আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

মিথ্যাচারের আওয়ামী ফ্যাসিবাদ

ড. হাসানুজ্জামান চৌধুরী

মিথ্যাচারের আওয়ামী ফ্যাসিবাদ

বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠাকারী একই আওয়ামী লীগের দুই কালের দুজন। একই পরিবারের পিতা শেখ মুজিব সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে সেই ১৯৭২ সালের শুরুতেই ফ্যাসিবাদের কর্ষণ ও বপন শুরু করে এবং এরপর জনবিচ্ছিন্ন অবস্থায় বলপ্রয়োগে মউতে চলে যায়। আ.লীগ থেকে বাকশাল ফ্যাসিবাদ এভাবেই ধসে পড়ে। দ্বিতীয়বার মুজিবকন্যা শেখ হাসিনা ১৯৯৬-২০০১ পর্যায়ে বাপের ফ্যাসিবাদকে নবায়ন ও নধরায়ন করে। আর তৃতীয়বার ওই শেখ হাসিনাই ২০০৯ থেকে ২০২৪-পর্যায়ে মুজিবের ফ্যাসিবাদকে দাবড়ায়ন ও দানবায়নের নিকৃষ্টতম সীমায় পৌঁছে দেয়। সমগ্র বাংলাদেশের ভূখণ্ড, ভূগোল, সমাজ তটরেখা এবং রাষ্ট্র ও রাজনীতি, সরকার ও প্রশাসন, আমলাতন্ত্র ও বাহিনীগুলো, পলিসি ও প্রোগ্রাম, জীবন ও অর্থনীতি, শিক্ষা ও সংস্কৃতি, স্বদেশ ও বিদেশনীতি, কথা ও আচরণ, মনন ও মানস অধঃপতিত হয় ভয়ানকভাবে। ভিন্নতম এক ফ্যাসিবাদী দাসতন্ত্রে ৫৬ হাজার বর্গমাইলের এই ব-দ্বীপে প্রতিষ্ঠিত হয় এক ব্যক্তি, এক পরিবারের, এক দলের স্বৈরতন্ত্র এবং এসব কিছুর সমন্বয়ে এক দম বন্ধ করা ভয়াল ফ্যাসিবাদ। যেখানে একসময় ‘মুজিব মানেই বাংলাদেশ’, সেখানে অন্য সময় ‘শেখ হাসিনার বিকল্প নেই’। কি সাংঘাতিক ব্যক্তি পূজা! এ ছাড়া চলে দুর্নীতি ও দুর্বৃত্তায়ন, ইতরতম দম্ভ ও দাপট, হুঙ্কার ও হামলা। আবার এহেন ফ্যাসিবাদের আরেক অবিচ্ছেদ্য ও সর্বপ্রধান নিয়ন্ত্রক মাত্রা ছিল ইন্ডিয়ান হেজেমনি তথা ভারতীয় হিন্দুত্ববাদী উপনিবেশীকরণ। ফ্যাসিবাদ ও আধিপত্যবাদ দুয়ে মিলে বাংলাদেশকে, এর স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে, জনজীবন ও জনসম্মতিকে তাদের পদতলে পিষ্ট করে রেখেছিল। শেষাবধি ১৬ বছরের বহু লড়াইয়ের পর ৩৬ জুলাই কোটি জনতার রুদ্ররোষে পড়ার ঠিক আগ মুহূর্তে স্বঘোষিত ‘জননেত্রী’ ‘জনশত্রু’ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে ব্রাহ্মণ্যবাদী ভারতীয় প্রভুর কোলে আশ্রয় নেয়। যেখান থেকে দেশ ধ্বংসের সবক নিয়ে এসেছিল, সেখানেই আশ্রিত দাসী হয়ে ফিরে যায়। ১৯৭২-৭৫-এর ফ্যাসিবাদ ১৫ আগস্ট ১৯৭৫-এর পটভূমির নির্মাতা। আবার ১৯৯৬-০১ এবং ২০০৯-২৪-এর ফ্যাসিবাদী বিবর দুনিয়া কাঁপানো জুলাই-আগস্ট বর্ষা বিপ্লবের ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানে পটভূমি তৈরি করেছে। ফ্যাসিবাদের দিক থেকে নেগেটিভ অর্থে। আর জনগণের দিক থেকে পজেটিভ অর্থে। ১৯৭১-এর ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধ এবং ২০২৪-এর ৩৬ দিনের রক্তাক্ত ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানকে যেন মানুষ তাদের কালেকটিভ মেমোরিতে গেঁথে রাখে, যা হবে ফ্যাসিবাদের পুনরুত্থানরোধক।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশে শেখ মুজিব ও শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসন এবং একচ্ছত্র পারিবারিক কর্তৃত্ব এবং ঘৃণ্যতম আমিত্বের কুকর্ম এক শেইমলেস লাই বা লজ্জাহীন মিথ্যাচারী অসভ্যতা তৈরি করেছিল। লাই বা মিথ্যাচার এদের উভয়ের ফ্যাসিবাদে ছিল নিকৃষ্টতম পর্যায়ে পৌঁছে যাওয়া নোংরামি। লাই বা মিথ্যাচারের পুঁতি গন্ধময় দৃষ্টান্ত হচ্ছে-শেখ মুজিব স্বাধীনতা ঘোষণা করেনি। পরে কাহিনি বানানো হয়েছিল অনেকগুলো পরস্পরবিরোধী অবাস্তব গাঁজাখুরি গল্প দিয়ে। মুজিব স্বাধীনতা ঘোষণা করতে, পাকিস্তান ভাঙার দায়িত্ব নিতে মোটেও রাজি ছিল না। তাজউদ্দীনের টেপরেকর্ডারে স্বাধীনতার ঘোষণা রেকর্ড করতে, লিখিত ঘোষণায় স্বাক্ষর দিতে এবং এমনকি আন্ডারগ্রাউন্ডে যেতেও রাজি ছিল না। সে টিক্কা খান-রাও ফরমান আলীর সঙ্গে পূর্ব যোগাযোগ মতো ২৭ মার্চ হরতাল ডেকে ২৫ মার্চ ১৯৭১ রাতেই পাকিস্তান আর্মির হাতে ধরা দেয়। স্বাধীনতার ঘোষণা করেছেন ২৫ মার্চ মধ্যরাতে অর্থাৎ ২৬ মার্চ ১৯৭১-এ তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমান। বাস্তবে মুজিবের সমগ্র পরিবার পুরো মুক্তিযুদ্ধকালে হাসিনাসহ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আপ্যায়নে ও সরকারিভাবে মাসোহারা নিয়ে ধানমন্ডিতেই আরেক বাসায় বহাল তবিয়তে ছিল। তাই প্রকৃত ইতিহাসকে লাই বা মিথ্যাচার দিয়ে ঢাকা যাবে না। এভাবে প্রতারক শেখ হাসিনা কর্তৃক ১/১১-এর সরকারকে সমর্থনদান, ক্ষমতায় আসার পথ তৈরি করা এবং ২০০৯, ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪-এর নির্বাচনী প্রহসন ও ইতরামিকে কোনো মিথ্যাচার দিয়ে হাসিনা ঢাকতে পারেনি বলেই তার ফ্যাসিবাদের পতন ঘটেছে। সে পালিয়েছে লেজ গোটানো নেড়ির মতো। গোপালি দাসী হয়ে চলে গেছে তারই গোমূত্র পানকারী হিন্দুত্ববাদী প্রভুর দেশে। যারা ১৫ বছরে সীমান্তে হত্যা করেছে ৫৮৮ জন বাংলাদেশিকে, আহত করেছে ৭৭৩ জনকে। আর ৭ জানুয়ারি ২০২৫ তারিখে ফেলানী হত্যা দিবসেও চুনারুঘাট সীমান্তে এক বাংলাদেশিকে হত্যা করা হয়েছে। যাই হোক, এখন সমস্যা হচ্ছে যে মুজিব মরে গেলেও, হাসিনা পালিয়ে গেলেও তাদের দ্বারা জন্ম দেওয়া চরম মিথ্যাচারের, নয়-ছয় ও ভোল পাল্টানোর যাচ্ছেতাই বানোয়াটের কালচার বা সংস্কৃতি পিতা-কন্যার ভিন্ন ভিন্ন সময়ের ফ্যাসিবাদে সারাক্ষণ এক জঘন্য বাস্তবতা হয়েই রয়ে গেল।

মুজিবের ফ্যাসিবাদী মিথ্যা ও কিচ্ছা উলঙ্গ হয়েছিল ডেভিড ফ্রস্ট, ওরিয়ানা ফাল্লাচি এবং জেরাল্ড ফোর্ডের সামনে। হাসিনার ফ্যাসিবাদী মিথ্যা ও কিচ্ছা সব লিমিট ছাড়িয়েছিল তার জীবনের প্রতিটি সংবাদ সম্মেলনে, সংসদে দেওয়া প্রতিটি বক্তৃতায় এবং জনসভায় দেওয়া প্রতিটি ভাষণে। বর্ষা বিপ্লবের এত বর্ষণের পরও কি গেল না ঘসেটি বেগমের ঘা-যুক্ত ঘর্ষণ? এ দেশের ভেরি লো পলিটিক্যাল কালচারে মিথ্যাচার আজও প্রথম, প্রধান ও প্রভাবশালী উপাদান আর এটাই ফ্যাসিবাদের চরিত্র-বৈশিষ্ট্য। মুজিবের ফ্যাসিবাদ ও হাসিনার ফ্যাসিবাদ লাই বা মিথ্যাচার আকীর্ণ ছিল। রাষ্ট্র পরিচালনায়, সরকারি ব্যবস্থাপনায়, প্রশাসন কাঠামোয়, রাজনীতিতে, অর্থনীতিতে, রাষ্ট্রীয় কোষাগার ব্যবহারে, ব্যাংকে, বাজারে, বাণিজ্যে, অবৈধ সিন্ডিকেটে, মধ্যস্বত্বে, বাজেটে, শিক্ষায়, সংস্কৃতিতে, জাতীয় আয়ে, দারিদ্র্যবিমোচনে, উন্নয়ন ভাবনায়, পররাষ্ট্রনীতিতে, দল পরিচালনায় তথ্যের প্রবাহেÑসর্বত্র লাই বা মিথ্যাচার হয়ে গিয়েছিল মুজিব ও হাসিনা, তাদের সরকার, প্রশাসন, আমলাতন্ত্র, দলীয় কাঠামো, আইন-আদালত, পারপিট্রেইটিং অলিগার্কির প্রধানতম অস্ত্র ও থাম্ব রুল। এর ফল হয়েছিল পিতা ও কন্যা উভয়ের ফ্যাসিবাদে রাষ্ট্র বিকৃত হয়েছিল চরম মাত্রায়। সরকার বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল বাস্তবতা থেকে, শহর-গ্রামের বিস্তীর্ণ ভূখণ্ডের জনসমাজ থেকে। শিক্ষা, সংস্কৃতি, দ্বীনকে বিপর্যস্ত করা হয়েছিল ধ্বংসের শেষ সীমায় নিয়ে গিয়ে। সংবাদপ্রবাহ, জনমত, জনসম্মতি, শিক্ষা, জ্ঞান, রুচি, ভব্যতা, সততা-সবকিছু মিথ্যার বেনো পানিতে ডুবে গিয়েছিল। জনজীবন বিপন্ন হয়েছিল। স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ, ইতিহাসÑসবই পড়েছিল চরম বিকৃতির খপ্পরে। শেষাবধি দল, গোষ্ঠী, পরিবার হয়ে ব্যক্তির স্বেচ্ছাচার চরম ক্ষমতার জন্ম দিয়েছিল। আওয়ামী-বাকশালী ফ্যাসিবাদে পিতার ও কন্যার উভয় শাসনে ক্ষমতা চরম কুক্ষিগত হয়েছিল। জনসমাজ ছিল বিচ্ছিন্ন। ভয়তন্ত্র কায়েম হয়েছিল হাসিনার ফ্যাসিবাদে। সবচেয়ে দুঃখের বিষয় এমন ঘৃণ্য ফ্যাসিবাদ এবং তার সঙ্গে হিন্দুস্তানি হিন্দুত্ববাদী আধিপত্যবাদের সংযুক্তি বাংলাদেশের স্বাধীনতা, রাষ্ট্রীয় আমানতদারি সার্বভৌমত্ব, ভৌগোলিক অখণ্ডত্ব এবং ভূরাজনৈতিক, অপরচ্যুনিটিকে ভালনারেবিলিটিতে রূপান্তরিত করে সবকিছুকে শেষ করেছিল।

অথচ শতকরা ৯২ দশমিক ৫০ ভাগ মুসলিমের দেশে আজকের জীবনে পৌঁছানোর যে ঐতিহাসিক পরিক্রমা, শর্ত ও সূত্র- সবই মূলত ইসলাম ও মুসলিমের জীবন এবং দ্বীনের সঙ্গে সম্পর্কিত। একই ধারাবাহিকতায় পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা, ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশের আবির্ভাব এবং ২০২৪-এর গণ ও সমষ্টি আত্মপরিচয় আর আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে অনিবার্যভাবে ও অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত হয়েছে দ্বীন ইসলামের সঙ্গে বাংলাদেশি সত্তাসংশ্লিষ্ট বিষয়াদি নিরঙ্কুশ গরিষ্ঠের জীবন জিজ্ঞাসা ও অন্য ধর্মাবলম্বীদের নাগরিক সত্তায় সংযুক্তি আর ঐক্যচেতনাকে সম্ভব করেছে। কিন্তু ফ্যাসিবাদী লাই বা মিথ্যাচার ওই কল্যাণধর্মিতা ও বাস্তব সামষ্টিক উন্নয়ন বোধের সঙ্গে শত্রুর অবস্থান গ্রহণ করে। আর সে জন্যই শেষাবধি ঘটে ২০২৪-এর অভূতপূর্ব ছাত্র-গণঅভ্যুত্থান। লক্ষণীয় যে হক বা সত্যকে ছেড়ে বাতিল বা মিথ্যাকে গ্রহণ করার সুযোগ নেই রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে। কায্যাব বা মিথ্যাবাদীকে স্বীকৃতি দেওয়া, মেনে নেওয়া, ছাড় দেওয়া, সহ্য করা, পতনের পর পুনর্বাসনÑএসবই আমাদের তাওহিদভিত্তিক জীবনবোধ, জীবন জিজ্ঞাসা ও জীবনচর্চার চূড়ান্ত বিরোধী। তাই পতিত আওয়ামী মিথ্যাচারভিত্তিক ফ্যাসিবাদকে চিরতরে কবরস্থ করতে হবে। আর তাদের সৃষ্ট ফ্যাসিবাদী মিথ্যা কালচারকে বর্জন করতে হবে। নতুন সংবিধান ও রাষ্ট্র বন্দোবস্ত দাঁড়াবে হক বা সত্যের ভিত্তিতে। ফ্যাসিবাদ আঁস্তাকুড়ে যাবে শুধু এই পথে। অন্য কোনো বিকল্প নেই।

ওয়ামা আলাইনা ইল্লাল বালাগুল মুবিন। ওয়ামা তাওফিকি ইল্লা-বিল্লাহ। আলহামদু লিল্লাহি রাব্বিল আলামিন।

লেখক : প্রফেসর (অব.) রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন