এত বিশাল ছাত্র গণঅভ্যুত্থানের পরও বাংলাদেশের উসর ভূখণ্ডে ফ্যাসিবাদ গিয়েও যেন যায় না। নিষ্ফলা মাঠে হাহাকার চাষিজনের। পাষণ্ড বাবা দিয়ে শুরু হয়। পামরকন্যা দিয়ে বিষাক্ত হয়ে যায় আদিগন্ত জমিন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর প্রথমবারের মতো অবৈধ কর্তৃত্ববাদ, স্বৈরতন্ত্র, একনায়কত্ব, একদলীয় ব্যবস্থা, পরিবারতন্ত্র, এক ব্যক্তির বন্দনা-পূজা কায়েম করেছিল শেখ মুজিব। সমগ্র দেশকে ডুবিয়ে দিয়ে তলাবিহীন ঝুড়িতে রূপান্তরিত করেছিল সে। তার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ পাকিস্তানি কাঠামোয় এলএফওর অধীনে নির্বাচন করে স্বাধীন দেশে পাকিস্তান আমলে এমএনএ ও এমপিএদের নিয়ে গণপরিষদ গঠন করেছিল এবং অবশেষে বিনা নির্বাচনে ক্ষমতা কুক্ষিগত করেছিল। ভারত কর্তৃক অনুমোদিত ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের স্পিরিট এবং গণ-আকাঙ্ক্ষাবিরোধী ১৯৭২-এর সংবিধান স্বৈরাচারী কায়দায় সমগ্র দেশের ওপর চাপিয়ে দিয়েছিল। লুটপাটতন্ত্র, গুণ্ডামি ও খুনখারাবিতন্ত্র, চরম অযোগ্যের দম্ভতন্ত্র কায়েম করেছিল শেখ মুজিব ও তার দল আওয়ামী লীগ। তাদের ফ্যাসিবাদী প্রকাশ্য উচ্চারণ ছিলÑ ‘এক নেতা এক দেশ বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ’; ‘বিশ্বে এলো নতুন বাদ, মুজিববাদ মুজিববাদ’; ‘শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে কিছু উচ্চারণ করা হলে জিহ্বা টেনে ছিঁড়ে ফেলা হবে’; ‘আইনের শাসন চাই না, মুজিবের শাসন চাই’; ‘সার্বভৌম শেখ মুজিব’; ‘বন্ধুরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কিছু উচ্চারণ করা যাবে না’; ‘কোথায় আজ সিরাজ শিকদার?’; ‘লাল ঘোড়া দাবড়ায়া দিমু’ ইত্যাদি। সেই সঙ্গে চুরিচামারি, লুচ্চামি, চরম অব্যবস্থাপনা, নজিরবিহীন অকেজো সরকার, ভারতের পদলেহন এবং বাংলাদেশকে ভারতের হিন্দু আধিপত্যবাদের ও সম্প্রসারণবাদের উপনিবেশে পরিণত করেছিল শেখ মুজিব।
শেষ পর্যন্ত চরমভাবে জন-অধিকার লঙ্ঘন করে, ভয়াবহ দলীয় লুটপাটতন্ত্র কায়েমসহ ৪০ হাজারের মতো মানুষ খুন করে, জেল-জুলুমে, গুম-হত্যায় জর্জরিত করে কয়েক লাখ মানুষকে ১৯৭৪-এর দুর্ভিক্ষে জীবন কেড়ে নিয়ে একদলীয় বাকশাল কায়েম করেছিল। অবশেষে সম্পূর্ণ জনবিচ্ছিন্ন অবস্থায় মুক্তিযোদ্ধা সামরিক অফিসারদের হাতেই গোষ্ঠীসুদ্ধ জীবন দিয়েছিল। শেখ মুজিব ও আওয়ামী লীগই দ্বিতীয় সংশোধন দিয়ে মৌলিক অধিকার হরণ করেছিল। এরাই ৭০ অনুচ্ছেদ, ইমার্জেন্সি প্রভিশন ও মৌলিক অধিকার বাতিল ব্যবস্থা রাখা, স্পেশাল পাওয়ারস অ্যাক্ট ১৯৭৪, প্রিন্টিং অ্যান্ড পাবলিকেশনস অ্যাক্ট ১৯৭৪-সহ ১৯৭৫-এর ২৫ জানুয়ারি সাড়ে ৩ বছরের মাথায় মাত্র ১৩ মিনিটে এক জল্লাদ ফ্যাসিস্টের ইচ্ছায় একদলীয় বাকশালী ফ্যাসিবাদ কায়েম করেছিল। বিনাভোটে প্রধানমন্ত্রী থেকে পাঁচ বছরের জন্য রাষ্ট্রপতি হয়েছিল এবং আজীবন থাকার স্বপ্ন দেখেছিল।
শেখ মুজিবের সাড়ে ৩ বছরের অপশাসন ছিল বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদ কায়েমের গোড়ার নমুনা, যা এক প্রলম্বিত প্রচ্ছায়া নিয়ে আবার ফিরে এসেছিল তারই দানবী কন্যা খুনি শেখ হাসিনার বিশেষত দ্বিতীয় শাসনামলের (২০০৯) গোড়া থেকেই। দুনিয়ার অন্যত্র ফ্যাসিবাদের যে চরিত্র, বৈশিষ্ট্য, শর্ত ও দুষ্কর্মের হালত, তার সবকিছুই পিতা ও কন্যার দুঃশাসনে হাজির ছিল। আর ২০২৪-এর দুনিয়া কাঁপানো নজিরবিহীন ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে খুনি হাসিনাকে জনগণ প্রচণ্ড গণরোষ ও গণ-প্রতি আক্রমণের মুখে গদি ছেড়ে, আঠাশ লাখ কোটি টাকা লুট ও পাচার করত এবং সঙ্গে ১৪টি স্যুটকেস (মালপানি, ডকুমেন্টস, অত্যাধুনিক টেলিফোন সেটসহ) এবং তার লুটপাটের ভাগীদার ও হিসাবের ক্যাশিয়ার বোন শেখ রেহানাকে নিয়ে ত্রস্ত হয়ে ভাগতে হয়েছিল। ঘনিষ্ঠ আত্মীয় ও অবৈধ নিয়োগে সামরিক উপদেষ্টা এবং সামরিক বাহিনীকে ধ্বংস করার কারিগর বদমাশ মেজর জেনারেল তারিক সিদ্দিকীকে নিয়ে প্রথমে এয়ার ফোর্সের হেলিকপ্টার ও পরে এয়ার ফোর্সের প্লেনে করে রাডার বন্ধ করে মিথ্যা ছড়িয়ে দেশ ছেড়ে পালাতে হয়েছিল তাকে। প্রকৃতপক্ষে গুজরাটের কসাই হিন্দুত্ববাদী আরএসএসের গোমূত্র পানকারী সাভারকারের ভাবশিষ্য দামোদো দাস মোদির কোলে আশ্রয় নিতে হয়েছে তাকে। ‘হাসিনা পালায় না’ বলে দম্ভোক্তি করেও জানের ডরে তিলক-সিঁদুরকে আশ্রয় করে হিন্দুত্ববাদী হিন্দুস্তানেই তার ঠাঁই মিলেছে। ফ্যাসিবাদের পতন ১৯৭৫-এ যেমনÑ ২০২৪-এও তেমনভাবে ঘটেছে।
কিন্তু এত বড় মনসুন রিভোলিউশনের পরও কি আমাদের দেশে সত্যিকার বিপ্লবী সরকার গঠিত হয়েছে? যারা উপদেষ্টা পরিষদে ঢুকেছে, তারা কি যোগ্যতায় ঢুকেছে আর করছেই বা কী। ফ্যাসিস্ট সংবিধান কি আস্তাকুঁড়ে গেছে? রাষ্ট্র কাঠামোর কি বদল হয়েছে? সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্র ও পুলিশে কি কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন হয়েছে? র্যাব কি বাতিল হয়েছে? গোয়েন্দাদের অস্বাভাবিক দাপট কি কমেছে? বিপ্লবের কর্মসূচি ঘোষণা ও যথাযথ কার্যক্রম কি গৃহীত হয়েছে? বিপ্লবী নতুন কালচার ও জীবনদৃষ্টি কি গৃহীত হয়েছে? শুধু ন্যূনতম বিষয়াদি তথা বাজারমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, বেকারদের চাকরি, শহীদদের পরিবারদের ক্ষতিপূরণ, আহতদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন কাজটুকুও কি করতে পেরেছে এই কোমরভাঙা উপদেষ্টা পরিষদ কর্তৃক? কেন তারা আজও নুয়ে পড়ছে পতিত ফ্যাসিবাদের দোসরদের কাছে এবং ভারতীয় হিন্দুত্ববাদী আধিপত্যবাদের পদতলে?
বিশ্বপরিসরে ফ্যাসিবাদ ও পরিণতি
লাতিন শব্দদ্বয় তথা ফ্যাসি বা বান্ডল এবং ফ্যাসিজ তথা ওপরে কুড়াল রাখা একত্র রডের বান্ডলের প্রতীক গ্রহণ করে ইতালির একনায়ক বেনিতো মুসোলিনি (১৮৫৩-১৯৪৫) ফ্যাসিসমো বা ফ্যাসিজম নাম দিয়ে এক ভয়ংকর চরম স্বেচ্ছাতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করে। এভাবে সে বলপ্রয়োগ, ভীতি, জবরদস্তি শাসনের সূত্রপাত করে। মুসোলিনির ইতালিয়ানি দি কমবেটিমেন্টো অর্থাৎ সংঘাত-সংঘর্ষ-ভায়োলেন্সের ইতালিয় গোষ্ঠীÑ এ থেকেই সবচেয়ে অধিক কুখ্যাত ফ্যাসিজম ও ফ্যাসিস্টের আবির্ভাব ঘটে বিশ্বপরিসরে ১৯১৯ সালে।
মুসোলিনির এই ফ্যাসিবাদে মূল কুনীতি ও অপবিশ্বাসগুলো ছিলÑ ক্রেডিয়ার, কমবেটিয়ার, অবেডিয়ার, যেগুলোর প্রকৃত অর্থ করা যায় অপবিশ্বাস, নির্বিচার সংঘাত আর প্রশ্নহীন অন্ধ আনুগত্য। ফ্যাসিবাদের পতাকা, সংগীত, স্লোগান, তথাকথিত আদর্শ, কূপমণ্ডূক নেতৃত্ব ও দল দাসত্ব, অতীতের কল্পিত উচ্চ মার্গীয় ইতিহাস এবং অন্ধ দাম্ভিক জাতীয়তাবাদ, জনগণের মধ্যে কল্পিত শত্রুতা ও স্থায়ী বিভাজন করেও প্রহসনমূলক ঐক্যের আহ্বান ইত্যাদি বাস্তবে নিষ্ঠুরতম কসাইতন্ত্রের বলপূর্বক প্রতিষ্ঠা এবং আজীবন প্রলম্বিতকরণের লু-প্রিন্ট ও সুপারইমপজিশন। শুধু তাদের দ্বারা বর্ণিত মিথীয় অতীত, শুধু তাদেরই প্রশ্নহীন অতলায়তনে আটকে থেকে ভবিষ্যতের নয়াদিগন্তের অসভ্য খোয়াবকে ত্রাস ও ভীতির মাধ্যমে সর্বজনগ্রাহ্য করা হয়েছিল। বিকল্প বা ভিন্নতা, ন্যায্যতা ও বৈধতা, যুক্তি ও অধিকার, জন-ইচ্ছা ও অন্যমাত্রায় সমষ্টি কল্যাণ ফ্যাসিবাদে বলপূর্বক অস্বীকৃত ও দমিত। ব্যক্তিসত্তা, নৈতিকতা, মানবাধিকার, জনমত, জনসম্মতি, ঔদার্য, গণতন্ত্রÑ এসব নিতান্তই মূল্যহীন। বাংলাদেশে মুজিব ও হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসনে এসবই দেখেছি আমরা। এ ছাড়া এই উভয় ক্ষেত্রে আরও দুটি বৈশিষ্ট্য ছিল ইসলাম কোপানো এবং এক্সট্রা বর্ডার ওভারলর্ড হিসেবে ভারতীয় ব্রাহ্মণ্যবাদী হেজিমনি।
ফ্যাসিবাদ রাষ্ট্র, সরকার, শাসন, প্রশাসন, আইন, বিধান, অর্থনীতি, রাজনীতি, সংস্কৃতি, শিক্ষা, সামাজিকীকরণÑ সবকিছুই একদল, একনেতা, এক পরিবার, এক দাবির পদতলে পিষ্ট। পারসোনালিটি কাল্ট বা ব্যক্তি নেতৃত্ব পূজার আওতায় ফ্যাসিবাদে রাষ্ট্র এমন এক জীবন্তসত্তা, যার ইচ্ছার কাছে সবাই আত্মসমর্পণকারী হতে বাধ্য। ঐক্য, শাসন, শৃঙ্খলার নামে ব্যক্তি ও সমষ্টির স্বাধীনতাকে হত্যা করে ফ্যাসিবাদে এক নিষ্ঠুর ম্যাৎসন্যায় ও বিবর তৈরি করা হয়।
ফ্যাসিবাদের চিন্তা, বিবেচনা ও কার্য-কাঠামোয় হুমকি, বলপ্রয়োগ, নির্যাতন, টোপ, লোভাতুরকরণ, ব্ল্যাকমেইলিং, ত্রাস, ভীতি, দুর্নীতি ও দুর্বৃত্তায়নের লাইসেন্স দেওয়া হয়। নীরবতায় থাকো, চোখ বন্ধ করে রাখো আর অর্থবৃত্ত কামাও যেভাবে পারো। দরকার হলে পিয়ন হয়ে ৪০০ কোটি টাকার বেশি কামিয়ে হেলিকপ্টার কেন, আমেরিকায় চলে যাও। কোনো অসুবিধা নেই। কিন্তু অন্ধ আনুগত্য থাকতে হবে। আর যদি উচ্চারণ বা প্রতিবাদ করো, তাহলে নিজের জীবন চুকাতে হবে। এই ভয়ংকর চিত্র বাংলাদেশে হাসিনার কুশাসনে পুরোপুরি বিদ্যমান ছিল। ফ্যাসিবাদের সংবিধান, আইন, বিধান, নিয়মকানুন, ব্যবস্থাপনা, সরকার পরিচালনা, জনসম্পর্ক ইত্যাদি সবই অযৌক্তিক, অনৈতিক ও স্বেচ্ছাচারী। এখানে সর্বত্র মবিলাইজেশন অব বায়াস তথা একতরফা পক্ষপাতদুষ্ট সমাহারকরণ চলে। এসপিওনেজ, গোয়েন্দা প্রাধান্য ও নির্ভরতা, পুলিশি রাষ্ট্র এবং আমলাতন্ত্রের নিকৃষ্টতম দাসত্ব ও মচ্ছব ফ্যাসিবাদ টিকে থাকার অন্যতম শর্ত। অর্থনীতি, রাজনীতি, শিক্ষা, সংস্কৃতি, প্রচারমাধ্যমÑ সবই একমুখী দাসত্বনির্ভর। এ জন্য বৈষম্য, অসম উন্নয়ন, অবনয়ন ধস, ম্যালফাংশন, ডিসফাংশন, ম্যানুফ্যাকচারিং কনসেন্ট, জিনি কো-এফিশেন্ট ফ্যাসিবাদের অনিবার্য প্যানোরমা ও পরিণতি। গুংহো ক্যাপিটালিজমের বিপরীতে ও নিয়ন্ত্রণে এখানে থাকে ক্রনি লুম্পেন ক্যাপিটালিজম। অলিগার্কি ও ক্লিপটোক্রেসি এখানে গভীর শিকড় গাড়ে।
কিন্তু এই অনাচার এক অসভ্য চাপানো সামাজিকীকরণ ও সংস্কৃতির পরিমণ্ডল দ্বারা পলেস্তারা আবৃত। কখনও বা একেবারেই উলঙ্গ ঠিক যেমনটি ফ্যাসিবাদী খুনি হাসিনার শেষ ষোলো বছরের কুশাসন আমলে দেখা গেছে। এসবকেই উন্নয়ন উল্লম্ফন, রোল মডেল, বিকল্পহীন নেতৃত্ব মাহাত্ম্য হিসেবে দেখানো হয়েছে।
এমনটি ফ্যাসিবাদ অন্যত্র নাজিজম বা নাৎসিবাদ রূপে, ন্যাশনাল সোশ্যালিস্ট পার্টি নামে জার্মান আইনসভা তথা রাইখ্স্টাগ জ্বালিয়ে দিয়ে অ্যাডলফ হিটলারের নেতৃত্বে ১৯৩০-এর দশকে জার্মানিতেও প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। জাপানেও ওই সময় যুদ্ধবাজ স্বৈরাচার বাস্তবে ফ্যাসিবাদী চরিত্র পেয়েছিল। এ জন্য ইতালি, জার্মানি, জাপানের মধ্যে অক্ষশক্তি গড়ে ওঠে। এইচ উইলেমস এ জন্যই ফ্যাসিবাদ-নাজিবাদকে যেনোফবিক ফোর্স, কালপ্রিটদের সম্মিলন এবং সংঘাত বিস্তারক বলে উল্লেখ করেছেন। পি এইচ মার্কেল এদের চিহ্নিত করেছেন ‘স্ট্রর্ম ট্রুপার’ হিসেবে। আর ডি ফ্যালিস মুসোলিনির ফ্যাসিবাদকে ক্ষমতা ছিনতাইকারী, ক্ষমতা খাদক হিসেবে ঘোষণা দিয়েছেন। তুলনীয় দৃষ্টান্ত হচ্ছে ১৯৭২-৭৫ সালে বাংলাদেশে মুজিবের নিকৃষ্টতম কুশাসন। এটা ছিল রূপক অর্থে ‘মুনতাসির ফ্যান্টাসি’। আর খুনি শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদে এটা হয়েছিল ‘বিশ্ব হারামি’রূপক অর্থে।
আরেকজন বিশ্লেষক জন এলসটার ফ্যাসিবাদকে দেখেছেন মন, ভীতি, মজ্জা আঘাতকারী, ফোবিয়া সৃষ্টিকারী ইত্যাদির অ্যালকেমি হিসেবে, যেখানে জবরদস্তি ও অন্তর্ঘাতের মাধ্যমে সিস্টেম মেইনটিন্যান্স ও স্ট্যাটাসকো বজায় রাখা হয়। ফ্যাসিবাদে র্যাশনালিটির কোনো মূল্য নেই। কোয়ার্শন, ব্লাইন্ড ফেইথ, আন কোয়েশ্চন্ড লয়্যালটি এখানে একমাত্র ওয়ার্কিং ফর্মূলা। এখানে ডেসিশন ও অ্যালোকেশন সবচেয়ে ইতরামিতে পৌঁছায় সম্পূর্ণ জনবিচ্ছিন্ন থেকে। বাংলাদেশে শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদের সাম্প্রতিকতম প্রকৃষ্ট নমুনা। ১৬ বছর এই মিথ্যাচার ও অসভ্যতাকে মেনে নিতে জনগণকে বাধ্য করা হয়েছিল যে, শেখ হাসিনা বিশ্বনেত্রী, আয়রন লেডি। তার বিকল্প কেউ নেই। সে আল্লাহ প্রেরিত ও জান্নাতি ঠিক তার প্রভু মোদির মতো। ‘শেখ হাসিনার সরকার বারবার দরকার’। দেশ তার ও তার পরিবারের। কেননা তার বাবা একাই দেশ স্বাধীন করে দিয়েছে। এ বিষয়গুলো যখন মানুষ রুখে দাঁড়িয়েছে, তখনই মনসুন রিভোলিউশনের মাধ্যমে খুনি শেখ হাসিনার পতন ঘটেছে।
লক্ষণীয় যে, নেতিবাচক অর্থে ধ্রুপদি দুই ফ্যাসিবাদের পরিণতির কথা সর্বাগ্রে বলা যায়। ইতালির বেনিতো মুসোলিনি ও তার ফ্যাসিবাদ উৎখাতপ্রাপ্ত হওয়ার পর মুসোলিনিকে হত্যা করে উল্টো করে ঝুলিয়ে রেখেছিল সে দেশের জনগণ এবং তার ন্যাশনাল ফ্যাসিস্ট পার্টিকে চিরতরে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। তার অনুসারীরা ক্যাপিটাল পানিশমেন্ট পেয়েছিল। জার্মানির অ্যাডলফ হিটলার সম্পূর্ণ পরাজিত অবস্থায় আত্মসমর্পণ করেছিল ১৯৪৫ সালের ৩০ এপ্রিল। তার নাজি পার্টি নিষিদ্ধ করা হয়েছিল চূড়ান্তভাবে, চিরতরে। তার সাঙ্গ-পাঙ্গদের এখনও খোঁজ পেলেই মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। গোড়া থেকে নূরেমবার্গ ট্রায়ালের ইতিহাসও রয়েছে। এখনও ইতালিতে নিও-ফ্যাসিবাদ ও জার্মানিতে নিও-নাজিবাদের অস্তিত্ব একদম সহ্য করা হয় না। এই দুদেশে যথাক্রমে ফ্যাসিবাদ ও নাজিবাদ ধ্বংস করে দিয়ে জনসম্মতি ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে এবং তা আজও টিকে আছে। ২০২৪ সালে বর্ষা বিপ্লবের পর এবার আমাদেরও একান্ত করণীয় হাসিনার চাপানো রিপাবলিক ও গণতন্ত্র ভণ্ডামির নামে নিরঙ্কুশ ইন্ডিয়ান হেজিমনিনির্ভর ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রকাঠামো ডিকন্সট্রাক্ট করে নতুন জনসম্মতিনির্ভর প্রকৃত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রকাঠামো ও শাসন বন্দোবস্ত রিকন্সট্রাক্ট করা।
তাহলে এখন কী করতে হবে? প্রথমত, ফ্যাসিস্ট খুনি হাসিনা ও তার ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগ এবং সব অঙ্গসংগঠনকে চিরতরে নিষিদ্ধ করতে হবে। তাদের নিবন্ধন বাতিল করতে হবে। তাদের ভবিষ্যতের সব নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করতে হবে। ভিন্ন নামেও যেন এরা রাজনীতিতে পুনর্বাসিত হতে না পারে, সে ব্যবস্থা নিতে হবে। আওয়ামী লীগ বরাবরই সবাইকে মেরেছে, কিন্তু নিজেরা মার খায়নি। এখন আওয়ামী লীগকে এমনভাবে হটাতে হবে, যেন আর কোনো দিন মাথা তুলে দাঁড়ানোর সাহস না করে। দ্বিতীয়ত, এদের দ্বারা লুটপাটকৃত যাবতীয় সম্পদ বাজেয়াপ্ত করতে হবে। বিদেশে এদের পাচারকৃত সমুদয় অর্থ ফিরিয়ে আনতে হবে। তৃতীয়ত, এদের দৃষ্টান্তমূলক ক্যাপিটাল পানিশমেন্টের আওতায় আনতে হবে। চতুর্থত, রাষ্ট্রব্যবস্থায় সত্যিকার জন-মালিকানা প্রতিষ্ঠা করতে হবে এবং বাতিল করতে হবে পারপিচ্যুয়াল এলিট রুল। পঞ্চমত, বিদ্যমান সংবিধান বাতিল করে নতুন সংবিধান বানাতে হবে। চরম ফ্যাসিবাদী মুজিববাদ ও হাসিনাবাদ বাতিল করতে হবে। ষষ্ঠত, সামরিক বাহিনী, পুলিশ, আমলাতন্ত্রসহ সব প্রতিষ্ঠান কাঠামোয় আমূল পরিবর্তন আনতে হবে আইনবিধান, নিয়মনীতি, ভূমিকা-কাজ, দৃষ্টিভঙ্গি-আচরণ, দায়-দায়িত্বসহ সম্পূর্ণ অবস্থানের পরিবর্তন এনে। বিচার বিভাগকেও চূড়ান্তভাবে বদলে ফেলতে হবে। যেমন বদলাতে হবে নির্বাচন কমিশনকে এবং জেলা প্রশাসনকে। সপ্তমত, আর্থসামাজিক ব্যবস্থায় মৌলিক সম্পর্কে ও কার্যকাঠামোয় পরিবর্তন আনতে হবে সব ক্ষেত্রে বৈষম্যহীনতা প্রতিষ্ঠা করে, ন্যায়বিচার কায়েম করে, যোগ্যতা ও প্রাপ্যতাকে ভিত্তি করে। অঞ্চল, শ্রেণি, প্রতিষ্ঠান, কাঠামোসহ সব ক্ষেত্রে ক্ষমতা ও বরাদ্দে আমূল ও যৌক্তিক পরিবর্তন আনতে হবে। অষ্টমত, শিক্ষা-সংস্কৃতি-নৈতিকতার পরিমণ্ডলে খোলনলচে পরিবর্তন আনতে হবে। নবমত, রাষ্ট্র, সরকার ও প্রশাসনের সব পর্যায়ে গণবিজড়ন, গণ-অংশগ্রহণ, গণনির্ভরতা, গণক্ষমতায়ন, গণনিরীক্ষা, গণসম্মতি ও গণসিদ্ধান্ত প্রতিষ্ঠা করতে হবে। গণভোট, সর্বজনীন ভোটাধিকার, প্রশ্ন উত্থাপন, রিকল, ইনিশিয়েটিভ, প্লেবিসাইট, পাবলিক হিয়ারিং, গণসংযোগ, গণবার্তাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে কার্যকরভাবে। সব ধরনের মিডিয়া গণমুখী ও সেবামুখী হতে হবে। দশমত, পাওয়ার ট্রান্সফার মেকানিজম জন-ইচ্ছাভিত্তিক ও মৌল-ঐকমত্যনির্ভর হতে হবে। একাদশত, সরকারের রূপ এবং রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকারের নির্বাহী এবং সংসদের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য আনতে হবে। দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। দ্বাদশত, ভারতীয় হেজিমনি, ইন্ডিয়ান হিন্দুত্ববাদ রুখতেই হবে। বাংলাদেশের জন্য নতুন পররাষ্ট্রনীতি হবে সার্বভৌমত্ব, সমতা, ন্যায়বিচার ও জাতীয় স্বার্থভিত্তিক। চিরতরে সরাতে হবে বহিঃশক্তির দাপট এবং উৎখাত করতে হবে দিল্লির দাসত্বের সব শেকড়। গোপন ও অসম সব চুক্তি বাতিল করতে হবে। পানিসন্ত্রাস বন্ধ করতে হবে। তথ্যসন্ত্রাস রুখতে হবে। সীমান্ত হত্যা শূন্যে আনতে হবে। আঘাত করলে পাল্টা প্রত্যাঘাতের শক্তি ও সংস্কৃতি চালু করতে হবে। সারা বাংলাদেশের মানুষকে নিয়ে সিটিজেন আর্মি রিজার্ভ ফোর্স হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। আমাদের ভূখণ্ড, আমাদের সমুদ্রসীমা, আমাদের আকাশসীমা, আমাদের সম্পদ এবং আমাদের ভূরাজনীতি, আমাদের জাতীয় স্বার্থের বিরুদ্ধে যেতে দেওয়া চিরতরে রুখে দিতে হবে। সমাধান এ পথেই। ফ্যাসিবাদও যাবে এ পথেই।
ড. হাসানুজ্জামান চৌধুরী
প্রফেসর (অব.), রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

