আধুনিক গণতন্ত্রের ইতিহাস আসলে ক্ষমতাকে ভাগ করার, সীমা টানার আর জবাবদিহিতার শৃঙ্খলে বাঁধার ইতিহাস। মন্টেস্কু যখন নির্বাহী, আইন ও বিচার বিভাগের পৃথক্করণের কথা বললেন, তার মূল যুক্তিটি ছিল সরল—যে ক্ষমতা অবিভক্ত, সে ক্ষমতা অনিবার্যভাবে স্বেচ্ছাচারী। ম্যাক্স ভেবার আরো এক ধাপ এগিয়ে দেখালেন, আধুনিক রাষ্ট্রের প্রাণশক্তি তার নিরপেক্ষ আমলাতন্ত্রে—যে প্রশাসন কোনো ব্যক্তি, পরিবার বা গোষ্ঠীর নয়, বরং বিধিবদ্ধ আইনের অনুগত। কিন্তু বিশ শতকের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা শেখাল, ক্ষমতা বিভাজনের এই ধ্রুপদি নকশার বাইরেও একটি অলিখিত বিভাজন-রেখা আছে, যা মুছে গেলে বাকি সব রেখাই অর্থহীন হয়ে পড়ে—সেটি রাজনৈতিক দল ও রাষ্ট্রের সীমারেখা। সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে শুরু করে যেখানেই দল রাষ্ট্রকে গিলে ফেলেছে, সেখানেই সংবিধান থেকেছে কাগজে, আদালত হয়েছে আজ্ঞাবহ, আর নির্বাচন পরিণত হয়েছে আনুষ্ঠানিকতায়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা একে বলেন, ‘পার্টি-স্টেট’ বা দলীয় রাষ্ট্র, যার লক্ষণ হলো, দলের কার্যালয় আর সচিবালয়ের মধ্যে পার্থক্য ঘুচে যাওয়া, রাষ্ট্রীয় সম্পদ দলীয় পুরস্কারে রূপান্তরিত হওয়া এবং দলের প্রতি আনুগত্যই নাগরিকত্বের মানদণ্ড হয়ে ওঠা। এর বিপরীত মডেলটিই গণতন্ত্র, যেখানে দল ক্ষমতায় যায় ও ক্ষমতা ছাড়ে; কিন্তু রাষ্ট্র থাকে স্থায়ী, নিরপেক্ষ ও সর্বজনীন; সরকার বদলায়, প্রজাতন্ত্র বদলায় না। দক্ষিণ এশিয়ার উত্তর-ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রগুলোয় এই বিভাজন-রেখাটি বরাবরই ভঙ্গুর, কারণ এখানে রাজনৈতিক দল প্রায়ই রাষ্ট্রের আগে জন্ম নেওয়া আন্দোলনের উত্তরাধিকার বহন করে এবং ক্ষমতায় গিয়ে নিজেকে রাষ্ট্রের সমার্থক ভাবতে শুরু করে। বাংলাদেশ এই প্রবণতার সবচেয়ে করুণ পরীক্ষাগারগুলোর একটি; একাত্তরের মহান অর্জনের পর থেকে আজ পর্যন্ত প্রতিটি বড় রাজনৈতিক বিপর্যয়ের গোড়ায় খুঁজলে পাওয়া যাবে এই একই ব্যাধি—দল ও রাষ্ট্রের একাকার হয়ে যাওয়া। ঠিক এই তাত্ত্বিক প্রেক্ষাপটেই সাম্প্রতিক একটি উচ্চারণ বিশেষ মনোযোগ দাবি করে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ উচ্চারণগুলোর একটি এসেছে খুব সাদামাটা এক দলীয় বৈঠক থেকে। জয়পুরহাট ও নওগাঁর নেতাদের সঙ্গে আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান নির্দেশ দিয়েছেন—দলকে ও সরকারকে যেন এক করে না দেখা হয়। তিনি উপমা দিয়েছেন রেললাইনের—ক্ষমতাসীন দল ও সরকার চলবে পাশাপাশি, একই গন্তব্যের দিকে; কিন্তু একটি আরেকটিকে স্পর্শ করবে না। কথাটি আপাতদৃষ্টিতে সাংগঠনিক শৃঙ্খলার নির্দেশনা মনে হলেও এর ভেতরে লুকিয়ে আছে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের একটি মৌলিক প্রশ্ন—রাষ্ট্র কার, আর দল কার?
উত্তরটি তত্ত্বে সহজ, চর্চায় কঠিন। রাষ্ট্র ও সরকার দেশের প্রতিটি নাগরিকের—যিনি ভোট দিয়েছেন তারও, যিনি বিপক্ষে ভোট দিয়েছেন তারও। আর দল একটি নির্দিষ্ট আদর্শ ও কর্মসূচিতে বিশ্বাসী মানুষের সংগঠন। নির্বাচনে জিতে দল সরকার গঠন করে ঠিকই, কিন্তু সরকার গঠনের মুহূর্ত থেকে তার দায় আর দলীয় সমর্থকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; দায় হয়ে যায় সর্বজনীন। এই দুই সত্তা যখন মিশে একাকার হয়ে যায়, তখন জন্ম নেয় দলীয় রাষ্ট্র—যেখানে প্রশাসন দলের আজ্ঞাবহ হয়, থানার দারোগা দলীয় কর্মীর মতো আচরণ করে, ব্যাংকের ঋণ ও ঠিকাদারির টেন্ডার দলীয় পরিচয়ে ভাগ হয়, আর রাষ্ট্রের সমালোচনা মাত্রই হয়ে ওঠে ‘রাষ্ট্রদ্রোহ’। বাংলাদেশ এই মডেলটি দেড় দশক ধরে হাড়ে হাড়ে দেখেছে। দল-রাষ্ট্র একাকার হওয়ার সেই ব্যবস্থাই শেষ পর্যন্ত এমন ফ্যাসিবাদী কাঠামো তৈরি করেছিল, যাকে উৎখাত করতে লাগল একটি রক্তক্ষয়ী গণ-অভ্যুত্থান। কাজেই তারেক রহমানের এই সতর্কবার্তা নিছক কৌশল নয়; এটি ইতিহাস থেকে নেওয়া শিক্ষা—যে পথে পূর্বসূরি শাসকদের পতন হয়েছে, সেই পথ থেকে নিজের দলকে দূরে রাখার সচেতন চেষ্টা।
কিন্তু ঘোষণা আর বাস্তবায়ন এক জিনিস নয় এবং এখানেই সমসাময়িক ঘটনাপ্রবাহ আমাদের ভাবতে বাধ্য করে। গত কয়েক দিনে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের বক্তব্যগুলো পাশাপাশি রাখলে একটি ধারাবাহিক সুর শোনা যায়। ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’ উদ্বোধনের দিন প্রধানমন্ত্রী বললেন, কেউ কেউ অহেতুক ইস্যু তৈরি করে দেশে অস্থিরতা সৃষ্টির অপচেষ্টা করছেন, যা অজান্তেই পলাতক স্বৈরাচারের পুনরুত্থানের পথ খুলে দিতে পারে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট নিয়ে চলমান আলোচনাকে তিনি চিহ্নিত করলেন একটি চক্রের ‘সুকৌশলী বিভ্রান্তি’ হিসেবে। বাঁশখালীর জনসভায় আহ্বান জানালেন, বিভ্রান্তকারীরা যেন কোনো সুযোগ না পায়, কারণ দিনশেষে ক্ষতিগ্রস্ত হয় জনগণই; সেই সঙ্গে ঘোষণা দিলেন, আগামী ১০ বছরের জ্বালানি-বিদ্যুৎ পরিকল্পনা জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করা হবে। অর্থাৎ সরকারের দৃষ্টিভঙ্গিতে সংকট মোকাবিলার সূত্র তিনটি—শান্তি-শৃঙ্খলা উন্নয়নের পূর্বশর্ত, সমালোচনার সঠিক ঠিকানা রাজপথ নয় সংসদ এবং অস্থিরতা মানেই পতিত শক্তির ষড়যন্ত্রের আশঙ্কা।
এই তিন সূত্রের প্রতিটিতে যুক্তি আছে। মাত্র মাস ছয়েকের সরকার, উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া বিধ্বস্ত অর্থনীতি, লুণ্ঠিত ব্যাংক খাত আর অপরিকল্পিত জ্বালানি চুক্তির বোঝা—এসব এক ফুঁয়ে সারানো যায় না, সময় লাগবেই। বিনিয়োগকারী দেশে টাকা ঢালেন স্থিতিশীলতা দেখে; প্রতিদিন রাজপথ অচল থাকলে কারখানা হয় না, কর্মসংস্থানও হয় না। আর এ কথাও অস্বীকারের উপায় নেই যে পরাজিত ফ্যাসিবাদী শক্তি হাত গুটিয়ে বসে নেই; ভুয়া তথ্য আর কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা যে হচ্ছে, তার নমুনা প্রায়ই চোখে পড়ে।
তবু এখানেই লুকিয়ে আছে সেই ফাঁদ, যার বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রী নিজেই দলকে সতর্ক করেছেন। কারণ ‘বিভ্রান্তি’ আর ‘ষড়যন্ত্র’ শব্দ দুটি ক্ষমতার হাতে বড় আরামদায়ক হাতিয়ার। সব সমালোচনাকে চক্রান্ত বললে সরকার নিজের ভুল দেখার চোখ হারায়, আর সব আন্দোলনকে অস্থিরতা বললে নাগরিকের সাংবিধানিক প্রতিবাদের অধিকার সংকুচিত হয়। বিগত স্বৈরাচারও তো প্রতিটি ন্যায্য দাবিকে ‘উন্নয়নবিরোধী ষড়যন্ত্র’ তকমা দিয়েই দমন করত। আজকের সরকার যদি সেই একই শব্দভান্ডার অভ্যাসে পরিণত করে, তবে দল ও সরকারের মাঝখানের রেললাইন-দূরত্বটি শুধু কাগজে থেকে যাবে; বাস্তবে দুই লাইন মিশে যাবে সেই পুরোনো একমুখী পথে। দল-সরকার পৃথক্করণের আসল পরীক্ষা তাই বক্তৃতায় নয়—পরীক্ষা হলো, ক্ষমতাসীন দল তার নিজের সরকারের সমালোচনা সহ্য করতে, এমনকি নিজে করতে পারে কি না।
এই জায়গা থেকেই কয়েকটি দিকনির্দেশনা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রথমত, দলের নেতাকর্মীদের বুঝতে হবে—রেললাইনের উপমার অর্থ শুধু এই নয় যে দল সরকারের কাজে হস্তক্ষেপ করবে না; অর্থ এও যে দল হবে নিজের সরকারের প্রথম পাহারাদার। তদবির, টেন্ডার, দখল আর প্রশাসনে খবরদারি থেকে দূরে থেকে তৃণমূলের অভাব-অভিযোগ সরকারের কানে পৌঁছে দেওয়াই এখন দলের প্রধান কাজ; প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা যেমন বলেছেন, গাফিলতি করলে আমলা বা রাজনৈতিক ব্যক্তি—কেউই ছাড় পাচ্ছেন না; সেই কঠোরতা সবচেয়ে আগে প্রযোজ্য হওয়া উচিত নিজ দলের বিপথগামীদের ওপর, কারণ জনগণ সরকারের সাফল্য-ব্যর্থতা মাপবে দলের কর্মীর আচরণ দিয়েই। দ্বিতীয়ত, সরকারকে আন্দোলন ও সমালোচনার ক্ষেত্রে সূক্ষ্ম বাছবিচারের সংস্কৃতি গড়তে হবে—কোনটি ন্যায্য দাবি আর কোনটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নাশকতা, তা নির্ধারিত হবে তথ্য-প্রমাণে, ঢালাও তকমায় নয়। জ্বালানির ১০ বছরের পরিকল্পনা সংসদে তোলার সিদ্ধান্তটি এদিক থেকে সঠিক পথের পদক্ষেপ; স্বচ্ছ তথ্যই গুজবের সবচেয়ে বড় প্রতিষেধক, আর সংসদই সেই মঞ্চ যেখানে বিরোধী মতকেও জবাব দিতে হয় যুক্তি দিয়ে, লাঠি দিয়ে নয়। তৃতীয়ত, বিরোধী পক্ষ ও নাগরিক সমাজের জন্যও শিক্ষা আছে—সমালোচনা করুন তথ্যনিষ্ঠভাবে, বিকল্প প্রস্তাব নিয়ে; কারণ ভিত্তিহীন গুজব শুধু সরকারের নয়, প্রতিবাদের নৈতিক শক্তিরও ক্ষয় ঘটায়, আর সেই সুযোগে লাভবান হয় কেবল পতিত স্বৈরাচার। চতুর্থত, সাধারণ নাগরিকের করণীয় হলো ধৈর্য ও সতর্কতার ভারসাম্য—সংস্কারকে সময় দেওয়া, কিন্তু জবাবদিহিতার প্রশ্নে ছাড় না দেওয়া; কোনো সরকারকেই অন্ধ আনুগত্য নয়, সজাগ সমর্থন দেওয়াই গণতান্ত্রিক নাগরিকের ধর্ম।
এই আলোচনায় একটি প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তাবও ভেবে দেখার দাবি রাখে। দল ও সরকারের পৃথক্করণকে কেবল নেতার সদিচ্ছার ওপর ছেড়ে না রেখে নিয়মে বেঁধে ফেলা যায়—যেমন, মন্ত্রিত্ব পাওয়া নেতাদের দলের নির্বাহী দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি, দলীয় কার্যালয় থেকে প্রশাসনিক তদবিরের পথ বন্ধে সুস্পষ্ট আচরণবিধি, সরকারি নিয়োগ-পদোন্নতিতে দলীয় সুপারিশের দরজা আনুষ্ঠানিকভাবে রুদ্ধ করা, আর দলের অভ্যন্তরে এমন একটি জবাবদিহিতার কাঠামো থাকা দরকার, যেখানে তৃণমূলের কর্মী স্থানীয় প্রশাসনের ব্যর্থতা নির্ভয়ে কেন্দ্রে জানাতে পারেন। উন্নত গণতন্ত্রগুলোয় ক্ষমতাসীন দলের পার্লামেন্টারি পার্টি আর সাংগঠনিক কাঠামো যে আলাদা সত্তা হিসেবে কাজ করে, তার পেছনে এই নিয়মতান্ত্রিক বিন্যাসই মূল শক্তি। ব্যক্তির সংযম ক্ষণস্থায়ী, প্রতিষ্ঠানের নিয়মই দীর্ঘস্থায়ী; রেললাইনের দূরত্ব যদি স্লিপারে-নাটবল্টুতে আঁটা না থাকে, ট্রেনের ঝাঁকুনিতেই তা একদিন সরে যায়।
শেষ বিচারে, ‘দল ও সরকার এক নয়’—এই এক বাক্যে তারেক রহমান আসলে নিজের দলের সামনেই সবচেয়ে কঠিন মানদণ্ডটি টাঙিয়ে দিয়েছেন। বাংলাদেশে ক্ষমতাসীন প্রতিটি দলই ইতিহাসে বারবার এই পরীক্ষায় ফেল করেছে; ক্ষমতার মধু দল আর রাষ্ট্রের সীমারেখা গলিয়ে দিয়েছে প্রতিবারই। জুলাই অভ্যুত্থানের রক্তের দামে পাওয়া এই নতুন যাত্রায় সেই পুরোনো বৃত্ত ভাঙা যাবে কি না, তার উত্তর নির্ধারিত হবে ছোট ছোট দৈনন্দিন আচরণে—থানায়, তহশিল অফিসে, টেন্ডার কমিটিতে, আর সমালোচনার মুখে সরকারের প্রথম প্রতিক্রিয়ায়। রেললাইনের দুটি পাত যেদিন সত্যিই সমান্তরাল থাকবে, সেদিনই বোঝা যাবে—ট্রেনটি গন্তব্যে পৌঁছানোর মতো মজবুত পথেই চলছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


