আজ থেকে সাত বছর আগে ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারির কথা হয়তো অনেকের মনে আছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে এটি ছিল এক কলঙ্কজনক দিন। এদিন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশে তার একমাত্র রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে চিরতরে নিঃশেষ করার যাবতীয় নীলনকশা প্রণয়ন করেছিলেন। একটি রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক দুর্নীতি মামলায় আদালতকে ব্যবহার করে গণতন্ত্রের লড়াইয়ে আপসহীন নেত্রী বেগম জিয়াকে কারারুদ্ধ করা হয়েছিল।
বেগম জিয়া যে শেখ হাসিনার শুধু রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বলি হতে যাচ্ছেন, তা দেশের মানুষের বুঝতে বাকি ছিল না। তাই বিএনপি নেত্রীকে নিয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রে মানুষ আশঙ্কাগ্রস্ত হয়ে পড়েছিল। সবার মনে একটি ভয় দানা বেঁধে উঠেছিল যে, কারাগারের নিঃসঙ্গ প্রকোষ্টে বয়োবৃদ্ধ অসুস্থ খালেদা জিয়ার জীবনের ওপর না জানি কোন হীন অপচেষ্টা চালানো হয়। কিছুদিনের মধ্যেই মানুষের ওই আশঙ্কা সত্য প্রমাণিত হয়।
একজন পরিপূর্ণ সুস্থ খালেদা জিয়াকে রাজধানীর নাজিম উদ্দিন রোডে পরিত্যক্ত ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে যেতে দেখেছিলেন দেশের মানুষ। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সেই সুস্থ বিএনপি নেত্রীকে আর দেখা যায়নি। যিনি কিনা হেঁটে হেঁটে কারাগারে গিয়েছিলেন, তাকে কিছুদিনের মধ্যেই হুইল চেয়ারে একেবারে জীর্ণশীর্ণ অবস্থায় দেখা যায়। কারাগারে তার ওপর যে ভয়ংকর মানসিক নির্যাতন চলেছে, তা মুহূর্তেই সবাই অনুধাবন করতে সক্ষম হন।
বেগম জিয়ার ওপর শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত আক্রোশ অনেকটা প্রকাশ্যই ছিল। বিভিন্ন সময় শেখ হাসিনা দম্ভের সঙ্গে নিজেই তা প্রকাশ করেছেন। সব রকম অপকৌশল করেছেন বিএনপি নেত্রীকে ঘায়েল করার।
এই অপকৌশলের অংশ হিসেবে আদালতকে ব্যবহার করে বেগম খালেদা জিয়াকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। বিদেশ থেকে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট্রের নামে আসা দুই কোটি ১০ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেয় আদালত। এই রায়ের কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বরিশালে এক জনসভায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী (বর্তমানে গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে পলাতক) ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা বিএনপি নেত্রীকে উদ্দেশ করে বলেছিলেন, ‘আজকে তিনি (বেগম খালেদা জিয়া) কোথায়?’
২০০৮ সালে সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে এ মামলাটি করা হয়েছিল। সে সময় খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে মোট ছয়টি ও শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ১৫টি মামলা করা হয়েছিল। ২০০৯ সালে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এসে নির্বাহী আদেশে তার বিরুদ্ধে করা ১৫টি মামলা প্রত্যাহার করে নেন। অথচ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলের মামলায় বিএনপি নেত্রীকে জেলে পাঠানো হয়। এটা ছিল মূলত বেগম জিয়ার প্রতি শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত জিঘাংসার প্রতিফলন।
কারাগারে যাওয়ার অল্প কিছুদিনের মধ্যে সেখানে অসুস্থ হয়ে পড়েন খালেদা জিয়া। এরপর তাকে চিকিৎসার জন্য বিএসএমএমইউতে নেওয়া হয়। দেশে করোনার প্রকোপ শুরু হলে ২০২০ সালের ২৫ মার্চ সরকারের নির্বাহী আদেশে শর্তসাপেক্ষে বাসায় থাকার অনুমতি পান তিনি। মিয়ানমারের জান্তা সরকার ঠিক যেভাবে দেশটির সাজাপ্রাপ্ত গণতন্ত্রপন্থি নেত্রী অং সান সুচিকে গৃহবন্দি করে রাখে, ঠিক তেমনিভাবে খালেদা জিয়াকে নিজ বাসভবনে অনেকটা গৃহবন্দি করে রাখা হয়।
লিভার সিরোসিস, কিডনি, হার্ট, ডায়বেটিস, রক্তচাপ, ফুসফুস, চোখ, দাঁত ও আর্থ্রাইটিসের সমস্যাসহ নানা কারণে তিনবারের সাবেক এ প্রধানমন্ত্রীর শারীরিক অবস্থা খুবই গুরুতর হয়ে উঠলেও তার প্রতি যেন তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আক্রোশ কমেনি। চিকিৎসকরা বারবার বেগম জিয়াকে বিদেশে নিয়ে উন্নত চিকিৎসার তাগিদ দিলেও সরকার তাতে কর্ণপাত করেনি।
খালেদা জিয়ার বিদেশে চিকিৎসার জন্য পরিবারের পক্ষ থেকে কমপক্ষে ১৮ বার সরকারের কাছে অনুমতি চাওয়া হয়। তবে আদালতের দোহাই দিয়ে প্রতিবারই তা প্রত্যাখ্যান করা হয়। সরকারের পক্ষ থেকে যুক্তি দেওয়া হয় বিদেশে যেতে হলে খালেদা জিয়াকে আবারো কারাগারে যেতে হবে, তারপর আদালতের মাধ্যমে অনুমতি নিতে হবে। আওয়ামী লীগ দলীয় এমপি হাজি সেলিম কারাদণ্ড নিয়ে চিকিৎসার জন্য বিদেশে যেতে পারলেও আইনের অজুহাত দেখিয়ে বেগম জিয়াকে অনুমতি দেওয়া হয়নি। এটাই প্রমাণ করে শেখ হাসিনা মূলত বিনা চিকিৎসায় খালেদা জিয়াকে হত্যা করতে চেয়েছিলেন।
শেখ হাসিনা একদিকে উন্নত চিকিৎসার জন্য খালেদা জিয়াকে বিদেশে যেতে দিচ্ছিলেন না, অন্যদিকে তাকে নিয়ে তুচ্ছ-তাচ্ছিল করছিলেন। ২০২৩ সালে লন্ডনে এক অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনা মন্তব্য করেছিলেন, ‘রোজই শুনি এই মরে মরে, এই যায় যায়; বয়স তো আশির ওপরে। সময় হয়ে গেছে। তার মধ্যে অসুস্থ। এখানে এত কান্নাকাটি করে লাভ নেই।’ কত ভয়াবহ ও কত নির্মম কথা কোনো মানুষ বলতে পারেন, তা এ বক্তব্যের মধ্যেই প্রতিফলিত হয়। যার অন্তরে ন্যূনতম মানবতা ও মমত্ববোধ নেই, কেবল তার মুখেই এ ধরনের অমানবিক কথা শোভা পায়।
২০২৪ সালের ২৫ জুন ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে খালেদা জিয়ার হৃদযন্ত্রে পেসমেকার বসানো হয়। ২০২৩ সালের ২৭ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্র থেকে তিন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত খালেদা জিয়ার রক্তনালিতে অস্ত্রোপচার করেন। এ সময় একটানা পাঁচ মাসেরও বেশি সময় তকে হাসপাতালে থাকতে হয়। সাড়ে চার বছরে খালেদা জিয়া মোট ৪৭৯ দিন হাসপাতালে ছিলেন।
এভাবে আওয়ামী লীগ আমলে অসহ্য যন্ত্রণা খালেদা জিয়া সহ্য করেছেন। এই আওয়ামী লীগ আমলেই তিনি হারিয়েছেন স্বামী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্মৃতিবিজড়িত মইনুল রোডের বাড়ি। এক কাপড়ে তাকে বাড়ি থেকে জোরপূর্বক বের করে দেওয়া হয়। সেদিন খালেদা জিয়ার চোখের পানি সারাদেশের মানুষকে কাঁদিয়েছিল।
এরপর তিনি আরও একবার কেঁদেছিলেন। ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর লাশ দেখার পর তার বুকফাটা আর্তনাদ জাতিকে দুঃখ ভারাক্রান্ত করেছিল। আরেক ছেলে তারেক রহমানকেও নির্বাসিত জীবনযাপনে বাধ্য করা হয়। দেশে শুধু গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বেগম খালেদা জিয়া ও তার পরিবারের সদস্যরা এমন নিদারুণ নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
কিন্তু ওই যে কথায় আছে, আল্লাহ যাকে সম্মান দেন, তাকে কেউ অসম্মানিত করতে পারে না। শেষ পর্যায়ে তিনি সম্মানিত হবেনই। আর সে কারণেই প্রচণ্ড গণরোষে শেখ হাসিনা দেশ থেকে পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন, আর বেগম খালেদা জিয়া কারামুক্ত হয়ে কাতারের আমিরের পাঠানো বিশেষ এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে চিকিৎসার জন্য লন্ডন গেছেন।
যুক্তরাজ্যে খালেদা জিয়া বর্তমানে ছেলে তারেক রহমানের বাসায় থেকে চিকিৎসা নিচ্ছেন। এর আগে তিনি লন্ডন ক্লিনিকে ভর্তি হয়েছিলেন। সেখানকার একটি মেডিকেল বোর্ডের অধীনে তার চিকিৎসা চলছে। এরপর আরো উন্নত চিকিৎসার জন্য তার যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার কথা রয়েছে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতনের পর বেগম জিয়া উন্নত চিকিৎসার সুযোগ পেলেও তার শারীরিক অবস্থা নিয়ে এখনো দেশবাসীর শঙ্কা কাটছে না। কারণ তাকে তিলে তিলে হত্যা করার যে মিশন শেখ হাসিনা নিয়েছিলেন, তাতে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন।
দেশবাসীও অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন তাদের প্রিয় গণতন্ত্রপন্থি নেত্রী সুস্থ হয়ে আবার বাংলাদেশে ফিরবেন। আবারো তার হাস্যোজ্জ্বল মুখখানি দেখবেন তারা। কারণ অনেকের কাছে তিনি কেবল নেত্রী নন, তিনি ‘মা’। তিনি হাসলে তারা হাসেন, তিনি কাঁদলে তারা কাঁদেন। তাদের কাছে তার হাসিই যেন এক হাস্যোজ্জ্বল বাংলাদেশের মুখ।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

