গণভোট ও নৈতিক সংকট

ড. মুহাম্মদ আনোয়ার জাহিদ

গণভোট ও নৈতিক সংকট

চব্বিশের জুলাই বিপ্লবের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করে। তাদের ক্ষমতা সংবিধানের লিখিত বিধান থেকে উৎসারিত ছিল না; বরং তা উদ্ভূত হয়েছিল প্রয়োজনের তাগিদে। বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্ট রাষ্ট্রের প্রয়োজনের নীতির (Doctrine of State Necessity) ভিত্তিতে অন্তর্বর্তী সরকারের বৈধতা স্বীকৃতি দেয়। এটি নজিরবিহীন নয়। The State v. Dosso, P.L.D. (1958 S.C. 533) মামলায় পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট হ্যান্স কেলসেনের বিপ্লবী বৈধতার তত্ত্ব (Theory of Revolutionary Legality) প্রয়োগ করে একটি নতুন সাংবিধানিক ব্যবস্থাকে বৈধতা প্রদান করেছিল।

অন্তর্বর্তী সরকার সব প্রধান রাজনৈতিক দল, বিশেষত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) সঙ্গে পরামর্শক্রমে সংস্কার কমিশন গঠন করে। লক্ষ্য ছিল পতিত শাসনামলে সৃষ্ট কাঠামোগত দুর্বলতা ও দুর্নীতির উৎসগুলো চিহ্নিত ও সংশোধন করা। এসব সুপারিশ সমন্বিত হয়ে ‘জুলাই সনদ’ নামে একটি ঐকমত্যভিত্তিক সংস্কার রূপরেখা গঠিত হয়। সব প্রধান রাজনৈতিক শক্তি এতে সম্মতি দেয়।

বিজ্ঞাপন

সনদ কার্যকর করতে গণভোটের প্রয়োজনীয়তা নির্ধারিত হয়। বিএনপি সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একই দিনে আয়োজনের দাবি তোলে। অন্তর্বর্তী সরকার তা মেনে নেয়। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি জনগণ ভোট দেন। বিএনপি নিরঙ্কুশ সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে এবং জুলাই সনদের পক্ষে ‘হ্যাঁ’ ভোট বিপুলভাবে জয়ী হয়।

কিন্তু এরপর নাটকীয় পরিবর্তন ঘটে। বিএনপি সংসদ সদস্যরা এমপি হিসেবে শপথ নিলেও প্রস্তাবিত গণপরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিতে অস্বীকৃতি জানান। গণভোট বাতিল ঘোষণার জন্য রিট আবেদনও দাখিল হয়েছে। দেশ আজ এক সাংবিধানিক সংকটের সন্ধিক্ষণে।

এ অবস্থায় একটি গভীর তাৎপর্যপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে—প্রয়োজনের ভিত্তিতে বৈধ ঘোষিত অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচন যদি গ্রহণযোগ্য হয়, তাহলে একই কর্তৃত্বে একই দিনে অনুষ্ঠিত গণভোট কি প্রত্যাখ্যান করা যেতে পারে?

১. বৈধতার অবিভাজ্যতা

অন্তর্বর্তী সরকারের কর্তৃত্ব প্রয়োজনের ভিত্তিতেই প্রতিষ্ঠিত। যদি বিএনপি যুক্তি দেয়, অন্তর্বর্তী সরকার পূর্ববর্তী সংবিধানের সৃষ্ট সত্তা নয় বিধায় গণভোটটি সংবিধানসম্মত বৈধতা পায়নি, তবে একই আপত্তি সংসদীয় নির্বাচনের ক্ষেত্রেও সমভাবে প্রযোজ্য হবে। একই বিষয়ে একই সঙ্গে গ্রহণ ও বর্জন করা যায় না।

Lissenden v. CAV Bosch Ltd, [1940] 1 All E.R. 425 (H.L.) মামলায় হাউস অব লর্ডস এই নীতিটি সংক্ষেপে ব্যক্ত করে বলেছে, একই পক্ষ একই দলিলকে একদিকে গ্রহণ এবং অন্যদিকে প্রত্যাখ্যান করতে পারে না। নির্বাচন ও গণভোট আইনগত দৃষ্টিকোণ থেকে অবিচ্ছেদ্য যমজের মতো। একটিকে অকার্যকর ঘোষণা করা মানে অপরটির বৈধতাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করা।

অতএব, বিএনপির সামনে দুটি বিকল্পই উন্মুক্ত—প্রয়োজনের ভিত্তিতে সার্বভৌম জনগণের অভিব্যক্তি হিসেবে উভয় প্রক্রিয়াকেই বৈধ হিসেবে স্বীকার করা, অথবা উভয়কেই প্রত্যাখ্যান করা। বেছে বেছে গ্রহণের এই প্রবণতা আইনগত সামঞ্জস্য ও জনআস্থাকে ক্ষুণ্ণ করে।

২. প্রতিশ্রুতি মানতেই হবে

জুলাই চার্টার ছিল সর্বদলীয় ঐকমত্যের ফল। বিএনপি এর শর্তাবলিতে সম্মতি প্রদান করেছিল এবং গণভোট আয়োজনের পক্ষে সমর্থন জানিয়েছিল; বরং সংসদীয় নির্বাচনের সঙ্গে একই দিনে গণভোট আয়োজনের পক্ষে তারাই জোরালোভাবে মত দিয়েছিল।

Pacta sunt servanda—অর্থাৎ, চুক্তি বা অঙ্গীকার অবশ্যই রক্ষা করতে হবে। এটি আইনের একটি মৌলিক নীতি। যদিও এটি সবচেয়ে সুপরিচিতভাবে ভিয়েনা কনভেনশন অন দ্য ল’ অব ট্রিটিজের ২৬ নম্বর অনুচ্ছেদে উল্লিখিত, তবুও এটি একটি সর্বজনীন আইনি নৈতিকতার প্রতিফলন। অভ্যন্তরীণ বিচারব্যবস্থাতেও এই নীতির প্রতিধ্বনি পাওয়া যায়। Balfour v. Balfour, [1919] 2 KB 571 মামলায় আদালত উল্লেখ করে, যখন পক্ষসমূহ তাদের অভিপ্রায় স্পষ্টভাবে প্রকাশ করে এবং তার ওপর নির্ভরতা সৃষ্টি হয়, তখনই বাধ্যতামূলক অঙ্গীকারের উদ্ভব ঘটে।

এখন যদি বিএনপি দাবি করে, তারা কেবল কৌশলগত কারণে সম্মতি দিয়েছিল, ফলাফল মেনে নেওয়ার প্রকৃত অভিপ্রায় তাদের ছিল না, তবে তা ভ্রান্ত উপস্থাপনার (Misrepresentation) শামিল হতে পারে। আইনের শাসন কৌশলগত দ্বিচারিতাকে পুরস্কৃত করে না।

৩. একই বিষয়ে বিপরীত অবস্থান গ্রহণ অগ্রহণযোগ্য

এস্টপেলের নীতি অনুযায়ী, কোনো পক্ষ আগে যে বিষয়টি স্বীকার বা নিশ্চিত করেছে, পরে যদি অন্যরা সেই স্বীকৃতির ওপর নির্ভর করে থাকে, তবে সেই পক্ষ তা অস্বীকার করতে পারে না। Central London Property Trust Ltd v. High Trees House Ltd [1947] KB 130 মামলায় লর্ড ডেনিং প্রমিসরি এস্টপেলের নীতিটি সুস্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেন। যদি কোনো স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি এমন উদ্দেশ্যে দেওয়া হয় যে, তা বাস্তবায়িত হবে এবং বাস্তবেও যদি তার ওপর নির্ভর করে কার্যক্রম পরিচালিত হয়, তবে তা অন্যায়ভাবে প্রত্যাহার করা যায় না।

বিএনপি প্রকাশ্যে জুলাই চার্টার এবং গণভোটকে সমর্থন করেছিল। ভোটাররা সেই আশ্বাসের ওপর আস্থা রেখে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। বিএনপি নেতাদের আহ্বানে অনেকেই গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট প্রদান করেছে। রাষ্ট্রও দ্বৈত প্রক্রিয়া আয়োজনের জন্য বিপুল সম্পদ ব্যয় করেছে। এখন গণভোটকে অস্বীকার করা প্রাতিষ্ঠানিক ও নৈতিক ক্ষতির কারণ হবে। তাই এস্টপেলের নীতি অনুযায়ী এমন আকস্মিক অবস্থান পরিবর্তন গ্রহণযোগ্য নয়।

৪. সদিচ্ছা একটি সাংবিধানিক মূল্যবোধ

সদিচ্ছা কেবল আন্তর্জাতিক আইনের একটি নীতি নয়; এটি সাংবিধানিক শাসনের অন্তর্নিহিত একটি নৈতিক ভিত্তি। গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা জনসমক্ষে প্রদত্ত প্রতিশ্রুতির সততার ওপর নির্ভর করে। সদিচ্ছার অনুপস্থিতিতে নির্বাচন শুধু একটি আনুষ্ঠানিক নাটকে পরিণত হয়, যার প্রকৃত গণতান্ত্রিক মূল্য থাকে না।

ভোটাররা বিএনপির গণভোট সমর্থনসূচক নির্বাচনি প্রচারণার আশ্বাসের ওপর নির্ভর করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। নির্বাচনের ফলাফল থেকে সুবিধা গ্রহণ করার পর গণভোট প্রত্যাখ্যান করা সদিচ্ছার নীতির পরিপন্থী হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। গণতান্ত্রিক বৈধতা দাবি করে যে, নির্বাচনের পূর্ববর্তী বক্তব্য ও নির্বাচনের পরবর্তী আচরণের মধ্যে সামঞ্জস্য থাকতে হবে।

বিভিন্ন দেশের আদালত সাংবিধানিক ব্যাখ্যায় গণতান্ত্রিক নৈতিকতার গুরুত্বের ওপর জোর দিয়েছে। Kesavananda Bharati v. State of Kerala, AIR 1973 SC 1461 (1973) 4 SCC 225 মামলায় ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট ‘মৌলিক কাঠামো তত্ত্ব’ (Basic Structure Doctrine) ব্যাখ্যা করে বলেন, সাংবিধানিক সংশোধন এমন হতে পারে না যা সংবিধানের মৌলিক নীতিসমূহ ধ্বংস করে। সদিচ্ছা ও জনগণের সার্বভৌমত্ব—যেকোনো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা মৌলিক নীতির অন্তর্ভুক্ত।

৫. নৈতিকতা ও শাসনের কর্তৃত্ব

আইন যদি নৈতিকতার ভিত্তি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তবে তা জবরদস্তির মাধ্যম হয়ে ওঠে। নির্বাচনি প্রচারণার সময় বিএনপির চেয়ারম্যান বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট প্রদানের জন্য জনগণের প্রতি প্রকাশ্যে আহ্বান জানিয়েছিলেন। এই ধরনের আহ্বান গণভোটে বিপুল সমর্থন অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।

এখন গণভোট প্রত্যাখ্যান করা কেবল আইনি অসামঞ্জস্য নয়, এটি একটি নৈতিক লঙ্ঘনও বটে। এটি একটি মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপন করে। তা হলো—জনগণের সুস্পষ্টভাবে প্রকাশিত ইচ্ছাকে একটি সরকার বাস্তবায়ন করতে অস্বীকার করলে সেই জনগণের কাছ থেকে কি সেই সরকারের নৈতিক কর্তৃত্ব অর্জিত হতে পারে?

রাজনৈতিক নৈতিকতা সাংবিধানিক বৈধতা থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। যে রাজনৈতিক দল সংস্কারমূলক ম্যানডেট সমর্থন করে ক্ষমতায় এসেছে, সে দল যদি ক্ষমতায় যাওয়ার পর সেই ম্যানডেট অস্বীকার করে, তবে তার শাসনের নৈতিক ভিত্তি গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

গণভোটকে সম্মান করার বিকল্প নেই

এখন স্পষ্ট, গণভোট বিষয়ে বিএনপির অবস্থান আইনগত ও নৈতিকভাবে টেকসই নয়। তবে বর্তমান অচলাবস্থা অব্যাহত থাকলে এবং গণভোটের ফলাফল অকার্যকর ঘোষিত হলে বিপ্লব-পূর্ব সাংবিধানিক ও প্রশাসনিক কাঠামোগত ব্যবস্থা অপরিবর্তিত থাকার সম্ভাবনা তৈরি হবে। জুলাই ২০২৪-এর আকাঙ্ক্ষায় যারা প্রাণ হারিয়েছেন বা স্থায়ীভাবে শারীরিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তাদের স্মৃতি রাজনৈতিক সুবিধাবাদের বিষয়বস্তুতে পরিণত হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে বিপ্লবকে একটি মৌলিক গণতান্ত্রিক রূপান্তরের মুহূর্ত হিসেবে না দেখে বরং প্রাতিষ্ঠানিক ধারাবাহিকতার একটি বেদনাময় প্রাক্কাল হিসেবে স্মরণ করা হতে পারে।

অন্যদিকে গণভোটের রায় বহাল রাখা এটাই নিশ্চিত করবে যে, সার্বভৌম জনগণের ইচ্ছা, যখন প্রয়োজনের ভিত্তিতে আইনসম্মতভাবে প্রকাশিত হয় এবং যখন প্রধান রাজনৈতিক শক্তিগুলো তাতে সম্মতি প্রদান করে, তখন সেটিকে সহজে উপেক্ষা করা যায় না। এটি এমন একটি বার্তা দেবে যে, গণতান্ত্রিক অঙ্গীকার কেবল আনুষ্ঠানিক ঘোষণা নয়, বরং তা বাস্তব ও বাধ্যতামূলক দায়িত্ব।

আইনি ও নৈতিক যুক্তি এখানে এক বিন্দুতে মিলিত হয়েছে। প্রয়োজনের ভিত্তিতে বৈধতা প্রাপ্ত অন্তর্বর্তী সরকারের কর্তৃত্বই নির্বাচন ও গণভোট উভয় প্রক্রিয়ার ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে। বিএনপি একটিকে গ্রহণ করে অন্যটিকে প্রত্যাখ্যান করতে পারে না। জুলাই চার্টারে সম্মতি প্রদান, গণভোটের পক্ষে অবস্থান গ্রহণ এবং সমন্বিত প্রক্রিয়া থেকে নির্বাচনিভাবে সুবিধা লাভের মাধ্যমে দলটি আইনগতভাবে Pacta Sunt Servanda, এস্টপেল এবং একই বিষয়কে একদিকে স্বীকার ও অন্যদিকে অস্বীকার না করার নীতির (Principle Against Approbation and Reprobation) দ্বারা আবদ্ধ হয়েছে। পাশাপাশি জনগণের প্রতি সদিচ্ছার ভিত্তিতে প্রদত্ত প্রকাশ্য প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে দলটি নৈতিকভাবেও দায়বদ্ধ হয়েছে।

একই দিনে জনগণ দুবার তাদের মতামত প্রকাশ করেছে। গণতান্ত্রিক ম্যানডেটকে অর্ধেক ভাগে বিভক্ত করা যায় না।

লেখক : অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি, ঢাকা

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন