৩৬ জুলাই ও ইসলাম

৩৬ জুলাই ও ইসলাম

‎জুলুম কখনো দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারে না। জালিমকে আল্লাহতায়ালা ছাড় দেন কিন্তু ছেড়ে দেন না। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘আর কারুন, ফেরাউন ও হামানকে (আমি ধ্বংস করেছি) তাদের কাছে মুসা গিয়েছিল প্রমাণাদিসহ। এরপরও তারা জমিনে অহংকার করেছিল; কিন্তু তারা (আমার আজাব) এড়াতে পারেনি। এদের প্রত্যেককেই তাদের অপরাধের কারণে আমি পাকড়াও করেছিলাম। তাদের কারো প্রতি আমি প্রেরণ করেছি প্রস্তরসহ প্রচণ্ড বাতাস, কাউকে পাকড়াও করেছে বিকট আওয়াজ, কাউকে আমি বিলীন করেছি ভূগর্ভে এবং কাউকে করেছি পানিতে নিমজ্জিত। আল্লাহ এমন নন যে, তাদের ওপর জুলুম করবেন বরং তারা নিজেরা নিজেদের ওপর জুলুম করত।’ (সুরা আনকাবুত : ৩৯-৪০)

‎‎এই আয়াতের দিকে লক্ষ করলে জালিম তথা স্বৈরশাসকের শেষ পরিণতি সম্পর্কে বোঝা বেশখানিকটা সহজ হয়ে যায়। ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানে ৩৬ জুলাই তথা ৫ আগস্ট সেই বাস্তবচিত্র আমাদের সামনে তুলে ধরেছে। শাসকের জুলুম যত বাড়তে থাকবে, ফুরোতে থাকবে তার শাসনকাল, ঘনিয়ে আসে লাঞ্ছিত হওয়ার সময়। হাদিসে নববিতে রাসুল (সা.) বলেন, ‘নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ জালিমকে অবকাশ দিয়ে থাকেন। অবশেষে তাকে এমনভাবে পাকড়াও করেন, সে আর ছুটে যেতে পারে না।’ (বুখারি : ৪৬৮৬)

বিজ্ঞাপন

‎‎৩৬ জুলাই এমনি এমনি আসেনি। এর পেছনে রয়েছে হাজারো অন্যায়-অত্যাচার, জুলুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম, মাজলুমের আত্মচিৎকার আর ইসলামবিদ্বেষী কর্মকাণ্ড! কোটা আন্দোলন দিয়ে শুরু হলেও শত শত হত্যাকাণ্ডের পর আন্দোলনের গতিপথ পরিবর্তিত হয়ে রূপ নেয় স্বৈরাচারী সরকার পতনের আন্দোলনে।

‎‎৫ আগস্ট দেশের মানুষ শুধু রাজপথেই নামেনি; সালাত, জিকির আর অশ্রুসিক্ত প্রার্থনায় তারা রবের সাহায্য চেয়েছিল। অনেকে রোজা রেখে, সালাতুল হাজত আদায় করে বেড়িয়েছিল ‘লংমার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের জন্য। আর যখন স্বৈরাচার হাসিনার পতন হয়, তাকবির আর সিজদার মাধ্যমে সবাই মহান রবের দরবারে অশ্রুসিক্ত নয়নে শুকরিয়া আদায় করেছিল। রাস্তায় রাস্তায় মুজিব-মূর্তি ভাঙা হয়েছিল তাকবির ধ্বনি ‘আল্লাহু আকবার’ বলার মাধ্যমে। এ যেন শিরক মূলোচ্ছেদ করার একটি ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস।

‎‎দেশের আইন যেখানে প্রণিত হয়, সেই মহান জাতীয় সংসদে প্রবেশ করে ছাত্র-জনতা তাকবির, অশ্রুসিক্ত প্রার্থনা আর সুরা নাসর তিলাওয়াতের মাধ্যমে উদযাপন করেছিল এ বিজয়। ‎‎মাজলুমদের এই বিজয় মনে করিয়ে দেয় পবিত্র কোরআনের সেই আয়াত, যাতে নবীজিকে লক্ষ করে আল্লাহতায়ালা বলছেন, ‘বলুন, হে আল্লাহ, রাজত্বের মালিক, আপনি যাকে চান রাজত্ব দান করেন, আর যার থেকে চান রাজত্ব কেড়ে নেন এবং আপনি যাকে চান সম্মান দান করেন। আর যাকে চান অপমানিত করেন, আপনার হাতেই কল্যাণ। নিশ্চয়ই আপনি সবকিছুর ওপর ক্ষমতাবান।’ (সুরা আলে ইমরান : ২৬)

আল্লাহতায়ালা জালিমদের পরিকল্পনা, স্বপ্ন ও দুনিয়াবি ক্ষমতাকে মাকড়সার জাল বোনার সঙ্গে তুলনা করেছেন। মাকড়সা অত্যন্ত সুনিপুণভাবে জাল বোনে। অনেক পোকামাকড় তার জালে ধরা পড়ে জীবন হারায়, তার খাদ্য হয়। সে হয়তো ভাবে খুব শক্তিশালী জাল সে বুনেছে। জালিমদের অবস্থাও তাই। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘যারা আল্লাহ ছাড়া অন্যদের অভিভাবক হিসেবে গ্রহণ করে, তাদের দৃষ্টান্ত মাকড়সার মতো, যে নিজের জন্য ঘর বানায় আর নিশ্চয় সবচেয়ে দুর্বল ঘর হলো মাকড়সার ঘর, যদি তারা জানত।’ (সুরা আনকাবুত : ৪১)

‎‎সর্বকালের সব শাসকগোষ্ঠীর এই চিরন্তন সত্যকে ধারণ করতে হবে যে, আসমানগুলো, পৃথিবীসহ সমগ্র বিশ্ব জগতের সর্বময় ক্ষমতার প্রকৃত মালিক আল্লাহতায়ালা। প্রকৃত রাজত্ব, বাদশাহি ও সম্মান তারই। তিনি যাকে চান সম্মান ও ক্ষমতা দান করেন, যাকে চান ক্ষমতাচ্যুত করেন, অসম্মানিত করেন।

‎‎তাই শাসক যেন ন্যায়পরায়ণ হয়, কারণ কিয়ামতের ময়দানে সাত শ্রেণির মানুষকে আরশের নিচে ছায়া দেওয়া হবে, এর মধ্যে প্রথম শ্রেণি হলো ন্যায়পরায়ণ শাসক; শাসক যেন ইসলামকে ধারণ করে, তাকওয়াবান হয়। তবেই আমরা সেই কাঙ্ক্ষিত সোনালি দিন ফিরে পেতে পারি, যার ভিত্তি হবে ইনসাফ।

লেখক : ‎শিক্ষার্থী, আল-কোরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন