সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বেশ কিছু বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড বিশ্ববাসীকে অনেকটা বিস্মিত করেছে। ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রপ্রধানকে অপহরণ, কলম্বিয়ার ওপর চাপ সৃষ্টি কিংবা গ্রিনল্যান্ডকে নিজেদের অংশ করে নেওয়ার প্রকাশ্য ঘোষণা, অনেকের কাছেই এগুলো ‘উদ্ভট’ মনে হতে পারে। কিন্তু গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই পদক্ষেপগুলো মোটেও উদ্ভট নয়, বরং এক সুগভীর ও পরিকল্পিত কৌশলের অংশ।
১৮২৩ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জেমস মনরো একটি ঐতিহাসিক নীতি ঘোষণা করেছিলেন, যা ‘মনরো নীতি’ (Monroe Doctrine) নামে পরিচিত। এর মূল কথা ছিলÑপশ্চিম গোলার্ধে ইউরোপীয় শক্তির কোনো হস্তক্ষেপ বরদাস্ত করবে না ওয়াশিংটন। দীর্ঘ দুই শতাব্দী ধরে লাতিন আমেরিকায় মার্কিন হস্তক্ষেপ ও আধিপত্যের প্রধান ঢাল ছিল এই নীতি। বর্তমানে ট্রাম্প প্রশাসন সেই মনরো নীতিকেই এক নতুন ও আগ্রাসী রূপ দিয়েছে, যাকে বিশ্লেষকরা বলছেন ‘ডনরো নীতি’ (Donroe Doctrine)। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজেই বলেছেন, ‘মনরো মতবাদ একটি বিরাট ব্যাপার, কিন্তু আমরা এটিকে অনেক, অনেক বেশি করে ছাড়িয়ে গিয়েছি…। তারা এখন এটিকে ডনরো মতবাদ বলে। পশ্চিম গোলার্ধে আমেরিকান আধিপত্য আর কখনো প্রশ্নবিদ্ধ হবে না।’ (দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস, ৩ জানুয়ারি, ২০২৬)
খনিজ যুদ্ধের ময়দান : লাতিন আমেরিকা
২০২৬ সালের এই সময়ে দাঁড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্রের এই আগ্রাসনের নেপথ্যে রয়েছে ভবিষ্যতের জ্বালানি ও প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণ। একসময় ‘গানবোট ডিপ্লোম্যাসি’ দিয়ে কূটনীতি চলত মূলত কয়লা ও তেলের জন্য। এখন সেই লড়াইয়ের কেন্দ্রে জায়গা করে নিয়েছে দুর্লভ খনিজ (Rare Earth Minerals)Ñলিথিয়াম, কপার, গ্রাফাইট ও গ্যালিয়াম। ব্যাটারি তৈরি, ড্রোন, সেমিকন্ডাক্টর থেকে শুরু করে এআই ডেটা সেন্টার ও আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রের জন্য এই খনিজগুলো অপরিহার্য।
ভেনেজুয়েলায় শুধু বিশ্বের ২০ শতাংশ তেল মজুত নেই, সেখানে আছে সেমিকন্ডাক্টর তৈরির প্রধান উপাদান গ্যালিয়াম। একইভাবে পুরো লাতিন আমেরিকায় রয়েছে বিশ্বের ৬০ শতাংশ লিথিয়াম এবং ৪০ শতাংশ কপার। বর্তমানে এই খনিজসম্পদের বড় অংশ যাচ্ছে চীনের কবজায়। ‘এইড-ডেটা’ (AidData)-এর তথ্যমতে, ২০০০ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে চীন লাতিন আমেরিকায় প্রায় ৩০৩ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। যুক্তরাষ্ট্র যখন এই অঞ্চলে ১ ডলার ঋণ দিয়েছে, চীন সেখানে দিয়েছে ৩ ডলার। চীন মার্কিন আধিপত্যকে প্রতিস্থাপন করেনি, তবে এটি ১৯৮০ এবং ১৯৯০-এর দশকে ওয়াশিংটনের যে আধিপত্য ছিল, তা ক্ষয় করেছে। চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, ২০২৪ সালে চীন ও লাতিন আমেরিকার দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ৫১৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা ১০ বছর আগে নির্ধারিত ৫০০ বিলিয়ন ডলারের লক্ষ্যকে ছাড়িয়ে গেছে। ওয়াশিংটন এখন যেকোনো মূল্যে এই ‘চীনা প্রভাব’ হটিয়ে নিজের হারানো আধিপত্য পুনরুদ্ধার করতে চায়।
গ্রিনল্যান্ড ও আর্কটিকের নীলনকশা
যুক্তরাষ্ট্রের নজর শুধু দক্ষিণ দিকেই নয়, বরং উত্তর মেরুর গ্রিনল্যান্ডের দিকেও। আর্কটিক মহাসাগরের কূল ঘেঁষে অবস্থান করা গ্রিনল্যান্ড নিজেদের করে নেওয়ার ইচ্ছা যুক্তরাষ্ট্রের আজকের নয়। ১৯৪৬ সালে হ্যারি ট্রুম্যান গ্রিনল্যান্ড কেনার চেষ্টা করেছিলেন, আর এখন ট্রাম্প সেই প্রচেষ্টাকে পূর্ণতা দিতে চান। আর্কটিক মহাসাগর সংযোগ করেছে প্রশান্ত ও আটলান্টিক মহাসাগরকে। এটি কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রকে আলাদা করেছে রাশিয়া থেকে। বৈজ্ঞানিক climate model-এর গবেষণায় দেখা গেছে, চলমান উষ্ণায়নের ফলে ২০৫০ সালের মধ্যে আর্কটিক মহাসাগর গ্রীষ্মে প্রায় বরফশূন্য বা খুব কম বরফযুক্ত অবস্থায় থাকতে পারে। তখন আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের একটি বিশাল অংশ এই রুট দিয়ে সম্পন্ন হবে। এছাড়া গ্রিনল্যান্ডে আছে তেল, গ্যাস ও খনিজের বিপুল সম্ভার। বর্তমানে আর্কটিকের প্রায় অর্ধেক নিয়ন্ত্রণ করে রাশিয়া। যুক্তরাষ্ট্র যদি গ্রিনল্যান্ডকে নিজের নিয়ন্ত্রণে নিতে পারে, তবে তারা ‘GIUK Gap’ (গ্রিনল্যান্ড, আইসল্যান্ড ও যুক্তরাজ্য সংযোগকারী সমুদ্রপথ) নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। এছাড়া নিরাপত্তার প্রশ্নেও এটি গুরুত্বপূর্ণ। রাশিয়ার পারমাণবিক সাবমেরিন বা ব্যালিস্টিক মিসাইল রুখতে পোলার রুটে নজরদারি বাড়াতে গ্রিনল্যান্ডই যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সেরা কৌশলগত অবস্থান। ট্রাম্পের ভাষায়, ‘আমরা গ্রিনল্যান্ডে কিছু একটা করতে যাচ্ছি, তারা পছন্দ করুক বা না করুক আমরা এটি করব, কারণ আমরা যদি তা না করি, তাহলে রাশিয়া বা চীন গ্রিনল্যান্ড দখল করবে এবং আমরা আমাদের প্রতিবেশী হিসেবে রাশিয়া বা চীনকে চাই না।’ (এনবিসি নিউজ, জানুয়ারি ১০, ২০২৬)
‘ডনরো নীতি’ আসলে শুধু একজন প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা নয়, বরং ক্ষয়িষ্ণু মার্কিন আধিপত্য টিকিয়ে রাখার একটি মরণপণ চেষ্টা। লাতিন আমেরিকার খনিজসম্পদ আর আর্কটিকের কৌশলগত অবস্থান নিশ্চিত করতে না পারলে ভবিষ্যতে চীন-রাশিয়া জোটের সামনে ওয়াশিংটন তার বৈশ্বিক ‘হেজেমনিক’ অবস্থান ধরে রাখতে পারবে না। তাই আপাতত ডোনাল্ড ট্রাম্পের এসব কর্মকাণ্ডকে উদ্ভট বা পাগলামি মনে হলেও এটা আসলে মোটেও তা নয়। বরং ট্রাম্পের কর্মকাণ্ডগুলো আসলে আমেরিকার আগামী ৫০ বছরের প্রভাব বিস্তারের একটি নিপুণ ব্লু-প্রিন্ট।
লেখক : শিক্ষার্থী, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

