারণে অসংখ্য সফর এবং সংবাদ কাভার করতে গিয়ে বিএনপির রাজনীতি, জাতীয় জীবনের বহু গুরুত্বপূর্ণ বাঁক, এমনকি জিয়া পরিবারের খুঁটিনাটি অনেক কিছুই জানতে পেরেছি।
২০০১ সালের নির্বাচনের আগ থেকে তারেক রহমান রাজনীতির মাঠে সক্রিয় ছিলেন। দলের বগুড়া কমিটির প্রাথমিক সদস্য আগে হলেও কেন্দ্রীয় কমিটির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব হওয়ার পর থেকে তারেক রহমান প্রথমেই তৃণমূল বিএনপির সম্মেলনের মাধ্যমে সারা দেশে ব্যাপক আলোড়ন তুলেছিলেন। ২০০৬ সালের নির্বাচনে তিনি বগুড়া থেকে দলের প্রার্থী হয়েছিলেন; কিন্তু ওয়ান-ইলেভেনের সরকার ভারতীয় আধিপত্যবাদী শক্তির সঙ্গে হাত মিলিয়ে সে নির্বাচন ভণ্ডুল করে দেয়। খালেদা জিয়া, তারেক রহমান, আরাফাত রহমান কোকোকে কারারুদ্ধ করে। লোক দেখানোভাবে শেখ হাসিনাকে কারারুদ্ধ করা হলেও ভারতের তখনকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং শেষে রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির মধ্যস্থতায় তার সঙ্গে সমঝোতা করে ২০০৮ সালে ক্ষমতায় আসেন শেখ হাসিনা। অন্যদিকে কারাগারে জিয়া পরিবারের ওপর নির্যাতন চালানো হয়। তারেক রহমানকে শূন্যে ঝুলিয়ে মেঝেতে ফেলে দিয়ে তার মেরুদণ্ডের দুটি হাড় ভেঙে দেওয়া হয়। ‘রাজনীতি করবেন না’ বলে জোর করে মুচলেকা আদায় করে তাকে লন্ডনে নির্বাসনে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোকেও নির্যাতন করে মালয়েশিয়ায় নির্বাসনে পাঠানো হয়। ২০০৮ সালে ষড়যন্ত্রের নির্বাচনে ক্ষমতাসীন হয়ে শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে আধিপত্যবাদী ভারতের পদানত করেন। আর এটা করতে গিয়েই তিনি দেশপ্রেমিক শক্তিকে গুম-খুনের পথ বেছে নেন। মিথ্যা মামলায় খালেদা জিয়াকে জেলে পাঠান। বাংলাদেশের মিডিয়ায় তারেক রহমানের বক্তব্য প্রচার নিষিদ্ধ করেন। ভারতকে ট্রানজিট, করিডোর, বন্দর সুবিধা এবং সেভেন সিস্টারের স্বাধীনতাকর্মীদের বাংলাদেশের ভেতর থেকে ধরে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেন। সীমান্ত সমস্যার সমাধান করা হয় ভারতকে অনেক জমি ছেড়ে দিয়ে। তিস্তার পানি আনতে না পেরে শেখ হাসিনা শেষদিকে বিরক্ত হয়েই বলেছিলেনÑভারত যা চেয়েছে, তার চেয়ে বেশি দিয়েছি। সবকিছু উজাড় করে দিয়েছি; কিন্তু বিনিময়ে কিছুই পাইনি। চাইও না। দেশের জন্য শেখ হাসিনা কিছু আনতে না পারলেও ভারতের সহযোগিতা নিয়ে অবৈধভাবে তিনবার ক্ষমতায় এসেছিলেন। আবার জুলাই বিপ্লবে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে পালিয়ে গিয়ে এখন তাদের আশ্রয়েই রয়েছেন। সুতরাং ব্যক্তি হাসিনা ও দল হিসেবে আওয়ামী লীগকে বারবার ক্ষমতায় বসিয়ে লুটপাটের সুযোগ করে দিয়েছে ভারত। বিনিময়ে তারা বাংলাদেশ থেকে তাদের সব সুযোগ-সুবিধা লুটে নিয়েছে। বাংলাদেশে প্রায় ১০ লাখ ভারতীয় ওয়ার্ক পারমিট ছাড়াই চাকরি করে বিশাল অঙ্কের অর্থ পাচার করেছে। হাসিনা আমলে ভারতীয়দের রেমিট্যান্স আয়ের চতুর্থ বৃহত্তম দেশ ছিল বাংলাদেশ।
তারেক রহমানের নতুন উপলব্ধি
৩ জানুয়ারি সন্ধ্যায় নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক বার্তায় তারেক রহমান বলেন, খালেদা জিয়া মানুষের কাছে কতটা তাৎপর্যপূর্ণ, তা উপলব্ধি করেছি।
খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে তিনদিনের রাষ্ট্রীয় শোক পালন শেষে সবার প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তারেক রহমান বলেন, তার প্রতি মানুষের অকৃত্রিম ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা তাদের পরিবারকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে ‘খালেদা জিয়া’নামটি মানুষের কাছে কতটা তাৎপর্যপূর্ণ তা এই শোকাতুর সময়ে নতুন করে উপলব্ধি করেছি।
রাষ্ট্রীয় শোকের সময়কাল সমাপ্ত হওয়ার পর দেওয়া পোস্টে তারেক রহমান লিখেছেন, এই কঠিন সময়ে দেশজুড়ে এবং বিদেশে অবস্থানরত শুভানুধ্যায়ীদের কাছ থেকে প্রাপ্ত ভালোবাসা, সমবেদনা ও দোয়া তার পরিবারকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে।
মায়ের স্মৃতিচারণ করে তারেক রহমান বলেন, ‘এই তিনদিনে আমরা আরো উপলব্ধি করেছি যে, আমার মা ভিন্ন ভিন্ন মানুষের কাছে ভিন্ন ভিন্ন তাৎপর্য বহন করতেন। অনেক ক্ষেত্রে তা ছিল এতটাই অর্থবহÑযা হয়তো আমরা নিজেরাও পুরোপুরি উপলব্ধি করতে পারিনি। অনেকের কাছে তিনি ছিলেন আপসহীনতার প্রতীক; নিজের বিশ্বাসের পক্ষে সাহসের সঙ্গে দাঁড়ানোর অটল প্রেরণা। রাজনীতির গণ্ডি ছাড়িয়ে এই প্রেরণা বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছেÑযা পরিচয়, আদর্শ ও অবস্থানের ঊর্ধ্বে উঠে অগণিত মানুষকে স্পর্শ করেছে।’
তারেক রহমান অন্তর্বর্তী সরকার, প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস এবং উপদেষ্টা পরিষদ সদস্যদের প্রতি বিশেষ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, সরকারের নেতৃত্ব ও দ্রুত সমন্বয়ের কারণেই অত্যন্ত স্বল্পসময়ের মধ্যে এমন বিরল ও সম্মানজনক অন্তিম আয়োজন সম্পন্ন করা সম্ভব হয়েছে।
এ ছাড়া খালেদা জিয়ার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানানোয় প্রতিবেশী ও বন্ধুরাষ্ট্রসমূহ, দেশ-বিদেশের রাজনৈতিক নেতা, কূটনীতিক এবং বিশ্বের নানা প্রান্তের অংশীদারদেরও ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন বিএনপির এই শীর্ষ নেতা।
জনগণের ভাষা বুঝে গন্তব্যে পৌঁছাতে হবে
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নবনিযুক্ত প্রেস সচিব সালেহ শিবলী ৩ জানুয়ারি সন্ধ্যায় রাজধানীর গুলশানে দলের চেয়ারম্যানের কার্যালয়ে উপস্থিত সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা যদি বাংলাদেশকে একটি কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে এগিয়ে নিতে চাই এবং জনগণের ভাষা বুঝে গন্তব্যে পৌঁছাতে চাই; তবে দায়িত্বশীল ও স্বাধীন সংবাদমাধ্যম একান্ত প্রয়োজন। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান একটি গণতান্ত্রিক, মানবিক ও স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ার যে পরিকল্পনা করেছেন, তার জন্য জনগণের ভোটে নির্বাচিত ও দায়বদ্ধ সরকার প্রয়োজন। আর সেই জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা গঠনে গণমাধ্যমকে দায়িত্বশীল ও স্বাধীনভাবে কাজ করতে হবে।’
তারেক রহমানের ব্যক্তিগত মন্তব্য একই দিনে ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া স্ট্যাটাস এবং নবনিযুক্ত প্রেস সচিবের দেওয়া বক্তব্য মেলালে বোঝা যায় তারা দেশের মানুষের পালস বুঝে সামনে এগোনোর চেষ্টা করছেন এটা খুবই ভালো লক্ষণ। এর আগে যেদিন তারেক রহমান দেশে ফেরেন, সেদিনও জুলাই ৩৬ এক্সপ্রেসওয়েতে (৩০০ ফিট) দেওয়া সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে আধিপত্যবাদের গুপ্তচররা দেশের ভেতর সক্রিয় রয়েছে বলে মন্তব্য করেন। জুলাইযোদ্ধা শহীদ হাদির নাম ও ভূমিকা স্মরণ করে বিচার দাবি করেন। একদিন পর তার কবর জিয়ারতে যান। একাত্তর ও চব্বিশের জুলাইকে সমর্যাদার অভিধায় স্থান দিয়ে মানুষের প্রশংসা কুড়ান।
পরিমিতিবোধে প্রশংসিত তারেক রহমান
একইভাবে খালেদা জিয়ার জানাজার দিনে নির্ধারিত সময় বেলা ২টায় জানাজা শুরু করা যায়নি। কফিন পৌঁছাতে কিছুটা বিলম্ব হয়। এ সময়টাতে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ এবং সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী বক্তব্য দেন। কফিন পৌঁছার পর দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার সংক্ষিপ্ত জীবনবৃত্তান্ত তুলে ধরেন স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য নজরুল ইসলাম খান। তারপরই তারেক রহমানকে আহ্বান জানানো হয় পরিবারের পক্ষ থেকে সমবেত জনসমুদ্রের উদ্দেশে কিছু বলার জন্য। তিনি কয়েক বাক্যে বক্তব্য শেষ করেন। জানাজা বিলম্বের কারণে সকাল থেকে সমবেত জনতা কিছুটা অধৈর্য হয়ে পড়েন। তারেক রহমান সম্ভবত সেটা অনুধাবন করতে পেরেছিলেন। মানুষের কষ্ট লাঘব করতে দীর্ঘ বক্তব্যে মানুষের মধ্যে বিরক্তির উদ্রেক করতে পারে এমন অনুভূতি থেকেই তারেক রহমান বক্তব্য খুব সংক্ষিপ্ত করেন। অথবা আগে থেকেই সিদ্ধান্ত নিয়ে এটা করে থাকতে পারেন। বিষয়টিকে উপস্থিত জনতা ইতিবাচকভাবে নিয়েছেন। তারেক রহমানের পরিমিতিবোধের প্রশংসা করতেও শোনা যায় অনেককে। শুধু তা-ই নয়, তিনি নিজের রাজনৈতিক পরিচয় এড়িয়ে খালেদা জিয়ার বড় সন্তান পরিচয়ের মধ্যে সীমিত রেখেছেন। এটাও তার বিনয় হিসেবে দেখেছে সমবেত জনতা।
লেখক: ব্যবস্থাপনা সম্পাদক, আমার দেশ
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

