সিরিয়া ও পূর্ব ভূমধ্যসাগরে ইসরাইল যদি সুস্পষ্ট ‘রেড লাইন’ নির্ধারণ না করে, তাহলে তুরস্কের সেনাবাহিনী ও নৌবাহিনী ইসরাইলের উত্তরাঞ্চলীয় ও সামুদ্রিক সীমান্তের দিকে আরো অগ্রসর হবে।
এক জ্যেষ্ঠ ইসরাইলি গোয়েন্দা কর্মকর্তার বরাতে দিয়ে এমন সতর্কতার কথা তুলে ধরে ইসরাইলভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য জেরুজালেম পোস্ট। ওই গোয়েন্দা আশঙ্কা করেন, ভবিষ্যতে গোলান মালভূমিতে তুরস্কের ট্যাংক এবং কায়সারিয়ার উপকূলের কাছে তুর্কি যুদ্ধজাহাজের মুখোমুখি হতে পারে ইসরাইল।
এই সতর্কবার্তাটি ২০২৫ সালের নাগেল কমিশনের প্রতিবেদনে (যেটি ইসরাইলের নিরাপত্তা বাজেট এবং সৈন্য সমাবেশ মূল্যায়ন করেছিল) প্রকাশিত উদ্বেগেরই প্রতিধ্বনি, যেখানে তুরস্ককে অটোমান-যুগের আধিপত্যবাদী আঞ্চলিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার দিকে অগ্রযাত্রা করছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, ‘সিরিয়া থেকে আসা হুমকি ইরানের হুমকির চেয়েও ভয়ংকর কিছুতে রূপ নিতে পারে। আঙ্কারা এবং তুরস্কের মিত্র সিরীয় প্রক্সি ও সেনাবাহিনীগুলোর সঙ্গে সরাসরি সংঘাতের জন্য ইসরাইলকে প্রস্তুত থাকতে হবে।’
এই হুমকির কারণেই উত্তর সিরিয়ার ইদলিবের কাছে একটি বিমানঘাঁটিতে ইসরাইল বিমান হামলা চালিয়েছে। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, তুরস্ক ইসরাইলি বিমানবাহিনীর উত্তরাঞ্চলীয় অভিযান বাধাগ্রস্ত করার জন্য রাডার ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা স্থাপনের চেষ্টা করছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।
প্রতিবেদনটির ভাষ্য অনুযায়ী, ওই হামলার মাধ্যমে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোয়ান এবং তার সিরীয় মিত্র আহমেদ আল-শারাকে পিছু হটার বার্তা দেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, এরদোয়ান সৌদি আরব, পাকিস্তান ও কাতারকে নিয়ে একটি জোট গড়ে তুলছেন (যেখানে মিশরেরও কিছু ভূমিকা রয়েছে)। আর এই জোটটির মধ্যে তীব্র আমেরিকা ও ইসরাইল-বিরোধী মনোভাব রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। এখানে আরো দাবি করা হয়েছে, এরদোয়ান ন্যাটোকে প্রতিস্থাপন করার উদ্দেশ্যে একটি ইসলামী কনফেডারেশনের জন্য একটি আদর্শ সংবিধানের খসড়াও তৈরি করেছেন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতে, এরদোয়ানের সামরিক বাহিনী এ বছর ইসরাইলের বিরুদ্ধে ইরানের যুদ্ধে যোগ দিতে প্রস্তুত ছিল, তবে ট্রাম্প এরদোয়ানকে তা না করার জন্য অনুরোধ করেন।
প্রতিবেদনে এরদোয়ানের ইসরাইলবিরোধী অবস্থান এবং তুরস্কের রাশিয়া, চীন ও ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতারও সমালোচনা করা হয়েছে। একই সঙ্গে বলা হয়েছে, তুরস্ক উত্তর সাইপ্রাস ও উত্তর সিরিয়ায় দীর্ঘমেয়াদি সামরিক উপস্থিতি বজায় রেখেছে এবং ইসরাইলের বিরুদ্ধে কূটনৈতিক ও সামরিক চাপ বাড়াচ্ছে।
ইসরাইল আনুষ্ঠানিকভাবে তুরস্ককে শত্রু রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করেনি এবং তা করতে চায়ও না বলে দাবি করা হয়েছে। তবে তুরস্কের সামরিক শক্তি বৃদ্ধি এবং সিরিয়ায় তার প্রভাব ও সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর বিষয়টি ইসরাইল উপেক্ষা করতে পারবে না বলে প্রতিবেদনে মন্তব্য করা হয়েছে।
তুরস্কের নৌবাহিনী নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। দেশটির কাছে কয়েক ডজন ফ্রিগেট, ডেস্ট্রয়ার ও উভচর অবতরণযান এবং ১২টি সাবমেরিন রয়েছে। আরও ছয়টি সাবমেরিনের পাশাপাশি ২৪টি নতুন ফ্রিগেট ও ডেস্ট্রয়ার নির্মাণ করা হচ্ছে।
তুলনায় ইসরাইলের নৌবাহিনীতে ১৫টি ক্ষেপণাস্ত্রবাহী জাহাজ, ছয়টি সাবমেরিন ও প্রায় এক ডজন ক্রুজার রয়েছে।
প্রতিবেদনে তুরস্কের ক্ষেত্রে ‘পারস্পরিকতার নীতি’ প্রয়োগের আহ্বান জানানো হয়েছে। দেশটির সঙ্গে চুক্তিগুলোকে তার পররাষ্ট্রনীতি ও সামরিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করার কথাও বলা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, এরদোয়ানকে তার যোগ্য স্থানে নামিয়ে আনা প্রয়োজন এবং তার উন্মত্ত ও হিংস্র পররাষ্ট্র ও সামরিক নীতিগুলোকে নিয়ন্ত্রণে আনা দরকার। যেসব আমেরিকান ও ইউরোপীয় নেতা এই অঞ্চলে স্থিতিশীলতাকে অগ্রাধিকার দেন, তাদের উচিত তার অতি উচ্চাভিলাষী ও আগ্রাসী পরিকল্পনাগুলোর বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়া।
এমএমআর
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


