এবারের মহাকাব্যিক বিশ্বকাপ ফুটবল

এবারের মহাকাব্যিক বিশ্বকাপ ফুটবল
ফাইল ছবি

ফুটবল বিশ্বকাপ ২০২৬ নিয়ে এই লেখা ছাপা হয়ে যখন পাঠকের হাতে পৌঁছাবে, ততক্ষণে তারা জেনে যাবেন কে জিতেছে বিশ্বকাপ শিরোপা। আর্জেন্টিনা না স্পেন? বিশ্বকাপের ছয় কেজিরও বেশি ওজনের সোনার ট্রফিটা লিওনেল মেসি না লামিন ইয়ামালের হাতে শোভা পাচ্ছে, সেই সুন্দর ছবিটিও সংবাদপত্রের নগর সংস্করণে প্রকাশিত হয়ে যাবে।

বিভিন্ন এআই মডেল এবং বৈশ্বিক প্রেডিকশন মার্কেট ‘কালশি’ এবং শীর্ষস্থানীয় স্পোর্টস অ্যানালিটিকস ডেটার পূর্বাভাস অনুযায়ী আর্জেন্টিনা চ্যাম্পিয়ন হওয়ার সম্ভাবনা ৫৮ শতাংশ এবং স্পেনের ৪২ শতাংশ। টুর্নামেন্টের শুরুতে মাইক্রোসফট কোপাইলট, জেমিনি ও অন্যান্য এআই মডেল পূর্বাভাস দিয়েছিল, এবার ফ্রান্স চ্যাম্পিয়ন হবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, সেমিফাইনালে ফ্রান্স স্পেনের কাছে হেরে বিদায় নিয়েছে, ফাইনাল খেলতেই পারেনি। তাই পূর্বাভাসের আর প্রয়োজন নেই। আর্জেন্টিনা বা স্পেনÑকে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে পাঠক ও দর্শকরা নিশ্চয়ই আপনারা বিশ্বকাপের মেগা ফাইনালের রুদ্ধশ্বাসের এই খেলা উপভোগ করে এরই মধ্যে জেনে গেছেন।

বিজ্ঞাপন

বিশ্বকাপের ১০৪ খেলার পর্যালোচনা

ফুটবল ইতিহাসের বৃহত্তম এবং সবচেয়ে বৈচিত্র্যময় টুর্নামেন্ট হিসেবে এবারের ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। দল সংখ্যা বৃদ্ধি, রেকর্ড ভাঙা গোলের মহোৎসব এবং খাদের কিনারা থেকে ফুটবল পরাশক্তিদের ঘুরে দাঁড়ানোর রোমাঞ্চÑসব মিলিয়ে ফুটবল বিশ্বের এই আসরটিকে মহাকাব্যিক বলা যায়।

এই বিশ্বকাপে ৪৮টি দলের অংশগ্রহণ এবং তিন দেশের ১৬টি ভেন্যু বা স্টেডিয়াম ১০৪টি ম্যাচের রোমাঞ্চকর লড়াই বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি দর্শককে মোহিত করেছে। আমেরিকা, মেক্সিকো এবং কানাডার যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত এই আসরটি মাঠের খেলা, কৌশলগত পরিবর্তন এবং বাণিজ্যিক সাফল্যের দিক থেকে যেমন অনন্য ছিল, তেমনি কিছু বড় ট্র্যাজেডি এবং বিতর্কিত অধ্যায়েরও সাক্ষী হয়ে আছে।

কেপ ভার্দে, কুরাসাও, জর্ডান এবং উজবেকিস্তানের মতো দলগুলো ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে প্রথমবার খেলার সুযোগ পায়। টুর্নামেন্টজুড়ে অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত ফুটবল খেলেছে ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়ন স্পেন।

নকআউট পর্বে তারা কোনো ম্যাচ অতিরিক্ত সময়ে না নিয়ে নির্ধারিত ৯০ মিনিটেই অস্ট্রিয়া, পর্তুগাল, বেলজিয়াম এবং ফ্রান্সকে হারিয়ে ফাইনালে ওঠে। ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা গ্রুপ পর্বে লিওনেল মেসির হ্যাটট্রিকে শুভসূচনা করলেও নকআউট পর্বে তাদের প্রতিটি ম্যাচ ছিল রোমাঞ্চে ঠাসা। মিসর, সুইজারল্যান্ড এবং সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে পিছিয়ে পড়েও তারা দুর্দান্তভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে ফাইনালে জায়গা করে নেয়। সর্বোচ্চ গোলদাতার গোল্ডেন বুট রেসে এমবাপ্পে ১০টি গোল করে এগিয়ে আছে। মেসি আটটি গোল ও চারটি অ্যাসিস্ট করেছেন। ফাইনাল খেলার পর তার অবস্থান নির্ধারিত হবে।

বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা তাদের পুরোনো ও অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের ওপর ভর করে এবং লিওনেল মেসির দূরদর্শী নেতৃত্বেই আবার ফাইনালে উঠে যায়।

সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ১-০ গোলে পিছিয়ে থেকেও শেষ মুহূর্তে তাদের দুর্দান্ত খেলা ও নাটকীয়তায় ২-১ গোলের জয় ছিনিয়ে নেয়। টুর্নামেন্টে সবচেয়ে কম গোল (মাত্র ১টি) হজম করা দল স্পেন সেমিফাইনালে ফ্রান্সকে হারিয়ে ফাইনালে জায়গা করে নেয়। তাদের জমাট রক্ষণ ও টিকিটাকা ফুটবলের আধুনিক সংস্করণ ফুটবল বিশেষজ্ঞদের প্রশংসা কুড়িয়েছে। এবারের বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় অঘটন ছিল রাউন্ড অব ৩২-এ জার্মানির বিদায়। টাইব্রেকারে প্যারাগুয়ের কাছে হেরে টুর্নামেন্ট থেকে তারা ছিটকে পড়ে, যা জার্মানির ফুটবল কাঠামোকে এক গভীর সংকটে ফেলে দিয়েছে। তেমনি সেমিফাইনালে ফ্রান্সের বিদায়কেও অঘটন হিসেবে চিহ্নিত করা যায়।

তবে এবার স্পেন অপ্রতিরোধ্য এবং শক্তিশালী দল হিসেবেই ফ্রান্সকে হারিয়েছে। সেমিফাইনালে ফ্রান্সের বিদায়কে ফুটবল বিশেষজ্ঞরা একটি ‘সম্মিলিত ব্যর্থতা’ এবং অতিমাত্রায় রক্ষণাত্মক ও অতি সাবধানি কৌশলের নির্মম পরিণতি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। স্পেনের তিন মিডফিল্ডার রদ্রি, ফাবিয়ান রুইজ ও দানি ওলমোর ত্রয়ী শক্তির সামনে ফ্রান্সের মাঝমাঠ পুরোপুরি খেই হারিয়ে ফেলে। মাঝমাঠে ফরাসিরা প্রায়ই ‘৩ বনাম ২’ অনুপাতে সংখ্যায় পিছিয়ে পড়ছিল বলে বিশেষজ্ঞদের মত। স্পেনের মিডফিল্ডাররা বল পজিশন নিয়ন্ত্রণে রেখে ম্যাচ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখলেও ফ্রান্সের পাসিংয়ের কোনো সমন্বয় ছিল না। মহাতারকা খেলোয়াড় এমবাপ্পের পরফরম্যান্স ছিল তীব্রভাবে প্রশ্নবিদ্ধ, ফ্রান্সের সংবাদমাধ্যম ‘ল্য ইক্যুইপ’ এমবাপ্পের পারফরম্যান্সকে ১০-এর মধ্যে মাত্র ৩ রেটিং দিয়েছে। উসমান দেম্বেলে এবং মাইকেল অলিজের মতো তারকা উইঙ্গারদেরও স্প্যানিশ ডিফেন্ডাররা সফলভাবে নিষ্ক্রিয় করে রেখেছিলেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, কোচ দিদিয়েম দেশমের মাত্রাতিরিক্ত রক্ষণাত্মক ফুটবল বা ‘সেফ গেম’ দলের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়।

এবারের বিশ্বকাপে দলগুলোর মধ্যে একটি ভিন্ন কৌশলগত প্রবণতা লক্ষ করা গেছে। থমাস টুখেলের অধীনে ইংল্যান্ড দল রক্ষণাত্মক কৌশল বেছে নিলেও আর্জেন্টিনার ক্ষুরধার আক্রমণের সামনে তা ভেঙে পড়ে। এটি প্রমাণ করে আধুনিক ফুটবলে শুধু লিড ধরে রাখার জন্য অতি রক্ষণাত্মক হওয়া আত্মঘাতী হতে পারে। অন্যদিকে স্পেন রক্ষণ ও আক্রমণের মধ্যে নিখুঁত ভারসাম্য বজায় রেখে সফলতা পেয়েছে।

ফিফার ইতিহাসে বিশ্বকাপ ফুটবল ২০২৬ সবচেয়ে বেশি লাভজনক আসর হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে, যার মোট রাজস্ব কাতার বিশ্বকাপের আয়কে ছাড়িয়ে প্রায় ১৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছে। যুক্তরাষ্ট্রে ‍ফুটবল ‍টুর্নামেন্ট আয়োজন করায় ১৯৯৪ সালের পর এবার সর্বোচ্চ দর্শক উপস্থিতির নতুন বিশ্বরেকর্ড হয়েছে।

এবার ৬৫ লাখের বেশি দর্শক মাঠে গিয়ে সরাসরি খেলা দেখেছেন। টুর্নামেন্টজুড়ে মাঠে গড়ে ৯৭ দশমিক ৭ শতাংশ দর্শকপূর্ণ ছিল। বিশেষ করে, যুক্তরাষ্ট্রের ফুটবলের দর্শকপ্রিয়তা আকাশচুম্বী হয়েছে, যেখানে বেলজিয়াম বনাম যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাচটি রেকর্ড ৪২ মিলিয়ন মানুষ দেখেছে। স্টেডিয়ামের বাইরে ফিফা ফ্যান ফেস্টিভ্যালগুলোয় ৭৭ লাখের বেশি দর্শক সমবেত হয়েছে। বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়া, টেলিভিশন এবং অনলাইন দর্শক সংখ্যা ৫০০ কোটি ছাড়িয়ে যাবে বলে ফিফার ধারণা। ফুটবলবিষয়ক ভিডিওগুলো সামাজিক প্ল্যাটফর্মগুলোয় ২০ বিলিয়ন বারের বেশি দেখানো হয়েছে।

টুর্নামেন্টে ভিএআর এবং রেফারিংয়ের কিছু সিদ্ধান্ত নিয়ে বেশ বিতর্ক তৈরি হয়। টুর্নামেন্টের সবচেয়ে বড় কেলেঙ্কারি ছিল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরাসরি হস্তক্ষেপে আমেরিকার তারকা ফোলারিন বালোগুনের লাল কার্ডের নিষেধাজ্ঞা ফিফা কর্তৃক তুলে নেওয়া। খেলার নিয়মে এই রাজনৈতিক প্রভাবকে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম ‘কালো অধ্যায়’ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই কর্মকাণ্ড ফুটবলীয় ‘ফেয়ার প্লে’কে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

গোলসংখ্যায় কাতার বিশ্বকাপের সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে এবারের বিশ্বকাপ। ১০৩টি ম্যাচে গোল হয়েছে ৩০৭টি। আজকের ফাইনালের গোল যোগ করলে তা আরো বেড়ে যাবে। আগেই বলেছি, চলতি আসরের সবচেয়ে গোছানো ও দৃষ্টিনন্দন ফুটবল উপহার দিয়েছে ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়ন স্পেন। অন্যদিকে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা যেন প্রতি ম্যাচেই খাদের কিনারা থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর এক জাদুকরী রূপকথা লিখছে।

ফুটবল বিশ্ব, ক্রীড়া বিশ্লেষক এবং দর্শকদের বিবেচনায় এবার সবচেয়ে সেরা ও রোমাঞ্চকর ম্যাচ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে রাউন্ড অব ৩২-এ আর্জেন্টিনা বনাম কেপ ভার্দে (৩-২) ম্যাচটি। এছাড়া ঐতিহাসিক প্রতিদ্বন্দ্বী দুই দল আর্জেন্টিনা বনাম ইংল্যান্ডের সেমিফাইনাল ম্যাচটি (২-১) ছিল চরম উত্তেজনা ও শারীরিক ফুটবলের এক ক্লাসিক প্রদর্শনী। রাউন্ড অব ১৬-তে ইংল্যান্ড বনাম মেক্সিকোর (৩-২) ম্যাচটিও ছিল দেখার মতো।

এবার ম্যাচের সংখ্যা ৬৪টি থেকে বাড়িয়ে ১০৪টি করা হয়, যা ‍ফুটবল বিশ্বায়নে বড় ভূমিকা রেখেছে। ছোট ছোট দেশের বিশ্বমঞ্চে খেলার সুযোগ পাওয়ায় বৈশ্বিক ফুটবলের উন্মাদনা বৃদ্ধি পেয়েছে। অবশ্য অতিরিক্ত ম্যাচের কারণে গ্রুপ পর্বের কিছু ম্যাচ আকর্ষণ হারিয়েছিল বলেও বিশ্লেষকদের মত। ঠাসা সূচির কারণে ফুটবলারদের ক্লান্তি এবং ইনজুরির প্রবণতা স্পষ্ট লক্ষ করা গেছে। ফিফা এই টুর্নামেন্টে টিকিটের দাম অতিরিক্ত নির্ধারণ করায় বিশ্বব্যাপী ফুটবল সমর্থকদের তীব্র সমালোচনার মুখোমুখি হয়। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এই বিশ্বকাপকে ঘিরে বিশ্বজুড়ে ৫০ বিলিয়ন ডলারের স্পোর্টস বাজি ধরা হয়েছে, যা আগের সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। ফুটবলীয় দৃষ্টিকোণ থেকে এবারের বিশ্বকাপকে ‘খুবই রোমাঞ্চকর ও সফল’ বলা যায়। তবে লজিস্টিক ব্যবস্থাপনা, ফিফার অতিরিক্ত বাণিজ্যিক মনোভাব এবং সাধারণ দর্শকদের জন্য টিকিটের চড়া মূল্য টুর্নামেন্টের পেশাদারিত্বের গায়ে কিছুটা দাগ লাগিয়েছে। এটি স্পষ্ট, ফুটবল এখন আর শুধু একটি খেলা নয়; বরং এটি একটি বিশ্বজনীন ব্যবসায়িক মডেলে পরিণত হয়েছে। এবারের বিশ্বকাপের সবচেয়ে ভালো দিক হলো ৪৮টি দলের বর্ধিত কলেবরে দুর্বল ও নতুন দলগুলোর চমকপ্রদ লড়াই এবং দুর্দান্ত গ্যালারি পরিবেশ। সবচেয়ে বিতর্কিত বিষয় হলো, ফিফার নজিরবিহীন টিকিট কেলেঙ্কারি এবং ফুটবলে সরাসরি রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ।

বিশ্বকাপের সেরা পাঁচ দল

এবারের বিশ্বকাপের টুর্নামেন্ট পরিস্থিতি, নকআউট পর্বের পারফরম্যান্স এবং সেমিফাইনাল-ফাইনালের সমীকরণ বিবেচনা করলে সামগ্রিকভাবে সেরা পাঁচটি দল হলো আর্জেন্টিনা, স্পেন, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড ও মরক্কো। ইএসপিএন, দ্য অ্যাথলেটিক এবং ক্রীড়া বিশ্লেষকদের মূল্যায়ন ও র‌্যাংকিংয়ে তাদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেছে।

বর্তমান বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা গ্রুপ পর্বে শতভাগ জয় নিয়ে নকআউট পর্বে পা রাখে। সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডকে ২-১ গোলে হারিয়ে ফাইনাল নিশ্চিত করে। লিওনেল মেসির জাদুকরী নেতৃত্ব ও ফর্ম এবং লাউতায়ো মার্টিনেজের দুর্দান্ত ফর্মে আর্জেন্টিনা পুরো টুর্নামেন্টে তাদের চ্যাম্পিয়ন মানসিকতা ধরে রেখেছে।

টুর্নামেন্টে সবচেয়ে আকর্ষণীয় ফুটবল খেলা দল স্পেন। মাত্র একটি গোল হজম করে সেমিফাইনালে শক্তিশালী ফ্রান্সকে ২-০ গোলে হারিয়ে ফাইনালিস্ট হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। লামিন ইয়ামাল এবং মিকেল ওয়ারজাবালদের গড়া স্পেনের এই তরুণ দলটি টুর্নামেন্টের সবচেয়ে নান্দনিক ও কার্যকর ফুটবল খেলেছে। রক্ষণে ইস্পাতকঠিন দৃঢ়তা এবং মাঝমাঠের নিখুঁত নিয়ন্ত্রণ ও পাসিংয়ের কারণে স্পেনকে এই বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা দল বলা হচ্ছে।

টুর্নামেন্টের অন্যতম প্রধান দাবিদার ফ্রান্স কোয়ার্টার ফাইনালে মরক্কোকে ২-০ গোলে হারিয়ে সেমিফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছায়। তবে সেমিফাইনালে স্পেনের কাছে হেরে তাদের শিরোপা স্বপ্ন শেষ হয়। কিলিয়ান এমবাপ্পের বিধ্বংসী রূপ (১০টি গোল) এবং উসমান দেম্বেলের আক্রমণভাগের গতি ফ্রান্সকে টুর্নামেন্টে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছিল। তবে শেষে এটি তারা ধরে রাখতে পারেনি। সেমিফাইনালে হারের পর তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচেও ফ্রান্স হেরে যায়। তার অবস্থান এখন চতুর্থ স্থানে।

কোয়ার্টার ফাইনালে নরওয়ের বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়ে নাটকীয় ম্যাচে ৩-২ ব্যবধানে জিতে সেমিফাইনালে উঠেছিল থ্রি লায়ন্সরা। তবে আর্জেন্টিনার কাছে ২-১ গোলে হেরে তারা ফাইনালে উঠতে ব্যর্থ হয়। তৃতীয় স্থান নির্ধারণকারী ম্যাচে ইংল্যান্ড ৬-৪ গোলে ফ্রান্সকে হারিয়ে ব্রোঞ্জ ট্রফি জিতেছে। দল হিসেবে ইংল্যান্ডের অবস্থান এখন তৃতীয়। হ্যারি কেইন এবং জুড বেলিংহামের আক্রমণাত্মক জুটি ইংল্যান্ডকে এ পর্যায়ে নিয়ে এসেছে। টুর্নামেন্টজুড়ে লড়াকু ফুটবল এবং সেমিফাইনালে পৌঁছানো তাদের অন্যতম সেরা দলের স্বীকৃতি দিয়েছে।

২০২২ বিশ্বকাপের পর ২০২৬ বিশ্বকাপেও মরক্কো তাদের রূপকথার যাত্রা বজায় রেখে কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছেছিল। সেখানে তারা ফ্রান্সের কাছে ২-০ গোলে হেরে বিদায় নেয়। নকআউট পর্বে নেদারল্যান্ডস ও কানাডার মতো শক্তিশালী দলকে বিদায় করে মরক্কো প্রমাণ করে তারা বিশ্বমঞ্চের অন্যতম ফুটবল পরাশক্তি। আশরাফ হাকিমি ও ব্রাহিম দিয়াজের চমৎকার নেতৃত্ব ও গোছানো রক্ষণভাগের কারণে তারা এই টুর্নামেন্টের সেরা ‘ডার্ক হর্স’ এবং সামগ্রিকভাবে পঞ্চম সেরা দল।

পাঁচ সেরা খেলোয়াড়

এবারের বিশ্বকাপে ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স, গোল, অ্যাসিস্ট এবং দলের জয়ে অনবদ্য প্রভাবের ওপর ভিত্তি করে লিওনেল মেসি, কিলিয়ান এমবাপ্পে, আর্লিং হালান্ড, হ্যারি কেইন এবং জুড বেলিংহামÑএই পাঁচজনকে টুর্নামেন্টের সবচেয়ে সেরা খেলোয়াড় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ফিফার অফিশিয়াল পারফরম্যান্স ইনডেক্স, গোল, অ্যাসিস্টের পরিসংখ্যান এবং গোল্ডেন বল ও বুটের লড়াইয়ের ভিত্তিতে তারা সেরা বিবেচিত হন।

মেসি এখন পর্যন্ত ৮টি গোল এবং ৪টি অ্যাসিস্ট নিয়ে গোল্ডেন বুটের দৌড়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছেন। তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে জোরা গোল করে ১০টি গোলের সংখ্যায় কিলিয়ান এমবাপ্পে তাকে টপকে যান। ফাইনালে নির্ধারিত হবে মেসি তার আগের অবস্থান ফিরে পাবেন কি না। টুর্নামেন্টের সবচেয়ে সৃজনশীল এবং আক্রমণাত্মক খেলোয়াড় হিসেবে তিনি শীর্ষ রেটিং (৮ দশমিক ৪১) পেয়েছিলেন। এখন পর্যন্ত মেসিকে টপকে বিশ্বকাপের ইতিহাসের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতার সিংহাসন নিজের করে নিয়েছেন ফরাসি ফরোয়ার্ড এমবাপ্পে।

মাত্র ৪ ম্যাচে ৭টি গোল করার এক অবিশ্বাস্য পরিসংখ্যান গড়েন নরওয়ের আর্লিং হালান্ড। ইংল্যান্ডের মাঝমাঠের প্রাণভোমরা হিসেবে ৬টি গোল করেছেন জুড বেলিংহাম। তেমনি অধিনায়ক হিসেবে দলকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে ৭টি গোল করেছেন হ্যারি কেন।

ফুটবলের জীবন্ত রূপকথা মেসি

ফুটবলের এক জীবন্ত রূপকথার নাম লিওনেল মেসি। শৈশব থেকে আজ পর্যন্ত মেসির অর্জনগুলোর দিকে তাকালে যে কেউ বলবে তিনি ফুটবলের এক শাশ্বত রূপকথা। ২০ বছর ধরে ফুটবল মাঠে তার নিখুঁত পারফরম্যান্স ও গিনেস বুক কাঁপানো রেকর্ডের খতিয়ান বলে দেবে মেসি ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় মহাকাব্য।

লিওনেল মেসি এখন পর্যন্ত ২০২৬ বিশ্বকাপে ৮টি গোল ও ৪টি অ্যাসিস্ট করে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছান। ফরাসি ফরোয়ার্ড এমবাপ্পে বিশ্বকাপে ১০টি গোল করে তার রেকর্ড ভেঙে দিলেও সামনে ফাইনাল ম্যাচ রয়েছে মেসির। সেই ম্যাচই নির্ধারণ করবে তার অবস্থান। ৩৯ বছর বয়সে নিজের ষষ্ঠ বিশ্বকাপ খেলতে নেমে তিনি আর্জেন্টিনাকে টানা দ্বিতীয়বারের মতো ফাইনালে তুলেছেন। ফুটবল বিশ্বে শ্রেষ্ঠত্বের বিতর্কটি মূলত ব্রাজিলের পেলে এবং আর্জেন্টিনার ম্যারাডোনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। তবে ২০২৬ বিশ্বকাপের পারফরম্যান্সের পর ফুটবল বিশ্লেষক ও ইতিহাসবিদদের মতে, মেসি এই দুজনকে ছাড়িয়ে এককভাবে ‘সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ’ হিসেবে স্থান করে নিয়েছে।

পেলেকে যদি বলা হয় ‘ফুটবলের রাজা’ আর ম্যারাডোনাকে ‘ফুটবলের ঈশ্বর’, তবে মেসি হলেন ফুটবলের পূর্ণতা। গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ড তাদের এক্স (টুইটার) হ্যান্ডেলে ও ওয়েবসাইটে মেসিকে ‘ইতিহাসের সবচেয়ে বড় রেকর্ড শিকারি’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। গিনেস বুকের মূল বার্তাটি হচ্ছেÑ‘আমরা কোনো ফুটবলারের রেকর্ড বুক লিখছি না, আমরা স্রেফ লিওনেল মেসির ক্যারিয়ার লিপিবদ্ধ করছি। তিনি প্রমাণ করেছেন, বয়স শুধুই একটি সংখ্যা এবং ফুটবল খেলায় তার চেয়ে নিখুঁত ও প্রভাবশালী কোনো মানবসন্তানের জন্ম হয়নি।’

মাত্র ২৭ বছর বয়সে এমবাপ্পে তিনটি বিশ্বকাপ খেলে মেসির ৩১ ম্যাচের রেকর্ডকে টপকে ২২টি গোল করে শীর্ষে বসেছেন। তিনি ইতিহাসে প্রথম খেলোয়াড়, যিনি টানা দুটি বিশ্বকাপে আট বা তার বেশি গোল করার কীর্তি গড়েছেন। গোলসংখ্যায় এমবাপ্পে এগিয়ে গেলেও বিশ্বকাপ ইতিহাসে সর্বোচ্চ অ্যাসিস্ট (১২টি) এবং সর্বোচ্চ ম্যাচ খেলার রেকর্ড এখনো মেসির দখলে। মেসির বিশ্বকাপ গোলসংখ্যা ২১ এবং এমবাপ্পের ২২। মেসি সত্যিই অনন্য।

লেখক : বর্তমান সরকারের প্রধান তথ্য কর্মকর্তা ও সাবেক সাধারণ সম্পাদক, জাতীয় প্রেস ক্লাব

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন