বিশ্বজুড়ে নৌবাহিনীর একটি শতবর্ষী ও অনন্য সাহিত্যিক ঐতিহ্য রয়েছে। যেকোনো জাহাজ, রণতরী কিংবা সাবমেরিনকে সবসময় সম্মানসূচক নারীবাচক সর্বনাম ‘She’ বা নারী হিসেবে সম্বোধন করা হয়। যে জাহাজ নাবিক ও ক্রুদের সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ, প্রচণ্ড ঝড়-ঝাপটা এবং শত্রুর আক্রমণ থেকে নিজের বুকের ভেতরে মায়ের মতো আগলে রাখে, সামুদ্রিক ঐতিহ্যে তাকে নারীর মর্যাদায় ভূষিত করাই বিশ্বরীতি। সেই গভীর ও মর্যাদাপূর্ণ ঐতিহ্যের প্রতি সম্মান জানিয়েই আমাদের সাধারণ বেসামরিক পাঠকদের অনুধাবনের সুবিধার্থে রূপক হিসেবে তুলে ধরছি বাংলাদেশের সামুদ্রিক নিরাপত্তার মূল চালিকাশক্তি দুই ‘প্রবীণ নারী’কে, যাদের নাম ‘বিএনএস নবযাত্রা’ এবং ‘বিএনএস জয়যাত্রা’।
বয়সের ভারে ন্যুব্জ, টাইপ ০৩৫জি মিং-ক্লাস ঘরানার এই দুটি চীনা সাবমেরিন হয়তো কোনো নতুন প্রজেক্টের যুদ্ধজাহাজের মতো ক্ষিপ্র, গতির দিক থেকে চটপটে কিংবা আধুনিক ন্যানো-প্রযুক্তিসম্পন্ন নয়। কিন্তু ২০১৭ সালে বঙ্গোপসাগরের উত্তাল জলসীমায় এদের আত্মপ্রকাশ পুরো দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলে এক মহাতরঙ্গের মতো কম্পন সৃষ্টি করেছিল। সাধারণ বেসামরিক পাঠকের কাছে এটি হয়তো সমুদ্রে ভাসমান শুধু দুটি সামরিক টহল যান হতে পারে, কিন্তু বঙ্গোপসাগরের বুকে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর নিজস্ব সাবমেরিন চালনা এবং ‘সাবমেরিন আর্ম’ গঠনের এই সূচনাটি ছিল আমাদের সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় নিরাপত্তার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় মনস্তাত্ত্বিক জয়।
বাংলাদেশের সামুদ্রিক ঐতিহ্যের মূল শিকড় ২০১৭ সালে নয়, বরং তা বীরত্বের সঙ্গে প্রোথিত রয়েছে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে। তৎকালীন পাকিস্তান নৌবাহিনীর সাবমেরিনারদের একটি দল ফ্রান্সের ত্যুলোঁ (Toulon) সামরিক ঘাঁটিতে সাবমেরিন সাব-সারফেস অপারেশনের ওপর উচ্চতর প্রশিক্ষণ নিচ্ছিলেন। কিন্তু দেশের ভেতরে পাকিস্তানি বাহিনীর নৃশংস গণহত্যা দেখে ১৯৭১ সালের মার্চেই ত্যুলোঁ বন্দর থেকে আটজন বাঙালি সাবমেরিনার নিজেদের জীবন বাজি রেখে পালিয়ে এসে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। তাদের সেই অসামান্য কৌশলগত জ্ঞান ও সাহসিকতায় গড়ে উঠেছিল ইতিহাসের অন্যতম দুঃসাহসিক নৌ-কমান্ডো যুদ্ধ ‘অপারেশন জ্যাকেপট’।
মাত্র এক রাতের ব্যবধানে ত্যুলোঁর সাবমেরিনারদের নেতৃত্বে নৌ-কমান্ডোরা চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরসহ প্রধান জলপথ পঙ্গু করে মুক্তিযুদ্ধের কৌশলগত মোড় ঘুরিয়ে দেন। সামরিক ইতিহাসবিদদের মতে, এই বীর সাবমেরিনারদের সাহসিকতা না থাকলে মুক্তিসংগ্রাম ভিয়েতনামের মতো ১৫-২০ বছর দীর্ঘায়িত হতো, যা মাত্র ৯ মাসে অর্জিত হয়। দেশ স্বাধীনতার পর পাকিস্তান থেকে ফিরে আসা অভিজ্ঞ বাঙালি সাবমেরিনাররা দেশের নিজস্ব সাবমেরিন সক্ষমতার অপেক্ষায় ছিলেন এবং তরুণ প্রজন্মেও সাবমেরিনার হওয়ার আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছিল। তবে আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে বহু বছর সাবমেরিন ক্রয়ের সাহস দেখায়নি দেশ। অবশেষে নৌ-সদর দপ্তরের দীর্ঘমেয়াদি পেশাদার প্রস্তাবনার ভিত্তিতে সরকার কম খরচে চীনের সঙ্গে আলোচনা করে দুটি সাবমেরিন ক্রয়ের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়।
আধুনিক নৌযুদ্ধের ইতিহাসে সাবমেরিনকে সবচেয়ে ভয়ংকর ও রহস্যময় ‘ভুতুড়ে অস্ত্র’ (Ghost Weapon) হিসেবে গণ্য করা হয়, যা পানির নিচে অদৃশ্য থেকে শত্রুকে মনস্তাত্ত্বিক চাপে রাখতে সক্ষম। ১৯৬৫ সালের দ্বিতীয় ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে পাকিস্তানের মাত্র একটি সাবমেরিন ছিল, ‘পিএনএস গাজী’। যুদ্ধকালীন সময়ে এটি বোম্বাই (মুম্বাই) নৌবন্দরের খুব কাছাকাছি পানির নিচে ওত পেতে অবস্থান করছিল। আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, ‘পিএনএস গাজী’ ভারতের একটি জাহাজও ডোবায়নি। অথচ শুধু পানির নিচে তার অদৃশ্য উপস্থিতি এবং সম্ভাব্য আক্রমণের ভয়ে ভারতীয় নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ বহর বন্দরে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছিল। অর্থাৎ কোনো জাহাজ না ডুবিয়েও সাবমেরিনটি পুরো ভারতীয় নৌবহরকে পঙ্গু করে দিয়েছিল।
পরে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে সাবমেরিন যুদ্ধের রূপ আরো ভয়াবহ ও প্রত্যক্ষ হয়ে ওঠে। বঙ্গোপসাগর ও আরব সাগরে উত্তেজনার মধ্যে পাকিস্তানি সাবমেরিন ‘পিএনএস হ্যাঙ্গর’-এর ছোড়া টর্পেডোর আঘাতে ভারতের শক্তিশালী অ্যান্টি-সাবমেরিন যুদ্ধজাহাজ ‘আইএনএস খুকরি’ সমুদ্রের বুকে মুহূর্তের মধ্যে ধ্বংস হয়ে তলিয়ে যায়। একই সময়ে পাকিস্তানের জরাজীর্ণ সাবমেরিন ‘পিএনএস গাজী’ কারিগরি ত্রুটি থাকা সত্ত্বেও বঙ্গোপসাগরে রওনা দিলে ভারতের প্রধান বিমানবাহী রণতরী ‘আইএনএস বিক্রান্ত’ নিজের নিরাপদ অবস্থান পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়। ৩০ নভেম্বর বিশাখাপত্তনমের কাছে দুর্ঘটনায় গাজী ধ্বংস হওয়ার আগ পর্যন্ত ভারতীয় নৌবাহিনী মারাত্মক দ্বিধাদ্বন্দ্বে ছিল এবং জলপথ ঝুঁকিমুক্ত নিশ্চিত করেই তারা পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরু করে।
আবার ১৯৮২ সালে ফকল্যান্ড যুদ্ধে আর্জেন্টিনার সাবমেরিন ‘সান লুইস’-এর টর্পেডো সিস্টেম অকার্যকর থাকা সত্ত্বেও তার নিছক উপস্থিতিই পরাশক্তি ব্রিটিশ রয়্যাল নেভিকে নির্দিষ্ট জলসীমায় প্রবেশ করতে বাধা দিয়েছিল। নৌবিজ্ঞানে একেই বলা হয় ‘সি-ডিনায়াল’ (Sea-Denial) বা ‘ফ্লিট-ইন-বিয়িং’ (Fleet-in-being), যেখানে শত্রুকে ধ্বংস না করেও শুধু নিজের অদৃশ্য অস্তিত্বের ভীতি বজায় রেখে বিশাল শত্রু নৌবহরকে পিছু হটতে বাধ্য করা যায়। বঙ্গোপসাগরে আমাদের দুটি সাবমেরিন ঠিক এই মনস্তাত্ত্বিক বর্মেরই কাজ করছে।
চীন থেকে সংগৃহীত ২৪ বছর বয়সি দুটি সাবমেরিন ওভারহোলিং ও রিফার্বিশ করে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর বহরে যুক্ত করার পর তা ভারতীয় প্রতিরক্ষা মহলে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করে। যদিও সাধারণ সামরিক নিয়মে সাবমেরিনের গড় আয়ু ৩০/৩২ বছর ধরা হয়, কিন্তু এই অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে ‘থ্রি-ডি (3D) নেভি’তে রূপান্তরিত হয়। আপাতদৃষ্টিতে পুরোনো প্রযুক্তির মনে হলেও, যখন আনুষ্ঠানিকভাবে এই দুটি সাবমেরিন বহরে যুক্ত হলো, তখন প্রতিবেশীর সামরিক মহলে চরম প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়।
বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের সাবমেরিন উপস্থিতি ভারতের এই অঞ্চলে একচ্ছত্র আধিপত্যের স্বপ্নে আঘাত হেনেছে। এর ফলে সৃষ্ট সামরিক সংকটে তাদের নৌবহরের অবাধ চলাচলে বাধা তৈরি হওয়ায়, বাংলাদেশ যেন ভবিষ্যতে আধুনিক সাবমেরিন সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে না পারে, সেজন্য প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলো কৌশলগত চক্রান্ত শুরু করে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, ১৯৮০-এর দশকের প্রযুক্তির টাইপ ০৩৫জি মিং-ক্লাসের এই ‘দুই প্রবীণ নারী’ চিরদিন বঙ্গোপসাগরে টহল দিতে পারবেন না। এগুলোতে আধুনিক ‘এয়ার-ইন্ডিপেনডেন্ট প্রোপালশন’ (AIP) সিস্টেম না থাকায় ব্যাটারি চার্জের জন্য ঘনঘন পানির ওপরে আসতে হয়, যা আধুনিক রাডার ও স্যাটেলাইটের যুগে শত্রুর কাছে সহজে চিহ্নিত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ায়। তাই এই প্রবীণ সাবমেরিনগুলোর অবসরের সময় ঘনিয়ে আসার আগেই তাদের স্থানে আধুনিক প্রযুক্তির ‘তরুণী’ (নতুন) সাবমেরিন অন্তর্ভুক্ত করা এখন জাতীয় নিরাপত্তার সবচেয়ে বড় তাগিদ।
ভবিষ্যতের সম্ভাব্য সংঘাতের সময় শত্রুকে বাংলাদেশের ভূখণ্ডে সরাসরি সামরিক আক্রমণ করতে হবে না। সাম্প্রতিক জ্বালানি ও অর্থনৈতিক সংকট দেখিয়েছে, বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথ বা ‘সি-লাইনস অব কমিউনিকেশন’র (এসএলওসি) ওপর কতটা সংবেদনশীলভাবে নির্ভরশীল। শত্রুভাবাপন্ন কোনো পরাশক্তি যদি বঙ্গোপসাগরের প্রবেশমুখে আমাদের জ্বালানি ও পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল অবরুদ্ধ করে দেয়, তবে সমগ্র বাংলাদেশ কয়েক দিনের মধ্যে স্থবির ও পঙ্গু হয়ে পড়তে বাধ্য হবে।
সুতরাং, সমুদ্রপথে কোনো ধরনের শত্রুভাবাপন্ন অবরোধ রুখতে এবং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক লাইফলাইন সচল রাখতে নতুন প্রজন্মের এআইপিযুক্ত ‘তরুণী’ সাবমেরিন কেনা কোনো বিলাসী সামরিক অপচয় নয়। এটি হলো পুরো দেশের স্বাধীন অস্তিত্ব ও অর্থনীতিকে বাঁচিয়ে রাখার ‘ইনস্যুরেন্স প্রিমিয়াম’। জাতীয় অর্থনীতির সামর্থ্য অনুযায়ী নতুন অত্যাধুনিক সাবমেরিন সংগ্রহ করার পেছনে যে বিনিয়োগ হবে, তা যেকোনো আর্থিক হিসাব-নিকাশের চেয়ে বহুগুণ বেশি দেশের সার্বভৌমত্বকে নিশ্চিত করবে।
বর্তমান সময়ে বঙ্গোপসাগর শুধু আঞ্চলিক নয়, বরং বিশ্বশক্তির কৌশলগত স্নায়ুযুদ্ধের প্রধান ময়দানে পরিণত হয়েছে। এর পেছনে দুটি পরাশক্তির বিশাল স্বার্থ কাজ করছে। চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও জ্বালানি সরবরাহ মূলত মালাক্কা প্রণালির ওপর নির্ভরশীল, যা যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের দ্বারা অবরুদ্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে। একেই বলা হয় চীনের বিখ্যাত মালাক্কা ডিলেমা ( Malacca Dilemma ) । এই ভয়াবহ পরিণতি এড়াতে চীন বিকল্প হিসেবে মিয়ানমারের কিয়াকফিউ (Kyaukphyu) গভীর সমুদ্র বন্দর এবং সেখান থেকে চীনের ইউনান প্রদেশ পর্যন্ত বিস্তৃত তেল ও গ্যাসের পাইপলাইন গড়ে তুলেছে, যা চট্টগ্রামের নিকটবর্তী হওয়ায় চীনের জন্য ‘মালাক্কা বাইপাস’ হিসেবে কাজ করছে।
অন্যদিকে, চীনের এই সামুদ্রিক বিস্তার রোধে ওয়াশিংটন বঙ্গোপসাগরে নিজেদের বলয় তৈরি করতে ২০২৬ সালের আগস্টে মার্কিন প্যাসিফিক ফ্লিটের অ্যাডমিরাল স্টিভ কোহলরের নেতৃত্বে ঢাকা সফর এবং নভেম্বরে CARAT যৌথ সামরিক মহড়ার কৌশল নিয়েছে। লজিস্টিক ও পোর্ট এক্সেস নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্র একই সময়ে GSOMIA ও ACSA চুক্তির জন্য চাপ দিচ্ছে।
এই ত্রিভুজাকার ভূরাজনৈতিক যুদ্ধে বাংলাদেশ চরম এক কূটনৈতিক রশি টানাটানির মুখে পড়েছে। আমাদের ঐতিহ্যগত ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান বজায় রাখা এখন কঠিন হয়ে পড়েছে; কারণ একদিকে আমাদের প্রধান বাণিজ্যিক ও সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহকারী দেশ চীন, অন্যদিকে ইন্দো-প্যাসিফিকের মার্কিন শক্তি এবং প্রতিবেশী ভারত।
প্রায় দুই দশক আগে জাতীয় নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থায় দুই বছর দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতায় আমি বুঝতে পেরেছিলাম, পরাশক্তিগুলো কোনো রাষ্ট্রকে সরাসরি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হলে ব্যাকচ্যানেল কূটনীতি, অর্থনৈতিক প্রলোভন বা রাজনৈতিক মদত দিয়ে গোপনে নিজেদের স্বার্থের চুক্তি হাসিল করে। বেসামরিক আমলা ও নীতিনির্ধারকরা ব্যক্তিগত ক্যারিয়ার বা প্রশাসনিক ব্যস্ততার কারণে পরাশক্তির এই দীর্ঘমেয়াদি কৌশল ও চতুর নেগোশিয়েটরদের মনস্তাত্ত্বিক ফন্দি অনুধাবন করতে প্রায়ই ব্যর্থ হন।
ইতিহাস আমাদের কঠোর বার্তা দেয়। যখনই কোনো স্বদেশপ্রেমী সামরিক বা বেসামরিক কর্মকর্তা জাতীয় সম্পদ ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় আপসহীন অবস্থান নিয়েছেন, তখনই অদৃশ্য শক্তি বা ‘ডিপ স্টেট’ চক্রান্তের মাধ্যমে তাদের সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের প্রাক্তন সফল চেয়ারম্যান কমডোর গোলাম রব্বানীর আত্মত্যাগ ও নির্মম পরিণতি আমাদের জাতীয় ইতিহাসে এক করুণ ও জ্বলন্ত সতর্কবার্তা। কোনো ছায়ানীতি বা অদৃশ্য শক্তি যেন রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক সুবিধার বিনিময়ে চট্টগ্রাম বা বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত সুবিধা বিদেশি শক্তির হাতে ইজারা দিয়ে আমাদের ইউক্রেনের বিখ্যাত ‘সেভাস্টোপল ট্র্যাজেডি’র দিকে ঠেলে না দেয়।
পরাশক্তির কোনো রুপালি প্রলোভনে পড়ে কিংবা সাধারণ সিভিল আমলাদের অপরিপক্ব সিদ্ধান্তে দেশের সামুদ্রিক সম্পদ ও বন্দর ব্যবহারের সুবিধা বিদেশি শক্তির কাছে হস্তান্তর করা যাবে না। প্রথমত, সামুদ্রিক সার্বভৌমত্ব রক্ষায় শুধু আমলা বা রাজনীতিকদের ওপর নির্ভর না করে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর অভিজ্ঞ রণকৌশলবিদ, সাবমেরিনার এবং পেশাদার জাতীয় নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন স্বাধীন কমিটি গঠন করতে হবে। দ্বিতীয়ত, আমাদের ১,১৮,০০০ বর্গকিলোমিটারের বেশি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (EEZ) এবং কক্সবাজারের অত্যন্ত আধুনিক বিএনএস পেকুয়া সাবমেরিন ঘাঁটি (বিএনএস ৮ সাবমেরিনার নামে পুনঃনামকরণ করা যেতে পারে) কোনো পরাশক্তির প্রক্সি যুদ্ধের সামরিক ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করতে দেওয়া যাবে না। এটি আমাদের জাতীয় অস্তিত্ব ও সামুদ্রিক সীমানা রক্ষা করার শেষ দুর্গ।
আমাদের ‘দুই প্রবীণ নারী’ নবযাত্রা ও জয়যাত্রার সুদৃঢ় পথ ধরে আগামী দিনে তরুণ প্রজন্মের হাত ধরে আসবে নতুন ‘তরুণী’ সাবমেরিনগুলো। ১৯৭১ সালে ফ্রান্সের ত্যুলোঁর আট বীর সাবমেরিনারের রক্ত, কমডোর রব্বানীর দেশপ্রেমিক আত্মত্যাগ, ৫ আগস্ট ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা এবং আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনাই হলো এই ভূরাজনৈতিক ঝড়ের মধ্যে বাংলাদেশের আসল দিকনির্দেশক। রাজনৈতিক প্রলোভন ও পরাশক্তিদের চতুর ব্যাকচ্যানেল চক্রান্তের সামনে নতিস্বীকার না করে, নৌ-বিশেষজ্ঞদের সঠিক পরামর্শের ভিত্তিতে স্বাধীন ও সার্বভৌম সামুদ্রিক নীতি বজায় রাখাই বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের টিকে থাকার একমাত্র পথ।
আর এই সার্বভৌমত্বকে অপরাজেয় রূপ দিতে আমরা যদি নতুন ও আধুনিক সাবমেরিন বহরের দিকে পা বাড়াই, তবে আমাদের অপারেশনাল প্রস্তুতিকে নতুন উদ্যমে পুনরুজ্জীবিত করতে সেই চিরচেনা ‘নবযাত্রা’ ও ‘জয়যাত্রা’ নামেই আবার শুরু করা উচিত। এই নাম দুটি শুধু অতীতের গৌরব নয়, বরং সমুদ্রের বুকে আমাদের অপরাজেয় অগ্রযাত্রার এক অবিনাশী অঙ্গীকার, যা মনে করিয়ে দেবে যে, এই বাংলার সমুদ্রসীমা রক্ষা করতে আমাদের জয়যাত্রা কখনো থামবে না।
লেখক : সাবেক সহকারী নৌবাহিনী প্রধান ও উপ-উপাচার্য বিইউপি
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


